প্রধান মেনু খুলুন


চোখের বালি 6כי নিমীলিতচক্ষে বলিল, “তাই বালি, এখনো তো তোমার খাওয়া হয় নাই, তুমি খাইতে যাও " ~~ 鱷 বিনোদিনী কিছুতেই গেল না। অলস মধ্যাহ্নের উত্তপ্ত হাওয়ায় ঘরের পর্দা উড়িতে লাগিল এবং প্রাচীরের কাছে কম্পমান নারিকেল গাছের অর্থহীন মর্মরশৰী স্বরের মধ্যে প্রবেশ করিল। মহেন্দ্রের হৃৎপিও ক্রমশই দ্রুততর তালে নাচিতে লাগিল এবং বিনোদিনীর ঘন নিশ্বাস সেই তালে মহেক্সের কপালের চুলগুলি কাপাইতে থাকিল। কাহারো কণ্ঠ দিয়া একটি কথা বাহির হইল না । মহেন্দ্র মনে মনে ভাবিতে লাগিল, “অসীম বিশ্বসংসারের অনন্ত প্রবাহের মধ্যে ভাসিয়া চলিয়াছি, তরণী ক্ষণকালের জন্ত কখন কোথায় ঠেকে, তাহাতে কাহার কী আসে যার এবং কতদিনের জন্তই বা যায় আসে।” শিয়রের কাছে বসিয়া কপালে হাত বুলাইতে বুলাইতে বিহ্বল যৌবনের গুরুভারে ধীরে ধীরে বিনোদিনীর মাথা নত হইয়া আসিতেছিল ; অবশেষে তাহার কেশাগ্র-ভাগ মহেক্সের কপোল স্পর্শ করিল। বাতাসে আন্দোলিত সেই কেশগুচ্ছের কম্পিত মৃদ্ধ শুর্ণ তাহার সমস্ত শরীর বারংবার কাপিয়া উঠিল, হঠাৎ যেন নিশ্বাস তাহার বুকের কাছে অবরুদ্ধ হইয়া বাহির হইবার পথ পাইল না ! ধড়ফড়, করিয়া উঠিয়া বসিয়া মহেন্দ্ৰ কহিল, “নাঃ, আমার কালেজ আছে, আমি যাই ।” বলিয়া বিনোদিনীর মুখের দিকে না চাহিয়া দাড়াইয়া উঠিল। বিনোদিনী কহিল, “ব্যস্ত হইয়ো না, আমি তোমার কাপড় জানিয়া দিই।” বলিয়া মহেঞ্জের কালেজের কাপড় বাহির করিয়া আনিল । মহেন্দ্র তাড়াতাড়ি কলেজে চলিয়া গেল, কিন্তু সেখানে কিছুতেই স্থির থাকিতে পারিল না । পড়াশুনায় মন দিতে অনেকক্ষণ বৃথা চেষ্টা করিয়া সকাল-সকাল বাড়ি ফিরিয়া আসিল । ঘরে ঢুকিয়া দেখে, বিনোদিনী বুকের তলায় বালিশ টানিয়া লইয়া নীচের বিছানায় উপুড় হইয়া কী একটা বই পড়িতেছে— রাশীকৃত কালো চুল পিঠের উপয় ছড়ানো । বোধ করি বা সে মহেন্দ্রের জুতার শব্দ শুনিতে পায় নাই । মহেন্দ্র আস্তে আস্তে পা টিপিয়া কাছে আসিয়া দাড়াইল । শুনিতে পাইল, পড়িতে পড়িতে বিনোদিনী একটা গভীর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিল । মহেন্দ্ৰ কহিল, ওগো করুণাময়ী, কাল্পনিক লোকের জন্ত হৃদয়ের বাজে খরচ করিয়ো না। কী পড়া হইতেছে।” of বিনোদিনী ক্রস্ত হইয়া উঠিয়া বসিয়া তাড়াতাড়ি বইখানা অঞ্চলের মধ্যে চোখের বালি > 36 . লুকাইয়া ফেলিল। মহেন্দ্র কাড়িয়া দেখিবার চেষ্টা করিতে লাগিল। অনেকক্ষণ হাতাহাতি-কাড়াকড়ির পর পরাভূত বিনোদিনীর অঞ্চল হইতে মহেন্দ্র বইখানি ছিনাইয়া লইয়া দেখিল— বিষবৃক্ষ । বিনোদিনী ঘন নিশ্বাস ফেলিতে ফেলিতে রাগ করিয়া মুখ ফিরাইয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। মহেন্দ্রের