পঞ্চম অঙ্ক।

প্রথম গর্ভাঙ্ক।

বেগুনবেড়ের কুটির দপ্তর খানার সন্মুখ। (গোপীনাথ দাস এবং এক জন গোপের প্রবেশ)

 গােপী। তুই এত খবর পেলি কেমন করে?

 গােপ। মােরা হলাল পত্তিবাসী, সারা খুণ্ডি যাওয়া আসা কত্তি নেগিচি, নুন না থাক্লি নুন চেয়ে আন্‌চি, তেল্পলাডা তেলপলাডাই আন্‌লাম, ছেলে কান্তি নাগ্লাে গুড় চেয়ে দেলাম—বসিগার বাড়ী সাত পুরুষ খেয়ে মানুষ, মােরা আর ওনাদের খবর আকিনে?

 গােপী। বিন্দু মাধবের বিবাহ হয় কোথায়?

 গোপ। ঐ যে কি গাঁডা বলে, কল্কাতার পচ্চিম, যারা কায়েদ্ গার পইতে কত্তি চেয়েলাে—যে বামুন আচে, ইদিরি খেব্য়ে ওটা যায় না, আবার বামুন বেড়্য়ে তােলে—ছােট বাবুর শ্বশুরগার মান বড়, গারনাল্ সাহেব টুপি না খুলে এস্তি পারে না, পাড়াগাঁয় ওরা কি মেয়ে দেয়? ছােট বাবুর ন্যাকাপড়া দেখে চাসা গাঁ আনলে না। লােকে বলে সউরে মেয়েগুনাে কিছু ঠমক্‌মারা, আর ঘরে বাজারে চেনা যায় না, কিন্তু বসিগার বৌর মত শান্ত মেয়েতাে আর চোকি পড়ে না, গােমার মা পত্যই ওনাদের বাড়ী যায়, তা এই পাঁচ বচ্চোর বে হয়েছে, এক দিন মুখখান দ্যাখতি প্যালে না। যে দিন বে করে আলে, মােরা সেই দিন দেখেলাম—ভাবলাম সউরে বাবুরাে রাংরাজ ঘ্যাঁস, তাইতে বিবির ন্যাকাত্ মেয়ে পয়দা করেচে।

 গােপী। বউটী সর্বদাই শ্বাশুড়ির সেবায় নিযুক্ত আছে।

 গােপ। দেওয়াঞ্জি মশাই! বলবাে কি? মােগার গােমার মা বল্লে, পাড়াতেও আষ্ট ছােট বউ না থাক্লি যে দিন গলায় দড়ির খবর শুনেলো সেই দিনিই মাঠাকুরুণ মরতো, শুনেলাম সউরে মেয়ে গুনো। মিন্ষেগার ভ্যাড়া করে আখে, আর মা বাপিরি না খাতি দিয়ে মারে, কিন্তু এ বউডােরে দেখে জান্লাম, এডা কেবল গুঞ্জব্ কথা।

 গােপী। নবীন বসের মাও বােধ করি বউটিকে বড় ভাল বাসে।

 গােপ। মাঠাকুরুণ যে পির্তিমির মধ্যি কারে ভাল না বাসেন তাওতাে দেখ্তি পাইনে। আ! মাগি য্যান অন্নপুন্নো, তা তােমরা কি আর অন্ন একেচ যে তিনি পুন্নো হবেন—গােডার নীলি বুড়রে খেয়েচে, বুড়িরিও খাবে খাবে কওি নেগেচে—

 গােপী। চুপ্ কর গুওডা, সাহেব শুন্লে এখনি আমাবস্যা বার কর্বে।

 গােপ। মুই কি কর্বাে, তুমিতাে খুঁচয়ে খুঁচয়ে বিষ বার কত্তি নেগেচো, মাের্ কি সাধ, কুটিতি বসি গােড়ার শালারে গালাগালি করি।—

 গােপী। আমার মনেতে কিছু দুঃখ হয়েছে— মিথ্যা মােকদ্দমা করে মানি মানুষ্টোরে নষ্ট কর্লাম। নবীনের শিরঃপীড়া আর নবীনের মার এই মলিন দশা শুনে আমি বড় ক্লেশ পাইতেছি।—

 গােপ। ব্যাঙ্গের সর্দ্দি–দেওয়াঞ্জী মশাই খাপা হবেন্ না, মুই পাগল ছাগল আছি একটা, তামাক সাজে আন্বাে?

 গােপী। গুওডা নন্দর বংশ, ভােগােলের শেষ।

 গােপ। সাহেবেরাই সব কত্তি নেগেচে, সাহেবেরা আপনারা কামার আপনারা খাঁড়া, যেখানে পড়ায় সেখানে পড়ে। গােড়ার কুটিতি দ পড়ে, গেরামের নােক নেয়ে বাঁচে।—

 গােপী। তুই গুওডা বড় ভেমো, আমি আর শুন্তে চাই না—তুই যা, সাহেবের আস্বার সময় হয়েছে।—

 গােপ। মুই চল্লাম, মাের দুদির হিসেবডা করে মােরে কাল একটা টাকা দিতি হবে, মােরা গঙ্গাচ্ছানে যাব।—

(প্রস্থান।)

 গােপী। বােধ করি, ঐ শিরঃপীড়ার উপরই কাল জ্রাঘাত হবে। সাহেব তােমার পুষ্করিণীর পাড়ে নীল বুন্‌বে তা কেই রাখিতে পারিবে না। সাহেবদের কিঞ্চিৎ অন্যায় বটে, গত বৎসরের টাকা না পেয়েও ৫০ বিঘা নীল করিতে এক প্রকার প্রবৃত্ত হয়েছে, তাহাতেও মন উঠিল না। পূর্ব্ব মাঠের ধানি জমি কয়েক খানার জন্যেই এত গােলমাল, নবীনবসের দেওয়াই উচিত ছিল—শেতলাকে তুষ্ট রাখিতে পারিলেই ভাল। নবীন মরেও এক কামড় কামড়াবে।—(সাহেবকে দূরে দেখিয়া)এই যে শুভ্রকান্তি নীলাম্বর আসিতেছেন আমাকে হয় তাে বা সাবেক দেওয়ানের সঙ্গে কতক দিন থাক্‌তে হয়।

(উডের প্রবেশ)

 উড। এ কথা যেন কেহ না জান্তে পারে, মাতঙ্গ নগরের কুটিতে দাঙ্গা বড় হবে, লাটিয়াল সব্ সেখানে থাক্‌বে। এখানকার জন্যে দশজন পােদ সুড়কি ওয়ালা জোগাড় করে রাখবে-আমি যাব, ছােট সাহেব যাবে, তুমি যাবে। শালা কাচা গলায় বেঁধে বাড়াবাড়ী কওে পারবে না, বেমো আছে, কেমন করিয়া দারােগার মদৎ আন্তে পারবে—

 গােপী। ব্যাটারা যে কাতর হয়েছে সুড়কিওয়ালার আবশ্যক হবে না। হিন্দুর ঘরে গলায় দড়ী দিয়ে, বিশেষ জেলের ভিতরে মরা বড় দোষ এবং ধিক্কারাস্পদ। এই ঘটু নাতে ব্যাটা বড় শাসিত হইয়াছে।

 উড। তুমি বুঝিতেছ না, বাপের মরাতে রাস্কেলের সুখ হইল—বাপের ভয়েতে নীলের দাদন লইত, এখন বাঞ্চতের সে ভয় গেল, যেমন ইচ্ছা তেমনি করবে। শালা আমার কুটির বদনাম করে দিয়াছে। হারাম্জাদাকে কাল আমি গ্রেপ্তার কর্বাে, মজুমদারের সহিত দোস্ত করিয়া দিব। অমর নগরের মাজিষ্ট্রেটের মত হাকিম আইলে বজ্জাত্ সব কত্তে পার্বে?

