গৌড়লেখমালা (প্রথম স্তবক)/বীরদেব-প্রশস্তি

গৌড়লেখমালা।

Ghoshrawa Inscription.tif

৪৫ পৃষ্ঠা]
K. V. Seyne & Bros.
ঘোষরাবাঁ-লিপি।

 

বীরদেব-প্রশস্তি।

[ঘোষরাবাঁ-লিপি]
প্ৰশস্তি-পরিচয়।

 ১৮৪৮ খৃষ্টাব্দে মার্চ্চ মাসে কাপ্তেন কিট্টো বিহার নগরের ৭ মাইল দক্ষিণ-পূর্ব্বে [ঘোষরাবাঁ নামক গ্রামে] এই প্রস্তর-লিপিটি প্রাপ্ত হইয়া, লিপির নিম্নে [ইংরাজি ভাষায়] তাহার আবিষ্কার-কাহিনী আবিষ্কার-কাহিনী। উৎকীর্ণ করাইয়া দিয়াছিলেন।[১] এক্ষণে ইংরাজি অক্ষরগুলি বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে; তথাপি কিছু কিছু চিহ্ন দেখিতে পাওয়া যায়। ইহা বীরদেব নামক জনৈক বৌদ্ধ যতির প্রশস্তি;—ঘোষরাবাঁ গ্ৰামে আবিষ্কৃত হইয়াছিল বলিয়া, “ঘোষরাবাঁ-লিপি” নামে পরিচিত। ইহার সহিত ইতিহাসের নানারূপ সম্পৰ্ক বর্ত্তমান থাকায়, ইহা বহুবার মুদ্রিত ও আলোচিত হইয়াছে।

 প্রথমে ডাক্তার ব্যালান্‌টাইন্ এই প্রস্তর-লিপির পাঠোদ্ধারে ব্যাপৃত হইয়াছিলেন। তাঁহার উদ্ধৃত পাঠ এবং কাপ্তেন কিট্টোর এবং লেড্‌লে সাহেবের বিবিধ মন্তব্য পাঠোদ্ধার-কাহিনী। এসিয়াটিক্ সোসাইটির পত্রিকায়[২] প্ৰকাশিত হইয়াছিল। পরে [জেনারেল] কনিংহাম একাধিকবার এই শিলা-লিপির উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন।[৩] এক্ষণে অধ্যাপক কিল্‌হর্ণ কর্ত্তৃক প্ৰকাশিত[৪] পাঠই ইহার প্ৰকৃত পাঠ বলিয়া সুপরিচিত হইয়াছে। কিন্তু এই লিপি এখনও বঙ্গ-সাহিত্যে যথাযোগ্যভাবে আলোচিত হয় নাই। ইহার সহিত বাঙ্গালার ইতিহাসের সম্বন্ধ বর্ত্তমান থাকায়, ইহা “লেখমালার” অন্তর্নিবিষ্ট হইল।

 ডাক্তার ব্যালান্‌টাইন্‌ই সর্ব্ব প্রথমে এই প্রস্তর-লিপির ব্যাখ্যা-কার্য্যে হস্তক্ষেপ করিয়াছিলেন। উত্তরকালে, এই সকল কথার কিছুমাত্ৰ উল্লেখ না করিয়া, ব্রোড্‌লে সাহেব ইহাকে ব্যাখ্যা-কাহিনী। একখানি নবাবিষ্কৃত প্রস্তর-লিপিরূপে [ডাক্তার রাজেন্দ্ৰলাল ও ডাক্তার ভাণ্ডারকার-কৃত দুইটি ব্যাখ্যা সহ] সোসাইটির পত্রিকায়[৫] প্রকাশিত করিয়াছিলেন। ইহা একটি বৌদ্ধ-লিপি। দেবপালদেবের শাসন-সময়ে বৌদ্ধ-শিক্ষার অবস্থা কিরূপ ছিল, ইহাতে তাহার কিছু কিছু পরিচয় লাভের সম্ভাবনা আছে। তজ্জন্য ইহা সমাদর লাভের যোগ্য।

