জেবুন্নিসা বেগম/দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ


জেবুন্নিসা বেগমের বিদ্যাশিক্ষা এবং কবিতার অনুশীলন

 ঔরঙ্গজেব্‌ বাদশাহ তাঁহার কন্যাকে হেন ধীমতি ও প্রতিভাশালিনী দেখিয়া তাঁহাকে লেখা পড়া শিখাইবার জন্য কয়েকজন শিক্ষক নিযুক্ত করেন। তাহাদিগের মধ্যে মুল্লা আশ্রফ মাজন্দ্রাণীর নাম উল্লেখযোগ্য। এই ব্যক্তি ইরান নিবাসী সুবিখ্যাত পণ্ডিত সৈয়দ্‌ তকী মজলিসীর বংশসম্ভূত; এবং তথা হইতেই ভারতবর্ষে আইসেন।

 জানা যায়—জেবুন্নিসা বেগম কুরান পাঠ শেষ করিয়াই মুল্লা আশ্রফের নিকট পড়িতে আরম্ভ করেন নাই—কয়েক বৎসর পর আরম্ভ করিয়াছিলেন। ইতিমধ্যে অপর কয়েকজন শিক্ষক তাঁহাকে লেখা পড়া শিখাইয়াছিল। এরূপে প্রায় একুশ বৎসর বয়স পর্য্যন্ত বিদ্যাভ্যাস করিবার পর তিনি লেখা পড়ার চর্চ্চায় জীবনের অধিকাংশই অতিবাহিত করিয়াছিলেন।

 মুগল বাদশাহী পরিবারস্থ মহিলাগণ-মধ্যে কেবল জেবুন্নিসা বেগমই যে বিদ্যাভ্যাস করিয়াছিলেন তাহা নহে—অপরাপর বেগমেরা এবং সভাসদ্‌গণের অন্তঃপুর-চারিণীরাও যে লেখা পড়া, গান বাজনা এবং নানাবিধ শিল্পকার্য্য শিক্ষা করিতেন ইহাতে কোন সন্দেহ নাই। কারণ নূরজহাঁ, জাহানারা ও রোশনারা প্রভৃতি বেগমেরাও সুশিক্ষিতা ছিলেন। কিন্তু তাঁহাদিগের মধ্যে কেহই জেবুন্নিসা বেগমের সমকক্ষ হইতে পারেন নাই।

 ভারতবর্ষে মুগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা


বালিকা বিদ্যালয়—ফতেহপুর সিক্রী

জহীরুদ্দীন বাবর ও তাঁহার পুত্ত্র নসিরুদ্দীন হুমায়ূন বাদশাহের রাজত্বকালে মুগল অন্তঃপুর-মহিলাগণকে লেখা পড়া শিক্ষা দেওয়া হইত কি না বলা যায় না। কিন্তু স্বনামধন্য মুগল সম্রাট মহম্মদ জলালুদ্দীন অকবর শাহের রাজ্যশাসনকালে যে মুগলদিগের মধ্যে স্ত্রীশিক্ষার প্রচলন ছিল, তাহার প্রমাণ স্বরূপ ফতেহপুর সিক্রীর বালিকা-বিদ্যালয় আজও বর্ত্তমান রহিয়াছে। খুব সম্ভব—উক্ত বাদশাহই তাঁহাদিগের মধ্যে প্রথমে স্ত্রীশিক্ষার প্রবর্ত্তন করিয়া থাকিবেন।

 জেবুন্নিসা বেগম মুল্লা আশ্রফের নিকট কেবল আরবী ও পারসী ভাষা শিখেন নাই—তিনি ধর্ম্ম শাস্ত্র এবং কাব্যাদি নানা বিষয়েরও অনেক গ্রন্থ অধ্যয়ন করিয়াছিলেন। তবে সর্ব্বাপেক্ষা কাব্যেই তাহার অধিক রুচি ছিল। মুল্লা আশ্রফও একজন সুকবি ছিলেন। সুতরাং তাহার কাব্যশাস্ত্র শিক্ষা পাইতে ক্রটী হয় নাই।