 গােপী। মজুমদারের মােকদ্দমার যে সূত্র করিয়াছে, যদি নবীন বসের এ বিভ্রাট না হতাে তবে এত দিন ভয়ানক হইয়া উঠিত—এখনও কি হয় বলা যায় না, বিশেষ যে হাকিম আসিতেছেন তিনি শুনিয়াছি রাইয়তের পক্ষ; আর মফঃস্বলে আইলে তাঁবূ আনেন। ইহাতে কিছু গােল বােধ হয়, ভয়ও বটে—

 উড। তােম্ ভয় ভয় ককে হাম্‌কো ডেক্‌ কিয়া, নীলকর সাহেবকো কোই কাম্‌মে উর হ্যায়? গিধ্বড়্কি শালা, তোমারা মােনাসেফ না হোয় কাম্ ছোড় দেও।

 গােপী। ধর্ম্মাবতার! কাযেই ভয় হয়—সাবেক দেওয়ান কয়েদ হলে তার পুত্র ৬ মাসের বাকি মাহিয়ানা লইতে আসিয়াছিল, তাহাতে আপনি দরখাস্ত করিতে বল্লেন, দরখাস্ত করিলে পর হুকুম দিলেন, কাগজ নিকাস ব্যতীত মাহিয়ানা দেওয়া যাইতে পারে না। ধর্ম্মাবতার, চাকর কয়েদ হলে বিচার এই?

 উড। আমি জানি না? ও শালা, পাজি নেমক্‌হারাম বেইমান! মাহিয়ানার টাকায় তােমাদের কি হইয়া থাকে? তােমরা যদি নীলের দামের টাকা ভক্ষণ না কর, তবে কি ডেড্লি কমিসন হইত? তা হইলে কি দুঃখী প্রজারা কঁদিতে কঁদিতে পাদরি সাহেবের কাছে যাইত? তােমরা শালারা সব নষ্ট করিয়াছ; মাল কম পড়িলে তােমার বাড়ী বেচিয়া লইব—য়্যারাণ্ট কাউয়ার্ড হেলিশ্নেভ।

 গােপী। আমরা, হুজুর, কসায়ের কুকুর—নাড়ী ভুঁড়িতেই উদর পূর্ণ করি। ধর্ম্মাবতার! আপনারা যদি মহাজনেরা যেমন খাতকের কাছে ধান আদায় করে, সেই রূপে নীল গ্রহণ করিতেন তাহা হইলে নীলকুটীর এত দুর্নাম হইত না, আমিন খালাসীরও প্রয়ােজন থাকিত না, আর আমাকে “গুপে গুওটা, গুপে গুওটা” বলিয়া সকুল লােকে গাল্ দিত না।

 উড। তুমি ওটা ব্লাইণ্ড, তােমার চক্ষু নাই—

(এক জন উমেদারের প্রবেশ।)

 আমি এই চক্ষে দেখিয়াছি (আপন চক্ষে অঙ্গুলি দিয়া) মহাজনেরা ধানের ক্ষেত্রে যায় এবং রাইয়তদিগের সঙ্গে বিবাদ করে। তুমি এই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা কর।

 উমে। ধর্ম্মাবতার! আমি এবিষয়ের অনেক দৃষ্টান্ত দিতে পারি। রাইয়তেরা বলে “নীলকর সাহেবদের দৌলতে মহাজনের হাত হইতে রক্ষা পাইতেছি।”

 গােপী। (উমেদারের প্রতি জনান্তিকে) ওহে বাপু! বৃথা খােসামদ। কর্ম্ম কিছু খালি নেই (উডের প্রতি) মহাজনেরা ধানের ক্ষেত্রে গমন করে এবং নিজ খাতকের সহিত বাদানুবাদ করে একথা যথার্থ বটে, কিন্তু এরূপ গমনের এবং বিবাদের নিগূঢ় মর্ম্ম অবগত হইলে শ্যামাচাঁদ-শক্তিশেলে অনাহারী প্রজারূপ সুমিত্রানন্দননিচয়ের নিপতন, খাতকের শুভাভিলাষী মহাজন মহাজনের ধানক্ষেত্রে ভ্রমণের সহিত তুলনা করিতেন না—আমাদের সঙ্গে মহাজনদের অনেক ভিন্নতা।

 উড। আচ্ছা, আমারে বুঝাও। কিছু কারণ থাকিতে পারে, শালা লােক আমাদিগের সব কথা বলিতেছে, মহাজনের কথা কিছু বলে না।

 গােপী। ধর্ম্মাবতার! খাতকদিগের সম্বৎসরের যত টাকা আবশ্যক সকলি মহাজনের ঘর হইতে আনে এবং আহারের জন্য যত ধান্য প্রয়ােজন তাহা মহাজনের গােলা হইতে লয়, বৎসরান্তে তামাক ইক্ষু তিল ইত্যাদি বিক্রয় করিয়া মহাজনের সুদ সমেত টাকা পরিশােধ করে অথবা বাজার দরে ঐ সকল দ্রব্য মহাজনকে দেয় এবং ধান্য যাহা জন্মে তাহা হইতে মহাজনের ধান্য দেড়া বাড়িতে অথবা সাড়ে সইয়ে বাড়িতে ফিরিয়া দেয়, ইহার পর যাহা থাকে তাহাতে ৩।৪ মাস ঘর খরচ করে। যদি দেশে অজন্মা বশতঃ কিম্বা খাতকের অসঙ্গত ব্যয় জন্য টাকা কিম্বা ধান্য বাকি পড়ে, তাহা বকেয়া বাকি বলিয়া নতূন খাতায় লিখিত হয়, বকেয়া বাকি ক্রমে ক্রমে উসুল পড়িতে থাকে, মহাজনেরা কদাপিও খাতকের নামে নালিশ করে না, সুতরাং যাহা বাকি পড়ে তাহা মহাজনদিগের আপাততঃ লােকসান বােধ হয়, এই জন্য মহাজনেরা কখন কখন মাঠে যায়, ধানের কারকীত্ রীতিমত হইতেছে কি না দেখে, খাজানা বলিয়া যত টাকা খাতকে চাহিয়াছে তদুপযুক্ত জমি বুনন হইয়াছে কি না তাহা অনুসন্ধান করিয়া জানে। কোন কোন অদূরদর্শী খাতক প্রতারণা করিয়া অধিক টাকা লইয়া সর্ব্বদাই ঋণে বিব্রত হইয়া মহাজনের লােক্সান্ করে এবং আপনারাও কষ্ট পায়, সেই কষ্ট নিবারণের জন্যেই মহাজনেরা মাঠে যায়, ‘নীলমাম্‌দো’ হইয়া যায় না (জিবকেটে) ধর্ম্মাবতার! এই নেড়ে হারাম্খোর বেটারা বলে।

 উড। তােমার ছাড়ন্তো শনি ধরিয়াছে, নচেৎ তুমি এত অনুসন্ধান করিতেছ কি কারণ, নইলে তুই এত বেয়াদোব হইয়াছিস কেন? বজ্জাত্, ইন্সেস চিউয়স্ ব্রূট।

 গােপী। ধর্ম্মাবতার। গালাগালি খেতেও আমরা, পয়জার খেতেও আমরা, শ্রীঘর যেতেও আমরা—কুটিতে ডিসপেন্সারি স্কুল হইলেই আপনার, খুন গুমি হইলেই আমরা। হুজুরের কাছে পরামর্শ করিতে গেলে রাগত হন, মজুমদারের মােকদ্দমায় আমার অন্তঃকরণ যে উচাটন হইয়াছে তা গুরুদেবই জানেন।

