সতের

 খুব দূর পথে প্রবাস যাত্রা সেই আমার প্রথম। বি এন্ আরএর বোম্বাই মেলে বারশ’ মাইল পথ—মেদিনীপুরে শালবনীর ঢেউ খেলান মাঠ, চিল্কা হ্রদের রজত মায়া, সিংহাচলমের কুর্ম্ম পৃষ্ঠ, ইনাৎপুরীর টানেল ও বনকুন্তলা গিরিবালাদের মেলা, বোম্বাইএর বিচিত্র জনসমারোহ ও তার পর বরোদা। পরেও এ পথে বার বার গিয়েছি এসেছি, কিন্তু এমন অজানার পথের ভয় বিস্ময় আনন্দ পুলক নিয়ে আর কখনও যাইনি। ষ্টেশন থেকে রিকশ’তে করে বেরিয়ে বরোদা কলেজের গুম্বজওয়ালা প্রকাও প্রাসাদ বাঁয়ে ফেলে সহরের দিকে যাত্রা করলুম। যখন মহারাজার অতিথি হয়ে সিষ্টার নিবেদিতা বরোদায় এসেছিলেন তখন বড় বড় রাজকর্ম্মচারীর সঙ্গে শ্রীঅরবিন্দ তাঁকে সম্বর্দ্ধনা করে আনতে যান। এইখানটায় এসে কলেজের বাড়ী দেখে নিবেদিতা বলেন “what an ugly pile— কি কদাকার স্তুপ”, আর তারপর একটু খানি এগিয়ে পুরাণো ভারতীয় ষ্টাইলে গড়া গৃহস্থের ছোট্ট বাড়ী দেখে বলেন, “oh! how beautiful, আহা কি সুন্দর!” কলাজ্ঞানে ক’ অক্ষর গোমাংস হ্যাটকোটধারী রাজ-অমাত্যরা তো অবাক! এত লাখ লাখ টাকার মিনার গুম্বোজওয়ালা বাড়ী হলো কদাকার আর একটুখানি কুঁড়ে হলো সুন্দর! একজন তো অরবিন্দের কাছে এসে কানে কানে বলেই ফেললেন, “I say, she is mad!” “ওহে! উনি তো পাগল!” সেজদা’ অরবিন্দ তখন বরোদা কলেজের ভাইস প্রিলিপাল কি মহারাজার প্রাইভেট সেক্রেটারী তা’ আমার স্মরণ নেই, সেটা কিন্তু ধর্ত্তব্যের মধ্যে নয়, কারণ যে পদে যেখানেই সেজদা’ থাকুন তাঁর সাহায্য ও পরামর্শ বিনা গায়কোবাড়ের একদিনও চলতো না। মহারাজার লক্ষ্মীবিলাস প্রাসাদ থেকে অল্প দূরেই কলেক্টর ‘নায়েব সুবা খাসি রাও’এর প্রকাণ্ড দোতলা লাল ইঁটের বাড়ীতে অরবিন্দ তখন থাকতেন। বরোদার ইঙ্গভারত রাজ অমাত্য সমাজে তাঁর তখন অসীম প্রভাব, বন্ধুরা সব মেজাজে ও বেশ ভূষায় সাহেব, অধিকাংশই বিলাত ও যুরোপ ফেরতা finished gentleman। তাঁদের কেতাদুরস্ত সভ্য সমাজে অকস্মাৎ অতি প্রত্যূষে উদয় হ’লো এক অদ্ভূত জীব ময়লা সার্ট ও ধুতি পরা, ছেঁড়া ক্যাম্বিসের ব্যাগ হাতে, ততোধিক ধূলো ময়লামাখা ক্যাম্বিসের জুতো পায়ে এক ভবঘুরে যুবক, চোখে তার নেশা, তাজা প্রাণে অনন্ত আশা, দুনিয়া তার কাছে অর্দ্ধেক রাজ্য ও রাজকন্যা লোভী রাজপুত্রের স্বপ্নের মত আর চেহারা ও বেশভূষা তো ঐ রকম সৃষ্টিছাড়া লক্ষ্মীছাড়া বেদেমার্কা। সেজদার খানসামা তো আমায় দেখে অবাক! ‘ঘোষ সাহেবকা ভাই’ শুনেও বোধ হয় তার চটক ভাঙ্গল না, বিশ্বাস হ’লো না, নীচেই আমাকে বাহিরের ঘরে বসিয়ে রেখে সে চললো ওপরে খবর দিতে।

