চিদ্বিলাস/বৈশেষিক দর্শন


বৈশেষিক দর্শন।

 বৈশেষিক দর্শনকে কখন কখন নব্য ন্যায়দর্শন বলা হইয়া থাকে। কারণ মহর্ষি গৌতম যে সমস্ত প্রমাণ স্বীকার করিয়াছেন মহর্ষি কনাদও তাহা স্বীকার করিয়াছেন। তবে গৌতমের সহিত কণাদের কিছু পার্থক্য আছে। গৌতম ষোড়শ পদার্থবাদী কিন্তু কণাদ ষট্ পদার্থবাদী এবং কাহারও কাহারও মতে কণাদ সপ্তপদার্থবাদী। কিন্তু তাহাতে কোনও প্রকার বিশেষ পার্থক্য হয় নাই, কারণ কণাদ তাঁহার সপ্ত পদার্থের মধ্যেই গোতমের ষোড়শ পদার্থ রাখিয়াছেন।

 কণাদের সপ্ত পদার্থ যথা,—দ্রব্য, গুণ, ক্রিয়া, সামান্য, বিশেষ, সমবায় ও অভাব। কেহ কেহ বলেন এই অভাব কোন পদার্থ নহে, কারণ এক স্থানে এক বস্তুর ভাবই অপর বস্তুর অভাব। আবার কেহ বলেন যে দুঃখের অত্যন্ত অভাবই যখন মুক্তি তখন অভাবও একটি পদার্থ বিশেষ। তবে এ সম্বন্ধে মতভেদ আছে।

 দ্রব্য নয়, প্রকার, যথা,—ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম, কাল, দিকৃ, আত্মা ও মন। প্রথম চারিটি দ্রব্যের কেবলমাত্র পরমাণু নিত্য; আকাশ সর্ব্বাবস্থাতেই নিত্য কি না সে সম্বন্ধে মতভেদ আছে। কিন্তু শেষোক্ত চারিটি দ্রব্য ভূত পদার্থ নাহে, তাহারা সর্ব্বক্ষণে নিত্য। আত্মা ও মন সম্বন্ধে গোতমের ও কণাদের এক মত।

 গুণ চতুর্ব্বিংশতি প্রকাশ, যথা—রূপ, রস, গন্ধ, শব্দ, স্পর্শ, সংখ্যা, পরিমাণ, পৃথকত্ব, সংযোগ, বিভাগ, পরত্ব, অপরত্ব, বুদ্ধি, সুখ, দুঃখ, ইচ্ছা, দ্বেষ, যত্ন, গুরুত্ব, দ্রবত্ব, স্নেহ, সংস্কার, ধর্ম্ম ও অধর্ম্ম। প্রত্যেক দ্রব্যেতে এই সমস্ত গুণের একটি বা অনেকগুলি বর্ত্তমান আছে।

 কর্ম্ম পাঁচ প্রকার—উৎক্ষেপন, অবক্ষেপন, আকুঞ্চন, প্রসারণ ও গমন।

 সামান্য শব্দে জাতি বুঝায়। জাতি নিত্য। জাতি দুই প্রকার পরা ও অপরা। সত্ত্বা অপেক্ষা অধিক দেশ ব্যাপী জাতি নাই বলিয়া ইহাকে পরা জাতি কহে। যে সমস্ত জাতি অল্পদেশব্যাপী তাহারা অপরা জাতি।

 কণাদ ‘বিশেষ’ নামে একটি পদার্থ স্বীকার করেন বলিয়া তাঁহার দর্শনের নাম বৈশেষিক দর্শন। এই বিশেষ পদার্থ কেবলমাত্র পরমাণু সম্বন্ধে ব্যবহৃত হয়। সমস্ত অবয়বী পদার্থ নিজ নিজ অবয়ব ভেদে পৃথক বলিয়া বোধ হয়; যেমন ঘট ও পটের আকার ভেদ আছে বলিয়াই আমরা উহাদিগের পার্থক্য বোধ করিতে পারি। মহর্ষি কণাদ বলেন যে পরমাণুর প্রকার ভেদ আছে। কিন্তু পরমাণু নিরবয়বী বলিয়া তাহাদিগের প্রকারভেদের কোনও প্রকার স্থূল নিদর্শন নাই। যে সূক্ষ্ম অতীন্দ্রিয় পদার্থ পরমাণুদিগের প্রকারভেদ সংঘটন করে মহর্ষি কণাদ তাহাকেই “বিশেষ” কহেন।

 অবয়বীর সহিত অবয়বের, জাতির সহিত ব্যক্তির, গুণ ও কর্ম্মের সহিত দ্রব্যের, এবং বিশেষের সহিত নিত্য পরমাণুর সম্বন্ধের নাম সমবায়।

 অভাব প্রধানতঃ দুই প্রকার—সম্বন্ধের অভাব, ও ভেদ। সম্বন্ধের অভাব তিন প্রকার—এক বস্তুর সহিত আর এক বস্তুর পূর্ব্বে সম্বন্ধ ছিল না, কিন্তু পরে হইয়াছে ইহার নাম প্রাগভাব; আবার এক বস্তুর সহিত আর এক বস্তুর সম্বন্ধ ছিল, কিন্তু সেই সম্বন্ধ নষ্ট হইয়াছে, ইহার নাম ধ্বংসাভাব, আবার এক বস্তুর সহিত অন্য এক বস্তুর কখনই সম্বন্ধ ছিল না এবং হইবে না—যেমন আকাশ ও রূপ,—ইহার নাম অত্যন্ত অভাব। ঘটেতে পটের অভাব এবং পটেতে ঘটের অভাব, ইহার নাম ভেদ।

 মুক্তির জন্য আত্মার শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসন আবশ্যক। মনন অনুমানের দ্বারা সাধিত হয়। ব্যাপ্তিজ্ঞান না হইলে অনুমান হইতে পারে না। আবার পদার্থ জ্ঞান না হইলে ব্যাপ্তিজ্ঞান জন্মে না। অতএব পদার্থতত্ত্ব জ্ঞানই পরম্পরা সম্বন্ধে মুক্তির কারণ। আত্মা ও অনাত্মা উভয়ের জ্ঞান হইলে জীব অনাত্মপদার্থ ত্যাগ করিয়া আত্মসাক্ষাৎ বা মুক্তিলাভ করেন।

ওঁ তৎ সৎ ওঁ