 উড। বঞ্চিতকে একটা সাহসী কার্য্য করিতে বলি, শালা ওমনি মজুমদারের কথা প্রকাশ করে—আমি বরাবর বলিয়া আসিতেছি তুমি শালা বড় না লায়েক আছে—নবীন বস কে শচীগঞ্জের গুদামে পাঠাইয়া কেন তুমি স্থির হও না।  গােপী। আপনি গরিবের মা বাপ, গেরিব চাকরের রক্ষার জন্য এক বার নবীন বস কে এ মােকদ্দমার কথা জিজ্ঞাসা করিলে ভাল হয়।

 উড। চপ্ রাও ইউ ব্যাস্টার্ড অভ্ হাের্স্ বিচ্। তেরা ওয়াস্তে হাম্‌ কুত্তাকা সাৎ মুলাকাৎ করেগা, শাল কাউয়ার্ড কায়েত বাচ্ছা (পদাঘাতে গােপীর ভূমিতে পতন) কমিস্যনে তােকে সাক্ষী দিতে পাঠাইলে তুই হারামজাদা সর্ব্বনাশ কত্তিস্, ডেভিলিষ্ নিগার! (আর দুই পদাঘাত) এই মুখে তােম্ ক্যাওট্‌কা মাফিক কাম্ ডেগা—শালা কায়েত—কাল্‌কো কাম্ দেখ্‌কে হাম্ তােম্‌কা আপ্‌ছে জেলমে্ ভেজ দেগা।

(উড এবং উমেদারের প্রস্থান)

 গােপী। (গাত্র ঝাড়িতে বাড়িতে উঠিয়া) সাত্ শত শকুনি করিয়া একটি নীলকরের দেওয়ান হয়, নচেৎ অগণনীয় মােজ হজম হয় কেমন করে? কি পদাঘাতই করিতেছে, বাপ্! বেটা যেন আমার কালেজ আউট বাবুদের গৌণপরা মাগ।

 (নেপথ্যে) দেওয়ান দেওয়ান।

 গােপী। বন্দা হাজির। এবার কার পালা—

“প্রেমসিন্ধু নীরে বহে নানা তরঙ্গ।”
(গোপীর প্রস্থান)

পঞ্চম অঙ্ক।

দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।

নবীনমীধবের শয়ন ঘর।

(আদুরী বিছানা করিতে করিতে ক্রন্দন)

 আদুরী। আহা! হা হা, কমে যাব, পরাণ ফ্যাটে বাঁর হলো, এমন করেও ম্যারেচে কেবল ধুক্‌ ধুক্‌ কর্ত্তি নেগেচে, মা ঠাঁকুরুণ দেখে বুক ফ্যাটে মরে যাবে। কুটি থরে নিয়ে গিয়েছে ভেবে তানারা গাচ্তলায় আঁচ্ড়া পিচ্ড়ি করে কান্তি নেগেচেন, কোলে করে যে মোদের বাড়ী পানে আন্লে তা দেখ্তি পালেন না।

 (নেপথ্যে)|আদুরি আমরা ঘরে নিয়ে যাব?

 আদুরী। তোমরা ঘরে নিয়ে এস, তানারা কেউ এখানে নেই।

(মূর্চ্ছাপন্ন নবীনমাধবকে বহন করতঃ সাধু এবং তোরাঁপের প্রবেশ)

 সাধু। (নবীনমাধবকে শয্যায় শয়ন করাইয়া) মাঠাকুরুণ কোথায়?

 আদুরী। তানারা গাচতলায় দেঁড়য়ে দেখ্তি নেগেলেন, (তোরাপকে দেখায়ে) ইনি যখন নে পেল্য়ে গ্যালেন, মোরা ভাবলাম কুটি নিয়ে গ্যাল, তানারা গাচতলায় আঁচ্‌ড়া পিচ্‌ড়ি কত্তি নেগ্লো, মুই নোক ডাক্তি বাড়ী আলাম্। মরা ছেলে দেখে মা ঠাকুরুণ কি বাঁচবে? তোমরা এট্ট দাঁড়াও মুই তানাদের ডাকে আনি।

(আদুরীর প্রস্থান।)
(পুরোহিতের প্রবেশ।)

 পুরো। হা বিধাতঃ! এমন লোককেও নিপাত করিলে! এত লোকের অন্ন রহিত হইল! বড় বাবু যে আর গাত্রোত্থান করেন এমন বোধ হয় না।

 সাধু। পরমেশ্বরের ইচ্ছা, তিনি মৃত মনুষ্যকেও বাঁচাইতে পারেন।

 পুরো। শাস্ত্রমতে তেরাত্রে বিন্দুমাধব ভাগীরথিতীরে পিণ্ডদান করিয়াছেন, কেবল কত্রী-ঠাকুরাণীর অনুরোধে মাসিক শ্রাদ্ধের আয়োজন। শ্রাদ্ধের পর এস্থান হইতে বাস উঠাইবার স্থির হইয়াছিল এবং আমাকে বলিয়াছিলেন আর ও দুর্দ্দান্ত সাহেবদিগের সহিত দেখাও করিবেন না, তবে অদ্য কি জন্য গমন করিলেন?

 সাধু। বড় বাবুর, অপরাধ নাই, বিবেচনারও ত্রুটি নাই। মাঠাকুরুণ এব বউ ঠাকুরুণ আনেক রূপ নিষেধ করিয়াছিলেন, তাঁহারা বলিলেন “যে কএক দিন এখানে থাকা যায় আমরা কুয়ার জল তুলিয়া স্নান করিব, অথবা আদুরী পুষ্করিণী হইতে জল আনিয়া দিবে, আমাদিগের কোন ক্লেশ হইবে না।” বড় বাবু বলিলেন “আমি ৫০ টাকা নজর দিয়া সাহেবের পায় ধরিয়া পুষ্করিণীর পাড়ে নীল করা রহিত করিব, এ বিপদে বিবাদের কোন কথা কহির না।” এই স্থির করিয়া বড় বাবু আমাকে আর তোরাপ্কে সঙ্গে লইয়া নীলক্ষেত্রে গমন করিলেন এবং কাঁদিতে কাঁদিতে সাহেবেকে বলিলেন “হুজুর! আমি আপনাকে ৫০ টাকা সেলামি দিতেছি, এ বৎসর এ স্থানটায় নীল কর্‌বেন না, আর যদি এই ভিক্ষা না দেন তবে টাকা লইয়া গরিব পিতৃহীন প্রজার প্রতি অনুগ্রহ করিয়া শ্রাদ্ধের নিয়ম ভঙ্গের দিন পর্য্যন্তু বুনন রহিত করুন।” নরাধম যে উত্তর দিয়াছিল তাহা পুনরুক্তি করিলেও পাপ আছে; এখনও শরীর লোমাঞ্চিতি হইতেছে। বেটা বল্লে “যবনের জেলে চোর ডাকাইতের সঙ্গে তোর পিতার ফাঁসি হইয়াছে, তাঁর শ্রাদ্ধে অনেক ষাড় কাঁটিতে হইবে, সেই নিমিত্তে টাকা রাখিয়া দে” এবৎ পায়ের জুতা বড় বাবুর হাঁটুতে ঠেকাইয়া। কহিল, “তোর বাপের শ্রাদ্ধে ভিক্ষা এই”।

 পুরো। নারায়ণ! নারায়ণ! (কর্ণে হস্ত প্রদান)