 এই শিলা-লিপির পংক্তি-সংখ্যা ১৯; তাহাতে সংস্কৃতভাষা-নিবদ্ধ ১৬টি শ্লোক উৎকীর্ণ রহিয়াছে। তাহা প্রস্তর-ফলকের ১ ফুট ১১ ইঞ্চ × ১ ফুট ২ ইঞ্চ পরিমিত স্থান অধিকার করিয়া লিপি-পরিচয়। রাখিয়াছে। অক্ষরগুলি ঘন-সন্নিবিষ্ট হইলেও, অক্ষুণ্ণ অবস্থায় বর্ত্তমান আছে। লিপিটি যে বহুযত্নে উৎকীর্ণ হইয়াছিল, তাহাতে সংশয় নাই। ইহা বিহার-প্রদেশে উৎকীর্ণ হইলেও, অক্ষরগুলির মধ্যে অনেক প্রাচীন বঙ্গাক্ষর বর্ত্তমান আছে। এক সময়ে এই অক্ষর যে বঙ্গদেশের চতুঃসীমার বাহিরেও ব্যবহৃত হইত, ইহাতে তাহার পরিচয় প্রকাশিত হইয়া রহিয়াছে। এই লিপিকে পাল-সাম্রাজ্যের প্রথম শতাব্দীর শেষভাগের উত্তর ভারতীয় লিপির আদৰ্শ বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে।

 ইহাতে [১৪ পংক্তিতে] একটি বজ্রাসন-প্রতিষ্ঠার কথা উল্লিখিত আছে। প্রতিষ্ঠাতার নাম বীরদেব। তাঁহারই জীবন-কাহিনীর বর্ণনা করিতে গিয়া, কবি প্রসঙ্গক্ৰমে নানা ঐতিহাসিক লিপি-বিবরণ। তথ্যের পরিচয় প্রদান করিয়া গিয়াছেন। উল্লেখযোগ্য তথ্যগুলি এই;—(১) ইন্দ্রগুপ্তের পুত্র বীরদেব (জালালাবাদ-উপত্যকার) নগরহার নামক স্থানের ব্রাহ্মণবংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। (২) তিনি বেদাদিশাস্ত্রের অধ্যয়ন সমাপ্ত করিয়াছিলেন; বৌদ্ধমতের অনুরাগী হইয়া [অধ্যয়নার্থ] কণিষ্ক-বিহারে গমন করিয়াছিলেন। (৩) তথায় সর্ব্বজ্ঞশান্তি নামক আচার্য্যের নিকট শিক্ষালাভ করিয়া এবং বৌদ্ধমতে দীক্ষিত হইয়া, বীরদেব (বুদ্ধগয়াধামের) মহাবোধি দর্শন করিবার উদ্দেশ্যে, প্রাচ্য-ভারতে আগমন করিয়াছিলেন। (৪) তথায় দীর্ঘকাল যশোবর্ম্মপুর নামক [তৎকাল-প্রসিদ্ধ] বৌদ্ধ-বিহারে অবস্থিতি করিয়া, তিনি দেবপাল নামক ভুবনপালের নিকট পূজা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। (৫) এই বৌদ্ধযতি দুইটি চৈত্য প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন। প্রশস্তিতে কবি বা শিল্পীর পরিচয় উল্লিখিত নাই। প্রস্তর-ফলকটি এক্ষণে বিহার-নগরের যাদুঘরে রক্ষিত হইতেছে।


প্রশস্তি-পাঠ।

 
श्रीमानसौ जयति सत्वहित-प्रवृत्त-
सन्मानसाधिगत-तत्त्वनयो मुनीन्द्रः।
क्लेशात्मनां दुरित-नक्र-दुरासदान्तः

संसार-सागर-समुत्त-
रणैकसेतुः॥(১)
अस्यास्मद् गुरवो बभूव रबलाः सम्भूय हर्त्तूं मनः
का लज्जा यदि केवलो न बलवानस्मि त्रिलोकप्रभौ।
इत्यालोचयते-
व मानसभुवा यो दूरतो वर्ज्जितः
श्रीमान् विश्व मशेष मेतदवताद्वोधौ स वज्रासनः॥(২)
अस्त्युत्तरापथ-विभूषण-भूतभूमि-
र्द्देशोत्तमो न-
गरहार इति प्रतीतः।
तत्र द्विजाति रुदितोदित-वंशजन्मा
नाम्नेन्द्रगुप्त इति राजसखो बभूव॥(৩)
रज्जेकया द्विजवरः स गुणी गृ-
हिण्या
युक्तो रराज कलया[ऽ]मलया यथेन्दुः।
लोकः पतिव्रतकथा-परिभावनासु
संकीर्त्तनं प्रथममेव करोति यस्याः॥(৪)
ताभ्यामजा-
यत सुतः सुतरां विवेकी
यो बाल एव कलितः परलोक-बुद्ध्या।
सर्व्वोपभोग-सुभगेपि गृहे विरक्तः
प्रव्रज्यया सुगत-शासनमभ्युपे(पै)-
तुम्॥(৫)

