ঘর-পোড়া লোক (শেষ অংশ)/পঞ্চম পরিচ্ছেদ

পঞ্চম পরিচ্ছেদ।

 হোসেন দারোগা সাহেবের নিকট প্রত্যাবর্তন করিলে, তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, “গোফুর খাঁর সহিত আপনার সাক্ষাৎ হইয়াছিল কি?”

 হোসেন। হাঁ মহাশয়! সাক্ষাৎ হইয়াছিল।

 দারোগা। তিনি কি বলিলেন?

 হোসেন। তিনি আপনার প্রস্তাবে সম্মত আছেন, কিন্তু অত টাকা এখন দিয়া উঠিতে পারিবেন না।

 দারোগা। কত টাকা। এখন তিনি প্রদান করিতে সমর্থ আছেন?

 হোসেন। এখন এক লক্ষ টাকা তিনি প্রদান করিতে সমর্থ আছেন।

 দারোগা। এত অল্প টাকায় ত আমি এই কার্য্য শেষ করিতে পারিব না।

 হোসেন। দুই লক্ষ টাকা এখন আমাদিগের হন্তে নাই। এখন আমি এক লক্ষ টাকা প্রদান করিতেছি, আসামীদ্বয় মুক্তিলাভ করিবার একমাস পরে বক্রী এক লক্ষ টাকা যেরূপে পারি, সেইরূপে সংগ্রহ করিয়া আপনাকে নিশ্চয়ই প্রদান করিব। তাহার কোন অন্যথা হইবে না।

 দারোগা। এখন কি এক লক্ষ টাকার অধিক আর কিছুই দিতে পারিবেন না?  হোসেন। নিতান্ত আবশ্যক হয়, আরও কিছু দিতে পারি। আপনার নিকট আমি কোন কথা গোপন করিতেছি না, আমার নিকট এখন এক লক্ষ পঁচিশ হাজার টাকা আছে, ইহার মধ্যে আপাততঃ আবশ্যক উপযোগী যে কয় হাজার টাকার প্রয়োজন, তাহা রাখিয়া অবশিষ্ট সমস্তই আমি আপনাকে প্রদান করিতে প্রস্তুত আছি। কার্য শেষ হইয়া গেলে, অবশিষ্ট টাকাগুলি আপনাকে আমি প্রদান করিয়া যাইব।

 দারোগা। আবশ্যক খরচ-পত্রের নিমিত্ত আপাততঃ আপনি পাঁচ হাজার টাকা আপনার নিকট রাখিয়া দিন। অবশিষ্ট এক লক্ষ কুড়ি হাজার টাকা আমাকে প্রদান করুন। আমি আপনার মনিবদ্বয়ের জীবন রক্ষা করিতেছি। অবশিষ্ট টাকা আমাকে সময় মত দিয়া যাইবেন।

 হোসেন। সে বিষয়ে আপনি নিশ্চিন্ত থাকিবেন। আপনি কি উপায়ে উহাদিগের জীবন রক্ষা করিতে সমর্থ হইবেন, তাহা আমরা এখন জানিতে পারিব কি?

 দারোগা। জানিতে পারিবেন বৈ কি। আমি উহাদিগের জীবন রক্ষা করিব বটে; কিন্তু কিছুদিবস উহাদিগকে সবিশেষ কষ্ট সহ্য করিতে হইবে। হোসেন। কিরূপ কষ্ট সহ্য করিতে হইবে, তাহা আমাকে বলিয়া. দিন।

 দারোগা। কেবলমাত্র আপনাকে বলিলে চলিবে না। গোফুর ও ওসমানকে আমি এই স্থানে আনাইতে পাঠাইতেছি; তাহারা আসিলে তাহাদিগকে আমি আমার মনের কথা বলিব, তাহাতে যদি উহারা সম্মত হন, তাহা হইলে আমি এই কার্য্যে হস্তক্ষেপ করিব, এবং আমাকে যে অর্থ প্রদান করিতে চাহিতেছেন, তাহা গ্রহণ করিব। নতুবা সেই অর্থে আমি হস্তক্ষেপ করিব না।

 হোসেনকে এই কথা বলিয়া দারোগা সাহেব একজন প্রহরীকে ডাকিলেন ও তাহাকে কহিলেন, “হাজতের ভিতর যে দুইজন আসামী আছে, তাহাদিগকে আমার নিকট লইয়া আইস।”

 দারোগা সাহেবের কথা শুনিয়া প্রহরী সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিল, এবং অবিলম্বেই গোকুর খাঁ ও তাহার পুত্রকে আনিয়া তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইল। দারোগা সাহেব তাহাদিগকে সেই স্থানে বসিতে বলিলে, অপুর্ণ-লোচনে উভয়েই সেই স্থানে উপবেশন করিলেন।

 দারোগা। এখন আর যোদন করিবার সময় নাই। আমি আপনাদিগকে যে সকল কথা বলিতেছি, তাহা সবিশেষ মনোযোগের সহিত শ্রবণ করুন। পরে সবিশেষ বিবেচনা করিয়া তাহার উত্তর প্রদান করুন। আমি আপনাদিগের জীবন রক্ষা করিতে চাহি। ইহাতে আপনাদিগের অভিমত কি?

