গৌড়রাজমালা/গৌড়াধিপ শশাঙ্ক


 মহারাজাধিরাজ যশোধর্ম্মের পরলোক গমনের পর, কে যে উত্তরাপথের সার্ব্বভৌম নরপতির পদ লাভ করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন, অথবা কেহ সমর্থ হইয়াছিলেন কিনা, তাহা বলা কঠিন। খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দের শেষার্দ্ধে, যে সকল নরপাল বিদ্যমান ছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে কেবল মৌখর বা মৌখরি-বংশীয় ঈশানবর্ম্মা এবং তদীয় পুত্ৰ শর্ব্ববর্ম্মাকে “মহারাজাধিরাজ” উপাধিতে ভূষিত দেখিতে পাওয়া যায়।[১] মৌখর-বংশীয় “মহারাজাধিরাজগণের” প্রভাব বাঙ্গালাদেশ পর্য্যন্ত বিস্তার লাভ করিয়াছিল কি না, বলা কঠিন। মগধের অপর গুপ্তবংশীয় কুমারগুপ্তের সহিত ঈশানবৰ্ম্মার যুদ্ধ চলিয়াছিল।[২] ফরিদপুর জেলায় আবিষ্কৃত চারিখানি তাম্রশাসনে যথাক্রমে ধর্ম্মাদিত্য, গোপচন্দ্র, এবং সমাচারদেব নামক তিন জন “মহারাজাধিরাজ” বা সম্রাটের পরিচয় পাওয়া গিয়াছে।[৩] ষষ্ঠ শতাব্দের শেষভাগে স্থানীশ্বরের [থানেশ্বরের] অধিপতি প্রভাকর-বর্দ্ধন উত্তরাপথের পশ্চিম ভাগে স্বীয় প্রাধান্য স্থাপন এবং “মহারাজাধিরাজ” উপাধি গ্রহণ করিয়াছিলেন। ৬০৫ খৃষ্টাব্দে প্রভাকর-বর্দ্ধন সহসা কালগ্রাসে পতিত হইলে, উত্তরাপথের সার্ব্বভৌম নৃপতির পদ লাভের জন্য ভীষণ সমরানল প্রজ্জ্বলিত হইয়াছিল। প্রভাকর-বর্দ্ধনের জামাতা মৌখরি গ্রহবর্ম্মা পাঞ্চালের রাজধানী কান্যকুব্জের সিংহাসনে অধিরূঢ় ছিলেন। প্রভাকর-বর্দ্ধনের মৃত্যু-সংবাদ প্রচারিত হইবামাত্র, মালব হইতে দেবগুপ্ত (?) সসৈন্য কান্যকুব্জাভিমুখে ধাবিত হইয়াছিলেন। মালব-রাজ কান্যকুব্জে উপনীত হইয়া, যুদ্ধে গ্রহবর্ম্মাকে নিহত এবং রাজপুরী অধিকৃত করিয়া, তদীয় পত্নী, স্থানীশ্বররাজ-দুহিতা রাজ্যশ্রীকে, লৌহশৃঙ্খলাবদ্ধ-চরণে কারাগারে নিক্ষেপ করিয়া, স্থানীশ্বর অভিমুখে যাত্রা করিতে উদ্যত হইয়াছিলেন। এই দুঃসংবাদ পাইবামাত্র, প্রভাকর-বর্দ্ধনের জ্যেষ্ঠ পুত্র রাজ্যবর্দ্ধন দশ সহস্ৰ অশ্বারোহী লইয়া, মালব-রাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ-যাত্রা করিয়া, সহজেই মালব-সৈন্যের পরাভব সাধন করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। কিন্তু এই বিজয়ের শ্রান্তি দূর হইতে না হইতে, ভগিনীর কারা-মোচনের পূর্ব্বেই, তিনি প্রবলতর প্রতিদ্বন্দ্বীর সম্মুখীন হইতে বাধ্য হইয়াছিলেন। এই অভিনব প্রতিদ্বন্দ্বী—“গৌড়াধিপ” শশাঙ্ক[৪]

 শশাঙ্কের পূর্ব্ব ইতিহাস সম্বন্ধে আমরা এতই অজ্ঞ যে তাঁহার এবং তাঁহার প্রতিষ্ঠিত গৌড়-রাজ্যের অভ্যুদয় নির্মেঘ-গগনে বিদ্যুৎ-প্রভার ন্যায় একেবারে আকস্মিক বলিয়া প্রতিভাত হয়। “হর্ষচরিত”-প্রণেতা বাণভট্ট শশাঙ্ককে “গৌড়াধিপ”, “গৌড়” এবং কখনও বা বিদ্বেষ-বশত “গৌড়াধম” এবং “গৌড়-ভুজঙ্গ” বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। ইউয়ান্ চোয়াং “কর্ণসুবর্ণের রাজা” বলিয়া শশাঙ্কের পরিচয় প্রদান করিয়াছেন। সংস্কৃত অভিধানে “গৌড়” শব্দের পর্য্যায়ে “পুণ্ড্র”, “বরেন্দ্রী” এবং “নীবৃতি” উল্লিখিত রহিয়াছে।[৫] গৌড়ে বা বরেন্দ্র-দেশে শশাঙ্কের সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপিত হইয়াছিল বলিয়াই, বোধ হয়, তিনি “গৌড়াধিপ” উপাধি গ্রহণ করিয়াছিলেন। তাঁহার রাজধানী “কর্ণসুবর্ণ” রাঢ়দেশে, [মুর্শিদাবাদ-নগরের ১২ মাইল ব্যবধানে] অবস্থিত ছিল বলিয়া স্থিরীকৃত হইয়াছে। যিনি কর্ণসুবর্ণ হইতে কান্যকুব্জ জয়ার্থ যাত্রা করিতে সাহসী হইয়াছিলেন, তিনি যে পূর্ব্বেই বঙ্গ অধিকার করিয়াছিলেন, এবং মগধ ও মিথিলায় প্রাধান্য-স্থাপন করিয়াছিলেন, তাহা নিঃসন্দেহে অনুমান করা যাইতে পারে। সাহাবাদ জেলার অন্তর্গত রোটাস্-গড়ে প্রাপ্ত একটি পাষাণ-নির্ম্মিত মুদ্রার ছাঁচে “মহাসামন্ত শশাঙ্কদেব” উৎকীর্ণ দেখিয়া, কোন কোন পণ্ডিত মনে করেন,—ইহা গৌড়াপিপ-শশাঙ্কের মুদ্রার ছাঁচ। এই অনুমান সত্য হইলে, মনে করিতে হইবে, শশাঙ্ক প্রথমে কোনও সার্ব্বভৌম নরপালের সামন্তশ্রেণী-ভুক্ত ছিলেন; এবং ষষ্ঠ শতাব্দের শেষভাগে, যে সুযোগে পশ্চিমদিকে স্থানীশ্বরের প্রভাকর-বর্দ্ধন এক অভিনব সাম্রাজ্যের ভিত্তি-স্থাপন করিয়াছিলেন, সেই সুযোগে, পূর্ব্বদিকে “লৌহিত্য-নদের উপকণ্ঠ হইতে গহনতালবনাচ্ছাদিত মহেন্দ্ৰ-গিরির উপত্যকা” পর্য্যন্ত বিস্তৃত ভূভাগ বশীভূত করিয়া, তিনি গৌড় রাজ্য প্রতিষ্ঠত করিয়াছিলেন। গৌড়-মণ্ডল দীর্ঘ কাল উত্তরাপথ-সাম্রাজ্যের অন্তভূর্ত থাকিলেও, ইতিপূর্ব্বেই ভাষায় এবং সাহিত্যে “গৌড়জনে”র স্বাতন্ত্র্য-প্রিয়তা প্রকাশ পাইয়াছিল। প্রাচীন আলঙ্কারিক দণ্ডী [কাব্যাদর্শে] ভাষার মধ্যে “গৌড়ী” নামক স্বতন্ত্র প্রাকৃত-ভাষার, এবং কাব্যরচনায় “গৌড়ী-রীতি” নামক স্বতন্ত্র রচনা-রীতির উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন। “গৌড়ী”-ভাষা এবং “গৌড়ী”-রীতি গৌড়-রাজ্যের অগ্রদুতরূপে গৃহীত হইতে পারে।