 সাধু। অমনি বড় বাবুর চক্ষু রক্তবর্ণ হইল, অঙ্গ থর থর করিয়া কাঁপিতে লাগিল, দন্ত দিয়া ঠোঁট কামড়াইতে লাগিলেন এবং ক্ষণেক কাল নিস্তব্ধ হয়ে থেকে সজোরে সাহেবের বক্ষঃস্থলে এমন একটি পদাঘাঁত করিলেন, বেটা বেনার বোঝার ন্যায় ধপাত্ করিয়া চিত হইয়া পড়িল। কেশে ঢালী, যে এক কুটির জমাদার হইয়াছে, সেই বেটা ও আর দশ জন সুড়কীওয়ালা, বড় বাবুকে ঘেরাও করিল, ইহাদিগকে বড় বাবু এক বার ডাকাতি মাদ্দা হইতে বাঁচাইয়াছেন, বেটারা বড় বাবুকে মারিতে একটু চক্ষু লজ্জা বোধ করিল। বড় সাহেব উঠিয়া জমাদ্দারকে একটা ঘুসি মারিয়া তাহার হাতের লাঠি লইয়া বড় বাবুর মাথায় মারিল, বড় বাবুর মস্তক ফাটিয়া গেল এবং অচৈতন্য হইয়া ভূমিতে পড়িলেন; আমি অনেক যন্ত্র করিয়াও গোলের ভিতর যাইতে পারিলাম না, তোরাপ দূরে দাঁড়াইয়া দেখিতেছিল, বড় বাবুকে ঘেরাও করিতেই এক গুঁয়ে মহিষের মত দৌড়ে গোল ভেদ করে বড় বাবুকে কৌলে লইয়া বেগে প্রস্থান করিল।

 তোরাপ। মোরে বল্লেন “তুই এট্টু তফাৎ থাক্‌, জানি কি ধরা পাঁকড়া করে নে যাবে” মোর উপর সুমুন্দিদের বড় গোষা, মারা মারি হবে জান্‌লি মুই কি নুক্য়ে থাকি? এট্টু, আগে যাতি পাল্লে বড় বাবুকে বেচঁয়ে আন্তে পাওাম, আর দুই সুমুন্দিরি বরকোত্‌ বিবির দরগায় জবাই কত্তাম। বড় বাবুর মাতা দেখে মোর হাত্‌ পা প্যাটের মধ্যি গেল, তাা সুমুন্দিগার মারবো কখন—আল্লা! বড় বাবু মোরে এত বার বাঁচালে মুই বড় বাবুরি অ্যাকবার বাঁচাতি পাল্লাম না।

(কপালে ঘা মারিয়া রোদন)

 পুরো। বুকে যে একটা অস্ত্রের ঘা দেখিতেছি?

 সাধু। তোরাপ গোলের মধ্যে পঁহুছিবা মাত্র ছোট সাহেব পতিত বড় বাবুর উপর এক তলোয়ারের কোপ মারে, তোরাপ হস্ত দিয়া রক্ষা করে, তোরাপের বাম হস্ত কাটিয়া যায়, বড় বাবুর বুকে একটু খোঁচা লাগে।

 পুরো। (চিন্তা করিয়া)

বন্ধু স্ত্রী ভৃত্যবর্গস্য বুদ্ধেঃ সত্বস্য চাত্মনঃ।
আপন্নিকষপাষাণে নরোজানাতি সারতাং॥

 বড়বাড়ীর জন প্রাণী দেখিতেছি না, কিন্তু অপর গ্রামনিবাসী ভিন্ন জাতি তোরাপ বড় বাবুর নিকটে বদে রোদন করিতেছে, আহা! গরিব খেটেখেগো লোক, হস্তখানি একেবারে কাটিয়া দিয়াছে—উহার মুখ রক্ত মাখা কি রূপে হইল?

 সাধু। ছোট সাহেব উহার হস্তে তলোয়ার মারিলে পর, নেজ মাড়িয়ে ধরিলে বেজী যেমন ক্যাচ ম্যাচ করিয়া কাম্ড়ে ধরে, তোরাপ জ্বালার চোটে বড় সাহেবের নাক কাম্ড়ে লইয়ে পালাইয়াছিল।

 তোরাপ। নাক্টা মুই গাঁটি গুঁজে নেকিচি, বাবু বেঁচে উটলি দ্যাখাবো, এই দেখ (ছিন্ন নাঁসিকা দেখাওন) বড় বাবু যদি আপনি পালাতি পাত্তেন, সুমুন্দির কাণ দুটো মুই ছিঁড়ে আন্তাম্, খোদার জীব পরাণে মাত্তাম না?

 পুরো। ধর্ম্ম আছেন, শূপর্ণখার নাসিকাচ্ছেদে দেবগণ রাবণের অত্যাচার হইতে ত্রাণ পাইয়াছিল, বড় সাহেবের নাসিকাচ্ছেদে প্রজারা নীলকরের দৌরাত্ম হইতে মুক্তি পাইবে না?

 তােরাপ। মুই এখন ধানের গােলার মধ্যি নুক্‌য়ে থাকি, নাত করে পেল্‌য়ে যাব, সুমুন্দি নাকের জন্যি গাঁ নসাতলে পেট্‌য়ে দেবে।

(নবীনমাধরে বিছানার কাছে মাটিতে দুই বার সেলাম করিয়া তােরাপের প্রস্থান।)

 সাধু। কর্ত্তা মহাশয়ের গঙ্গা লাভ শুনে মাঠাকুরুণ যে ক্ষীণ হয়েচেন, বড় বাবুর এ দশা দেখিবামাত্র প্রাণ ত্যাগ করিবেন সন্দেহ নাই—এত জল দিলাম, বুকে হাত বুলালাম, কিছুতেই চেতন হইল না, আপনি এক বার ডাকুন দিকি।—

 পুরাে। বড় বাবু! বড় বাবু! নবীনমাধব! (সজল নয়নে)প্রজাপালক! অন্নদাতা!—চক্ষু নাড়িতেছেন। আহা জননী এখনি আত্মহত্যা করিবেন। উদ্বন্ধন বার্তা শ্রবণে প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন দশ দিবস পাপ পৃথিবীর অন্ন গ্রহণ করিবেন না, অদ্য পঞ্চম দিবস, প্রত্যুষে নবীনমাধব জননীর গলা ধরিয়া অনেক রােদন করিলেন এবং কলিলেন, “মাতঃ যদি অদ্য আপনি আহার না করেন তবে মাতৃ আজ্ঞা লঙ্ঘন জনিত নরক মস্তকে ধারণ পূর্ব্বক আমি হবিষ্য করিব না, উপবাসী থাকিব”। তাহাতে জননী নবীনের মুখ চুন্বন করিয়া কহিলেন “বাবা আমি রাজমহিষী ছিলেম, রাজমাতা হলেম, আমার মনে কিছু খেদ থাকিত না, যদি মরণ কালে তাঁর চরণ একবার মন্তকে ধারণ করিতে পারিতাম; এমন পুণ্যাত্মার অপমৃত্যু হইল, এই কারণে আমি উপবাস করিতেছি। দুঃখিনীর ধন তোমরা, তোমার এবং বিন্দুমাধবের যুখ চেয়ে আমি অদ্য পুরোহিত ঠাকুরের প্রসাদ গ্রহণ করিব, তুমি আমার সম্মুখে চক্ষের জল ফেল না” বলিয়া নবীনকে পঞ্চম বর্ষের শিশুর ন্যায় ক্রোড়ে ধারণ করিলেন!

