কিশোরদের মন/ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ


ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

 বিমল ফিরেছে।

 কিন্তু ইস্কুল খোলার মাসখানেকের পর, ক্লাসে ভারি একটা ওলোট পালোট দেখা যাচ্ছে।

 First বেঞ্চের শেষ সিটে—সুবিনয়।

 আর ঝম্‌ঝম্‌ বৃষ্টিতে ভিজে এসে, বিমল, লাষ্ট্‌ বেঞ্চির শেষে বসে আছে।

 কতক্ষণ পরে সে ছুটি নিয়ে চলে গেল।

 ইস্কুলের ডিবেটিং ক্লাবের মিটিংএর শেষে, বক্তৃতার ইংরেজীর একটা গ্রামারের কোশ্চেন নিয়ে, ঘোর তর্কাতর্কি হয়। তাতে ইস্কুলে দুটাে দল হয়ে যায়। কিন্তু সে তর্কের মীমাংসা হল না।

 সুবিনয় আর বিমল, সেই দিন দু’জনে দুই দলে পড়ে’ যায়।

 তার থেকে, একদিন বেড়াতে বেড়াতে কথায় কথায় ঐ বিষয়টি নিয়েই দু’জনে আরও একটুকু তর্ক বেধে গেল।

 তারা নদীর ধারে বেড়াচ্ছিল। নদীর যেমন অসংখ্য ঢেউ আর ঢেউগুলো যেমন উঁচু নীচু, তাদের তর্কও তেমনি ক্রমে অফুরন্ত হয়ে একটু একটু ক’রে নরম-গরম হয়ে উঠ্‌ল।

 বিমল বল্‌লে,—“মেনে নিতে পারি তোর কথাটাই, যদি একটা উপযুক্ত প্রমাণ পাই।”

 সুবিনয়ও বল্‌লে,—“মান্‌তে পারি তোর কথাই, যদি তার কোনো খাঁটি প্রমাণ থাকে।”

 প্রমাণ ত মিটিংএই অনেক উঠেছিল, কিন্তু মীমাংসাতে তার কোনোটাই টেঁকে নি। এখন প্রমাণ দুজনেই যা দিলে, তাতে তর্ক আরও ক্রমে বেড়েই চল্‌ল।

 আর হতে হতে এই তর্কের ফল এমন হল যে, শেষে দুজনের কথাবার্ত্তা বন্ধ হয়ে গেল।

 নদীর ধার দিয়ে দুজনে এক সঙ্গেই এল। একই ঝির্‌ঝিরে বাতাসে। কিন্তু তা’পর দুজনে দুদিকে চলে গেল।

 বিমল থাক্‌ত তার পিসীমার বাড়ীতে, সহরের আর একটা পাড়াতে।

 বিমল যদি কোনোদিন সুবিনয়দের বাড়ীতে না যেত, ত পরদিন ভোরেই সুবিনয় তার ওখানে আস্‌ত।

 এমন একটি দিনও যায় নি, দুজনে যেদিন দেখা না হয়েছে।

 কিন্তু আজ দুমাস হল, কেউ কারো বাড়ীতে যায় না।

 মা জিজ্ঞেস্‌ কর্‌তে এলে সুবিনয় পড়ার বই নিয়ে খুব শক্ত হয়ে পড়্‌তে বসে।

 মা বলেন,—“তোদের হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষে বুঝি খুব কাছে খোকা?”

 “হ্যাঁ মা, বেশি দেরী নেই।” বলে’ তাড়াতাড়ি সুবিনয় জোরে জোরে পড়্‌তে আরম্ভ করে।

 আর যখন মণ্টু আর রেণু আসে, তখন আলমারি থেকে সবগুলো ছবির বই তাদের বের করে দিয়ে, আর তাদের ঘোড়া, পুতুল, বাক্স, সমস্ত ঘরের মধ্যে নিয়ে এসে, বলে,—“আয় তোরা এইখেনে খ্যাল্‌।”

 রেণু বলে—“বিমলদা আসুক আগে!”

 মণ্টু—লাঠিটে হাতে, আর জুতো পর্‌তে পর্‌তে বলে,

 —“আসুক আগে”

 শেষে, বিমলদা না আসাতে তাদের যা খেলা হয়, তাতে ঘরখানির অবস্থা দেখে কান্না পায়।

 নয় ত, তাদের দু জনকে দু’ পাশের সোফার উপরে ঘুমিয়ে থাক্‌তে দেখে, খেলার জিনিষগুলোরো কান্না পায়।

 বাইরে রাত আরো অন্ধকার হয়ে যায়।

 সুবিনয় ওদেরে বুকে করে তুলে নিয়ে মার কাছে দিয়ে আসে। আর নয় মানুয়াকে বলে— “ওদের খাটে ওদের শুইয়ে দিয়ে হাওয়া করে’ ঘুম পাড়া মানুয়া!”

 সুবিনয় আজ কাল রাতের এগারোটারও পর পর্য্যন্ত পড়্‌তে থাকে।


 এদিকে বিমল, গঙ্গাস্নানে মা আস্‌বে কি না, এই বিষয় নিয়ে কত রকমের আলোচনা করে’ ক’খানা চিঠি লিখে রেখেছে, কিন্তু তার একখানাও তার ডাকে দেওয়া হয় নি।

 বিমল পড়ে, ইস্কুলে যায়, কিন্তু বিকেল পাঁচটার পর থেকেই তার মনে হয়, পৃথিবীটে যেন মুছে ফেল্‌তে রাত্রি এখনি এসেছে।

 মুগুর ভাঁজা সে ছেড়ে দিয়েছে। সে খেল্‌তে যায়, কিন্তু একটা কলের খেলোয়াড় বানিয়েও যদি fieldএ নামিয়ে দেওয়া যেত, বোধ হয় অমন করে, সেটাও অতবার ভুল করত না।

 বাসায় আসার পথে, পাল্কী-বেয়ারাদের কুঁড়েগুলোর সাম্‌নে আগুনের ধূনীর চারদিক ঘিরে ধুলো উড়িয়ে যে ছেলেগুলো নাচ্‌ছে, সে হয়ত হঠাৎ তার দু একটাকে ধরে’ কাঁধে উঠিয়ে নেয়।—বেয়ারারা হুঁকো কল্‌কে তাড়াতাড়ি নামিয়ে মোড়া এগিয়ে দিয়ে বলে—

 “বাবুজী, পের্‌ণাম; বৈঠিয়ে, বৈঠিয়ে!”

 কিন্তু বিমলের ভুল ভাঙ্‌তেই বিমল আস্তে তাদের নামিয়ে দিয়ে, প্রণামের উত্তর রেখে, তাড়াতাড়ি চুপ্‌ করে’ চলে যায়।