वेदानधीत्य सकलान् कृतशास्त्रचिन्तः
श्रीमत् कणिष्क मुपगम्य महाविहारम्।
आचार्य्यवर्य्य मथ स प्रशम-प्रशस्यं
सर्व्वज्ञशान्ति मनुगम्य
तप श्वचार॥(৬)
सोयं विशुद्धगुण-सम्भूत-भूरिकीर्त्तेः
शिष्योऽनुरूप-गुणशील-यशोभिरामः।
बालेन्दुवत् कलिकलङ्क-विमुक्त-कान्ति
र्वन्द्यः
सदा मुनिजनै रपि वीरदेवः॥(৭)
वज्रासनं वन्दितु मेकदाऽथ
श्रीमन्महाबोधि मुपागतोऽसौ।
द्रष्टुं ततोऽगात् सहदेशि-भिक्षून्
श्रीमत् यशोवर्म्म-
१० पुरं विहारम्॥(৮)
तिष्टन्नथेह सुचिरं प्रतिपत्तिसारः
श्रीदेवपाल-भुवनाधिपलब्ध-पूजः।
प्राप्त-प्रभः प्रतिदिनोदय-पूरिताशः
पूषेव दारित-
११ तमःप्रसरो रराज॥(৯)
भिक्षोरात्मसमः सुहृद्भुज इव श्रीसत्यबोधे र्निजो
नालन्दा परिपालनाय नियतः संघस्थिते र्य स्थितः।
येनैतौ स्फु-
१२ टमिन्द्रशैल-मुकुट-श्रीचैत्य-चूड़ामणी


श्रामण्यव्रत-सम्वृतेन जगतः श्रेयोऽर्थ मुत्थापितौ॥(১০)
नालन्दया च परिपालितयेह सत्या
श्रीम-
१३ द्विहार-परिहार-विभूषिताङ्ग्या।
उद्भासितोपि बहु-कीर्त्तिवधू-पतित्वे
यः साधु साधुरिति साधुजनैः प्रशस्तः॥(১১)
चिन्ताज्वरं शमयताऽर्त्तजन-
१४ स्य दृष्ट्या
धन्वन्तरेरपि हि येन हतः प्रभावः।
यश्चेप्सितार्थ परिपृर्ण मनोरथेन
लोकेन कल्पतरु-तुल्यतया गृहीतः॥(১২)
तेनैतद
१५ त्र क़ृत मात्ममनोवदुच्चै-
र्वज्रासनस्य भवनं भुवनोत्तमस्य।
सञ्जायते यदभिवीक्ष्य विमानगानां
कैलासमन्दर-महीधरशृङ्ग-शङ्का॥(১৩)
सर्व्व-
१६ स्वोपनयेन सत्वसुहृदा मौदार्य्य मभ्यस्यता
सम्बोधौ विहितस्पृहं सहगुणै र्विंस्पर्द्धि वीर्य्यन्तथा।
अत्रस्थेन निजे निजाविह बृहत् पुण्याधिकारे-
१७ स्थिते
येन स्वेन यशोध्वजेन घटितौ वंशावुदीचीपथे॥(১৪)
सोपानमार्गमिव मुक्तिपुरस्य कीर्त्ति
मेतां विधाय कुशलं यदुपात्त मस्मात्।

१८ कृत्वादितः सपितरं गुरुवर्ग मस्य
सम्बोधि मेतु जनराशि रशेष एव॥(১৫)
यावत् कूर्म्मो जलधिवलयां भूतधात्रीं बिभर्त्ति
ध्वान्तध्वंसी
१९ तपति तपनो यावदेवोग्ररश्मिः।
स्निग्धालोकाः शिशिरमहसा यामवत्यश्च यावत्
तावत् कीर्त्ति र्जयतु भुवने वीरदेवस्य शुभ्रा॥(১৬)

