তরুণের স্বপ্ন/উত্তর কলিকাতা অধিবাসীগণের নিকট নিবেদন


উত্তর-কলিকাতা অধিবাসীগণের নিকট নিবেদন

[মান্দালয় জেল হইতে ২৪শে সেপ্টেম্বর ১৯২৭ তারিখে লিখিত নিবেদন-পত্রটি কর্ত্তৃপক্ষ আটক করেন। নিয়ে তাহা উদ্ধত হইল]

যথাবিহিত সন্মানপুরঃসর নিবেদন—

বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য-নির্ব্বাচনদ্বন্দ্ব আমি জাতীয় মহাসমিতি (কংগ্রেস কমিটি) কর্ত্তৃক উত্তর-কলিকাতার অ-মুসলমান বিভাগের জন্য লভ্য-পদপ্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়াছি। জনমত্তের আনুকূল্যের সংবাদ পাইয়া স্বদেশসেবী ও শুভার্থীগণের উপদেশে এবং দেশের ও দশের সেবার অধিকতর সুযোগ পাইবার ভরসায় আমি জাতীয় মহাসমিতির আদেশ শিরোধার্য্য করিয়া লইয়াছি। আমি কারাবাসী না হইলে সদস্য-পদপ্রার্থী হইবার পূর্ব্বেই যে ভাবে আপনাদের সম্মুখে উপস্থিত হইয়া আপনাদের মতামত লইতাম, আমার বর্ত্তমান অবস্থায় আমি তাহা করিয়া উঠিতে পারিলাম না; কিন্তু আমি আশা করি, আপনারা নিজগুনে আমার ত্রুটি মার্জ্জনা করিবেন।

কারারুদ্ধ অবস্থায় নির্ব্বাচন প্রার্থী হওয়া উচিত কি না এবং নির্ব্বাচনপ্রার্থী হওয়ার সার্থকতা আছে কি না—সে বিষয়ে আমি গভীর ভাবে চিন্তা করিয়াছি। জাতীয় মহাসমিতিও এ বিষয় বিশেষ চিন্তা করিয়া এবং নির্ব্বাচনপ্রার্থী হওয়ার সার্থকতা আছে স্থির করিয়া আমাকে দাঁড়াইতে আদেশ করিয়াছেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন আজ জীবিত থাকিলে তিনিও আমাকে নির্ব্বাচনপ্রার্থী হইতে আদেশ করিতেন। বলিয়া আমি বিশ্বাস করি। শ্রীযুক্ত অনিলবরণ রায় ও শ্রীযুক্ত সত্যেন্দ্রচন্দ্র মিত্র মহাশয়ের পুনঃ নির্ব্বাচনের সময়ে তিনি যাহা বলিয়াছিলেন তাহা আমার এই ধারণা সমর্থন করে। এই সকল কথা বিবেচনা করিয়া ও বর্ত্তমান অবস্থায় আমার নির্ব্বাচনপ্রার্থী হওয়ার সার্থকতা আছে ভাবিয়া আমি আপনাদের সম্মুখে উপস্থিত হইতে সাহসী হইয়াছি। জনমতের আনুকুল্যও ষে আমার এরূপ সিদ্ধান্তের জন্য অনেকটা দায়ী তাহা বলা বাহুল্য। সুযোগ থাকিলে ও সম্ভবপর হইলে আমি আপনাদের সম্মুখে উপস্থিত হইয়া জাতীয় সমস্যা বিষয়ে আমার সকল মতামত আপনাদের নিকট নিবেদন করিতাম এবং আপনাদের উপদেশ ও