 ঠিক কোন্ খানে যে গৌড়াধিপের সহিত রাজ্যবর্দ্ধনের সংঘর্ষ উপস্থিত হইয়াছিল, বাণভট্ট তাহা স্পষ্টাক্ষরে লিখিয়া যান নাই। “হর্ষচরিতের” ষষ্ঠ উচ্ছ্বাসে বর্ণিত হইয়াছে,—রাজ্যবর্দ্ধন স্থানীশ্বর হইতে যুদ্ধযাত্রা করিবার পর, “বহুদিবস অতীত হইলে”, [অতিক্রান্তেষু বহুষু বাসরেষু] হর্ষ সংবাদ পাইলেন, “তাঁহার ভ্রাতা অক্লেশে মালবসৈন্যের পরাজয় সাধন করিতে সমর্থ হইলেও, গৌড়াধিপ তাঁহাকে মিথ্যা লোভ দেখাইয়া, বিশ্বাস উৎপাদন করিয়া, স্বভবনে (লইয়া গিয়া) অস্ত্রহীন অবস্থায় একাকী পাইয়া, গোপনে নিহত করিয়াছেন।”[৬] ইউয়ান্ চোয়াংএর গ্রন্থে এই বর্ণনার কিঞ্চিৎ বিকৃত প্রতিধ্বনি পরিরক্ষিত হইয়াছে। ইউয়ান্ চোয়াং লিখিয়াছেন,—প্রভাকরবর্দ্ধনের মৃত্যুর পর (হর্ষবর্দ্ধনের) জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রাজ্যবর্দ্ধন সিংহাসনে আরোহণ করিয়া, সদ্ভাবে রাজ্যশাসন করিতেছিলেন। এই সময় ভারতের পূর্ব্বাংশস্থিত কর্ণসুবর্ণের রাজা শশাঙ্ক অনেক সময় তাঁহার মন্ত্রিগণকে বলিতেন,—‘যদি সীমান্ত প্রদেশের রাজা ধার্ম্মিক হয়, তবে স্বরাজ্যের অকল্যাণ হয়।’ এই কথা শুনিয়া, তাঁহারা রাজা রাজ্যবর্দ্ধনকে সাক্ষাৎ করিতে আহ্বান করিয়াছিলেন, এবং তাঁহাকে নিহত করিয়াছিলেন।”[৭]

 বাণভট্ট-প্রদত্ত রাজ্যবর্দ্ধন-নিধনের এই সংক্ষিপ্ত বিবরণ সম্পূর্ণ বিশ্বাসযোগ্য বলিয়া মনে হয় না। একজন প্রতিযোগী (মালবাধিপতি) যাঁহার ভগিনীপতিকে নিহত করিয়া, ভগিনীকে শৃঙ্খলাবদ্ধ চরণে কারাগারে নিক্ষেপ করিয়াছিল, সেই রাজ্যবর্দ্ধন যে মুখের কথায় ভুলিয়া, একাকী নিরস্ত্র আর একজন প্রতিযোগীর [গৌড়াধিপের] ভবনে যাইতে সম্মত হইয়াছিলেন তাহা সম্ভব নহে। “হর্ষচরিত” পূর্ব্বাপর আলোচনা করিলে, প্রকৃত ঘটনার কতক আভাস পাওয়া যায়। রাজ্যবর্দ্ধন যখন কান্যকুব্জাভিমুখে যাত্রা করেন, তখন তাঁহার মাতুল-পুত্র ভণ্ডি অশ্বারোহী-সেনার অধিনায়করূপে তাঁহার অনুগমন করিয়াছিলেন।[৮] হর্ষ ভ্রাতৃ-বিয়োগের সংবাদ পাইবামাত্র, “পৃথিবী নির্গৌড়” করিবার জন্য সসৈন্য কিয়দ্দূর অগ্রসর হইলে, সংবাদ পাইলেন—রাজ্যবর্দ্ধনের বাহুবলে উপার্জ্জিত মালব-রাজ্যের দ্রব্যাদি লইয়া ভণ্ডি আসিতেছেন।[৯] ভণ্ডির আনীত লুণ্ঠিত দ্রব্য মধ্যে বহুসংখ্যক হস্তী, দ্রুতগামী অশ্ব, নানাবিধ অলঙ্কার, ধনপূর্ণ কুম্ভ এবং নিগড়াবদ্ধ কয়েদীগণ ছিল।[১০] ভণ্ডি শিবিরে উপনীত হইলে, হর্ষ তাঁহাকে ভ্রাতৃ-মরণবৃত্তান্ত জিজ্ঞাসা করিলেন। ভণ্ডি যথাযথ সমুদায় বৃত্তান্ত বর্ণন করিলেন। অনন্তর নরপতি তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন,—‘রাজ্যশ্রীর সংবাদ কি?’ (ভণ্ডি) পুনরায় বলিলেন,—“দেব! আমি লোকের মুখে শুনিতে পাইয়াছি, রাজ্যবর্দ্ধন স্বৰ্গারোহণ করিলে, এবং গুপ্ত নামক ব্যক্তি কর্ত্তৃক কান্যকুব্জ অধিকৃত হইলে, রাজ্ঞী রাজ্যশ্রী কারাগার হইতে বহির্গত হইয়া, [সানুচরী] বিন্ধ্যারণ্যে প্রবেশ করিয়াছিলেন। তাঁহার অনুসন্ধানে অনেক লোক প্রেরিত হইয়াছে, কিন্তু কেহ এখনও প্রত্যাগত হয় নাই।”[১১] রাজ্যশ্রীর কারামুক্তি-কাহিনী অষ্টম উচ্ছ্বাসে আরও একটু বিস্তৃতভাবে বর্ণিত হইয়াছে। হর্ষ যখন বিন্ধ্যারণ্যে ভগিনীর সাক্ষাৎ লাভ করিলেন, তখন “অনুচরিগণের নিকট হইতে ভগিনীর কারাবাস হইতে আরম্ভ করিয়া গৌড়াধিপের আক্রমণকালে গুপ্ত নামক কুলপুত্র-কর্ত্তৃক কান্যকুব্জের কারাগার হইতে তাঁহার নিষ্কাশন, কারা-বহির্গত হইয়া রাজ্যবর্দ্ধনের মৃত্যু-সংবাদ শ্রবণ, শুনিয়া আহার ত্যাগ, অনাহারে বিন্ধ্যারণ্যে ভ্রমণক্লেশ, এবং হতাশ হইয়া অগ্নি-প্রবেশের উদ্যোগ পর্য্যন্ত সমস্ত বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়াছিলেন।”[১২]