 

 

বঙ্গানুবাদ।

(১)

 যে মুনীন্দ্র জীবহিতপ্রবৃত্ত-সাধুচিত্তবৃত্তি-প্রভাবে ধর্ম্ম-তত্ত্ব অধিগত করিয়াছেন, ক্লেশ-নিপীড়িত[৬] জনসাধারণের পক্ষে পাপ-কুম্ভীরসমাকুল দুরতিক্রমনীয় সংসার-সাগর উত্তীর্ণ হইবার একমাত্র সেতুরূপে বর্ত্তমান সেই শ্রীমান্ [বুদ্ধদেব] জয় লাভ করুন্।

(২)

 তাঁহার মনোহরণ করিবার অভিপ্রায়ে সমুদ্ভূত হইয়া, আমার অপেক্ষা শ্রেষ্ঠগণ বলহীন হইয়া গিয়াছেন, আমি যদি একাকী সেই ত্রিলোকপ্রভুর নিকটে বলবান্ বলিয়া প্রতিপন্ন হইতে না পারি, তাহাতে লজ্জা কি,—এইরূপ আলোচনা-পরায়ণ মনোভব [কামদেব] যাঁহাকে দূর হইতে বর্জ্জন করিয়া গিয়াছেন, বোধিদ্রুম-মূলাসীন সেই শ্রীমান্ “বজ্রাসন” অশেষ বিশ্বকে রক্ষা করুন্।[৭]

(৩)

 উত্তরাপথের অলংঙ্কার ন গ র হা র[৮] নামে সুবিখ্যাত যে উত্তম দেশ [বর্ত্তমান], তথায় অত্যুন্নত দ্বিজাতি-বংশে ইন্দ্রগুপ্ত নামক রাজসুহৃৎ জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন।

(৪)

 সেই গুণশালী দ্বিজবর, রজ্জেকা নাম্নী গৃহিণীর সহিত সংযুক্ত হইয়া, অমলকলা-সংযুক্ত [পূর্ণ] চন্দ্রের ন্যায় শোভা প্রাপ্ত হইতেন। পতিব্রতাগণের কথা চিন্তা করিবার সময়ে, লোকে সর্ব্বাগ্রে সেই [রজ্জেকা দেবীর] নাম সংকীর্ত্তন করিয়া থাকে।

(৫)

 তাঁহাদিগের একটি পুত্র জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। [তাঁহাদের ন্যায় দম্পতীর পুত্র বলিয়া] অতিশয়[৯] বিবেকী [সেই পুত্র], পরলোক-বুদ্ধিতে [পরিচালিত হইয়া] সকল ভোগসুখ-মনোজ্ঞ পিতৃগৃহে আসক্তিশূন্য হইয়া, সন্ন্যাসাবলম্বনে সুগত-শাসন স্বীকার করিবার জন্য, বাল্যকাল হইতেই, [তাহা] জ্ঞাত হইয়াছিলেন।

(৬)

 সমগ্র বেদের অধ্যয়ন এবং শাস্ত্রচিন্তা সমাপ্ত কবিয়া, সেই শ্রীমান্ কণিষ্ক-মহাবিহারে[১০] উপনীত হইয়া, ক্রোধোপশান্তিসাধনে[১১] প্রশংসাপ্রাপ্ত সর্ব্বজ্ঞশান্তি নামক আচার্য্যবরের [উপদেশের] অনুসরণ করিয়া, তপস্যা করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন।

(৭)

 বিশুদ্ধগুণসঞ্জাত-বহুকীর্ত্তিবিভূষিত [সেই] সর্ব্বজ্ঞশান্তির অনুরূপ গুণ-শীল-যশঃ উপার্জ্জন করিয়া, বীরদেব নামক তাঁহার কলিকলঙ্ক-বিমুক্তকান্তি সেই নয়নাভিরাম শিষ্য বালেন্দুবৎ সর্ব্বদা মুনিজনগণের বন্দনা লাভ করিয়াছিলেন।

(৮)