 সেজদা’ বেলা আটটা অবধি তখন ঘুমোতেন, তিনি সশব্যস্তে এসে “একি তুমি এখানে, এ ভাবে! শীগ্‌গির বাথরুমে যাও, কাপড় ছাড়ো, কাপড় ছাড়ো” বলে আমায় ঠেল্‌তে ঠেল্‌তে ওপরে চালান করে দিলেন, যাতে সেই উদ্‌ভ্রান্ত প্রেমিকের অবস্থায় খাসি রাও ও মাধব রাও-রা আমাকে দেখে না ফেলেন। সাবান ও তোয়ালের সাহায্যে চার দিন ও চার রাতের কয়লার গুঁড়ো এবং ধূলোর খোলসটি ত্যাগ করে সেজদার একটা সার্ট ও ও ফরসা ধুতি পরে বাবরি চুলটা রাবীন্দ্রিক কেতায় আঁচড়ে যখন বাইরে এলুম তখন সবাই কথঞ্চিৎ আশ্বস্ত, ক্রমে ক্রমে dining roomএ যাদব ভ্রাতার সঙ্গে দেখা। খাসি রাও “Well young man” ইত্যাদি সাহেবী সম্ভাষণে আমায় মাতব্বরী চালে পিঠ চাপ্‌ড়ে সম্বর্দ্ধনা করে নিলেন। মাধব রাও কোন দিনই ততখানি সাহেব হতে পারেন নি, বরোদা সেনা বিভাগের একটি রেজিমেণ্টের এডজুট্যাণ্ট এই শ্যামবর্ণ শান্তশ্রী দেখন-হাসি মানুষটী প্রথম দর্শনেই আমার বন্ধু হয়ে পড়্‌লেন, সেটা বলাই বাহুল্য।

 তারপর আরম্ভ হলো বরোদার নতুন জীবন যার সম্বল হ’লো কবিতা লেখা, নভেল পড়া, সব্জীবাগ আর শিকার। সেজদাকে অনেক ইঙ্গিত-ইসারা দিয়েও বাঁকিপুরের চায়ের দোকানের জন্যে টাকা বের হ’লো না, তিনি স্পষ্ট ‘হাঁ’ ‘না’ কিছুই না বলে ‘বোবার শত্রু নেই’ নীতিটি অনুসরণ করে যেতে লাগ্‌লেন। টাকার সম্বন্ধে সেজদা’র কস্মিন কালে মায়া ছিল না, কিন্তু যেটা পছন্দ করতেন না সেটার সিদ্ধির উদ্দেশ্যে উপুড়হস্ত হবার পাত্র তিনি নন। ব্যাপারখানা বুঝে আমি দোকানী জীবনের যবনিকা তোলার আশায় জলাঞ্জলি দিয়ে বরোদায়ই বসে রইলুম। রাঙা মা আমার সেখানে আশা-নিরাশার উৎকণ্ঠায় একা পড়ে তাঁর হারানো চোখের মণিটিকে মোরিয়া হয়ে বার বার করুণ পত্রাঘাত কর্‌তে লাগলেন।

 ইতিমধ্যে বাঁকিপুরে প্লেগ আরম্ভ হ’লো। বর্দ্ধমান থেকে আনা চাকরটি প্লেগ হয়ে সেই বিদেশ বিভূঁইয়ে মৃত্যুমুখে পড়লো, মা প্রাণের মায়া ত্যাগ করে তার সেবা-শুশ্রূষায় বসে গেলেন। তখনকার অবস্থা সহজেই অনুমেয়। প্রকাণ্ড ব্রাহ্ম দোকানদার আমাদের ভাঙা দোকানের প্রাপ্য টাকা নিত্য তাগাদায়ও দিচ্ছে না, সহরে ভয়াবহ প্লেগের ত্রাস, ঘরে ঘরে কান্নার আকাশ ফাটা রোল, হাজারে হাজারে মানুষ দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে। ঘরে প্লেগের রুগী শুষ্‌ছে, বন্ধু আত্মীয় বল্‌তে কেউ কোথায়ও নেই, তাঁর অন্ধের যষ্টি সন্তান বার-চোদ শ’ মাইল দূরে বরোদায়। এই সব খবর পেয়ে সেজদা’কে অনেক বলেও ফেরবার রেল ভাড়ার টাকাটুকুও যখন আমি পেলুম না, অগত্যা তখন কলকেতায় বন্ধু সুরেনকে তার করে দিলুম।