পরামর্শ শুনিতে চাহিতাম। কিন্তু সে অধিকার হইতে আমি গবর্ণমেণ্ট কর্ত্তৃক বঞ্চিত হইয়াছি। প্রায় দুই বৎসর হইতে চলিল আমি বিনা-বিচারে ও বিনা অপরাধে কারারুদ্ধ। এই সুদীর্ঘকালের মধ্যে বহু অনুরোধ করা সত্ত্বেও আমাকে গবর্ণমেন্টের কোনও আদালতের সামনে উপস্থিত করা হয় নাই। এমন কি আমার বিরুদ্ধে কর্ত্তৃপক্ষের কি অভিযোগ ও সাক্ষ্য আছে তাহাও প্রকাশ্যে অথবা জনান্তিকে আমাকে বলা হয় নাই। আমার অপরাধ সম্বন্ধে আমি বলিতে পারি যে, অপরাধ যদি কিছু করিয়া থাকি তাহা এই যে, পরাধীন জাতির সনাতন গতানুগতিক জীবনপন্থা ছাড়িয়া কংগ্রেসের একজন দীন সেবকহিসাবে স্বদেশ-সেবায় মন-প্রাণ-শরীর সমর্পণ করিবার প্রয়াস পাইয়াছি। তারপর আমি যে শুধু কারারুদ্ধ হইয়াছি তাহা নয়, বিশ মাস হইল আমি দেশান্তরিত। বাঙ্গলার মাটি, রাঙ্গলার জলের পবিত্র স্পর্শ হইতে কতকাল যাবৎ আমি বঞ্চিত! তবে আমার সান্ত্বনা ও সৌভাগ্য এই যে, আমার কারাবাস ব্যর্থ হয় নাই। আজ “আমার সকল ব্যথা রঙীন হয়ে, গোলাপ হয়ে” ফুটিয়াছে। এইখানে আসিবার পূর্ব্বে আমি বাঙ্গলাকে, ভারতভূমিকে ভালবাসিতাম। কিন্তু এই বিচ্ছেদের দরুণ সোনার বাঙ্গলাকে, পুণ্য ভারতভূমিকে শতগুণে ভালবাসিতে শিখিয়াছি। বাঙ্গলার আকাশ, বাঙ্গলার বাতাস—"স্বপ্ন দিয়ে তৈরী সে যে স্মৃতি দিয়ে ঘেরা” বাঙ্গলার মোহনীয় রূপ আজ আমার নিকট কত পবিত্র, কত সুন্দর হইয়াছে। যে আত্যন্তিক আত্মোৎসর্গের আদর্শ লইয়া আমি কর্ম্মভূমিতে প্রবেশ করিয়াছিলাম, নির্ব্বাসনের পরশমণি আমার দিন দিন সে মহাদানের যোগ্য করিয়া তুলিয়াছে। যে চিরন্তন সত্য বাঙ্গলার ভাগীরথী ও বাঙ্গলার ঢেউ খেলানো শ্যামল শস্যক্ষেত্রে মূর্ত্ত হইয়া উঠিয়াছে, বাঙ্গলার যে প্রাণধর্ম্মকে বঙ্কিম হইতে আরম্ভ করিয়া দেশবন্ধু পর্য্যন্ত প্রতিভাবান মনীষিগণ সাধনার দ্বারা উপলব্ধি করিয়া সাহিত্যের মধ্যে প্রকট করিয়াছিলেন, বাঙ্গলার যে বিচিত্র রূপ কত শিল্পী, কবি ও সাহিত্যিকের লেখনী ও তুলিকার বিষয় হইয়াছে, আজ তাহার আভাস পাইয়া আমি ধন্য হইয়াছি। এই অনুভূতির পুণ্য প্রভাবে আমার দুই বৎসর কারাবাস সার্থক হইয়াছে। আমি বুঝিতে পারিয়াছি, যে, এহেন মায়ের জন্য দুঃখ ও বিপদ বরণ করা কত গৌরবের, কত সৌভাগ্যের কথা।