 জেবুন্নিসা বেগম আরবী ভাষায় এরূপ পারদর্শী হইয়াছিলেন যে, ঐ ভাষাতেই তিনি প্রথম একটা কসীদা (একশ্রেণীর কবিতা) রচনা করেন। সে সময়ে ঔরঙ্গজেব বাদশাহের দরবারে মক্কাশরীফ নিবাসী একজন বিজ্ঞ সভাসদ্‌ ছিলেন। আরবীই তাঁহার মাতৃভাষা ছিল। এজন্য কসীদাটী তাঁহাকে দেখান হয়। দেখিয়া তিনি বলেন—ইহা কোন আরবদেশীয় লোকের রচিত হইবে না। কারণ এই কসীদা অতি সুন্দর হইলেও ইহার কোন কোন স্থানে বাকপদ্ধতির ভ্রম-প্রমাদ দেখা যায়। তথাপি কসীদাটী যে ব্যক্তিই রচনা করুক না কেন, তাঁহার যে পাণ্ডিত্য আছে একথা স্বীকার করিতে হইবে। ইহার পর হইতে জেবুন্নিসা বেগম আরবীতে আর কিছু লিখেন নাই—তাহার মাতৃভাষা ফারসীতে কবিতা রচনা করিতে থাকেন।

 ঔরঙ্গজেব বাদশাহ ঘোর কবিতাদ্রোহী ছিলেন। তাঁহার সম্মুখে কেহ কবিতা আবৃত্তি করিলে তিনি বিরক্ত হইয়া উঠিতেন। তাঁহার দরবারে কোন কবি আদর বা আশ্রয় পাইত না। পূর্ব্বাবধি রাজসভায় যে সব কবি ছিল, উক্ত বাদশাহের এইরূপ ভাবগতিক দেখিয়া ক্রমে তাহারা দরবার হইতে সরিয়া পড়ে।

 ঔরঙ্গজেব বাদশাহ কেবল যে কবিতাদ্রোহী ছিলেন তাহা নহে—সঙ্গীতও মোটেই ভালবাসিতেন না। তাঁহার দরবারে যেমন কোন কবির স্থান ছিল না সেইরূপ কোন সঙ্গীতবিদ্যাবিৎ ব্যক্তিও স্থান পাইত না।

 বাদশাহী পরিবারের কেহ যে, কোনরূপ রঙ্গীন বস্ত্র ব্যবহার করে ইহা ঔরঙ্গজেব বাদশাহের ইচ্ছার বিরুদ্ধ ছিল। এজন্য জেবুন্নিসা বেগম প্রায় সর্ব্বদাই সাদা কাপড় পরিতেন—অলঙ্কারও অধিক ব্যবহার করিতেন না। এ সম্বন্ধে তিনি যে কবিতা লিখিয়াছিলেন, তাহা নিম্নে উল্লেখ করা হইল।

دخترِ شاهم وليكن روبفقر آوردہ ام”
“زيب و زينت بس همينم نامِ من زيب النسا

“দখ্‌তর-এ-শাহম্‌ ওলেকিন্‌ রুবফকর আউরদাঅম্‌
জেব্‌ ও জিনত্‌ বস্‌ হমীনম্‌ নাম-এ-মন্‌ জেবুন্নিসা।“

বাদশাহের কন্যা আমি কিন্তু গরীবের রূপ ধরিয়াছি।
বেশভূষা আমার এই—এইরূপের যে আমি আমার নাম “জেবুন্নিসা“ অর্থাৎ স্ত্রী-ভূষণ।