 এখানে স্পষ্টই দেখিতে পাওয়া যায়,—রাজ্যবর্দ্ধন, মালব-রাজকে পরাজিত করিয়া, নিজকে নিরাপদ জ্ঞান করিয়া, যুদ্ধ-লব্ধ গজ, অশ্ব, দ্রব্যাদি এবং বন্দিগণকে সেনাপতি ভণ্ডির সহিত স্থানীশ্বরে প্রেরণ করিয়াছিলেন; এবং স্বয়ং ভগিনীর উদ্ধার-সাধনের জন্য কান্যকুব্জ যাত্রা করিয়াছিলেন। কান্যকুব্জের নিকটবর্ত্তী হইয়াই, হয়ত, রাজ্যবর্দ্ধন সসৈন্য গৌড়াধিপ কর্ত্তৃক স্বীয় পথ রুদ্ধ দেখিতে পাইয়াছিলেন। রাজ্যবর্দ্ধনের দশ সহস্ৰ অশ্বারোহীর মধ্যে কতক মালবপতির সহিত যুদ্ধে নিহত হইয়াছিল, এবং কতক লুণ্ঠিত দ্ৰব্য-রক্ষার্থ ভণ্ডির সহিত প্রেরিত হইয়াছিল। সুতরাং রাজ্যবর্দ্ধনের সহিত তখন হয়ত ছয় সাত হাজারের অধিক অশ্বারোহী ছিল না। পক্ষান্তরে, গৌড়াধিপ ইহা অপেক্ষা অনেক অধিক সেনাবল না লইয়া, কান্যকুব্জের মত দূরদেশ-জয়ে যাত্রা করিতে সাহসী হন নাই। সুতরাং গৌড়াধিপের সম্মুখীন হইয়া যুদ্ধ করিয়া থাকিলে, রাজ্যবর্দ্ধন হয় যুদ্ধক্ষেত্রে ধৃত হইয়াছিলেন, বা আত্মসমর্পণ করিয়াছিলেন;—আর না হয়, পরাজয় নিশ্চিত জানিয়া, বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পণ করিয়াছিলেন। রাজ্যবর্দ্ধন মিথ্যা প্রলোভনে মুগ্ধ হইয়া, স্বেচ্ছায় গৌড়াধিপের শিবিরে গমন করেন নাই, গত্যন্তর ছিল না বলিয়াই গিয়াছিলেন। হর্ষবর্দ্ধনের তাম্রশাসন-নিচয়ে রাজ্যবর্দ্ধনের মৃত্যুর যে বিবরণ প্রদত্ত হইয়াছে, তাহাও এই অনুমানের অনুকূলে সাক্ষ্য দিতেছে। যথা—[১৩]

“राजानो युधि दुष्ट-वाजिन इव श्रीदेवगुप्तादयः
कृत्वा येन कशाप्रहार-विमुखाः सर्व्व समं संयताः।
उत्‌खाय द्विषतो विजित्य वसुधा ङ्कृत्वा प्रजानां प्रियं
प्राणानुज्‌झितवानराति भवने सत्यानुरोधेन यः॥

 “যিনি কশাঘাতে সংযত দুষ্ট অশ্বের ন্যায় শ্রীদেবগুপ্তাদি সমস্ত রাজগণকে সমভাবে সংযত করিয়াছিলেন, যিনি শত্ৰুকুল নির্ম্মূল করত বসুধা জয় করিয়া এবং প্রজাপুঞ্জের প্রিয়কাৰ্য্য সাধন করিয়া সত্যরক্ষা করিতে গিয়া, শত্রুভবনে প্রাণত্যাগ করিয়াছিলেন।”

 প্রশস্তি-কার “সত্যানুরোধে” কথাটি বলিয়া, স্পষ্ট দেখাইয়াছেন,—রাজ্যবর্দ্ধন স্বেচ্ছায় গৌড়ধিপের ভবনে গমন করেন নাই।

 রাজ্যবর্দ্ধন নিহত হইলে, কান্যকুব্জ নির্ব্বিবাদেই গৌড়পতির হস্তগত হইয়াছিল। তিনি গুপ্ত নামক ব্যক্তির হস্তে কান্যকুব্জ-নগর রক্ষার ভার অর্পণ করিয়াছিলেন। গুপ্ত সম্ভবতঃ গৌড়াধিপের আদেশক্রমে, রাজ্যশ্রীকে কারামুক্ত করিয়া, তাঁহাকে অনুচরীগণের সহিত যথাভিলষিত স্থানে গমন করিতে অনুমতি দিয়াছিলেন। রাজ্যশ্রীর কারামুক্তি শশাঙ্কের তৎকাল-দুর্লভ সহৃদয়তার পরিচায়ক।

