তরুণের স্বপ্ন/উত্তর কলিকাতা অধিবাসীবৃন্দের নিকট নিবেদন


ফেল্‌সল্‌ লজ

শিলং

১০।৮।২৭

শ্রদ্ধা পুরঃসর নিবেদন,—

গত বৎসর বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার নির্ব্বাচনের সময়ে আমি উত্তর-কলিকাতার অ-মুসলমান কেন্দ্র হইতে সদস্যপদ প্রার্থী হইয়া দাঁড়াই। তদুপলক্ষে মান্দালয় জেলে অবস্থান কালে গত ২৪শে সেপ্টেম্বর তারিখে আপনাদিগকে যে নিবেদন-পত্র পাঠাই তাহা আপনাদের নিকট পৌঁছায় নাই। কর্ত্তৃপক্ষেরা যে কারণেই হউক সে পত্র যথাস্থানে প্রেরণ করা সমীচীন বোধ করেন নাই। তাঁহারা আমার এই সামান্য নিবেদন পত্র কেন আটকাইলেন, তাহা জিজ্ঞাসা করিয়াও কোনও উত্তর পাই নাই। তারপর আমার নির্ব্বাচন সম্পর্কীয় ব্যাপারে ব্যক্তিবিশেষের নিকট যে পত্র দিই তাহার মধ্যে অনেকগুলি গন্তব্যস্থানে পৌঁছাইতে পারে নাই। আমার কারারুদ্ধ অবস্থায় গবর্ণমেণ্টের জনৈক উচ্চপদস্থ কর্ম্মচারীর নিকট শুনিয়াছি যে, আমি যাহাতে কারাগৃহ হইতে নির্ব্বাচন সম্পর্কীয় কোন কাজ চালাইতে না পারি—ইহাই কর্ত্তৃপক্ষের অভিপ্রায় ছিল।

কিন্তু আমার নিবেদন-পত্র আপনাদের হস্তে না পৌঁছাইলেও বোধ করি কারার নীরব আকুল নিবেদন আপনাদের হৃদয়ে প্রবেশ করিয়াছিল। তাই আপনারা আমার নিবেদন না শুনিয়াই, অতি-প্রবল যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী থাকা সত্ত্বেও আমার মত অযোগ্য ব্যক্তিকে এত বেশী ভোট দিয়া নির্ব্বাচিত করিয়াছিলেন। যে দিন রাত্রি প্রায় দশটার সময়ে মান্দালয় জেলের নিভৃত কক্ষে বসিয়া আমরা কয়েকজন রাজবন্দী সাফল্যের সংবাদ পাই—সে সময়ে প্রকাশ্যভাবে আপনাদের নিকট কৃতজ্ঞতা জানাইবার উপায় আমার ছিল না। কিন্তু আমি ভরসা করি যে, গিরি নদী এবং অরণ্যানীর ব্যবধান অতিক্রম করিয়া আমার হৃদয়ের বাণী আপনাদের নিকট পৌঁছিয়াছিল।

আমার বিশেষ কৃতজ্ঞতার কারণ এই যে, যে অবস্থায় পড়িলে সাধারণতঃ বন্ধুকে তাহার ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাও চিনিতে পারে না, ঠিক সেই অবস্থায়—রাজপুরুষগণ কর্ত্তৃক যখন আমি লাঞ্ছিত—আপনারা আমলাতন্ত্রের ভ্রূকুটিতে বিচলিত না হইয়া আমাকে সম্মানের উচ্চ বেদীতে বসাইয়াছেন। আমার উপর ঈদৃশ প্রীতি ও বিশ্বাস দেখাইয়া আপনারা যে শুধু আমাকে ধন্য করিয়াছেন তাহা নয়—আপনারা সকল রাজবন্দীকে গৌরবমণ্ডিত করিয়াছেন।

কারাবাসী থাকিতে আপনাদিগকে আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাইবার ও দেশের বর্ত্তমান সমস্যা বিষয়ে আপনাদের মতামত জিজ্ঞাসা করিবার সুযোগ পাই নাই। মনে করিয়াছিলাম, যখন মুক্তি পাইব তখন এই দুইটী কর্ত্তব্য সম্পাদন করিতে পারিব। মুক্তি লাভের আশা পূর্ব্বে মোটেই ছিল না, কিন্তু হঠাৎ যে দিন অপ্রত্যাশিতভাবে মুক্ত হইলাম সেই দিন আমি ভগ্নস্বাস্থ্য ও শয্যাগত। আপনাদের প্রতিনিধি হিসাবে আমার যাহা কর্ত্তব্য আমার মুক্তির পর আমি আজ পর্য্যন্ত তাহা করিতে পারি নাই। অনিচ্ছাসত্বেও আপনাদের সহিত পরিচয় স্থাপন না করিয়াই আরোগ্য লাভের আশায় আমাকে এখানে চলিয়া আসিতে হইয়াছে। কর্ম্মক্ষেত্রে নামিতে এখনো বিলম্ব আছে, অথচ এখন পূর্ব্বাপেক্ষা অনেকটা সুস্থ বোধ করিতেছি, এই নিমিত্ত স্থির করিলাম যে, আপাততঃ পত্রের দ্বারাই আপনাদিগকে আমার নিবেদন জানাইব।