(নেপথ্যে বিলাপ সূচক ধ্বনি)

আসিতেছেন।

(সাবিত্রী, সৈরিন্ধ্রী, সরলতা, আদুরী, রেবতী, নবীনের খুড়ী এবং অন্যান্য প্রতিবাসিনীর প্রবেশ)

ভয় নাই, জীবিত আছেন—

 সাবিত্রী। (নবীনের মৃতবৎ শরীর দর্শন করিয়া) নবীনমাধব! বাবা আমার, বাবা আমার, বাবা আমার, কোথায়, কোথায়, কোথায়, উহুহু।—(মূর্চ্ছিত হইয়া পতন)

 সৈরি। (রোদন করিতে করিতে)ছোট বউ! তুমি ঠাকুরুণকে ধর, আমি প্রাণকান্তকে একবার প্রাণ ভরে দর্শন করি। (নবীনমাধবের সুখের নিকট উপবিষ্টা)

 পুরো। (সৈরিন্ধ্রীর প্রতি) মা! তুমি পতিব্রতা সাধ্যসতী, তোমার শরীর সুলক্ষণে মণ্ডিত, পতিরতা সুলক্ষণা ভার্য্য়ার ভাগ্যে সত পতিও জীবিত হয়; চক্ষু নাঁড়িতেছেন, নির্ভয়ে সেবা কর। সাধু! কত্রী ঠাকুরাণীর জ্ঞান সঞ্চার হওয় পর্য্যন্ত তুমি এখানে থাক।

(প্রস্থান।)

 সাধু। মা ঠাকুরুণের নাকে হাত দেয়া দেখ দেখি, মৃত শরীর অপেক্ষাও শরীর স্থির দেখিতেছি।

 সর। (নাসিকায় হস্ত দিয়া রেবতীর প্রতি মৃদুস্বরে) নিশ্বাস বেস বহিতেছে, কিন্তু মাথা দিয়ে এমন আগুন বাহির হতেছে যে আমার গলা পুড়ে যাচ্যে।

 সাধু। গোমস্তা মহাশয় কবিরাজ আন্তে গিয়ে সাহেবদের হাতেপড় লেন নাকি? আমি কবিরাজের বাসায় যাই।

(প্রস্থান)

 সৈরি। আহা! আহা! প্রাণনাথ! যে জননীর অনাহারে এত খেদ করিতেছিলে, যে জননীর ক্ষীণতা দেখিয়া রাত্রি দিন পদ সেবায় নিযুক্ত ছিলে, যে জননী কয়েক দিবস তোমাকে ক্রোড়ে না করিয়া নিদ্রা যাইতে পারিতেন না; সেই জননী তোমার নিকটে মূর্চ্ছিত হইয়া পতিত আছেন, এক বার দেখিলে না! (সাবিত্রীকে অবলোকন করিয়া) আহা! হা! বৎসহারা হাম্মারবে ভ্রমণকারিণী গাভী সর্পাঘাতে পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইয়া প্রান্তরে যেরূপ পতিত হইয়া ধাকে, জীবনাধার পুত্রশোকে জননী সেই রূপ ধরাশায়িনী হইয়া আছেন—প্রাণনাথ! একবার নয়ন মেলে দেখ, একবার দাসীরে অমৃত বচন দাসী বলে ডেকে কর্ণকুহর পরিতৃপ্ত কর—মধ্যাহৃসময় আমার সুখ সূর্য্য অস্তগত হইল—আমার বিপিনের উপায় কি হইবে!(রোদন করিতে করিতে নবীনমাধবের বক্ষের উপর পতন)

 সর। ও গো তোমরা দিদিকে কোলে করে ধর।

 সৈরি। (গাত্রোত্থান করিয়া) আমি অতি শিশুকালে পিতৃহীন হয়েছিলাম, আহা! এই কালনীলের জন্যেই পিতাকে কুটিতে ধরে নিয়ে যায়, পিতা আর ফিরিলেন না। নীলকুটি তাঁর যমালয় হইল। কাঙ্গালিনী জননী আমার, আমায় নিয়ে মামার বাড়ী যান, পতিশোকে সেই খানে তাঁর মৃত্যু হয়, মামীরা আমাকে মানুষ করেন, আমি মালিনীর হস্ত হইতে হঠাৎ পতিত পু্পের ন্যায় পথে পতিত হইয়া ছিলাম, প্রাণনাথ আমাকে আদর করে তুলে নিয়ে গৌরব বাড়াইয়াছিলেন; আমি জনক জননীর শোক ভুলে গিয়েছিলাম, প্রাণকান্তের জীবনে পিতা মাতা আমার পুনর্জ্জীবিত হইয়াছিলেন, (দীর্ঘনিশ্বাস) আমার সকল শোক নূতন হইতেছে, আহা! সর্ববাচ্ছাদক স্বামীহীন হইলে আমি আবার পিতা মাতা বিহীন পথের কাঙ্গালিনী হইব।
(ভূতলে পতন)

 খুড়ী। (হস্ত ধারণ পূর্বক উত্তোলন করিয়া) ভয় কি? উতলা হও কেন? মা! বিন্দুমাধবকে ডাক্তার আন্তে লিখে দিয়াছে, ডাক্তার আইলেই ভাল হবেন।

 সৈরি। সেজো ঠাকুরুণ! আমি বালিকা-কালে সেঁজোতির ব্রত করিয়াছিলীম, আলপানায় হস্ত রাখিয়া বলেছিলাম যেন রামের মত পতি পাই, কৌশল্যার মত শাশুড়ী পাই, দশরথের মত শ্বশুর পাই, লক্ষণের মত দেবর পাই; সেজো ঠাকুরুণ! বিধাতা আমাকে সকলি আশার অধিক দিয়াছিলেন; আমার তেজঃপুঞ্জ প্রজা-পালক রঘুনাথ স্বামী; অবিরল অমৃতৃ-মুখী বধূপ্রাণা কৌশল্যা শাশুড়ী; স্নেহপূর্ণলৌচন প্রফুল্লবদন বধূমাতা বধূমতা বলেই চরিতার্থ, দশ দিক্ আল করা শ্বশুর, শারদ কৌমুদী বিনিন্দিত বিমল বিন্দুমাধব আমার সীতা দেবীর লক্ষণদেবর অপেক্ষাও প্রিয়তর। মা গো! সকলি মিলেছে, কেবল একটি ঘটনার অমিল দেখিতেছি—আমি এখনও জীবিত আছি—রাম বনে গমন করিতেছেন, সীতার সহগমনের কোন উদ্যোগ দেখিতেছি না। আহা! আহা! পিতার অনাহারে মরণ শ্রবণে সাতিশয় কাতর ছিলেন, পিতার পারণের জন্যেই প্রাণনাথ কাচা গলায় থাকিতে থাকিতেই, স্বর্গধামে গমন করিতেছেন (এক দৃষ্টিতে মুখাবলোকন করিয়া) মরি, মরি, নাথের ওষ্ঠাধর একেবারে শুষ্ক হইয়া গিয়াছে—ওগো! তোমরা আমার বিপিনকে একবার পাঠশালা হতে ডেকে এনে দাও, আমি একবার (সাশ্রুনয়নে) বিপিনের হাত দিয়া স্বামীর শুষ্কমুখে একটু গঙ্গা জল দি।

(মুখের উপর মুখদিয়া অবস্থিতি)
 সকলে। আহা! হা!