 হেন গোঁড়া মুসলমান ও নীরস পিতার ভয়ে জেবুন্নিসা বেগম প্রকাশ্যরূপে কাব্যালোচনা করিতে সাহস পাইতেন না। গোপনে একটী পুস্তকে কবিতা লিখিয়া তাহা সাবধানে লুকাইয়া রাখিতেন।

 ঘটনাক্রমে সেই পুস্তকখানি একদিন মুল্লা আশ্রফের হাতে পড়ে। তাহাতে লিখিত কবিতাগুলি পাঠ করিয়া সেই সব কবিতার লালিত্যে তিনি বিমুগ্ধ হইয়া যান। তখন তিনি ঐ সমস্ত কবিতা কে রচনা করিয়াছে ইহা জানিবার জন্য উৎসুক হইয়া তাঁহার ছাত্রীকে জিজ্ঞাসা করিলেন—“শাহজাদী, এসব কি তোমার রচিত?” জেবুন্নিসা বেগমই ঐসব কবিতা রচনা করিয়াছেন—উত্তরে ইহা জানিয়া মুল্লা আশ্রফ বলিলেন—“সুবহান্‌ আল্লা (ধন্য ভগবান্‌), তুমি যে একজন সুকবি; তোমারত কবিতা লিখিবার বেশ শক্তি আছে। যদি কোন আপত্তি না থাকে, তবে তুমি যে সব কবিতা রচনা কর, তাহা আমাকে দেখাইও।”

 শিক্ষকের মুখে এই প্রকার প্রশংসা ও উৎসাহবাক্য শুনিয়া জেবুন্নিসা বেগমের কবিতা লিখিবার উদ্যম দ্বিগুণ বৃদ্ধি হইল। এবং সেদিন হইতে তিনি যখন যে কবিতা রচনা করিতেন তাহা নিজ গুরুর দ্বারা সংশোধন করাইয়া লইতে লাগিলেন।

 জেবুন্নিসা বেগমের হেন কবিতার অনুরাগ ও চর্চ্চার কথা ক্রমে যখন সর্ব্বত্র প্রচার হইতে লাগিল, তখন যে সব কবি নির্জ্জীব অবস্থায় ছিলেন, তাঁহাদের দেহে যেন আবার জীবনসঞ্চার হইল; এবং যাহাতে তাঁহাদিগের রচিত কবিতা উক্ত বেগমের নিকট পৌঁছে, সেজন্য তাঁহারা যথাসাধ্য চেষ্টা করিতে লাগিলেন। এমন কি অনেকেই প্রার্থনা-পত্রাদি পর্য্যন্ত কবিতায় লিখিয়া পাঠাইতেন। তাহার একটা উদাহরণ এই:—

 নিয়ামত খাঁ আলী নামক এক উচ্চবংশীয় কবি অভাবে পড়িয়া একটা “কল্‌গী” (পাগড়ী বা টুপীর অলঙ্কার বিশেষ) বিক্রয়ের জন্য জেবুন্নিসা বেগমের নিকট প্রেরণ করেন। কিন্তু অনেক দিন অপেক্ষা করিয়াও যখন তাঁহার বাঞ্ছিত বিষয়ের কোন ফল জানিতে পারিলেন না, তখন তিনি জেবুন্নিসা বেগমকে স্মরণ দেওয়ার উদ্দেশ্যে ইঙ্গিতে এ সম্বন্ধে একটী কবিতা রচনা করিয়া তাহা উক্ত বেগমের নিকট প্রেরণ করেন। কবিতাটী এই:—

اے بند گيت سعادت اخترِ من”
در خدمتِ تو عيان شدہ جوهرِ من
گر جيقه خريدنيست پس گو زرِ من
“ور نيست خريدنی بزن بر سرِ من

“অয় বন্দগীয়ত্‌ সা’দত্‌ আখতর্‌-এ-মন্‌
দর্‌ খেদ্‌মত্‌-এ-তু অয়াঁ শুদা জৌহর-এ-মন্‌
গর্‌ জিকা খরিদনেস্ত পস্‌ গু জর-এ-মন্‌
ওর্‌ নেস্ত খরিদনী বজন্‌ বর্‌ সর্‌-এ-মন্‌।”