আমার মুক্তির পর আপনারা আমাকে যে ভাবে অভিনন্দিত করিয়াছিলেন এবং আমার আরোগ্য ও মঙ্গল কামনার্থে যাহা করিয়াছিলেন তাহা আমি ভুলিতে পারিব না। আপনারা আমায় সেবার অধিকার দিয়া ধন্য করিয়াছেন; আমি যাহাতে সেই অধিকারের যথোচিত ব্যবহার করিতে পারি তাহাই আমার একান্ত কামনা। আপনারা আমার উপর প্রীতি ও বিশ্বাস প্রদর্শনের দ্বারা আমায় সম্মানিত করিয়াছেন; আমি যেন তার কথঞ্চিৎ যোগ্য হইতে পার—ইহাই ভগবানের চরণে আমার আকুল প্রার্থনা।

সম্পূর্ণ সুস্থ হইতে বিলম্ব থাকিলেও আপনাদের আশীর্ব্বাদ ও শুভ ইচ্ছার ফলে আমি ধীরে ধীরে আরোগ্যের দিকে চলিয়াছি। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতা লাভ করিলেও মানসিক শান্তি লাভ করা সহজ নয়। বাঙ্গলার এতগুলি স্বদেশ-বৎসল যোগ্য সন্তান যখন বিনা অপরাধে, বিনা বিচারে কারাক্লেশে নিষ্পিষ্ট হইতেছেন, বাঙ্গলার এতগুলি নর-নারী যখন কারারুদ্ধ প্রিয়জনের দুঃখ কষ্ট ও দৈনন্দিন লাঞ্ছনার চিন্তায় অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যে অসহায় ভাবে কালাতিপাত করিতেছেন—বাঙ্গলার এতগুলি গৃহ যখন প্রাণাধিক প্রিয় পুত্র, ভাই, স্বামী ও পিতার বিহনে শ্মশান-প্রায় হইয়াছে—তখন কোন্‌ বাঙ্গালী নিশ্চিন্ত মনে আহার নিদ্রায় কাল কাটাইতে পারে? বাঙ্গলার গবর্ণর আমাকে জানাইয়াছেন যে, আমি এবার কাউন্সিলে উপস্থিত না হইলেও সদস্য তালিকা হইতে আমার নাম কাটা যাইবে না। কিন্তু তবুও ইচ্ছা করে যে, কাউন্সিলের আগামী অধিবেশনে রাজবন্দীদের কথা যখন উত্থাপিত হইবে তখন আমি উপস্থিত থাকিয়া স্বীয় কর্ত্তব্য পালন করি। চিকিৎসকদেয় অনুমতি পাইব কি না জানি না, যদি পাই, তবে কয়েকদিনের জন্য কলিকাতায় গিয়া প্রতিনিধির কর্ত্তব্য যথাশক্তি সম্পাদনের চেষ্টা করির। যদি যাইতে পারি এই আশায় কতকগুলি প্রস্তাব ও প্রশ্নের নোটিশ যথাসময়ে কাউন্সিলের জন্য পাঠাইয়াছি। কিন্তু যদি চিকিৎসকদের অনুমতি না পাই তাহা হইলে যত শীঘ্র সম্ভব আরোগ্যলাভ করিয়া যাহাতে জনসেবার্থ পুনরায় কর্ম্মক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইতে পারি, তাহার জন্য সচেষ্ট হইব। চারিদিকে নবজাগরণের লক্ষণ দেখা দিয়াছে। জাতির জীবনস্রোতে আবার যখন বানের ডাক আমাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করিবে তখন যেন কায়মনে প্রস্তুত থাকিতে পারি, ইহাই সর্ব্বথা বাঞ্ছনীয়।

কিমধিকং। আপনার আমার শ্রদ্ধাঞ্জলি গ্রহণ করুন। ইতি—