 খুড়ি। (গাত্র ধরিয়া তুলিয়া) মা! এখন এমন কথা মুখে এনো না, (ক্রন্দন) মা! যদি বড় দিদির চেতন থাক্ত তবে এ কথা শুনে বুক ফেটে মর্তেন।

 সৈরি। মা! স্বামী আমার ইহ লোকে বড় ক্লেশ পেয়েচেন, তিনি পরলোকে পরম সুখী হন এই আমার বাসনা। প্রাণনাথ দাসী তোমার যাবজ্জীবন জগদীশ্বরকে ডাক্বে, প্রীণনাথ! তুমি পরম ধার্ম্মিক, পরোপকারী, দীনপালক, তোমাকে অনাথবন্ধু বিশ্বেশ্বর অবশ্যই স্থান দিবেন। আহা! হা! জীবনকান্ত! দাসীকে অজ লইয়া যাও তোমার দেবারাধনার পুষ্প তুলিয়া দেবে।

আহা আহা মরি মরি একি সর্বনাশ।
সীতা ছেড়ে রাম বুঝি যায় বনবাস॥
কি করিব কোথা যাব কিসে বাঁচে প্রাণ।
বিপদ বান্ধব কর বিপদে বিধান॥
রক্ষ রক্ষ রমানাথ রমণী-বিভব।
নীলানলে হয় নাশ নবীনমাধব॥
কোথা নাথ দীননাথ প্রাণনাথ যায়।
অভাগিনী অনাথিনী করিয়ে আমায়॥

(নবীনের বক্ষে হস্ত দিয়া দীর্ঘনিশ্বাস)

পরিহরি পরিজন পরমেশ পায়।
লয় গতি দিয়ে পতি বিপদে বিদায়॥
দয়ার পয়োধি তুমি পতিত পাবন।
পরিণামে কর ত্রাণ জীবন জীবন॥

 সর। দিদি! ঠাকুরুণ চক্ষু মেলিয়াছেন, কিন্তু আমার প্রতি মুখ বিকৃতি করিতেছেন (রোদন করিয়া) দিদি! ঠাকুরুণ আমার প্রত্তি এমন সকোপ নয়নে কখনত দৃষ্টি করেন নাই।

 সৈরি। আহা, আহা, ঠাকুরুণ সরলতাকে এম্নি ভাল বাসেন যে, অজ্ঞানবশতঃ একটু রুষ্ট চক্ষে চাহিয়া সরলতা চাঁপা ফুল বালির খোলায় ফেলিয়া দিয়াছেন—দিদি! কেঁদো না, ঠাকুরুণের চৈতন্য হইলে তোমায় আবার চুম্বন করবেন এবং আদরে পাগলির মেয়ে বলবেন।

(সাবিত্রী গাত্রোত্থান করিয়া নবীনের নিকটে উপবিষ্ট, এবং কিঞ্চিৎ আহ্লাদ প্রকাশ করিয়া নবীনকে একদৃষ্টিতে অবলোকন করিতে করিতে)

 সাবি। প্রসব বেদনার মত আর বেদনা নাই—কিন্ত যে অমূল্য রত্ন প্রসব করিয়াছি মুখ দেখে সব দুঃখ গেল (রোদন করিতে করিতে) আরে দুঃখ! বিবি যদি যমকে ছিটিলিখে কত্তারে না মার্তো তবে সোণার খোকা দেখে কত আহ্লাদ কত্তেন (হাত তালি)।

 সকলে। আহা! আহা! পাগল হয়েচেন।

 সাবি। (সৈরিন্ধ্রীর প্রতি) দাইবউ—ছেলে এক বার আমীর কোলে দাও, তাপিত অঙ্গ শীতল করি, কত্তার নাম করে খোকার মুখে একবার চুমো খাই (নবীনের মুখ চুম্বন)

 সৈরি। মা! আমি যে তোমার বড় বউ, মা দেখ্তে পাচ্চ না-—তৌমার প্রাণের রাম অচৈতন্য হয়ে পড়ে রয়েচেন, কথা কহিতে পাচ্যেন না।

 সাবি। ভাতের সময় কথা ফুটবে। আহা, হা! কত্তা থাক্লে আজ কত আনন্দ, কত বাজ্না বাজ্তো (ক্রন্দন)

 সৈরি। সর্ব্বনাশরে উপর সর্ব্বনাশ! ঠাকুরণ পাগল হলেন?

 সর। দিদি! জননীকে বিছেনা ছাড়া করিয়া দাও, তাঁরে আমি শুশ্রূষা দ্বারা সুস্থ করি।

 সাবি। এমন চিটিও লিখেছিলে, এমন আহ্লাদের দিন বাজ্‌না হলো না (চারি দিকে অবলোকন করিয়া সবলে গাত্রোত্থান পূর্ব্বক সরলতার নিকটে গিয়া) তোমার পায়ে পড়ি বিবি ঠাক্‌রুণ! আর এক খান চিটি লিখে যমের বাড়ী থেকে কত্তারে ফিরে এনে দাও, তুমি সাহেবের বিবি তা নইলে আমি তােমার পায়ে ধত্তাম।

 সর। মাগাে! তুমি আমাকে জননী অপেক্ষাও স্নেহ কর, মা তােমার মুখে এখন কথা শুনে আমি যমযন্ত্রণা হইতেও অধিক যন্ত্রণা পাইলাম! (দুই হস্তে সাবিত্রীকে ধরিয়া) মা! তােমার এ দশা দেখে আমার অন্তঃকরণে অগ্নিবৃষ্টি হইতেছে।

 সাবি। খান্‌কি বিটি, পাজি বিটি, মেলোচ্ছাে বিটি, আমাকে একাদশীর দিন ছুঁয়ে ফেল্লি (হস্ত ছাড়ায়ন)

 সর। মাগাে! আমি তােমার মুখে একথা শুনে আর পৃথিবীতে থাকিতে পারিনে (সাবিত্রীর পদদ্বয় ধারণ পূর্ব্বক ভূমিতে শয়ন) মা! আমি তােমার পাদপদ্মে প্রাণত্যাগ করিব।

(ক্রন্দন)

 সাবি। খুব হয়েছে, গস্তানি বিটি মরে গিয়েছে, কত্তা আমার স্বর্গে গিয়েচেন, তুই আবাগী নরকে যাবি (হাস্য করিতে করিতে করতালি)

 সৈরি। (গাত্রোত্থান করিয়া) আহা! আহা! সরলতা আমার অতি সুশীলা, আমার শাশুড়ির সাত আদরের বউ, জননীর মুখে কুবচন শুনে অতিশয় কাতর হয়েচে! (সাবিত্রীর প্রতি) মা! তুমি আমার কাছে এস।

 সাবি। দাই বউ! ছেলে একা রেখে এলে বাছা, আমি যাই।

 (দৌড়ে নবীনের নিকটে উপবেশন)

 রেবতী। (সাবিত্রীর প্রতি) হ্যাঁগা মা! তুমি যে বলে থাক ছােট বউর মত বউ গাঁয় নেই, ছােট বউরি না খেব্য়ে তুমি যে খাও না, তুমি সেই ছােট বউরি খান্কি বলে গাল দিলে। হ্যাঁগা মা! তুমি মাের কথা শােন্‌চো না—মােরা যে তােমাগার খায়ে মানুষ, কত যে খাতি দিয়েচো।

 সাবি। আমার ছেলের আট কৌড়ের দিন আসিস্ তােরে জলপান দেব।

 খুড়ী। বড় দিদি! নবীন তােমার বেঁচে উট্বে, তুমি পাগল হইও না।

 সাবি। তুমি জান্লে কেমন করে? ও নামতো আর কেউ জানে না, আমার শ্বশুর বলেছিলেন, বউমার ছেলে হলে “নবীনমাধব” নাম রাখ্বো। আমি খােকা পেয়েছি, ঐ নাম রাখবো। কত্তা বল্তেন কবে খােকা হবে “নবীনমাধব” বলে ডাক্বো। (ক্রন্দন) যদি বেঁচে থাক্তেন আজ্ সে সাধ্ পুরতাে।

 (নেপথ্যে শব্দ)

ঐ বাজ্‌না এয়েচে (হাততালি)

 সৈরি। কবিরাজ আসিতেছেন, ছােট বউ উঠে ও ঘরে যাও।

(কবিরাজ ও সাধুচরণের প্রবেশ।)
(সরলতা, রেবতী এবং প্রতিবাসিনীদের প্রস্থান, সৈরিন্ধ্রী অবগুণ্ঠনাবৃতা হইয়া এক পার্শ্বে দণ্ডায়মান)

 সাধু। এই যে মা ঠাকুরুণ উঠে বসিয়াছেন।

 সাবি। (রােদন করিয়া) আমার কত্তা নেই বলে কি তােমরং আমার এমন দিনে ঢোল্ বাড়ী রেখে এলে?