বক্ষস্তল তোলপাড় করিতেছিল। অনেক চেষ্টায় সে হাসিয়া কহিল, “ছি ছি, বড়ো ফাকি দিলে। আমি ভাবিয়াছিলাম, খুব একটা গোপনীয় কিছু হইবে বা । এত কাড়াকড়ি করিয়া শেষকালে কিনা বিষবৃক্ষ বাহির হইয়া পড়িল ।” I বিনোদিনী কহিল, “আমার আবার গোপনীর কী থাকিতে পারে, শুনি ।” মহেন্দ্র ফস করিয়া বলিয়া ফেলিল, “এই মনে করে যদি বিহারীর কাছ হইতে কোনো চিঠি আসিত ।” নিমেষের মধ্যে বিনোদিনীর চোখে বিদ্যুৎ স্ফুরিত হইল। এতক্ষণ ফুলশর ঘরের কোণে খেলা করিতেছিল ; সে যেন দ্বিতীয় বার ভস্মসাৎ হইয়া গেল । মুহূর্তে-প্ৰজলিত অগ্নিশিখার মতো বিনোদিনী উঠিয়া দাড়াইল । মহেন্দ্র তাহার হাত ধরিয়া কহিল, “মাপ করো, আমার পরিহাস মাপ করে ।” বিনোদিনী সবেগে হাত ছিনাইয়া লইয়া কহিল, “পরিহাস করিতেছ কাহাকে । যদি তাহার সঙ্গে বন্ধুত্ব করিবার যোগ্য হইতে, তবে তাহাকে পরিহাস করিলে সহ করিতাম। তোমার ছোটো মন, বন্ধুত্ব করিবার শক্তি নাই, অথচ ঠাট্টা ।” বিনোদিনী চলিয়া যাইতে উদ্যত হইবা মাত্ৰ মহেন্দ্র দুই হাতে তাহার পা বেষ্টন করিয়া বাধা দিল । এমন সময়ে সম্মুখে এক ছায়া পড়িল, মহেন্দ্র বিনোদিনীর পা ছাড়িয়া চমকিয়া মুখ তুলিয়া দেখিল, বিহারী। বিহারী স্থির দৃষ্টিপাতে উভয়কে দগ্ধ করিয়া শান্ত ধীর স্বরে কহিল, “অত্যন্ত অসময়ে উপস্থিত হইয়াছি, কিন্তু বেশিক্ষণ থাকিব না। একটা কথা বলিতে আসিয়াছিলাম। আমি কাশী গিয়াছিলাম, জানিতাম না সেখানে বউঠাকরুন আছেন। না জানিয়া তাহার কাছে অপরাধী হইয়াছি ; তাহার কাছে ক্ষমা চাহিবার অবসর নাই, তাই তোমার কাছে ক্ষমা চাহিতে আসিয়াছি । আমার মনে জ্ঞানে অজ্ঞানে যদি কখনো কোনো পাপ স্পর্শ করিয়া থাকে, সেজন্য তাহাকে যেন কখনো কোনো দুঃখ সহ করিতে না হয়, তোমার কাছে আমার এই প্রার্থনা।” বিহার কাছে দুর্বলতা হঠাৎ প্রকাশ পাইল বালা মহেঞ্জের মনটা নে প্ৰলিয়া A ) Šo চোখের বালি উঠিল । এখন তাহার ঔদার্ধের সময় নহে। সে একটু হাসিয়া কহিল, “ঠাকুরঘরে কলা খাইবার যে-গল্প আছে, তোমার ঠিক তাই দেখিতেছি। তোমাকে দোষ স্বীকার করিতেও বলি নাই, অস্বীকার করিতেও বলি নাই ; তবে ক্ষমা চাহিয়া সাধু হইতে আসিয়াছ কেন ? বিহার কাঠের পুতুলের মতো কিছুক্ষণ আড়ষ্ট হইয়া দাড়াইয়া রহিল— তার পরে যখন কথা বলিবার প্রবল চেষ্টায় তাহার ঠোট কঁাপিতে লাগিল তখন বিনোদিনী বলিয়া উঠিল, “বিহারী-ঠাকুরপো, তুমি কোনো উত্তর দিয়ে না। কিছুই বলিয়ে না। ঐ লোকটি যাহা মুখে আনিল তাহাতে উহারই মুখে কলঙ্ক লাগিয়া রহিল, সে কলঙ্ক তোমাকে স্পর্শ করে নাই ।” k বিনোদিনীর কথা বিহারীর কানে প্রবেশ করিল কি না সন্দেহ— সে যেন স্বপ্নচালিতের মতো মহেঞ্জের ঘরের সন্মুখ হইতে ফিরিয়া সিড়ি দিয়া নামিয়া যাইতে