 অনন্তর সেই শ্রীমান্ একদা বজ্রাসন[১২] বন্দনা করিবার অভিপ্রায়ে, মহাবোধিতে [বুদ্ধগয়াধামে] উপনীত হইয়াছিলেন; এবং তথা হইতে “সহদেশি”[১৩] ভিক্ষুগণকে দর্শন করিবার অভিপ্রায়ে, যশোবর্ম্মপুরের[১৪] বিহারে গমন করিয়াছিলেন।

(৯)

 তিনি তথায় প্রতিপত্তি লাভ ও দীর্ঘকাল অবস্থিতি করিয়া, দেবপাল নামক ভুবনাধিপতির নিকট পূজা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। সূর্য্যদেব যেমন প্রতিদিন প্ৰভাতসময়ে দিক্‌সমূহ উদ্ভাসিত ও প্রভাবিস্তারে অন্ধকারের প্রসার বিদীর্ণ করিয়া শোভা পাইয়া থাকেন, তিনিও সেইরূপ প্রতিদিন প্রভাত সময়ে আশানুরূপ চরিতার্থতা লাভে তপঃপ্রভাবে তমোগুণকে বিদীর্ণ করিয়া, শোভা প্রাপ্ত হইতেন।[১৫]

(১০)

 শ্রীসত্যবোধির[১৬] আপন বাহুর ন্যায় সুহৃৎ, ভিক্ষুগণের আপন আত্মার ন্যায় [প্ৰিয়তম] সেই বীরদেব সংঘস্থিতির জন্য নালন্দার[১৭] পরিপালন-ভার প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। শ্ৰামণ্য ব্রতধারী [সেই বীরদেব] জগতের হিত-কামনায় ইন্দ্রশিলা-পর্ব্বতের[১৮] উপর, তাহার মুকুটস্বরূপ, দুইটি চৈত্যচূড়ামণি উত্থাপিত করাইয়াছিলেন।

(১১)

 তিনি বিহার-পরিহার-বিভূষিতাঙ্গী নালন্দার প্রতিপালন-কার্য্যে [নিযুক্ত হইয়া] বহু কীর্ত্তিবধূ-পতিরূপে উদ্ভাসিত হইলেও, [সকল কীর্ত্তিবধূকেই সমভাবে ভাল বাসিবার জন্য] সাধুজনকর্ত্তৃক সাধু সাধু বলিয়া প্রশংসিত।

(১২)

 তিনি ধন্বন্তরীর প্রভাব প্রতিহত করিয়া, দৃষ্টিপাতমাত্রে, আর্ত্তজনের চিন্তাজ্বর প্রশমিত করিয়া থাকেন। [তাঁহার নিকটে আসিলে] সকল মনোরথ পূর্ণ হইয়া যায় বলিয়া, লোকে তাঁহাকে কল্পতরুতুল্য বলিয়াই মনে করিয়া থাকে।

(১৩)

 তিনি এখানে, “বজ্রাসনের” জন্য, আত্ম-মনের ন্যায় সমুন্নত ভুবনোত্তম [এমন] একটি মন্দির নির্ম্মাণ করিয়া দিয়াছেন [যে] তাহার প্রতি দৃষ্টিপাত করিলে, বিমানচারিগণের মনে কৈলাস-মন্দর-মহীধরশৃঙ্গ বলিয়া আশঙ্কা উপস্থিত হইয়া থাকে।

(১৪)

 সর্ব্বস্বের উপনয়ের[১৯] দ্বারা [সর্ব্ব] প্রাণি-হিতার্থিগণের ঔদার্য্য এবং সম্বোধি [তত্ত্বজ্ঞান] লাভার্থ, স্পৃহনীয় গুণ ও বীর্য্য [অধ্যাত্মশক্তি] অভ্যাস করিয়া, তিনি এখানকার পুণ্যাধিকারে অবস্থিত থাকিবার সময়ে, উত্তরাপথ-সংস্থিত আপন [মাতৃ-পিতৃ] দুইটি বংশে[২০] নিজের যশোধ্বজ সংবদ্ধ করিয়া দিয়াছেন।

(১৫)

 মুক্তি-পুরীর সোপান-পথের ন্যায় এই কীর্ত্তি[২১] সংস্থাপিত হওয়ায়, ইহাতে যে পুণ্য সঞ্জাত হইল, তাহাতে প্রথমে[২২] [বীরদেবের] পিত্রাদি গুরুবর্গ ও পরে অশেষ জনরাশি সম্বোধি লাভ করুক্।