 ভাবার্থ:—

হে, আমার শুভগ্রহ তোমাকে প্রণাম করি,
আমার অলঙ্কার তোমার সেবায় নিয়োজিত আছে।
যদি ঐ শব অর্থাৎ সামান্য দ্রব্য ক্রয়ের অভিপ্রায়
হয়—তবে তাহাই আমার আমূল্য রত্ন বলিব।
যদি ক্রয় করিতে না চাও তবে আমার
শিরোপরি আঘাত কর।

 উক্ত কবিতা জেবুন্নিসা বেগম পাইলে তাহার রচনা-কৌশল দেখিয়া তিনি অতিশয় সন্তুষ্ট হন, এবং তৎক্ষণাৎ পাঁচ সহস্র মুদ্রা নিয়ামত খাঁ আলীকে পাঠাইয়া দেন। এরূপের আরও প্রার্থনা-পত্রাদি আছে। বাহুল্য-ভয়ে সে সব উল্লেখ করা হইল না।

 ফারসী কবিতার প্রত্যেক কথার প্রতিশব্দ ঠিক রাখিয়া বাঙ্গালায় অনুবাদ করা অত্যন্ত কঠিন। এ প্রকার অনুবাদ করিতে গেলে অনেক স্থলে অস্বাভাবিক ও শ্রুতিকটু হইয়া পড়ে। তথাপি প্রত্যেক শব্দের অর্থ ঠিক রাখিয়াই অনুবাদ করিতে যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়াছি। যেখানে সেরূপ করা নিতান্ত অসম্ভব হইয়াছে সেখানে ভাবার্থ মাত্র লেখা হইল।

 বিদ্যানুরাগিণী জেবুন্নিসা বেগম অনেক বিজ্ঞ-ব্যক্তিকে প্রতিপালন করিয়া তাঁহাদিগের দ্বারা নানা বিষয়ের গ্রন্থ লিখাইতেন। সেই সময়েই ধর্ম্মবীর কবীরের গ্রন্থ ফার্‌সী ভাষায় অনুবাদ করা হইয়াছিল।

 জেবুন্নিসা বেগম কেবল অন্যকে লেখা পড়া চর্চ্চার উৎসাহ প্রদান করিতেন না—তিনি স্বয়ংও “জেবুন্‌মনশাত্‌” নামে ফারসী ভাষার রচনা-প্রণালীর একখানি পুস্তক এবং “মখ্‌ফী” ভণিতাযুক্ত তাহার সুপ্রসিদ্ধ কবিতাবলী “দিওয়ান্‌-এ-মখ্‌ফী“ রচনা করিয়াছিলেন।

 কাহারও কাহারও মতে উক্ত দেওয়ান জেবুন্নিসা বেগম রচনা করেন নাই—১৭১৯ হইতে ১৭৪৮ খৃষ্টাব্দের দিল্লীর বাদ্‌শাহ রোশন্‌ আখ্‌তর্‌ মহম্মদ শাহের আশ্রিতা এক রমণীই ঐ দেওয়ানের রচয়িত্রী।

 উল্লিখিত বাদশাহের রাজত্বকালে বাণিজ্য-ব্যবসা উপলক্ষে বিদেশ হইতে এক ব্যক্তি দিল্লীতে আইসে। ঐ বণিকের সঙ্গে তাহার এক রূপসী কন্যাও ছিল। তাহারা আর্মেনীয়েন বা সর্কেশীয়েন হওয়া সম্ভব। মহম্মদ শাহ সেই কন্যার রূপে বিমুগ্ধ হইয়া তাহাকে নিজ আশ্রয়ে রাখিয়া দেন। স্ত্রীলোকটী নাকি প্রায় সর্ব্বদাই বুর্খায় মুখ ঢাকিয়া রাখিত বলিয়া তাহার নাম “মখ্‌ফী” অর্থাৎ “গুপ্তা” হইয়াছিল। প্রবাদ এই:—ঐ রমণী বুদ্ধিমতি ও অতি চতুরা ছিল। বাদশাহী মহলে থাকিয়া সে ফার্‌সী ভাষা উত্তমরূপে শিক্ষা প্রাপ্ত হয়, এবং ঐ ভাষায় কবিতা রচনা করে।