লাগিল । বিনোদিনী তাহার পশ্চাতে গিয়া কহিল, “বিহারী-ঠাকুরপো, আমাকে কি তোমার কোনো কথা বলিবার নাই । যদি তিরস্কারের কিছু থাকে, তবে তিরস্কার করো ।” বিহারী যখন কোনো উত্তর না করিয়া চলিতে লাগিল, বিনোদিনী সম্মুখে আসিয়া দুই হাতে তাহার দক্ষিণ হাত চাপিয়া ধরিল। বিহারী অপরিসীম ঘৃণার সহিত তাহাকে ঠেলিয়া দিয়া চলিয়া গেল। সেই আঘাতে বিনোদিনী যে পড়িয়া গেল তাহা সে জানিতেও পারিল না । পতনশৰ শুনিয়া মহেন্দ্র ছটিয়া আসিল । দেখিল, বিনোদিনীর বাম হাতের ককুইয়ের কাছে কাটিয়া রক্ত পড়িতেছে । মহেন্দ্ৰ কহিল, “ইস, এ যে অনেকটা কাটিয়াছে।” বলিয়া তৎক্ষণাৎ নিজের পাতলা জামার খানিকটা টানিয়া ছিড়িয়া ক্ষতস্থানে ব্যাণ্ডেজ বাধিতে প্রভত হইল । বিনোদিনী তাড়াতাড়ি হাত সরাইয়া লইয়া কছিল, “না না, কিছুই করিয়ো না, রক্ত পড়িতে দাও।” 藝 মহেন্দ্ৰ কহিল, “বাধিয়া একটা ঔষধ দিতেছি, তাহা হইলে আর ব্যথা হইবে না, শীঘ্ৰ সারিয়া যাইবে।” বিনোদিনী সরিয়া গিয়া কহিল, “আমি ব্যথা সারাইতে চাই না, এ কাটা আমার থাকৃ।” । চোখের বালি » »ግ . মহেন্দ্ৰ কহিল, "আজ অধীর হইয়া তোমাকে আমি লোকের সামনে অপদস্থ করিয়াছি, আমাকে মাপ করিতে পারিবে কি ” Cবিনোদিনী কহিল, “মাপ কিসের জন্য। বেশ করিয়াছ। আমি কি লোককে ভয় করি । আমি কাহাকেও মানি না । যাহারা আঘাত করিয়া ফেলিয়া চলিয়া যায় তাহারাই কি আমার সব, আর যাহারা আমাকে পায়ে ধরিয়া টানিয়া রাখিতে । চায় তাহারা আমার কেহই নহে ?” মহেন্দ্র উন্মত্ত হইয়া গদগদকণ্ঠে বলিয়া উঠিল, “বিনোদিনী, তবে আমার ভালোবাসা তুমি পায়ে ঠেলিবে না ?” * বিনোদিনী কহিল, “মাথায় করিয়া রাখিব । ভালোবাসা আমি জন্মাবধি এত বেশি পাই নাই যে ‘চাই না? বলিয়া ফিরাইয়া দিতে পারি o 辑 মহেন্দ্র তখন দুই হাতে বিনোদিনীর দুই হাত ধরিয়া কহিল, তবে এসো আমার ঘরে । তোমাকে আমি আজ ব্যথা দিয়াছি, তুমিও আমাকে ব্যথা দিয়া চলিয়া আসিয়াছ— যতক্ষণ তাহা একেবারে মুছিয়া না যাইবে, ততক্ষণ আমার খাইয়া শুইয়া কিছুতেই মুখ নাই।” বিনোদিনী কহিল, “আজ নয়, আজ আমাকে ছাড়িয়া দাও । যদি তোমাকে দুঃখ দিয়া থাকি, মাপ করে।” মহেন্দ্ৰ কহিল, “তুমিও আমাকে মাপ করো, নহিলে আমি রাত্রে ঘুমাইতে পারিব না ।” বিনোদিনী কহিল, “মাপ করিলাম।” মহেন্দ্র তখনই অধীর হইয়া বিনোদিনীর কাছে হাতে হাতে ক্ষমা ও ভালোবাসার একটা নিদর্শন পাইবার জন্য ব্যগ্র হইয়া উঠিল। কিন্তু বিনোদিনীর মুখের দিকে চাহিয়া থমকিয়া দাড়াইল । বিনোদিনী সিড়ি দিয়া নামিয়া চলিয়া গেল— মহেন্দ্রও ধীরে ধীরে সিড়ি দিয়া উপরে উঠিয়া ছাদে বেড়াইতে লাগিল । বিহারীর কাছে হঠাৎ আজ মহেন্দ্র ধরা পড়িয়াছে, ইহাতে তাহার মনে একটা মুক্তির আনন্দ উপস্থিত হইল। লুকাচুরির যে একটা ঘূণ্যতা আছে, একজনের কাছে প্রকাশ হইয়াই যেন তাহা অনেকটা দূর হইল। মহেন্দ্ৰ মনে মনে কহিল, আমি নিজেকে ভালো বলিয়া মিথ্যা করিয়া আর চালাইতে চাহি না— কিন্তু আমি ভালোবাসি, আমি ভালোবাসি, সে কথা মিথ্যা নহে। নিজের ভালোবাসার গৌরবে তাহার স্পর্ব এতই বাড়িয়া উঠিল যে, নিজেকে মন্দু বুলিয়া সে আপন মনে উদ্ধতভাবে গর্ব করতে লাগিল । নিস্তব্ধ সন্ধ্যাকালে নীরব জ্যোতিষ্কমণ্ডলী-অধিরাজিত > >bア ங் চোখের বালি অনন্ত জগতের প্রতি একটা অবজ্ঞা নিক্ষেপ করিয়া মনে মনে কহিল, "যে আমাকে যত মন্দই মনে করে করুক, কিন্তু আমি ভালোবাসি। বলিয়া বিনোদিনীর মানসীমূর্তিকে দিয়া মহেন্দ্র সমস্ত আকাশ, সমস্ত সংসার, সমস্ত কর্তব্য আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল। বিহারী হঠাৎ আসিয়া আজ যেন মহেঞ্জের জীবনের ছিপি-জাট মসীপাত্র উলটাইয়া ভাঙির ফেলিল— বিনোদিনীর কালো চোখ এবং কালো চুলের কালি দেখিতে দেখিতে বিস্তৃত হইয়া পূর্বেকার সমস্ত সাদা এবং সমস্ত লেখা লেপিয়া একাকার করিয়া দিল । * ২৯ পরদিন ঘুম ভাঙিয়া বিছানা হইতে উঠিব। মাত্রই একটি মধুর আবেগে মহেন্দ্রের হৃদয় পূর্ণ হইয়া গেল। প্রভাতের স্বর্যালোক যেন তাহার সমস্ত ভাবনায় বাসনায় সোনা মাখাইয়া দিল। কী কুন্দর পৃথিবী, কী মধুময় আকাশ, বাতাসযেন পুষ্পরেণুর মতো সমস্ত মনকে উড়াইয়া লইয়া যাইতেছে । সকালবেলায় বৈষ্ণব ভিক্ষুক খোল করতাল বাজাইয়া গান জুড়িয়া দিয়াছিল। দরোয়ান তাড়াইয়া দিতে উদ্যত হইলে, মহেন্দ্র দরোয়ানকে ভৎসনা করিয়া তখনই তাহাদিগকে একটা টাকা দিয়া ফেলিল। বেহাৱা কেরোসিনের ল্যাম্প লইয়া যাইবার সময় অসাবধানে ফেলিয়া দিয়া চুরমার করিল ; মহেন্দ্রের মুখের দিকে তাকাইয়া ভয়ে তাহার প্রাণ শুকাইয়া গেল, মহেন্দ্র তিরস্কারমাত্র না করিয়া প্রসন্নমুখে কহিল, "ওরে, ওখানটা ভালো করিয়া বাট দিয়া ফেলিস, যেন কাহারে পায়ে কাচ না ফোটে ।" । আজ কোনো ক্ষতিকেই ক্ষতি বলিয়া মনে হইল না । প্রেম এতদিন নেপথ্যের আড়ালে লুকাইয়া বসিয়া ছিল, আজ সে সম্মুখে আসিয়া পর্দা উঠাইয়া দিয়াছে । জগৎসংসারের উপর হইতে আবরণ উঠিয়া গেছে । প্রতিদিনের পৃথিবীর সমস্ত তুচ্ছতা আজ অন্তহিত হইল। গাছপালা, পশুপক্ষী, পথের জনতা, নগরের কোলাহল, সকলই আজ অপরূপ । এই বিশ্বব্যাপী নূতনতা এতকাল ছিল কোথায় । মহেঞ্জের মনে হইতে লাগিল, আজ যেন বিনোদিনীর সঙ্গে অন্য দিনের মতো সামান্ত ভাবে মিলন হইবে না । আজ যেন কবিতায় কথা বলিলে এবং সংগীতে ভাব প্রকাশ করিলে, তবে ঠিক উপযুক্ত হয়। আজিকার দিনকেও ঐশ্বর্যে সৌন্দর্যে পূর্ণ করিয়া মহেন্দ্র স্বষ্টিছাড়া সমাজছাড়া একটা আরব্য উপন্যাসের অদ্ভুত দিনের