 একদিন চাকরটি মারা গেল। অতি কষ্টে তার সৎকারের ব্যবস্থা করে এক বস্ত্রে মা গিয়ে পাল বাবুর শরণ নিলেন, তাঁরা প্লেগের ছোঁয়াচের ভয়ে মাকে উঠানের দুয়ার অবধি ছাড়া আর বেশি ঢুকতে দিলেন না। সৌভাগ্য ক্রমে ইতিমধ্যে সুরেন আমার ও মায়ের তার পেয়ে এসে মাকে কলকেতায় নিয়ে গেল। এইভাবে আমাদের বাঁকিপুরী দোকানী জীবনের পালার ট্র্যাজিডি সর্ব্বস্বান্ত দশার মধ্যে সাঙ্গ হলো আর আমার বরোদার আয়েসী কাব্যি জীবনের হ’লো আরম্ভ।

 বরোদার বাড়ীর অন্দরের দিকে একটি ঘরে পড়লো আমার আস্তানা। সেইখানে কবিতার খাতা, এস্রাজ, বাগানের সরঞ্জাম আর নভেলের কাঁড়ি নিয়ে আমি পাতলুম নতুন করে আড্ডা। দুপুর বেলা খাওয়া-দাওয়ার পর আর রাত্রে খানিকটা সময় সেজদাও এইখানে আমার ঘরে এসে গল্পগাছা করে যেতেন। যখন দিদি ও বৌদি’ বরোদায় থাকতেন তখন তাঁরাও সেই দলে ভিড়ে নীচেই দুপুরের শান্ত কপোত-কূজিত বেলাটুকু কাটিয়ে দিতেন। বাড়ীর পিছনে আস্তাবলের কাছে অনেকটা জমি খালি পড়েছিল, সেইটুকুকে বাঁশের ও বাঁকারীর বেড়ায় ঘিরে নিয়ে আমি কপি, কড়াই শুঁটি ও বিট গাজরের বাগান করে নিয়েছিলুম। আমাদের বাড়ীর এই দিকটার পাঁচিলের ও-পারে বস্তির মাঝে একঘর লোক ছিল; তারা ভাই, বিধবা বোন ও বড় ভাইএর বউ ও তার কাচ্চা-বাচ্চা নিয়ে ক’জনায় মিলে খড়ের কুঁড়েয়ই সংসার পেতেছিল। এই পেটরোগা খোঁড়া ভাই ছিল আমার বাগানের মালি আর শিকারের সঙ্গী। তার ফরসা ছিপ্‌ছিপে বোনটির ছিল তরুণ সৌখীন বাঙালী বাবু আমার ওপর ভারি লোভ, ঘর সংসারের কাজের অছিলায় সে বার বার ঘর-বাহির করতে শুধু আমাকে ঐ ফাঁকে দুচোখ ভরে দেখবার জন্যে। বৈধব্যের নিরস গৃহকর্ম্মরত এক ঘেয়ে জীবনে সে বোধহয় ঠিক মনের মানুষ কখনও পায় নি, ধনী বাঙালী যুবকের রহস্যময় অজানা সঙ্গ তার প্রাণকে হাতছানি দিয়ে সদাই ডাকতো, সেই ডাকের টানের সুখে অস্থির হয়ে চঞ্চল পদে তৃষিত নেত্রে তার আসা-যাওয়া ও দুয়ার ধরে আমার দিকে চেয়ে থম্‌কে থাকার আর অন্ত ছিল না; তার মন ভোলাবার মুচকি হাসিটুকু কৃষিকর্ম্মরত আমাকেও তার দিকে না চাইয়ে ছাড়তো না। গ্রামা বিধবা গুজরাটী বালিকার এই নীরব আত্মনিবেদন আর আমাদের দু’জনের ব্যর্থ ব্যাকুল চাওয়া-চাওয়ি সেই ভাঙা পাঁচিটাকে আড়াল করে কি গুঞ্জনই তুলতো!