 রাজ্যবর্দ্ধনকে নিহত করিলে, সহজে উত্তরাপথে স্বীয় প্রাধান্য স্থাপনে সমর্থ হইবেন, এই আশায় শশাঙ্ক শরণাগত রাজ্যবর্দ্ধনকে নিষ্ঠুরভাবে নিহত করিয়াছিলেন। কিন্তু বিধাতা গৌড়াধিপের অদৃষ্টে সার্ব্বভৌমের পদলাভ লেখেন নাই। স্থানীশ্বরের শূন্য সিংহাসনে তদীয় অনুজ হর্ষ আরোহণ করিলেন। হর্ষ ভণ্ডিকে গৌড়াধিপের গতিরোধার্থ নিয়োগ করিয়া, স্বয়ং রাজ্যশ্রীর অনুসন্ধানের জন্য বিন্ধ্যারণ্যে প্রবেশ করিলেন। “হর্ষচরিতে” রাজ্যশ্রীর সহিত মিলন এবং তাঁহাকে লইয়া হর্ষের গঙ্গাতীরস্থিত শিবিরে প্রত্যাগমন পর্য্যন্ত বর্ণিত হইয়ছে। ইউয়ান্ চোয়াং লিখিয়াছেন,—হৰ্ষ রাজপদে বৃত হইয়া, মন্ত্রীগণকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন,—“যতদিন আমার ভ্রাতার শক্রগণকে সমুচিত শাস্তি দিতে না পারিব, এবং নিকটবর্ত্তী রাজ্যসমূহ বশীভূত করিতে না পারিব, ততদিন এই দক্ষিণ হস্তদ্বারা আহার্য্য সামগ্ৰী তুলিয়া মুখে দিব না।” তাঁহার আদেশক্রমে স্থানীশ্বরে ৫০০০ হস্তী, ২০০০ অশ্বারোহী, এবং ৫০০০০ পদাতি সংগৃহীত হইল।[১৪] এই সেনা লইয়া, হৰ্ষবর্দ্ধন গৌড়সাম্রাজা আক্রমণ করিয়াছিলেন। ইউয়ান্ চোয়াং লিখিয়াছেন,—“(হর্ষবর্দ্ধন) পূর্ব্বদিকে অগ্রসর হইয়া, যে সকল রাজ্য তাঁহার অধীনতা স্বীকার করিতে অস্বীকৃত হইয়াছিল, সেই সকল রাজ্য আক্রমণ করিয়াছিলেন; এবং অবিরত যুদ্ধে ব্যাপৃত থাকিয়া, ছয় বৎসরের মধ্যে, ‘পঞ্চ-ভারতের’ (Five Indias) সহিত যুদ্ধ করিয়াছিলেন। তৎপর স্বরাজ্যের পরিসর বিস্তৃত করিয়া, সেনাবল বৃদ্ধি করিয়াছিলেন। ৬০০০০ হস্তী এবং ১০০০০০ অশ্বারোহী সংগৃহীত হইয়াছিল। তিনি অতঃপর আর অস্ত্ৰধারণ না করিয়া, নির্ব্বিরোধে ৩০ বৎসর রাজত্ব করিয়াছিলেন।”[১৫] ইউয়ান্ চোয়াংএর অন্যতম অনুবাদক টমাস্ ওয়াটার্স লিখিয়াছেন, এই অংশে পাঠান্তর দৃষ্ট হয়। এক রূপ পাঠানুযায়ী অনুবাদ এস্থলে প্রদত্ত হইল। আর এক রূপ পাঠানুসারে অর্থ হয়,—হৰ্ষবর্দ্ধন ছয় বৎসর যুদ্ধ করিয়া, “‘পঞ্চ-ভারত’ স্বীয় বশবর্ত্তী করিয়াছিলেন।” “পঞ্চ-ভারত” অর্থ যাহাই হউক, হৰ্ষবর্দ্ধন যে ছয় বৎসর কাল অবিরত যুদ্ধ করিয়াও, গৌড়াধিপের বিশেষ ক্ষতি করিতে পারেন নাই, তাহার প্রমাণ পাওয়া যায়। কলিঙ্গের শৈলোদ্ভব-বংশীয় মহাসামন্ত মাধবরাজের ৩০০ চলিত গৌপ্তাব্দে [৬১৯ খৃষ্টাব্দে] সম্পাদিত তাম্রশাসনে “মহারাজাধিরাজ” শশাঙ্ক “চতুরুদধি-সলিল-বীচি-মেখলা-নিলীন-সদ্বীপ-গিরিপত্তনবতী-বসুন্ধরার” অধীশ্বর বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছেন।[১৬]

 ছয় বৎসর ব্যাপী যুদ্ধের পরও যে গৌড়াধিপ শশাঙ্ক শান্তিভোগে সমর্থ হইয়াছিলেন, এরূপ মনে হয় না। ইউয়ান্ চোয়াং লিখিয়াছেন,—তিনি কুশীনগর প্রদেশ হইতে বৌদ্ধ-শ্রমণগণকে বিদূরিত করিয়া দিয়াছিলেন; পাটলিপুত্রের বুদ্ধ-পদচিহ্নবিশিষ্ট প্রস্তর ভাঙ্গিয়া ফেলিতে, এবং তাহাতে বিফলকাম হইয়া, গঙ্গাগর্ভে ডুবাইয়া দিতে যত্ন করিয়াছিলেন; বুদ্ধগয়ার বোধিবৃক্ষ উন্মূলিত এবং আশ্রম সমূহ ধ্বংস করিয়াছিলেন; বোধিবৃক্ষের নিকট একটি বিহারে প্রতিষ্ঠিত বুদ্ধ-মূর্ত্তি ধ্বংস করিয়া, শিব-মূর্ত্তি স্থাপন করিতে আদেশ দিয়াছিলেন। শশাঙ্ক যে কর্ম্মচারীর উপর শেষোক্ত ভার অর্পণ করিয়াছিলেন, তিনি বুদ্ধ-মূর্ত্তিতে হস্তক্ষেপ করিতে সাহস না পাইয়া, মূর্ত্তির সম্মুখে একটি প্রাচীর নির্ম্মাণ করিয়া, উহাকে একেবারে ঢাকিয়া ফেলিয়া, প্রাচীর গাত্রে শিব-মূর্ত্তি অঙ্কিত করিয়া দিয়াছিলেন। ইউয়ান্ চোয়াং লিখিয়াছেন—এই ঘটনার পর শশাঙ্ক আতঙ্কে অভিভূত হইয়া পড়িয়াছিলেন। তাঁহার শরীরে বহুসংখ্যক ক্ষত প্রকাশ পাইয়াছিল; এবং শরীরের মাংস পচিয়া পড়িতে আরম্ভ করিয়াছিল। এই রোগে কিছুদিন ক্লেশভোগ করিয়া, অবশেষে গৌড়াধিপ মানবলীলা সম্বরণ করিয়াছিলেন।

