গৌড়রাজমালা/বিজয়সেন



 বর্ম্মবংশের অভ্যুদয় এবং মদনপালের দুর্ব্বলতা নিবন্ধন গৌড়রাষ্ট্র যখন বিশৃঙ্খল হইয়া পড়িয়াছিল, তখন সামন্তসেনের পৌত্র [হেমন্তসেন ও রাজ্ঞী যশোদেবীর পুত্র] বিজয়সেন বরেন্দ্রভূমিতে একটি স্বতন্ত্র রাজ্যের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। হেমন্তসেন একজন বড় যোদ্ধা ছিলেন। কিন্তু তিনি বাহুবলে গৌড়রাজ্যের কোন অংশ করতলগত করিতে পারিয়াছিলেন কি না, তাহা বলা যায় না। হেমন্তসেনের পুত্র বিজয়সেন, রাঢ়ে এবং বঙ্গে, বর্ম্ম-রাজের সহিত প্রতিযোগিতা করিতে অসমর্থ হইয়াই, সম্ভবত স্বীয় অভিলাষ চরিতার্থ করিবার জন্য, বরেন্দ্র-অভিমুখে ধাবিত হইয়াছিলেন। অথবা হেমন্তসেনই হয়ত বরেন্দ্রে আশ্রয় লইয়াছিলেন, এবং পরে সুযোগ পাইয়া, বিজয়সেন তথায় স্বতন্ত্র রাজ্য-স্থাপনে ব্ৰতী হইয়াছিলেন। বল্লালসেন “দানসাগরের” ভূমিকায় লিখিয়া গিয়াছেন—

तदनु विजयसेनः प्रादुरासीत् वरेन्द्रे”

 “(হেমন্তসেনের) পর বিজয়সেন বরেন্দ্রে প্রাদুর্ভূত হইয়াছিলেন।”

 বিজয়সেনের অভ্যুদয়কাল সম্বন্ধে পণ্ডিতগণের মধ্যে অনেক মতভেদ আছে। কিল্‌হর্ণের অনুসরণ করিয়া, সামন্তসেনকে খৃষ্টীয় একাদশ শতাব্দীর চতুর্থ পাদে, হেমন্তসেনকে দ্বাদশ শতাব্দীর প্রথম পাদে, এবং বিজয়সেনকে দ্বিতীয় পাদে [আনুমানিক ১১২৫–১১৫০ খৃষ্টাব্দে] স্থাপিত করা যাইতে পারে। এ পর্য্যন্ত আর কোন লেখক এই মত গ্রহণ করিয়াছেন বলিয়া জানি না, এবং কিল্‌হৰ্ণও তাঁহার মতের অনুকূল যুক্তিগুলি বিস্তৃতভাবে উল্লেখ করিয়া যাইতে পারেন নাই।

 প্রধানতঃ দুইটি প্রমাণ-বলে, খৃষ্টীয় একাদশ শতাব্দের চতুৰ্থপাদ বিজয়সেনের অভ্যুদয়কাল বলিয়া নিরূপিত হইয়াছে। বিজয়সেনের দেবপাড়া প্রশস্তিতে (২১ শ্লোক) উক্ত হইয়াছে, তিনি “নান্য” নামক নৃপতিকে কারারুদ্ধ করিয়াছিলেন। নেপালের রাজা জয়প্রতাপমল্লের কাটামুণ্ডুতে প্রাপ্ত ১৬৪৯ খৃষ্টাব্দের [৭৬৯ নেপালী-সম্বতের] শিলালিপিতে উল্লিখিত মিথিলার এবং নেপালের “কার্ণাটক”-বংশীয় রাজগণের বংশ-তালিকায় এক “নান্যদেব” উক্ত বংশের আদিপুরুষরূপে উল্লিখিত হইয়াছেন।[১] জর্ম্মণির প্রাচ্যবিদ্যানুশীলন সমিতির পুস্তকালয়ে রক্ষিত একখানি পুঁথিতে নান্যদেব [১০১৯ শকে ১০৯৭ খৃষ্টাব্দে] বর্ত্তমান ছিলেন বলিয়া প্রমাণ পাওয়া যায়।[২] প্রত্নবিদ্‌গণ দেবপাড়া প্রশস্তির “নান্য” এবং কার্ণাটক-বংশের আদিপুরুষ “নান্যদেব”কে অভিন্ন মনে করিয়া থাকেন।[৩] এই মত গ্রহণ করিলেও, একাদশ শতাব্দের শেষ পাদে বিজয়সেনের রাজত্বকাল নিরূপণ অনাবশ্যক; পরন্তু নান্যদেব দ্বাদশ শতাব্দের দ্বিতীয় পাদ পর্য্যন্ত জীবিত ছিলেন; এবং সেই সময়ে, বিজয়সেনের সহিত তাঁহার বিরোধ উপস্থিত হইয়াছিল, এরূপ মনে করিবার যথেষ্ট কারণ আছে। কার্ণাটক-বংশীয় নৃপতিগণের বংশ-তালিকা-অনুসারে নেপাল-বিজয়ী হরিসিংহ নান্যদেব হইতে অধস্তন সপ্তম পুরুষ। হরিসিংহের মন্ত্রী চণ্ডেশ্বর ঠকুরের সংগৃহীত “বিবাদ-রত্নাকরের” মঙ্গলাচরণ হইতে জানা যায়, হরিসিংহ ১২৩৯ শকাব্দে [১৩১৭ খৃষ্টাব্দে] জীবিত ছিলেন। সুতরাং, প্রতি পুরুষ গড়ে ২৫ বৎসর হিসাবে, হরিসিংহের ঊর্দ্ধতন সপ্তম পুরুষ নান্যদেব, মোটামুট ১১৫০ খৃষ্টাব্দ পর্য্যন্ত জীবিত ছিলেন, এরূপ অনুমান করা যাইতে পারে। গৌড়রাষ্ট্রের সেই অধঃপতনের সময়, কর্ণাটক্ষত্রিয়-বংশোদ্ভব বিজয়সেন বরেন্দ্রে যে কার্য্য-সাধনে উদ্যোগী হইয়াছিলেন, অপর একজন কর্ণাট-ক্ষত্রিয়, নান্যদেব, পূর্ব্বাবধিই মিথিলায় সেই কার্য্যেই ব্ৰতী হইয়াছিলেন। সুতরাং নূতন ব্ৰতী বিজয়সেনের সহিত পুরাতন ব্রতী নান্যদেবের সংঘর্ষ স্বাভাবিক।