 এক এক দিন খুব ভোরে চারটের সময় উঠে আমি বের হতুম শিকারে। মাধব রাও আমাকে একটি ব্রিচলোডিং বন্দুক এ একটা ছোট্ট স্পোর্টিং রাইফেলও দিয়েছিলেন। একটা বেতের বাস্কেটে চায়ের সরঞ্জাম ও Sandwitch নিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়তুম মাঠের পথে। তখন হয়তো দিনের আলোর আভাষও জাগে নি, তবু শেষ রাতের অন্ধকারে আমার দূর পদধ্বনির সাড়া পেয়ে গাছের কালো তাল পাকানো ছায়ামূর্ত্তির মাঝ থেকে পাখীরা দু’ একজন সাড়া দিচ্ছে ও পাখা ঝাপটাচ্ছে। রিক্ত মাটিফাটা ধান ক্ষেতের আলে আলে এখানে ওখানে যে সব পলাশ, বাবলা বা ঘন পাতার বুনো গাছ ঝোপ হয়েছিল তার কাছে গুলি-ভরা বন্ধুক হাতে আমরা চুপি চুপি এসে দাঁড়াতুম। কোথায় তাল পাকানো পাতার মাঝে তিতির ডাকছে, পাশাপাশি ঘেঁষাঘেঁসি দু’টিতে কোথায় বসে ডানা ঝাপটাচ্ছে, তা’ কান খাড়া করে ডাকটি শুনে দেখে ঠাহর কর্‌তে হবে। তারপর ঊষার স্তব্ধ স্নিগ্ধ আকাশ ফাটিয়ে একটা বিকট শব্দ আর পাখা ঝটাপটি কর্‌তে কর্‌তে একটার ঝোপের মধ্যে ঢুকে যাওয়া এবং হাত পা ডানা গুটিয়ে আর-একটার ঢিপ করে মাটিতে পড়া। লুব্ধ শিকারীর নিষ্ঠুর মন বুঝতো না কতখানি অশান্তি ও বীভৎসতায় সেই স্নিগ্ধ প্রসন্ন নিবিড় ঊষাকে মলিন করে তুলছি।

 রাঙা জবার মত সূর্যি পূব আকাশ রাঙিয়ে উঠলে পর আমরা পথ চলতে শুরু করতুম বাবলা গাছে ঘুঘু মারতে মারতে, পুকুরের পদ্মনাল ও পানফলের লতার মাঝে কাদা খোঁচা জলটুঙি পানকৌড়ির ছোট্ট চঞ্চল জীবনটি হঠাৎ ঘুচিয়ে দিতে দিতে, আকাশে উড়ন্ত বেলে হাঁসের পালে প্রাণঘাতী ছররা ছেড়ে তাদের দু’ একটাকে লাট খাইয়ে পেড়ে ফেলতে ফেলতে। ছররা খেয়ে বুনো পায়রা পড়তো অনেকটা দূর উড়ে গিয়ে হঠাৎ হাত পা গুটিয়ে টুপ করে, কাদা খোঁচা আর উড়তো না— সেইখানেই সে পড়তো ছোট্ট তার ছাই রঙের পাখা দু’টি কাঁপিয়ে লুটিয়ে লুটিয়ে, বড় সারস পড়তো লম্বা পা দু’টো দুম্‌ড়ে গিয়ে প্রকাণ্ড তার পাখা এলিয়ে মাতালের মত টলতে টলতে, আকাশে উড়ন্ত বেলে হাঁস পড়তো উল্টো ডিগবাজী খেয়ে ঝুপ করে। সারস বা বড় মেছো পাখীর মুমূর্ষু অবস্থায় তার রাঙা চোখে কি বিলোল ভয় ও উদ্বেগ যে দেখেছি—সে যেন একটা রঙীন স্বপ্নের সাজানো বাগান হঠাৎ লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে, যেন কোথায় লক্‌লকে অগ্নিশিখায় কার প্রাণ পুত্তলী সীতা পুড়ছে বলে চারদিকে উঠেছে করুণ কান্নার ঝড়, যেন ভয়-সন্ত্রস্ত ঊনপঞ্চাশটা পাগল দারুণ প্রাণের মায়ায় ছটফট করে ছুটে বেড়াচ্ছে সেই বিলোল রাঙা চোখের টলটলে দৃষ্টিতে।