(১৬)

 যে পর্য্যন্ত কূর্ম্মদেব জলধিবলয়া ভূতধাত্রী [বসুন্ধরা]কে ধারণ করিয়া রহিবেন,—যে পর্য্যন্ত অন্ধকার-বিধ্বংসী উগ্ররশ্মি তপনদেব তাপ বিকীরণ করিবেন,—যে পর্য্যন্ত [যামবতী] রজনী [শীতরশ্মি] চন্দ্রকিরণে স্নিগ্ধ আলোক বিতরণ করিতে থাকিবেন,—তৎকাল পর্য্যন্ত বীরদেবের [এই] শুভ্রকীর্ত্তি পৃথিবীতে জয়লাভ করুক্।

 

 

মূল পাঠের টীকা

^(১)  বসন্ততিলক।

^(২)  শার্দ্দূলবিক্রীড়িত।

^(৩)  বসন্ততিলক।

^(৪)  বসন্ততিলক।

^(৫)  বসন্ততিলক। এই শ্লোকের শেষ শব্দ [अभ्युपैतुम्] “अभ्युपेतुम्” রূপে উৎকীর্ণ রহিয়াছে।

^(৬)  বসন্ততিলক। ‘महाविहारं’ প্রথমে ‘महारं’ রূপে উৎকীর্ণ হইয়াছিল; পরে ‘विहा’ এই দুইটি অক্ষর নিম্নে উৎকীর্ণ হইয়াছে।

^(৭)  বসন্ততিলক।

^(৮)  ইন্দ্রবজ্রা।

^(৯)  বসন্ততিলক।

^(১০)  শার্দ্দূলবিক্রীড়িত।

^(১১)  বসন্ততিলক।

^(১২)  বসন্ততিলক।

^(১৩)  বসন্ততিলক।

^(১৪)  শার্দ্দূলবিক্রীড়িত।

^(১৫)  বসন্ততিলক।

^(১৬)  মন্দাক্রান্তা।

প্রশস্তি-পরিচয় ও অনুবাদ-অংশের টীকা

  1.  ইংরাজি ভাষায় উৎকীর্ণ লিপিটি এইরূপ ছিল—“Recovered and placed here by Captain M. Kittoe on part of Government, March 30, A. D. 1848.”
  2.  J. A. S. B., Vol. XVII, Part 1, pp. 492-501.
  3.  Archeological Survey Reports Vol. I, p. 38; Vol. III, p. 120; and Ancient Geography of India, Vol. I, p. 44.
  4.  Indian Antiquary Vol. XVII, pp. 307-312.
  5.  J. A. S. B. Vol XII, pp. 268-274.
  6.  এই শ্লোকের “ক্লেশাত্মনাং”-শব্দে পাতঞ্জল-দর্শনোক্ত [২ পাদ ৩ সূত্র] “পঞ্চক্লেশ” সূচিত হইয়াছে বলিয়া বোধ হয়। যথা,—

    अविद्याऽस्मिता-रागद्वेषाभिनिवेशाः पञ्च क्लेशाः।

     অবিদ্যাদি-পঞ্চক্লেশ-নিপীড়িত জনগণের পক্ষে সংসার-সাগর সমুত্তীর্ণ হইবার সম্ভাবনা নাই; তাহাদের পক্ষে বুদ্ধদেবকে সেতুরূপে গ্রহণ করাই কর্ত্তব্য,—এইরূপ গুরুবাদমূলক মত এই শ্লোকে প্রকটিত হইয়াছে।