 আদুরী। ওনার ঘটে কি আর জ্ঞেন আছে, উনি অ্যাকেবারে পাগল হয়েছেন। উনি ঐ মরা বড় হালদারেরে বল্‌চেন “মাের কচি ছেলে” আর ছােট হালদারনিরি বিবি বলে কত গালাগালি দেলেন, ছােট হালদারনী কেঁদে ককাতি নেগ্লাে। তােমাদের বল্‌চেন বাজন্দেরে।

 সাধু। এমন দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে!

 কবি। (নবীনের নিকট উপবিষ্ট হইয়া) একে পতিশোকে উপবাসীনী, তাহাতে নয়নানন্দ নন্দনের ঈদৃশীদশা—সহসা এরূপ উন্মত্তা হওয়া সম্ভব, এবং নিদানসঙ্গত। নাড়ীর গতিক্টা দেখা আবশ্যক, কর্ত্রী ঠাকরুণ হস্ত দেন (হাত বাড়াইয়া)

 সাবি। তুই আঁটকুড়ির ব্যাটা কুটির নোক্‌, তা নইলে ভাল মান্ষের মেয়ের হাতিধত্তে চাচ্চিস্ কেন, (গাত্রোত্থান করিয়া) দাই বউ! ছেলে দেখিস্ মা, আমি জল খেয়ে আসি, তোরে এক খান চেলির শাড়ি দেব।

(প্রস্থান)

 কবি!|আহা? জ্ঞানপ্রদীপ আর প্রজ্বলিত হইবে না; আমি হিমসাগর তৈল প্রেরণ করির, তাহাই সেবন করা এক্ষণকার বিধি। (নবীনের হস্ত ধরিয়া) ক্ষীণতাধিক্যমাত্র, অপর কোন বৈলক্ষণ্য দেখিতেছি না, ডাক্তার ভায়ারা অন্য বিষয়ে গো বৈদ্য বটেন, কিন্ত কাটাকুটির বিষয়ে ভাল; ব্যয় বাহুল্য, কিন্তু একজন ডাক্তার আনা কর্ত্তব্য।—

 সাধু। ছোট বাবুকে ডাক্তার সহিত আসিতে লেখা হইয়াছে।

 কবি। ভালই হইয়াছে।—

(চারি জন জ্ঞাতির প্রবেশ)

 প্রথম। এমন ঘটনা হইবে তাহা আমরা স্বপ্নেও জানি না। দুই প্রহরের সময়, কেহ আহার করিতেছে, কেহ স্নান করিতেছে, কেহবা আহার করিয়া শয়ন করিতেছে। আমি এখন শুনিতে পাইলাম।

 দ্বিতীয়। আহা! মস্তকের আঘাতটি সাংঘাতিক বোধ হইতেছে; কি দুর্দ্দৈব! অদ্য বিবাদ হইবার কোন সম্ভাবনা ছিল না, নচেৎ রাইয়তেরা সকলেই উপস্থিত থাকিত।

 সাধু। দুই শত রাইয়তে লাঠী হস্তে করিয়া মার্‌ মার্ করিতেছে এবৎ “হা বড় বাবু! হা বড় বাবু!” বলিয়া রোদন করিতেছে। আমি তাহাদিগের স্ব স্ব গৃহে যাইতে কহিলাম, যেহেতু একটু পন্থা পাইলেই, সাহেব নাকের জ্বালায় গ্রাম জ্বালাইয়া দিবে।

 কবি। মস্তকটা ধৌত করিয়া আপাততঃ টারপিন তৈল লেপন কর; পশ্চাৎ সন্ধ্যাকালে আসিয়া অন্য ব্যবস্থা করিয়া যাইব। রোগীর গৃহে গোল করা ব্যাধ্যাধিক্যের মূল—কোন রূপ কথা বার্ত্তা এখানে না হয়।

(কবিরাজ, নাধুচরণ এবং জ্ঞাতিগণের এক দিকে, এবং আদুরীর অন্য দিকে প্রস্থান, সৈরিন্ধ্রীর উপবেশন।)

পঞ্চম অঙ্ক।

তৃতীয় গর্ভাঙ্ক।

সাধুচরণের ঘর।
(ক্ষেত্রমণির শয্যাকণ্টকি, এক দিকে সাধুচরণ, অপর দিকে রেবতী উপবিষ্ট)

 ক্ষেত্র। বিছেনা বেড়ে পাত, ও মা! বিছেনা ঝেড়ে দে।

 রেবতী। জাদু মোর্‌, সোণার চাঁদ মোর্, ওমন খারা কেন কচ্চো মা। বিছেনা ঝেড়ে দিইচি মা, বিছানায়তো কিছু নেইরে মা, মোদের ক্যাতার ওপরে তোমার কাকিমারা যে নেপ্ দিয়েচে তাইতো পেড়ে দিয়েছি মা।

 ক্ষেত্র। স্য়াকুলির কাঁটা ফোটচে, মরে গ্যালাম, আরে মলাম্‌ রে, বাবার দিখি ফিরিয়ে দে।

 সাধু। (আস্তে আস্তে ক্ষেত্রমণিকে ফিরায়ে, স্বগত) শয্য়াকণ্টকি মরণের পূর্ব্বলক্ষণ (প্রকাশে) জননী আমার দরিদ্রের রতনমণি; মা, কিছু খাও না মা, আমি যে ইন্দ্রাবাদ হইতে তোমার জন্যে বেদানা কিনে এনিচি মা, তোমার যে চুনুরি শাড়িতে বড় সাধ্ মা, তাও তো আমি কিনে এনিচি মা, কাপড় দেখে তুমি তো আহ্লাদ করিলে না মা!

 রেবতী। মার মোর কত সাধ্, বলে সেমোন্তোনের সমে মোরে সাঁক্তির মালা দিতি হবে—আহা হাঁ! মার মোর কি রূপ কি হয়েচে, কর্বো কি, বাপোরে বাপোঃ! (ক্ষেত্রমণির মুখের উপর মুখ দিয়া অবস্থিতি) সোণার ক্ষেত্র মোর কয়লা পানা হয়ে গিয়েছে, দেখ দেখ মার চকির মণি কনে গ্যাল!

 সাধু। ক্ষেত্রমণি! ক্ষেত্রমণি! ভাল করে চেয়ে দেখ না মা!

 ক্ষেত্র। খোন্তা, কুড়ুল, মা! বাবা! আ! (পার্শ্ব পরিবর্ত্তন)

 রেবতী। মুই কোলে তুলে নেই, মার বাছা মার কোলে ভাল থাকবে। (অঙ্কে উত্তোলন করিতে উদ্যত)

 সাধু। কোলে তুলিস্নে টাল্ যাবে।

 রেবতী। এমন পোড়া কপাল করেলীম! আহা হা! হারাণ যে মোর মউর চড়া কাত্তিক, মুই হারাণের রূপ ভোল্বো ক্যামন করে, বাপো! বাপো! বাপো!