 গোফুর। ইহাতে আমাদিগের আর অভিমত কি হইতে পারে? যখন মৃত্যু নিশ্চয় হইবেই, তখন বাঁচিতে পারিলে আর কে না বাঁচিতে চাহে? আপীলে কিছু হইবে কি?

 দারোগা। আপীলে আপনাদিগের জীবন রক্ষা কিছুতেই হইবে না।  গোফুর। তবে কি কোনরূপ যোগাড়যন্ত্র করিয়া লাট সাহেবকে ধরিবেন?

 দারোগা। সেরূপ যোগাড়যন্ত্র করিবার ক্ষমতা আমার নাই। করিলেও তাহার নিকট হইতে ক্ষমা পাইবার আশা নাই।

 গোফুর। তবে কি আপনি বিলাত আপীলে কিছু করিতে পারিবেন?

 দারোগা। সে স্বপ্নেও ভাবিবার কথা নহে। বিলাতের আপীলে কিছু হইবে না, তাহার চেষ্টাও করিব না।

 গোফুর। তবে কিরূপে আমাদিগকে বাঁচাইবেন?

 দারোগা। উপায় অপর আর কিছুই নহে, উপায়ের মধ্যে কেবল এই আছে যে, যদি আমি আপনাদিগকে ছাড়িয়া দি, তাহা হইলেই আপনাদিগের জীবন রক্ষা হইতে পারে; নতুবা জীবন রক্ষার আর কোন উপায় নাই। যাহাদিগকে ফাঁসি দিবার হুকুম হইয়াছে, তাহাদিগকে অনুসন্ধান করিয়া যদি না পাওয়া যায়, তাহা হইলে আর ফাসি হইবে কাহার?

 গোফুর। আমাদিগকে যদি ছাড়িয়া দেন, তাহা হইলে আমাদিগকে ধরিয়া আনিয়া ফাঁসি দিবে। তাহা হইলে আমাদিগের জীবন রক্ষা হইল কি প্রকারে?

 দারোগা। সেই নিমিত্তই আমি আপনাদিগকে এখানে আনিয়াছি। আপনাদিগকে ছাড়িয়া দিলে, আপনাদিগকে একবারে দেশ পরিত্যাগ করিয়া গমন করিতে হইবে। যে স্থানে আপনাদিগের পরিচিত কোন লোক আছে, সে স্থানে, আপনারা থাকিতে পারিবেন না; বহু দূরবর্তী কোন স্থানে গমন করিয়া আপনাপন নাম পরিবর্ত্তন করিয়া সেই স্থানে আপনাদিগকে বাস করিতে হইবে। আপনারা জীবিত আছেন, এ কথা জানিতে পারিলে, আপনাদিগের বড়ই অমঙ্গল হইবে। তাহা হইলে গবর্ণমেন্ট পুনরায় আপনাদিগকে ধরিয়া আনিয়া ফাঁসি-কাষ্ঠে ঝুলাইয়া দিবে। এইরূপে স্বদেশ পরিত্যাগ করিয়া কোন স্থানে আপনাপন পরিবারবর্গ লইয়া গিয়া বাস করুন, তাহাতে কিছুমাত্র আপত্তি নাই। কিন্তু যত দিবস আপনারা বাঁচিবেন, ততদিবস না হউক, কিছু দিবস পর্যন্ত আপনাদিগকে লুক্কায়িত অবস্থায় থাকিতে হইবে। বিশেষ বিবেচনা করিয়া দেখুন, এরূপ প্রস্তাবে যদি আপনারা সম্মত হইতে চাহেন, তাহা হইলে আমাকে বলুন, আমি আপনাদিগকে মুক্তি প্রদান করি।

 গোফুর। এ বিষম কথা। এরূপ অবস্থায় আমরা কিরূপে জীবনধারণ করিতে সমর্থ হইব?