 দ্বিতীয় প্রমাণ লক্ষ্মণ-সম্বৎ। কিল্‌হৰ্ণ স্থির করিয়াছেন,—১১১৯ খৃষ্টাব্দের অক্‌টোবর মাস হইতে এই সম্বতের গণনা আরম্ভ হইয়াছিল; এবং তিনি দেবপাড়া প্রশস্তির ভূমিকায় মন্তব্য প্রকাশ করিয়াছিলেন যে, লক্ষ্মণসেনের রাজত্বের আরম্ভ হইতে এই সম্বৎ-গণনার আরম্ভ হয়। আবুল ফজলের “আকবর-নামা”-রচনার সময়েও, লক্ষ্মণ-সম্বতের উৎপত্তি সম্বন্ধে এইরূপ কিম্বদন্তী প্রচলিত ছিল।[৪] সুতরাং লক্ষ্মণসেনের পিতামহ বিজয়সেন অবশ্য একাদশ শতাব্দের শেষপাদে রাজত্ব করিয়াছিলেন। কিন্তু বল্লালসেন-রচিত দানসাগর-নামক নিবন্ধে উল্লিখিত হইয়াছে—[৫]

“निखिल-चक्रतिलक-श्रीमद्वलालसेनेन पूर्णे
शशि-नव-दशमिते शक-वर्षे दानसागरो रचितः।”

অর্থাৎ ১০৯১ শকাব্দ (১১৬৯ খৃষ্টাব্দ) পূর্ণ হইলে, বল্লালসেন “দানসাগর” রচনা করিয়াছিলেন।

 ডাক্তার ভাণ্ডারকার বোম্বাই-প্রদেশে সংগৃহীত বল্লালসেন-রচিত “অদ্ভুত সাগরের” যে বিবরণ প্রকাশ করিয়াছেন, তাহাতে উল্লিখিত হইয়াছে,—বল্লালসেন “শাকে খ-নব-খেন্দ্বব্দে” [১০৯০ শকাব্দে = ১১৬৮ খৃষ্টাব্দে] “অদ্ভুত সাগর” আরম্ভ করিয়াছিলেন।[৬] বোধ হয় এই নিমিত্ত কিল্‌হর্ণ পূর্ব্ব মত পরিত্যাগ করিয়া, লক্ষ্মণসেনের রাজত্ব খৃষ্টীয় দ্বাদশ শতাব্দের শেষ পাদে এবং বল্লালসেনের রাজত্ব তৃতীয় পাদে নির্দ্দেশ করিয়া গিয়াছেন।[৭] শ্রীযুত মনোমোহন চক্রবর্ত্তী মহাশয় অদ্ভুত সাগর হইতে বল্লালসেনের রাজ্যাভিষেকের কালও আবিষ্কৃত করিয়াছেন।[৮] অদ্ভুত সাগরের, “সপ্তর্ষীনামদ্ভুতানি”-প্রকরণে লিখিত আছে,—“ভুজ-বসু-দশ মিতে (১০৮১) শকে শ্রীমদ্‌বল্লালসেন-রাজ্যাদৌ” ইত্যাদি। ইহাতে ১০৮১ শক (১১৫৯ খৃষ্টাব্দ) বল্লালসেনের রাজত্বের প্রথম বৎসর রূপে নির্দ্দিষ্ট হইয়াছে।

  1. Keilhorn’s List of Northern Inscriptions, Appendix to Epigraphia Indica, Vol V.
  2. Deutsche Morganlandische Gesselschaft.
  3. Epigraphia Indica, Vol. I, p.
  4. Journal of the Asiatic Society of Bengal, 1888, Part I, p. 2.
  5. J. A. S. B., 1896, Part I, p. 23. India office-এর পুস্তকালয়ে যে এক খণ্ড, “দানসাগর” আছে, তাহার উপসংহারেও, এই শ্লোকার্দ্ধ আছে। (Eggeling’s Catalogue, p. 545)। রাজসাহী কলেজের সংস্কৃতাধ্যাপক শ্রদ্ধাভাজন পণ্ডিত শ্রীযুত শ্রীশচন্দ্র চক্রবর্ত্তী মহাশয় বলেন,—তিনি সিভিলিয়ান Mr. Rankingএর নিকট একখণ্ড “দানসাগর” দেখিয়াছিলেন; তাহাতেও এই শ্লোক আছে।
  6. Bhandarkar’s Report on the search for Sanskrit Manuscripts during 1887–88 and 1890-91, p. lхххv.
  7. Epigraphia Indica, Vol. viii, Synchronous Table for Northern India, A. D. 400-1400; column 7.
  8. Journal of the Asiatic Society of Bengal, 1906, p. 17 note.