এইরূপ নিবেদনে নিজের পরিচয় দেওয়ার একটা রীতি বহুদিন হইতে চলিয়া আসিতেছে, কিন্তু আমার এমন কোনও সম্বল বা সম্পদ নাই যাঁহার উল্লেখ করিয়া আমি আপনাদের সহায়তা দাবী করিতে পারি। পাঁচ বৎসর পূর্ব্বে যখন উচ্ছল জলধি তরঙ্গের ন্যায় উদ্বেলিত ভারতবাসীর প্রাণ দেশমাতৃকার চরণে আত্মোৎসর্গ করিবার জন্য উতলা হইয়াছিল, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গন হইতে বাহির হইয়া আমি কর্ম্মক্ষেত্রে প্রবেশ করি।

নিজের জীবন পূর্ণরূপে বিকশিত করিয়া ভারত-মাতার পদাম্বুজে অঞ্জলিস্বরূপ নিবেদন করিব এবং এই আন্তরিক উৎসর্গের ভিতর দিয়া পূর্ণতর জীবন লাভ করিব—এই আদর্শের দ্বারা আমি অনুপ্রাণিত হইয়াছিলাম। স্বদেশসেবা বা রাজনীতির পর্য্যালোচনা আমি সাময়িক বৃত্তিহিসাবে গ্রহণ করি নাই। এই জন্য পরাধীন দেশে স্বদেশসেবকের জীবনে যে বিপদ ও পরীক্ষা, দুঃখ ও বেদন অবশ্যম্ভাবী, তার জন্য কায়মনে প্রস্তুত হইবার চেষ্টা করিয়াছিলাম। আমি কৃতকার্য্য হইতে পারিয়াছি কি না, অথবা কতদূর কৃতকার্য্য হইয়াছি—তার বিচার করিবেন আমার দেশবাসিগণ। আমার এই ক্ষুদ্র অথচ ঘটনাবহুল জীবনে যে সব ঝড় আমার উপর দিয়া বহিয়া গিয়াছে বিঘ্নবিপদের সেই কষ্টিপাথর দ্বারা আমি নিজেকে সূক্ষ্মভাবে চিনিবার ও বুঝিবার সুযোগ পাইয়াছি। এই নিবিড় পরিচয়ের ফলে আমার প্রত্যয় জন্মিয়াছে যে, যৌবনের প্রভাতে যে কণ্টকময় পথে আমি জীবনের যাত্রা সুরু করিয়াছি, সেই পথের শেষ পর্য্যন্ত চলিতে পারিব; অজানা ভবিষ্যৎকে সম্মুখে রাখিয়া যে ব্রত একদিন গ্রহণ করিয়াছিলাম তাহা উদ্‌যাপন না করিয়া বিরত হইব না। আমার সমস্ত প্রাণ ও সারা জীবনের শিক্ষা নিঙাড়িয়া আমি এই সত্য পাইয়াছি—পরাধীন জাতির সব ব্যর্থ—শিক্ষা, দীক্ষা, কর্ম্ম—সকলই ব্যর্থ যদি তাহা স্বাধীনতা লাভের সহায় বা অনুকুল না হয়। তাই আজ আমার হৃদয়ের অন্তরতম প্রদেশ হইতে এই বাণী নিরন্তর আমার কানে ধ্বনিত হইয়া উঠিতেছে,—"স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় রে, কে বাঁচিতে চায়?” আমি কৃতাঞ্জলিপুটে আপনাদের নিকট এই প্রার্থনা করিতেছি—আপনারা আমাকে আশীর্ব্বাদ করুন—স্বরাজলাভের পুণ্য প্রচেষ্টাই যেন আমার জীবনের জপ, তপ ও স্বাধ্যায়, আমার সাধনা ও মুক্তির সোপান হয় এবং জীবনের শেষ দিবস পর্য্যন্ত আমি যেন ভারতের মুক্তি-সংগ্রামে নিয়ত থাকিতে পারি।

আত্মোৎসর্গের পবিত্র ও জীবন্ত বিগ্রহ প্রাতঃস্মরণীয় দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের চরণে দেশসেবায় আমার প্রথম শিক্ষা দীক্ষা। তাঁহার জীবদ্দশায় সকল বিপদ তুচ্ছ করিয়া তাঁহার পতাকা অনুসরণ করিয়াছি। তাহার অবর্ত্তমানে তাঁহার লোকোত্তর চরিত্রের শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করিয়া ও তাঁহার মহিমাময় জীবনের আদর্শ সম্মুখে রাখিয়া একনিষ্ঠ ভাবে জীবনের পথে চলিব, এই সঙ্কল্প মনের মধ্যে পোষণ করি। সর্ব্বমঙ্গলময় ভগবান আমার সহায় হউন।

আমার এই উপস্থিত সমস্যার সমাধান, আপনাদের হাতেই ছাড়িয়া দিলাম, কারণ এ নির্ব্বাচনদ্বন্দ্বে প্রবাসী রাজবন্দী পাহাড়, নদী ও সমুদ্রের ব্যবধানে থাকিয়া কি করিতে পারে? দেশমাতৃকার অকিঞ্চন সেবক হইলেও আমি তো আপনাদের সম্পূর্ণ অপরিচিত নহি। আজ সকলের সহিত সাক্ষাৎ পরিচয় না থাকিলেও কি আপনাদের উপর আমার কোন দাবী নাই? আমি প্রার্থনা করি, আপনারা ভুলিবেন না যে, আমার জয়ের অর্থ জাতীয় মহাসভার জয়, জনমতের জয়, আপনাদের জয়। সম্মুখে যে ব্যয়সাপেক্ষ নির্ব্বাচন সংগ্রাম তাহাতে আপনারাই আমার সহায় সম্পদ, বল ভরসা—সব কিছু। আপনাদের সেবা করিয়া কৃতার্থ হইব, ইহাই আমার অভিপ্রায়। আমার সন্দেহ নাই যে, আপনারা আমাকে সেবার সুযোগ ও অধিকার দিয়া ধন্য করিবেন। আর অধিক কি বলিব—দেশমাতৃকায় মূর্ত্ত বিগ্রহ আপনারা। সাগরপারের বন্দীর সশ্রদ্ধ অভিবাদন গ্রহণ করুন। ইতি—