 হোসেন। অপর কোন উপায়ে যখন আপনাদিগের বাঁচিবার সম্ভাবনা নাই, তখন এই উপায় অবলম্বন না করিলে, আর উপায় কি? আপনি বৃদ্ধ হইয়াছেন, আপনার নিজের জীবনের মায়া তত না থাকিলেও থাকিতে পারে; কিন্তু ইহা ভিন্ন ওসমানের জীবন আর কিরূপে রক্ষা হইতে পারে। যে সকল দেশে এতদিবস বাস করিয়াছেন, সেই সকল দেশে না হয়, আর নাই থাকিলেন। অপর স্থানে গমন করিয়া সেই স্থানে পরিবারগণের সহিত বাস করুন। আমি নিজে পারি, বা অপর কোন লোক রাখিয়া পারি, জমিদারীর বন্দোবস্ত করিব। আবশ্যক হইলে সময় সময় আপনার নিকট গমন করিয়া পরামর্শ গ্রহণ করিব। আপনারা সেই স্থানে বসিয়া বসিয়া জমিদারীর উপসত্ব ভোগ করিতে থাকিবেন।

 গোফুর। এরূপ স্থান আমরা কোথায় পাইব?

 হোসেন। এরূপ স্থানের অভাব নাই। অনুসন্ধান করিয়া এত বড় পৃথিবীর ভিতর ওরূপ স্থান আর বাহির করিতে পারিব না?

 দারোগা। যদি আপনারা এরূপ প্রস্তাবে সম্মত হন, তাহা হইলে ওরূপ স্থান অনেক পাওয়া যাইবে। আপাততঃ আপনারা কোন প্রধান সহরে গমন করিয়া তথায় বাস করুন। পরিশেষে উপযুক্তরূপ স্থান ঠিক হইলে সেই স্থানে গমন করিবেন।

 গোফুর। এমন কোন্ সহর আছে যে, সেই স্থানে আমরা অপরের অজ্ঞাত ভাবে বাস করিতে পারিব?

 দারোগা। হয় কলিকাতায় গমন করুন, না হয় বোম্বাই সহরে গিয়া একটা বাড়ী ভাড়া লইয়া আপনাপন নামের ও বাসস্থানের পরিবর্ত্তন করিয়া বাস করুন। কোন কার্য্যের নিমিত্ত আপনারা বাড়ীর বাহিরে গমন করিবেন না, বা পরিচিত কোন লোকের সহিত সাক্ষাৎ করিবেন না। তাহা হইলে আপনাদিগকে কেহই জানিতে পারিবে না। ইচ্ছা করিলে পরিবারবর্গের সহিতও সেই স্থানে বাস করিতে পারেন। কৈবল দেশ হইতে চাকর-চাকরাণী সঙ্গে গ্রহণ করিবেন না। নূতন স্থানে গমন কতয়া সেই প্রদেশীয় নূতন, চাকর-চাকরাণী নিযুক্ত করিবেন। তাহা হইলে তাহারা আপনাদিগের প্রকৃত পরিচয় জানিতে পারিবে না। এইরূপে দুই পাঁচ বৎসর অতিবাহিত করিতে পারিলে, আর সবিশেষ কোনরূপ ভয়ের কারণ থাকিবে না।

 গোফুর। তাহা ত হইল, আমরা যেন এইরূপ উপায়ে জীবন রক্ষা করিলাম। কিন্তু দুই দুইটা প্রাণদণ্ডের আসামী ছাড়িয়া দেওয়া অপরাধে আপনার কি হইবে? অবশ্যই তাহার জন্য আপনাকে দণ্ড গ্রহণ করিতে হইবে?

 দারোগা। রাজদণ্ডে আমি দণ্ডিত হইতে পারি। এই অপরাধে আমার কারাদণ্ড হইবে, কিন্তু আমার প্রাণদণ্ড হইবে না। আমি কারাবাসে গমন করিয়া যদি দুইজনের জীবন রক্ষা করিতে পারি, তাহা হইলে আমার হাতে কোনরূপ কষ্ট হইবে না। আপনার নিকট হইতে আমি যে অর্থ গ্রহণ করিতেছি, তাহা হইতে আমাকে কুড়ি পঁচিশ হাজার টাকা ব্যয় করিতে হইবে। অবশিষ্ট যাহা থাকিবে, আমার জেল হইলে, তাহার দ্বারা আমার স্ত্রী-পুত্র সকলে জীবনধারণ করিতে পারিবে। অথচ আপনাদিগের কিরূপ উপকার করিতে সমর্থ হইব, একবার তাহা মনে করিয়া দেখুন দেখি।