 ইউয়ান্ চোয়াং লিখিয়াছেন—বৌদ্ধধর্ম্মের বিলোপ-সাধনে কৃতসঙ্কল্প হইয়া, শশাঙ্ক কুশীনগর প্রদেশে, বুদ্ধগয়ায় এবং পাটলিপুত্রে এই ধ্বংসলীলার আরম্ভ করিয়াছিলেন। কিন্তু চীনদেশীয় শ্রমণের এই সিদ্ধান্ত যুক্তি-প্রমাণের সম্পূর্ণ বিরোধী। বৌদ্ধধর্ম্মের অভ্যুদয়ের সঙ্গে সঙ্গে যে কিছু সাম্প্রদায়িক হিংসাদ্বেষ উৎপন্ন হইয়াছিল, তাহা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ধর্ম্মযাজকগণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। মহাভাষ্যকার পতঞ্জলি দ্বন্দ্বসমাস-প্রকরণে (পাণিণি ২।৪।১২) যাহাদের মধ্যে বিরোধ চিরন্তন [শাশ্বতিক] এইরূপ প্রাণীবাচক শব্দের দৃষ্টান্তমধ্যে “শ্রমণব্ৰাহ্মণম্” উল্লেখ করিয়াছেন। পুরাণে বৌদ্ধধর্ম্মের যে নিন্দা দৃষ্ট হয়, তাহ ব্রাহ্মণ-যাজকের অন্তর্নিহিত শ্রমণ-বিদ্বেষ-প্রসূত। ব্রাহ্মণ হউক আর অব্রাহ্মণই হউক, সাধারণ শৈব বা বৈষ্ণবের মনে সেরূপ বিদ্বেষ ছিল না। এই শ্রেণীর লোকেরা বুদ্ধ এবং বৌদ্ধধর্ম্মকে কিরূপ শ্রদ্ধার চক্ষুতে দেখিতেন, তাহা ক্ষেমেন্দ্র-ব্যাস-দাসকৃত “দশাবতার চরিতম্” কাব্যের “বুদ্ধাবতার” প্রসঙ্গে এবং জয়দেবের

“निन्दसि यज्ञविधे रहहः! श्रुतिजातं
सदय हृदय-दर्शित-पशुघातं
केशव धृत-वुद्ध-शरीर
जय जगदीश हरे।”

গাথায় প্রকটিত হইয়াছে।[১৭] শশাঙ্ক যে যুগে প্রাদুর্ভূত হইয়ছিলেন, সেই যুগের শৈব এবং বৈষ্ণব নরপতিগণ বৌদ্ধ-দেবতা এবং বৌদ্ধ-ভিক্ষুকে রীতিমত ভক্তি করিতেন। সম্রাট্‌ স্কন্দগুপ্ত (৪৫৫–৪৬৬ খৃঃ অঃ) “পরম-ভাগবত” বা বৈষ্ণব ছিলেন। বসুবন্ধুর জীবনচরিতকার পরমার্থ লিখিয়া গিয়াছেন—তিনি বৌদ্ধ-শ্রমণগণের উদার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।[১৮] বলভীর মৈত্রক-বংশীয় “পরম-ভাগবত” প্রথম ধ্রুবসেন ২১৬ বলভী সম্বতে (৫৩৬ খৃষ্টাব্দে) সম্পাদিত একখানি তাম্রশাসনের দ্বারা মাতাপিতার পুণ্য বৃদ্ধির এবং স্বকীয় ঐহিক ও পারত্রিক কল্যাণের জন্য ভাগিনেয়ী পরমোপাসিকা দুড্‌ডা-কর্ত্তৃক বলভী-নগরে প্রতিষ্ঠিত একটি বিহারে স্থাপিত বুদ্ধগণের পূজোপহারের এবং ভিক্ষুসংঘের সেবার জন্য একটি গ্রাম দান করিয়াছিলেন।[১৯] শশাঙ্কের প্রতিদ্বন্দ্বী হর্ষ স্বীয় তাম্রশাসনে আপনাকে “পরম মাহেশ্বর” বা শৈব বলিয়া উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন, অথচ ইউয়ান্ চোয়াং লিখিয়াছেন—হর্ষ বুদ্ধের এবং বৌদ্ধ-শ্রমণের একান্ত পক্ষপাতী ছিলেন। যে দেশে, যে যুগে শৈব বা বৈষ্ণব-সাধারণের মনে বৌদ্ধধর্ম্ম-বিদ্বেষ স্থানলাভ করিতে পারিত না, সেই দেশের, সেই যুগের, শশাঙ্কের ন্যায় একজন গৃহস্থ শৈবের পক্ষে, বৌদ্ধধর্ম্ম-লোপের কল্পনা অসম্ভব।

 দ্বিতীয় কারণ, ইউয়ান্ চোয়াং স্বয়ং লিখিয়া গিয়াছেন,—তৎকালে পুণ্ড্রবর্দ্ধন, কর্ণসুবর্ণ, সমতট, এবং তাম্রলিপ্তি, বাঙ্গালার এই চারিটি প্রধান নগরে, বহুসংখ্যক বৌদ্ধশ্রমণ এবং অনেক বৌদ্ধমঠ স্তূপ, এবং বোধিসত্ত্ব-মন্দির বর্ত্তমান ছিল। শশাঙ্ক এই সকল নগরের বৌদ্ধ-কীর্ত্তিকলাপের ধ্বংস-সাধনের চেষ্টা করিয়াছিলেন বলিয়া ইউয়ান্ চোয়াং তাঁহার গ্রন্থে কোনও আভাস প্রদান করেন নাই। শ্রমণগণের নির্য্যাতন এবং বৌদ্ধ-মন্দিরাদির ধ্বংস-সাধন করিয়া, বৌদ্ধধর্ম্মের মূলোৎপাটনই যদি শশাঙ্কের উদ্দেশ্য হইত, তবে তিনি বরেন্দ্র, রাঢ় এবং বঙ্গেই তাহার সূচনা করিতেন। বাঙ্গালার বৌদ্ধগণকে নির্ব্বিরোধে স্বধর্ম্মানুষ্ঠান করিতে দিয়া, তিনি যখন মগধে ও মিথিলায় [কুশীনগর প্রদেশে] বৌদ্ধ-দলনে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন, তখন বুঝিতে হইবে—ইহার মূলে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছিল না,—স্বতন্ত্র কারণ বিদ্যমান ছিল। বুদ্ধগয়া এবং কুশীনগর বৌদ্ধগণের প্রধান তীর্থস্থান। এই দুই স্থানের বৌদ্ধ-শ্রমণগণ বৌদ্ধ-সম্প্রদায় মধ্যে নিশ্চয়ই অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিলেন। শশাঙ্ক এবং হর্ষবর্দ্ধনের বিরোধ উপস্থিত হইলে, হর্ষ যখন মিথিলা এবং মগধ জয়ের চেষ্টা করিতেছিলেন, তখন হয়ত বুদ্ধগয়া এবং কুশীনগরের শ্রমণগণ হর্ষবর্দ্ধনের অনুকূলে কোনও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হইয়াছিলেন, এবং এই অপরাধের দণ্ড দিবার জন্য শশাঙ্ক তাঁহাদের নির্য্যাতনে এবং বোধি-বৃক্ষাদি ধ্বংস করিয়া, ষড়যন্ত্রের কেন্দ্র বুদ্ধগয়ার মাহাত্ম্য-নাশে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। শশাঙ্ক জীবিত থাকিতে, হৰ্ষবর্দ্ধন যে মগধে স্বীয় প্রভাব-বিস্তারে সমর্থ হয়েন নাই, ইউয়ান্ চোয়াং প্রদত্ত শশাঙ্কের মৃত্যুবিবরণই তাহার প্রধান প্রমাণ।