 বেলা নয়টায় আন্দাজ আমরা কোন বাঁশ ঝাড়ের ছায়ায় শুকনো কঞ্চি জড়ো করে আগুন জ্বালতুম, আর ঘটিতে করে জল ফুটিয়ে চা তৈরী করে তার সঙ্গে মাংস রুটির sandwich খেতুম। তারপর শিকার করতে করতে দুপুরের রোদ মাথায় উঠলে কোন ঘন আম গাছের ছায়ায় অঙ্গ মেলে দিয়ে একটু বিশ্রাম এবং বেলা তিনটা থেকে সন্ধ্যা অবধি পুনরপি নিরর্থক নির্ম্মম প্রাণীবধ ও টো টো করে মাঠ ঘাট বন বাদাড় নদী তীর ধানের ক্ষেত চষে বেড়ানো। বাড়ী ফিরতে হতো রাত আটটা, তখন শিকারীর ঝোলায় হয়তো মরা, আধমরা, ডানা ভাঙ্গা, পা-দুমড়ানো এমন গোটা চল্লিশেক পাখী জমে গেছে। বাড়ীতে ফিরে ঝোলা উপুড় করবা মাত্র তারা সব খোঁড়াতে খোঁড়াতে ডানার ভরে ঝুপ ঝাপ ঝটাপট করে ঘরের কোণে কোণে ছুটাছুটি করতো। তা’ দেখে দিদির মায়ার প্রাণে এত আঘাত লাগতো যে দিদি আমার এমন মুখরোচক করে রাঁধা মাংস মোটেই মুখে দিত না।

 বরোদা থেকে অজয় নদী বোধ হয় ১৫।১৬ মাইল দূর, যাওয়া আসায় এই ত্রিশ মাইল হাঁটা ও খালে বিলে বনে বাদাড়ে পাখী মারার পর সে যে কি সুখনিথর শ্রান্তি ক্লান্তি নিয়ে বাড়ী ফেরা যেত, পা যখন আর উঠতে চাইছে না, এলিয়ে পড়া শরীর কেবল খুঁজছে একটা নরম বিছানা আর দু’চোখ ভরে ঘুম। তখনকার শিকারের সে পাগল টান এখন আর কল্পনায়ও ভাবা যায় না।

 একদিন পাখী মারতে মারতে একদল বুনো শুয়োরের পালের সামনে পড়ে গেছলুম। কি আর করা যাবে, হাতে রাইফেল নেই, ছর্‌রা দিয়ে তো আর নারায়ণের সে বিরাট রূপকে পেড়ে-ফেলা চলে না। একদিন একদল ময়ূরীর পিছনে পিছনে ঝোপে ঝাপে লুকোচুরি খেলেও এক ঘণ্টার মধ্যে একটাকেও মারতে পারি নি। অজয় নদীর মাঝে চরে চরে সন্ধ্যার পর নানা রকম ছোট বড় মাঝারি এবং অতিকায় পাখীর এক একটা প্রায় দশ বার হাজারী ঝাঁক নামতো। তাদের কলরবে কান পাতা শক্ত হ’তো, পরস্পরের কথাবার্ত্তা অবধি শোনা যেত না। সে সময়ে চড়ার কাছে শিয়াল বা কোন বন্য পশু গেলে নাকি ঐ পাখীর দল তাকে ঠুকরে ঠুকরে সাবাড় করতো। কোন নৌকাওয়ালা মাঝিকে আমি সন্ধ্যার পর চরের কাছে যেতে রাজী করাতে পারি নি। এক একটা পাখী আকারে এত বড় যে, দেখতে উট পাথীর মত, এত ভারি যে, তারা উড়তে হলে বিশ পঁচিশ হাত ছুটে গিয়ে তবে আকাশে উঠতে পারে; গায়ে তাদের তীব্র আঁস্‌টে গন্ধ, পা দু’টো খুব উঁচু ও মোটা, দেহখানা দু’ তিন মণ ওজনে, মাংস নাকি খুব মুখরোচক। আমার ছোট রাইফেলের গুলি তারা শরীরে নিয়ে অনায়াসে অট্টহাস্য করতে করতে উড়ে চলে যেত।

 মাধব রাওয়ের দেওয়া এই রাইফেল ও ব্রিচ লোডিং বন্দুক দু’টো এনে পুজোর ছুটিতে দেওঘরেও আমি দাড়োয়া নদীর ধারে মাঠে ঘাটে পাখী শিকার করেছি। মুখরোচক পাখী মেরে এনে একটু মাখন, দু’ একটা গোলমরিচ ও কিছু আস্ত গরম মশলা এবং পরিমিত পরিমাণে নুন চিনি দিয়ে Jng-soupএর পাত্রে মুখ এঁটে গরম জলে ফুটিয়ে নিতুম, সেই উপাদেয় মাংস সেজদা’ খেতেন। এই পাখী ও পশু শিকারের বায়ু গিয়ে শেষ হ’লো কিনা শেষটা মানুষ শিকারের আসুরিক কাণ্ডে।