 গোফুর। আমাদিগের জীবন রক্ষা করিবার নিমিত্ত আপনাকে কারাদণ্ড ভোগ করিতে হইবে, এরূপ উপকার আমি প্রার্থনা করি না। কিন্তু আপনার পরোপকারিতার নিমিত্ত আমি আপনাকে ধন্যবাদ না দিয়া থাকিতে পারিলাম না, ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করি, আপনার মঙ্গল হউক।  দারোগা। আমার নিমিত্ত আপনাকে ভাবিতে হইবে না। সহজে আমাকে কেহ জেলে দিতে পারিবে না। তবে ঈশ্বর করুন, যদি আমি কোনরূপ গোলযোগে পতিত হই, তাহা হইলে হোসেনকে বলিয়া দিন, তিনি যেন আমাকে সবিশেষরূপ সাহায্য করেন, লোকের দ্বারাই হউক, বা অর্থের দ্বারাই হউক।

 হোসেন। হোসেন এরূপ নীচ-প্রকৃতিবিশিষ্ট লোক নহে যে, আপনাকে এইরূপ সাহায্য করিবার প্রয়োজন হইলে, মনিবের আদেশ গ্রহণ করিতে হইবে।

 দারোগা। এখন আপনাদিগের এখানে আর অধিক বিলম্ব করিবার প্রয়োজন নাই। শীঘ্র আপনারা এখান হইতে প্রস্থান করুন। রাত্রির ভিতরেই আপনাদিগকে এতদূরে গিয়া উপস্থিত হইতে হইবে যে, অনুসন্ধান করিয়াও পুনরায় যেন আপনাদিগকে আর পাওয়া না যায়।

 হোসেন। আমরা এখন কিরূপ উপায়ে এই স্থান হইতে গমন করিব?

 দারোগা। আমি তাহারও বন্দোবস্ত করিয়া দিতেছি। এই বলিয়া দাবোগা সাহেব তাঁহার বিশ্বাসী দুইজন এক্কাওয়ালাকে ডাকাইতে কহিলেন। একজন প্রহরী গিয়া তাহাদিগকে ডাকিয়া আনিলে, দারোগা সাহেব তাহাদিগকে কহিলেন, “তোমাদিগের খুব দ্রুতগামী মোড়া আছে?” .

 এক্কাচালক। আছে।

 দারোগা। সমস্ত রাত্রিতে কত ক্রোশ পথ অতিবাহিত করিতে পারিবে?  এক্কাচালক। ত্রিশ ক্রোশের কম নহে। চল্লিশ ক্রোশ যাইলেও যাইতে পারি।

 দারোগা। এখান হইতে * * *রেলওয়ে ষ্টেশন পঁয়তাল্লিশ ক্রোশ হইবে, বেল নয়টার ভিতর সেই ষ্টেশনে ইহাদিগকে পৌঁছিয়া দিতে হইবে।

 এক্কাচালক। ভাড়া কত দিবেন?

 দারোগা। কত চাহ?

 এক্কাচালক। দুইখানি একায় পনর টাকা করিয়া ত্রিশ টাকা লইব।

 দারোগা। তাহাই হইবে। তদ্ব্যতীত তোমরা যে কোথায় গিয়াছিলে, কাহাকে লইয়া গিয়াছিলে, এবং কাহার আদেশে গিয়াছিলে, এ কথা কিছুতেই কাহাকেও বলিবে না। ইহার নিমিত্ত তোমাদিগের প্রত্যেককে পঞ্চাশ টাকা করিয়া আরও এক্কা শত টাকা প্রদান করিতেছি। তোমরা তোমাদিগের এক্কা এখনই লইয়া আইস।

 দারোগা সাহেবের কথা শুনিয়া এক্কাওয়ালাগণ তাহাদিগের এক্কা আনিবার নিমিত্ত আপন স্থানে গমন করিল। হোসেন এক লক্ষ কুড়ি হাজার টাকা দারোগা সাহেবের হস্তে প্রদান করিলেন। দেখিতে দেখিতে এক্কা-চালকগণ আপনাপন একা আনিয়া সেই স্থানে উপস্থিত হইল। দারোগা সাহেবের আদেশমত হোসেন তাহাদিগের হস্তে এক শত ত্রিশ টাকা প্রদান করিয়া গোফুর খাঁ, ও ওসমান খাঁ এবং দুইজন পরিচালকের সহিত সেই এক্কায় আরোহণ করিয়া দ্রুতগতি সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিলেন। যাইবার সময় দারোগো সাহেব উভয়ের হস্ত হইতে হাতকড়ি খুলিয়া লইয়া হোসেনকে বলিয়া দিলেন, “ইহাদিগকে কোন স্থানে রাখিয়া দিয়া, দুই চারিদিবস পরে একবার এখানে আসিয়া এদিকের কিরূপ অবস্থা ঘটে, তাহার সংবাদ লইয়া যাইবেন।”