 যে যাহাই বলুক্‌ না কেন “দিওয়ান-এ-মখ্‌ফী“ যে জেবুন্নিসা বেগম রচনা করিয়াছিলেন ইহা সর্ব্ববাদিসম্মত। কবিতাগুলি এত উচ্চ ভাবের এবং এমন সুমধুর যে, ঐ সব কবিতা ভুবনবিখ্যাত পারস্য কবি শমসুদ্দীন মহম্মদ হাফেজের কবিতা হইতে কোন অংশে হীন নহে—এইরূপ অনেকের অভিমত।

 কথিত আছে—জেবুন্নিসা বেগম নানা বিষয়ের মূল্যবান বহু গ্রন্থ সংগ্রহ পূর্ব্বক একটী পাঠাগার স্থাপন করিয়াছিলেন। তাঁহার এইরূপ বিদ্যানুরাগের কথা ইরান পর্য্যন্ত ছড়াইয়া পড়িলে সে দেশ হইতেও অনেক বিজ্ঞ ব্যক্তি এবং কবি ভারতবর্ষে যশ কিনিবার উদ্দেশ্যে দিল্লীতে আসিয়াছিলেন।

 নাসিরালী সরহিন্দী, মির্জ্জা মহম্মদালী সায়েব, মুল্লা হর্‌গনী, আকিল খাঁ রাজী, বহরোজ ও নিয়ামত্‌ খাঁ আলী প্রভৃতি সুপ্রসিদ্ধ কবি ও বিদ্বান্‌ লোকেরা জেবুন্নিসা বেগমের সমসাময়িক ছিলেন। তাঁহাদিগের মধ্যে আকিল খাঁ ও নাসিরালীর সঙ্গে উক্ত বেগমের প্রায়ই কবিতাতে বাদানুবাদ এবং বিদ্রূপ ও চাতুরি চলিত।

 ধারাবাহিকরূপে নাসিরালী ও তাঁহার পূর্ব্বপুরুষগণ কবিতা রচনা এবং শিক্ষকতা করিয়া জীবিকানির্ব্বাহ করিতেন। যদিও নাসিরালী বিজ্ঞ সুকবি ছিলেন কিন্তু নিজকে সেইরূপ মনে করিয়া তিনি কখনও গর্ব্ব করিতেন না। কাহারও স্তুতি-করা তাহার স্বভাব-বিরুদ্ধ ছিল। অনাহারে পড়িয়া থাকিতে প্রস্তুত তথাপি কোন বড়লোকের কাছে হাত পাতিতেন না। এজন্য তাঁহার অবস্থা তেমন সচ্ছল ছিল না। সেই সময়ের “আলী“ ভণিতাযুক্ত যে সকল কবিতা দেখা যায় সে সমস্তই তাঁহার রচিত।

 নাসিরালীর সুখ্যাতি লোকপরম্পরা জেবুন্নিসা বেগম জানিতে পারিলে, তাঁহার সহিত কবিতা-চর্চ্চা করিবার বাসনা উক্ত বেগমের মনে জাগিয়া উঠে। নাসিরালীর মনেও এইরূপ বাসনা পূর্ব্বাবধিই ছিল। তিনি প্রায়ই ভাবিতেন—যদি কোন প্রকারে জেবুন্নিসা বেগমের দরবারে প্রবেশ করিতে পারি, তাহা হইলে আমার অবস্থার অনেক উন্নতি হওয়া সম্ভব। দৈববশতঃ একদিন সে সুবিধা ঘটিয়া উঠে।