 গৌড়াধিপ শশাঙ্কের পরলোক গমনের পর, সহজেই তদীয় সাম্রাজ্য হর্ষবর্দ্ধনের পদানত হইয়াছিল। ইউয়ান্ চোয়াং বাঙ্গালার বিভিন্ন প্রদেশের রাজধানী পুণ্ড্রবর্দ্ধন, সমতট, তাম্রলিপ্তি এবং কর্ণসুবর্ণের বিবরণে কোনও রাজার উল্লেখ করেন নাই। পুণ্ড্রবর্দ্ধন, সমতট এবং তাম্রলিপ্তির প্রাচীন রাজবংশ সম্ভবতঃ শশাঙ্ক কর্ত্তৃক উন্মূলিত হইয়াছিল এবং কর্ণসুবৰ্ণে শশাঙ্কের উত্তরাধিকারী হৰ্ষবর্দ্ধন কর্ত্তৃক সিংহাসনচ্যুত হইয়াছিলেন। ৬৪৮ খৃষ্টাব্দে হৰ্ষবর্দ্ধনের মৃত্যুর পর, সপ্তম শতাব্দীর শেষার্দ্ধের বাঙ্গালার ইতিহাস ঘোর অন্ধকারাচ্ছন্ন। মগধের আদিত্যসেন (৬৭১ খৃষ্টাব্দে) “মহারাজাধিরাজ” উপাধি গ্রহণ করিয়া, অশ্বমেধের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন। বাঙ্গালায় তাঁহার আধিপত্য বিস্তার লাভ করিয়াছিল কিনা, বলা সুকঠিন। পরিব্রাজক ইৎসিং লিখিয়া গিয়াছেন,—সপ্তম শতাব্দের শেষার্দ্ধে, সেঙ্গচি নামক একজন পরিব্রাজক চীনদেশ হইতে জলপথে সমতটে বা বঙ্গে আগমন করিয়াছিলেন। সেঙ্গচি রাজভট নামক একজন নিষ্ঠাবান্ বৌদ্ধ-নৃপতিকে সমতটের সিংহাসনে আসীন দেখিয়াছিলেন।[২০]

 খৃষ্টীয় অষ্টম শতাদের অভ্যুদয়ের সঙ্গে সঙ্গে বাঙ্গালায় বড়ই দুর্দ্দিনের সূত্রপাত হইয়াছিল। উত্তরাপথের ইতিহাসে এই যুগ ঘোর পরিবর্ত্তনের যুগ। হৰ্ষবর্দ্ধনের মৃত্যুর পর, উত্তরাপথে সার্ব্বভৌমতন্ত্র-শাসন বিলুপ্ত হইয়াছিল; কিন্তু তৎপরিবর্ত্তে, বিভিন্ন প্রদেশে, স্থিতিশীল স্বতন্ত্র রাজতন্ত্র-শাসন প্রতিষ্ঠিত হইতে অনেক বিলম্ব ছিল। অবিরত রাজবিপ্লব এই যুগের প্রধান লক্ষণ। বাঙ্গালার ভাগ্যে এই বিপ্লব-জনিত ক্লেশের ভার অপেক্ষাকৃত গুরুতর হইয়াছিল। বিন্ধ্য-প্রদেশের অধীশ্বর দ্বিতীয় জয়বর্দ্ধনের [রঘোলিতে প্রাপ্ত] তাম্রশাসন হইতে জানা যায়,—“শৈলবংশতিলক” শ্রীবর্দ্ধন নামক নরপতির সৌবর্দ্ধন নামক পুত্র ছিল। এই সৌবর্দ্ধনের আবার তিন পুত্র হইয়াছিল।

“तेषा मूर्ज्जित-वैरि-विदारण-पटुं पौण्ड्राधिपं क्ष्मा-पतिं।
इ त्वै को विषयं तमेव सकलं जग्राह शौर्य्यान्वितः॥”

 “ইঁহাদিগের মধ্যে শৌর্য্যান্বিত একজন পরাক্রান্ত-শত্ৰু-বিদারণ-পটু পৌণ্ড্রাধিপকে নিহত করিয়া সমস্ত (পৌণ্ড্র) দেশ অধিকার করিয়াছিলেন।”[২১]

 এই পৌণ্ড্র-বিজেতার কনিষ্ঠ সহোদরের প্রপৌত্র দ্বিতীয় জয়বর্দ্ধন রখোলিতে প্রাপ্ত শাসনের সম্পাদন-কর্ত্তা। এই তাম্রশাসনের প্রকাশক শ্রীযুক্ত হীরালাল, অক্ষরের আকৃতির হিসাবে ইহাকে খৃষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীর শেষভাগে স্থাপন করিতে চাহেন। সুতরাং দ্বিতীয় জয়বর্দ্ধনের অনুল্লিখিত-নামা প্রপিতামহের অনুল্লিখিত-নামা পৌণ্ড্রাধিপহন্তা অগ্রজকে অষ্টম শতাব্দের প্রারম্ভে স্থাপন করা যাইতে পারে। এই পৌণ্ড্র-জিৎ কোন্ দেশ হইতে আসিয়া, পৌণ্ড্রদেশ আক্রমণ করিয়াছিলেন, তাঁহার বংশের নাম হইতে তাহার কথঞ্চিৎ আভাস পাওয়া যায়। গৌড়াধিপ শশাঙ্কের কলিঙ্গের মহাসামন্ত মাধবরাজ “শৈলোদ্ভব”-বংশীয় ছিলেন, তাহা পূর্ব্বেই উল্লিখিত হইয়াছে। অন্যান্য তাম্রশাসন হইতে জানা যায়,—সপ্তম শতাব্দে উড়িষ্যা ও কলিঙ্গ “শৈলোদ্ভব”-বংশীয় রাজগণের করতল-গত ছিল। অজ্ঞাতনামা “শৈলবংশীয়” পৌণ্ড্রজিৎ “শৌলোদ্ভব-বংশের” শাখান্তর হইতে সমুদ্ভূত বলিয়া অনুমান হয়। এই অভিনব পৌণ্ড্রাধিপের নামের মত, ইঁহার পরিণাম সম্বন্ধেও, আমরা কিছুই জানি না।