  7.  নাগানন্দের নান্দী স্মরণীয়।
  8.  কাবুলের অন্তর্গত জালালাবাদের নিকটে ‘নগরহার’ অবস্থিত ছিল। Cunningham’s Ancient Geography of India Vol. I, p. 43; and Beal’s Si-yu-ki, Vol. I, p. 91.
  9.  “সুতরাং”-শব্দ অবধারিতার্থ-প্রতিপাদক (সু + তরপ্) এবং “কলিত” শব্দ প্রাপ্ত বা বিদিত অর্থ-প্রতিপাদক। মূল প্রশস্তির “অভ্যুপেতুম্”-শব্দ “অভ্যুপৈতুম্”-শব্দের লিপিকর-প্রমাদ। অঙ্গীকার বা স্বীকার অর্থে ইহা ব্যবহৃত হইয়াছে।
  10.  আধুনিক পেশোয়ার-নগরের উপকণ্ঠে যে কণিষ্ক-স্তূপের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হইয়াছে, [ইউয়ান্‌ চোয়াং-এর মতে] তাহার পশ্চিমে মহারাজ কণিষ্ক-নির্ম্মিত মহাবিহার অবস্থিত ছিল। আল্‌বেরুণী “কণিক-চৈত্য” বলিয়া ইহার উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন। Watter’s Vol. I, p. 208.
  11.  এই শ্লোকের “प्रशम-प्रशस्य” পদটি গভীরার্থ-বিজ্ঞাপক। মল্লিনাথ [কিরাতার্জ্জুনীয়ে দ্বিতীয় সর্গে ৩২ শ্লোকে] “प्रशम” শব্দের ব্যাখ্যায় লিখিয়া গিয়াছেন,—“प्रशमः क्रोधोपशान्तिरिति।” এই অর্থেই যে “प्रशम”-শব্দ সাধারণতঃ ব্যবহৃত হইত, “মহাবীর-চরিতে” [দ্বিতীয় অঙ্কে] তাহার একটি সুপরিচিত উদাহরণ প্রাপ্ত হওয়া যায়। যথা,—

    “एष मे प्रशमस्य कर्कशः परिणामः।”

     বুদ্ধশান্তি, রত্নাকরশান্তি প্ৰভৃতি যতিগণের নাম সুবিদিত। সর্ব্বজ্ঞশান্তিও তদ্রূপ একজন যতির নাম।

  12. The platform or terrace which supported the holy pippal tree was called Bodhimanda, or “the ornament of the Bodhi tree”, and on it was raised the famous Vajrásana or diamond throne, in commemoration of the spot on which Sákya Sinha had obtained Buddhahood after sitting in meditation for six years—Cunningham’s Archeological Survey Report, Vol. III, p. 80.
  13.  “सहदेशि भिक्षून्” ডাক্তার হুল্‌জ কর্ত্তৃক “monks of his native country” বলিয়া ব্যাখ্যাত হইয়াছে। কিন্তু এখানে কোনরূপ সম্প্রদায়বিশেষই সূচিত হইয়াছে বলিয়া বোধ হয়।
  14.  যশোবর্ম্মপুর কোথায় ছিল, তাহার আলোচনায় প্রবৃত্ত হইয়া, ডাক্তার হুল্‌জ ঘোষরাবাঁকেই যশোবর্ম্মপুর বলিয়া গ্রহণ করিয়াছেন। কনিংহাম বিহার নগরকে যশোবর্ম্মপুর বলিয়া স্থির করিয়া গিয়াছেন—(Archeological Survey Report Vol. III, 120, 135 and Vol. VIII, p. 76).
  15.  এই শ্লোকে দেবপালদেব ‘ভুবনাধিপ’ বলিয়া বর্ণিত হইয়াছেন। বিহার-প্রদেশ যে তাঁহার সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল, তাঁহার মুদ্গগিরি-সমাবাসিত জয়স্কন্ধাবার হইতে প্রদত্ত [মুঙ্গেরে আবিষ্কৃত] তাম্রশাসনই তাহার প্রমাণ। এই শ্লোকের “दारितः तमप्रसरो” দুইটি অর্থ ধ্বনিত করিয়া, রচনাকৌশলের পরিচয় প্রদান করিতেছে।
  16.  শ্রীসত্যবোধি নামক স্থবির বীরদেবের পূর্ব্বে নালন্দার অধ্যক্ষ ছিলেন বলিয়া অনুমান করিয়া, ডাক্তার হুল্‌জ লিখিয়া গিয়াছেন,—“Satyabodhi may have been Víradeva’s predecessor at Nálandá.” কিন্তু এই শব্দে পবিত্র বোধিবৃক্ষ সূচিত হইয়াছে কিনা, তাহা চিন্তনীয়।
  17.  বড়গাঁও নামক বিহার-নগরের নিকটবর্ত্তী স্থানে নালন্দার বিশ্ববিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত ছিল বলিয়া কনিংহাম সিদ্ধান্ত করিয়া গিয়াছেন।—Ancient Geography of India, Vol. I, p. 469.
  18.  ইন্দ্ৰশিলা-পর্ব্বত বৌদ্ধ-সাহিত্যে সুপরিচিত। ইহা গিরিয়েক পর্ব্বতের প্রাচীন নাম বলিয়া কনিংহাম সিদ্ধান্ত করিয়া গিয়াছেন। কাপ্তান কিট্টো, এবং তাঁহার পদাঙ্কানুসরণকারী ব্রোড্‌লে সাহেব, বিহার-নগরকেই ইন্দ্ৰশিলা বলিয়া স্থির করিয়াছিলেন। ইহার বাদানুবাদ Cunningham’s Archeological Survey Report Vol. I, pp. 145-151 দ্রষ্টব্য।
     ডাক্তার হুল্‌জ্ একাদশ শ্লোকের ব্যাখ্যায়, “পরিহার” শব্দে “an arm-ring” কল্পনা করিয়া গিয়াছেন। পরিহার শব্দের এরূপ অর্থ যে কোনও অভিধানে দেখিতে পাওয়া যায় না, তাহার উল্লেখ করিয়াও, ডাক্তার হুল্‌জ্ কেন এরূপ অর্থ গ্রহণ করিয়াছিলেন, তাহা বোধগম্য হয় না। পরিহার-শব্দের সাধারণ অর্থ [অবজ্ঞা বা অনাদর বা ত্যাগ] অবশ্যই এখানে সূচিত হয় নাই।
     মনুসংহিতায় [৮৷২৩৭] আরও একটি অর্থ দেখিতে পাওয়া যায়। যথা—