 একদিন নাসিরালী দিল্লী-দুর্গের নিকট দিয়া যাইতেছিলেন। এমন সময় তিনি দেখিতে পাইলেন—জেবুন্নিসা বেগম লাল পোশাক পরিয়া মহলের অলিন্দের উপর পাইচারি করিতেছেন। তাঁহাকে দেখা মাত্র নাসিরালীর চিনিতে বাকী রহিল না তিনিই জেবুন্নিসা বেগম। তখন তিনি উক্ত বেগম যেন শুনিতে পান এরূপ উচ্চৈঃস্বরে নিম্নলিখিত কবিতা আবৃত্তি করিলেন।

سرخ پوشے به لبِ بام نظر می اَيد
نه بزور و نه بزاري نه بزر می اَيد

সুর্খ পোশে বলব-এ-বাম্‌ নজর্‌ মে আয়দ
নবজোর্‌ ও ন বজারী ন বজর মে আয়দ।

লোহিত বেশধারী এক ব্যক্তিকে অলিন্দের
উপর দেখিতেছি।
বলেতে, বিলাপে বা ধন দৌলতে তাহাকে
লাভ করা যায় না।

 উক্ত কবিতা শুনিয়া জেবুন্নিসা বেগম মনে করিলেন—এ ব্যক্তি নিশ্চয়ই নাসিরালী হইবে, সে ব্যতীত আর কেহ হইবে না। এইরূপ অবধারণ করিয়া তিনি নিম্নলিখিত উত্তর প্রদান করেন।

ناصر علی بنام علي بردۂ پناہ
ورنه به ذوالفقارِ علي سر بريده مت

নাসিরালী বনাম আলী বুরদ-ই-পনাহ
ওরনা ব জুল্‌ফকার্‌-এ-আলী সরবরীদামত্‌

নাসিরালী তোমার নাম “আলী” তাই আশ্রয় পাইয়াছ। নতুবা আলীর “জুল্‌ফকার” তরবারিতে তোমার মস্তক ছেদন করিতাম।

 উক্ত কবিতার সম্বন্ধে একটু পরিষ্কার রূপে বল অপ্রাসঙ্গিক হইবে না মনে করিয়া অপর পৃষ্ঠায় বিধৃত করা হইল।

 নাসিরালীর “তখল্লুস” অর্থাৎ ভণিতার নাম “আলী” ছিল—একথা পূর্ব্বেও বলা হইয়াছে। মহম্মদের জামাতার নামও “আলী”। এইজন্য জেবুন্নিসা বেগম বলিয়াছেন—মহম্মদের জামাতার নামের মত তোমার নাম হওয়াতে আশ্রয় পাইয়াছ।

 “জুল্‌ফকার” সাধারণ তরবার নহে। উহা মহম্মদের ছিল। তাঁহার মৃত্যুর পর সেই তরবার মহম্মদের জামাতা “আলী” পাইয়াছিলেন।

 নাসিরালী ও জেবুন্নিসা বেগমের প্রথম সাক্ষাতের সম্বন্ধে যে কথা বলা হইয়াছে তাহার পর অবধিই নাসিরালী উক্ত বেগমের আশ্রয় পাইয়াছিলেন, এবং তাঁহাদের দুই জনের মধ্যে কবিতার অনুশীলন চলিতে লাগিল।

 আকিল খাঁ জেবুন্নিসা বেগমের প্রণয়-পাত্র ছিলেন। তিনি লাহোরের শাসনকার্য্যে নিযুক্ত থাকিবার সময় তথায় জেবুন্নিসা বেগমের সহিত তাঁহার প্রণয়ের সূচনা হয়। এ বিষয় পরে উল্লেখ করা হইবে।