 পৌণ্ড্রদেশ যখন “শৈলবংশীয়” আক্রমণকারীর পদানত, তখন যশোবর্ম্মা নামক একজন উচ্চাভিলাষী নরপাল কান্যকুব্জের সিংহাসন লাভ করিয়া, হৰ্ষবর্দ্ধনের রাজধানীর পূর্ব্ব-গৌরব পুনরুজ্জীবিত করিতে যত্নবান্ হইয়াছিলেন। যশোবর্ম্মার দিগ্বিজয়-কাহিনী তদীয় সভাকবি বাক্‌পতিরাজ কর্ত্তৃক “গউড়বহো” নামক প্রাকৃত ভাষায় রচিত কাব্যে বর্ণিত হইয়াছে।[২২] চীনদেশের ইতিহাসে উল্লিখিত হইয়াছে, ৭৩১ খৃষ্টাব্দে যশোবর্ম্মা চীন সম্রাটের নিকট দুত প্রেরণ করিয়াছিলেন। ইহার পূর্ব্বেই সম্ভবতঃ যশোবর্ম্মার “গউড়বহো"-বর্ণিত দিগ্বিজয় সম্পন্ন হইয়াছিল।

 বাক্‌পতিরাজের কাব্যের “গউড়” বা গৌড়পতি এবং “মগহনাহ” বা মগধ-নাথ অভিন্ন ব্যক্তি; অর্থাৎ তৎকালে মগধেশ্বর শশাঙ্ক-প্রবর্ত্তিত উত্তরাপথের পূর্ব্বাংশের অধিপতি “গৌড়াধিপ”-উপাধিতে ভূষিত ছিলেন। বস্তুতঃ সপ্তম শতাব্দের সূচনা হইতে [দ্বাদশ শতাব্দের অবসানে] তুরুষ্ক-বিজয় পর্য্যন্ত, গৌড়মণ্ডলের আভ্যন্তরীণ অবস্থা যখন যেরূপই হউক, “গৌড়েশ্বর” বা “গৌড়াধিপ”-উপাধিধারী নরপতির অভাব কখনও উপস্থিত হয় নাই। যশোবর্ম্মার প্রতিদ্বন্দ্বী “গৌড়পতি” সম্ভবতঃ আদিত্যসেনের প্রপৌত্র মহারাজাধিরাজ দ্বিতীয় জীবিত গুপ্ত। বাক্‌পতি লিখিয়াছেন,—কান্যকুব্জ হইতে দিগ্বিজয়ার্থ বহির্গত হইয়া, যশোবর্ম্মা যখন বিন্ধ্য-পর্ব্বত অতিক্রম করিতেছিলেন, তখন “তাঁহার ভয়ে, মদস্রাবী গজের ললাট-নিঃসৃত জলের দ্বারা সম্মুখ-দেশ মায়া-নির্ম্মিত নৈশ-অন্ধকারের মত অন্ধকার করিয়া, মগধ-নাথ পলায়ন করিলেন (৩৬৫ শ্লোক)॥” কিন্তু মগধ-নাথের সামন্তগণ পলায়ন করিতে সম্মত হইলেন না; ফিরিয়া যুদ্ধার্থ প্রস্তুত হইলেন।

 “পলায়নপর মগধ-নাথের (সামন্ত)-নৃপতিগণ প্রত্যাবর্ত্তন করিয়া, উল্কা-নির্গত অগ্নিকণা-সমূহের ন্যায় শোভা পাইতে লাগিলেন (৪১৪ শ্লোক)॥

 “সেই যুদ্ধের আরম্ভে (যশোবর্ম্মার) শত্ৰু-সৈন্যের শোণিতের দ্বারা তাম্রবর্ণে রঞ্জিত মহীতল মেঘ হইতে পতিত বিদ্যুল্লতার ন্যায় শোভা পাইতে লাগিল (৪১৫)॥

 “রাজা (যশোবর্ম্মা) পলায়ন-পর মগধ-নাথকে নিহত করিয়া, দারুচিনির সুগন্ধে পরিপূর্ণ সমুদ্রতীর-বনে গমন করিয়াছিলেন (৪১৭)॥”

 মগধ-নাথ যেরূপ সমরানুরাগী সামন্তগণে পরিবেষ্টিত হইয়া, যশোবর্ম্মার সম্মুখীন হইতে সমর্থ হইয়াছিলেন, তাহাতে বোধ হয়,—তাঁহার “গৌড়াধিপ” উপাধি নিরর্থক ছিল না। কিন্তু বঙ্গ-পতি এই সামন্ত-চক্রের বহির্ভূত ছিলেন। বাক্‌পতি “মগধ-নাথের” ন্যায় বঙ্গ-পতির নামের উল্লেখ করেন নাই। তিনি এই মাত্র লিখিয়াছেন, যশোবর্ম্মা মগধ-নাথকে নিহত করিয়া, সমুদ্রতীরস্থিত বঙ্গ-রাজ্যে উপনীত হইলে, অসংখ্য হস্তীর অধিনায়ক বঙ্গেশ্বর যুদ্ধে পরাজিত হইয়া, বিজেতার পদানত হইয়াছিলেন।

 যশোবর্ম্মা বাহুবলে উত্তরাপথ-সাম্রাজ্য পুনঃ প্রতিষ্ঠায় সমর্থ হইলেও, তাঁহার ভাগ্যে অধিক দিন সাম্রাজ্য-সম্ভোগ ঘটিয়া উঠে নাই। গৌড়-বঙ্গ-বিজয়ের অনতিকাল পরেই, [৭৩৬ খৃষ্টাব্দের পরে] কাশ্মীরের অধিপতি ললিতাদিত্য-মুক্তাপীড় আসিয়া, তাঁহাকে কান্যকুব্জের সিংহাসন হইতে অপসারিত করিয়াছিলেন।[২৩] “রাজতরঙ্গিণী” এই ঘটনার চারিশত বৎসরের কিঞ্চিদধিক কাল পরে [১১৫০ খৃষ্টাব্দে] সম্পূর্ণ হইয়াছিল,[২৪] এবং কহ্লণ সম্ভবতঃ জনশ্রুতি অবলম্বনেই ললিতদিত্যের কান্যকুব্জ-বিজয়-কাহিনী সঙ্কলন করিয়াছিলেন। কিন্তু তিনি যে ভাবে এই কাহিনীর বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন, তাহা পর্য্যালোচনা করিলে, ইহাকে ঐতিহাসিক ভিত্তিহীন বলিয়া উড়াইয়া দিতে সাহস হয় না। কহ্লণ লিখিয়াছেন,—ললিতাদিত্য-মুক্তাপীড় “কবি বাক্‌পতিরাজ-শ্রীভবভূতি-আদি-সেবিত” যশোবর্ম্মাকে বশীভূত করিয়া, কলিঙ্গ অভিমুখে যাত্রা করিলেন। তখন গৌড়মণ্ডল হইতে অসংখ্য হস্তী আসিয়া তাঁহার (সেনার) সহিত মিলিত হইল।”