    “धनुः शतं परीहारो ग्रामस्य स्यात् समन्ततः॥”

     ইহার ব্যাখ্যা করিতে গিয়া কুল্লুকভট্ট লিখিয়া গিয়াছেন,—“ग्रामसमीपे सर्व्वासु दिक्षु चत्वारि हस्तशतानि त्रीन् वा यष्टिप्रक्षेपान् यावत् पशुप्रचारार्थं शस्यवपनादि-संरोध-परिहारः कार्य्यः।” এখানেও ‘পরিহার’-শব্দে এইরূপ সীমা উল্লিখিত হইয়াছে। বিহারই নালন্দার ‘পরিহার’, তাহাতেই নালন্দা ‘বিভূষিতাঙ্গী’ ছিল।

  19.  “উপনয়” শব্দের সুপরিচিত অর্থ—উপনয়ন—“उप समीपे नीयते येन कर्म्मणा”। তাম্রশাসনাদিতে এই শব্দ আরও একটি অর্থে ব্যবহৃত হইবার পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়, তাহা “প্রদান” বলিয়া কথিত হইতে পারে। এখানে সেই অর্থই সূচিত হইয়াছে।
  20.  “বংশ”-শব্দটি শ্লিষ্টার্থ-জ্ঞাপকরূপে ব্যবহৃত হইয়াছে। বংশ-দণ্ডে ধ্বজা বন্ধন করিবার রীতি আছে। এখানে “বংশ” [মাতৃপিতৃকুল] যেন বীরদেবের যশোধ্বজ বন্ধনের বংশদণ্ড—এইরূপ ভাব ধ্বনিত হইয়াছে।
  21.  “কীর্ত্তি” শব্দের সাধারণ অর্থ সুপরিচিত, “दानादिप्रभवा कीर्त्तिः शौर्य्यादिप्रभवं यशः”। কিন্তু মন্দিরাদিও “কীর্ত্তি” নামে কথিত হইয়া থাকে। “কীর্ত্তি”-শব্দের এই অর্থ হেমচন্দ্রের “অভিধান-চিন্তামণিতে” দ্রষ্টব্য। এখানে এই অর্থই সূচিত হইয়াছে। রাজসাহীর অন্তর্গত মান্দায় আবিষ্কৃত [লেখক কর্ত্তৃক কলিকাতা যাদুঘরে প্রেরিত] গোপালদেবের নামাঙ্কিত একখানি প্রস্তর-লিপিতে এই অর্থে “कृता कीर्त्ति र्विराजितं” লিখিত আছে।
  22.  এই শ্লোকের “कृत्वादितः” একটি উল্লেখযোগ্য প্ৰয়োগ,—“आदितः कृत्वा।”