  1. Fleet’s Gupta Inscriptions. p. 220.
  2. Ibid, р. 202.
  3. Three copper-plate grants from East Bengal (Indian Antiquary, 1910, pp. 193-216); The Kotwalipārā spurious grant of Samacāradeva (Journal and Proceedings of the Asiatic Society of Bengal 1910, p. 435). ডাক্তার হর্ণলি মনে করেন–ধর্ম্মাদিত্য মহারাজাধিরাজ যশোধর্ম্মের নামান্তর, এবং গোপচন্দ্র দ্বিতীয় কুমারগুপ্তের পুত্র। The evidence of the Faridpur Grants নামক এসিয়াটিক্ সোসাইটীর জর্ণেলে প্রকাশার্থ প্রবন্ধে বন্ধুবর শ্রীযুক্ত রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় নানাবিধ যুক্তির দ্বারা প্রমাণ করিতে যত্ন করিয়াছেন,—এই চারিখানি তাম্রশাসনই জাল বা কূট-শাসন। রাখাল বাবু প্রাচীন লিপিতত্ত্বে বিশেষ পারদর্শী এবং তাঁহার প্রতিদ্বন্দ্বী ডাঃ হর্ণলি এই ক্ষেত্রে একজন মহারথী। এই উভয় বিশেষজ্ঞের মধ্যে উপস্থিত তর্কের মীমাংসা না হইলে, এই সকল তাম্রশাসন হইতে ইতিহাসের উপাদান সঙ্কলন সুকঠিন।
  4. বাণভট্ট প্রণীত “হর্ষচরিতষষ্ঠ উচ্ছ্বাস
  5. “पुण्ड्राः स्यु र्वरेन्द्री-गौड़-नीवृति” इति त्रिकाण्डशेषः।
  6. জীবানন্দ বিদ্যাসাগর সম্পাদিত “হর্ষচরিতম্” (কলিকাতা, ১৮৯২ খৃষ্টাব্দ), ৪৩৬ পৃঃ।
  7. Beal’s Buddhist Records of the Western World, vol. I. P. 210
  8. হর্ষচরিতম্, ষষ্ঠ উচ্ছ্বাসঃ, ৪২৮ পৃঃ।
  9. হর্ষচরিতম্, সপ্তম উচ্ছ্বাসঃ, ৬০০ পৃঃ।
  10. হর্ষচরিতম্, সপ্তম উচ্ছ্বাসঃ, ৬০৩-৬০৫ পৃঃ।
  11. “समतिक्रान्ते च कियत्यपि काले भ्रातृमरण-वृत्तान्त मप्राक्षीत्। अथ अकथयच्च यथावृत्त मखिलं भण्डिः। अथ नरपतिः तमुवाच राज्यश्री-व्यतिकरः क इति। स पुन रवादीत् देव! देवभूयं गते देवे राज्यवर्द्धने, गुप्तनाम्ना च गृहीते कुशस्थले देवी राज्यश्रीः परिभ्रश्य बन्धनात् विन्ध्याटवीं सपरिवारा प्रविष्टा इति लोकतो वार्त्ता मृशृणवम्। अन्वेष्टारस्तु तां प्रति प्रभूताः प्रहिता जना, न अद्यापि निवर्त्तन्त इति।” ६०२-६०३ पृः।
  12. “बन्धनात् प्रभृति विस्तरतः स्वसुः कान्यकुब्जात् गौड़-सम्मुमं गुप्तितो गुप्तनाम्ना कुलपुत्रेण निष्कासनं, निर्गतायाश्च राज्यवर्द्धन-मरण-श्रवणं, श्रुत्वा आहार-निराकरण मनाहार-पराहतायाश्च विन्ध्याटवी-पर्य्यटन-खेदं, जातनिर्वेदाया पावक-प्रवेशोपक्रमणं यावत् सर्व मशृणोत् व्यतिकरं परिजनतः। ६६४ पृः।
  13. Banskhera Plate of Harsha. Epigraphia Indica, Vol. IV. рр. 210-211; Madhuvan Plate, Ep. Ind. Vol. VII. pp. 155–160; Sonpat Seal, Fleet’s Gupta Inscription.
  14. Beal’s Records, Vol. I. P. 213.
  15. “Proceeding eastwards he invaded the states which had refused allegiance, and waged incessant warfare until in six years he had fought the five Indias (reading chi according to the other reading chen, had brought the five Indias under allegiance). Then having enlarged his territory he increased his army, bringing the elephant corps up to 60,000 and the cavalry to 100, 000, and reigned in peace for thirty years without raising a weapon.
     Watters On Yuang Chwang’s Travels in India 629-645 V. S. (London, 1904), Vol. I. P. 343.
  16. Epigraphia Indica, Vol. VI. P. 143.
  17. খৃষ্টীয় একাদশ শতাব্দের শেষার্দ্ধে ক্ষেমেন্দ্র কাশ্মীরে প্রাদুর্ভূত হইয়াছিলেন। পুরাণকার বুদ্ধাবতার প্রসঙ্গে যেখানে লিখিয়াছেন, বিষ্ণু অসুরগণের সম্মোহনের জন্য বুদ্ধরূপে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন, সেখানে বুদ্ধচরিতের সূচনায় ক্ষেমেন্দ্র লিখিয়াছেন—

    “काले प्रयाते कलिविप्लवेन रागग्रहोग्रे भगवान् भवाद्धौ
    मज्जत्‌सु संमोइ-जले जनेषु जगर्न्निवास करुणान्धितोऽभूत्॥
    स सर्व-सत्तोपकृति-प्रयत्नः कृपाकुलः शाक्यकुले विशाले।
    शुद्धोदनाख्यस्य नराधिपेन्दो र्धन्यस्य गर्भेऽवततार पत्न्याः॥
    “अथ स भगवान् कृत्वा सर्वे जगज्जिन-भास्कर
    स्तिमिर-रहितं ज्ञानालोकैः क्रमाद्गुणि-बान्धवः।
    जन-करुणया सङ्घर्माख्यं निधाय परं वपु-
    स्तरण-शरणं संसाराब्ध्या वभूत् पुनरच्युतः॥

  18. Smith’s Early History of India, Second Edition, p. 292.
  19. Indian Antiquary, vol. IV. (1875), pp. 104-107.
  20. Beal’s Life of Hiuen Tsiang (London 1888,) P. XXX; Watters II. p. 188.
  21. Epigraphia Indica, Vol. IX. P. 44.
  22. “गउड़ वहो”—এস্, পি, পণ্ডিত সম্পাদিত। সটীক। Bombay Sanskrit Series, No. 34.
  23. এম্, এ, ষ্টিন অনূদিত “রাজতরঙ্গিণীর” ভূমিকা ও টিপ্পনী দ্রষ্টব্য।
  24. “अशिश्रियं स्तं निःशेषा दण्डिनो गौड़मण्डलात्॥ (৪।১৪৮)॥”