 সাধু। রেয়ে ছোঁড়া কখন গিয়েছে, এখনও এল না।

 রেরতী। বড় বাবু মোরে বাগের মুখ থেকে ফিরে এনে দিয়েলো। আঁটকুড়ির বেটা এমন কিলও মেরিলি, বাছার পেট্ খসে গেল, তার পর বাছারে নিয়ে টানাটানি। আহা হা! দৌউত্র হয়েলো, রক্তোর দলা, তবু সব গড়ন দেখা দিয়েলো; আঙ্গুল গুলো পর্য্যন্ত হয়েলো। ছোট সাহেব মোর ক্ষেত্ররে খালে, বড় সাহেব বড় বাবুরি খালে। আহা হা! কাঙ্গালেরে কেউ রক্কে করে না!

 সাধু। এমন কি পুণ্য করিছি যে দৌহিত্রের মুখ দর্শন করিব।

 ক্ষেত্র। গা কেটে গেল—মাজা—ট্যাংরা মাচ হু—হু—হু—

 রেবতী। নমীর আত্‌ বুঝি পোয়ালো, মোর সোণার পিত্তিমে জলে যায় মোর উপায় হবে কি! মোরে মা বলে ডাক্বে কেডা! ই কিত্তি নিয়ে এইলে—

(সাধুর গলা ধরিয়া ক্রন্দন)

 সাধু। চুপ্ কর, এখন কাঁদিস্ নে, টাল্ যাবে।

(রাইচরণ এবং কবিরাজের প্রবেশ)

 কবি। এক্ষণকার উপসর্গ কি? সে ঔষধ খাওয়ান হইয়াছিল?

 সাধু। ঔষধ উদরস্থ হয় নাই—যাহা কিছু পেটের মধ্যে গিয়াছিল তাহাও তৎক্ষণাৎ বমন হইয়া গিয়াছে—এখন এক বার হাতটা দেখুন দিকি, বোধ হইতেছে, চরম কালের পূর্ব্ব লক্ষণ। রেবতী। কাঁটা কাঁটা কত্তি নেগেচে, এত পুরু করে বিছানা করে দেলাষ, তবু মা মোর ছোট্ ফট্ কচ্চেন—আঁর এক্‌টু ভাল অষুধ দিয়ে পরাণ দান দিয়ে যাও—মোর বড় সাধের কুটুম্বু গো!

(রোদন)

 সাধু। নাড়ী পাওয়া যায় না।

 কবি। (হস্ত ধরিয়া) এ অবস্থায় নাড়ী ক্ষীণ থাকা মঙ্গল লক্ষণ, “ক্ষীণে বলবতী নাড়ী সা নাড়ী প্রাণঘাতীকা।”

 সাধু। ঔষধ এ সময় খাওয়ান না খাওয়ান সমান; পিতা মাতার শেষ পর্য্যন্ত আশ্বাস, দেখুন যদি কোন পন্থা থাকে।

 কবি। আতপ তণ্ডুলের জল আবশ্যক, পূর্ণ মাত্রা সূচিকাভরণ সেবন করাই এক্ষণকার বিধি।

 সাধু। রাইচরণ! ও ঘরে স্বস্ত্যয়নের জন্যে বড় রাণী যে আতপ চাল দিয়াছেন, তাহাই লইয়া আয়।

(রাইচরণের প্রস্থান)

 রেবতী। আহা! অন্নপুন্নো কি চেতন আছেন, তা আপনি আলোচাল হাতে করে মোর ক্ষেত্রমণিরি দেক্তি আস্বেন, মোর কপাল হতেই মাঠাকুরুণ পাগল হয়েচেন।

 কবি। একে পতিশোকে ব্যাকুলা, তাহাতে পুত্ত্র মৃতবৎ, ক্ষিপ্ততার ক্রমশঃ বৃদ্ধি হইতেছে, বোধ হয় কর্ত্রী ঠাকুরুণের নবীনের অগ্রে পরলোক হইবে, অতিশয় ক্ষীণা হইয়াছেন।

 সাধু। বড় বাবুকে অদ্য কিরূপ দেখিলেন? আমার বোধ হয় নীলকরনিশাচরের অত্যাচারাগ্নি বড় বাবু আপনার পবিত্র শোণিত দ্বারা নির্ব্বাপিত করিলেন। কমিসনে প্রজার উপকার সম্ভব বটে, কিন্তু তাহাতে ফল কি? চৈতন বিলের এক শত কেউটে সর্প আমার অঙ্গময় একেবারে দংশন করে, তাহাও আমি সহ্য করিতে পারি, ইটের গাঁথনি উনানে সুঁদ্রি কাষ্ঠের জ্বালে প্রকাণ্ড কড়ায় টগ্বগ্ করিয়া ফুটিতেছে যে গুড়, তাহাতে অকস্মাৎ নিমগ্ন হইয়া খাবি খাওয়াও সহ্য করিতে পারি; আমাবস্যার রাত্রিতে হারে রে হৈ হৈ শব্দে নির্দ্দয় দুষ্ট ডাকাইতেরা সুশীল, সুবিদ্বান্ একমাত্র পুত্ত্রকে বধ করিয়া সম্মুখে পরমা-সুন্দরী পতি-প্রাণা দশ মাস গর্ভবতী সহধর্ম্মিণীর উদরে পদাঘাত দ্বারা গর্ভপাতন করিয়া সপ্তরুষার্জিত ধন সম্পত্তি অপহরণ পূর্ব্বক আমার চক্ষু তলোয়ার ফলায় অন্ধ করিয়া দিয়া যায়, তাহাও সহ্য করিতে পারি; গ্রামের ভিতরে একটা ছাড়িয়া দশটা নীলকুটি স্থাপিত হয় তাহাও সহ্য করিতে পারি, কিন্তু এক মূহুর্ত্তের নিমিত্তেও প্রজাপালক বড় বাবুর বিরহ সহ্য করিতে পারি না।

 কবি। যে আঘাতে মস্তকের মস্তিষ্ক বাহির হইয়াছে, ঐ সাংঘাতিক। সান্নিপাতিকের উপক্রম দেখিয়া আসিয়াছি, দুই প্রহর অথবা সন্ধ্যাকালে প্রাণত্যাগ হইবে। বিপিনের হস্ত দিয়া একটু গঙ্গাজল মুখে দেওয়া গেল, তাহা দুই কস্ বহিয়া পড়িল। নবীনের কায়স্তিনী পতি শোকে ব্যাকুলা, কিন্তু পতির সদ্গতির উপায়ানুরক্তা।

 সাধু। আহা! আহা! মা ঠাকুরুণ যদি ক্ষিপ্ত না হইতেন, তবে এ অবস্থা দর্শন করিয়া বুক ফেটে মরিতেন। ডাক্তার বাঁবুও মাথার ঘা সাংঘাতিক বলিয়াছেন।

 কবি। ডাক্তার বাবুটি অতি দয়াশীল, বিন্দুবাবু টাকা দিতে উদ্যোগী হইলে, বলিলেন “বিন্দুবাবু তোমরা যে বিব্রত, তোমার পিতার শ্রাদ্ধ সমাধা হওয়ার সম্ভব নাই, এখন আমি তোমার কাছে কিছু লইতে পারি না, আমি যে বেহারায় আসিয়াছি সেই বেহারায় যাইব, তাহাদের আপনার কিছু দিতে হবে না” দুঃশাসন ডাক্তার হলে, কর্ত্তার শ্রাদ্ধের টাকা লইয়া ধাইত, বেটাকে আমি দুই বার দেখিছি, বেটা যেমন দুর্মুখো তেমনি অর্থপিশাচ।

 সাধু। ছোট বাবু ডাক্তার বাবুকে সঙ্গে করে ক্ষেত্রমণিকে দেখিতে আসিয়াছিলেন, কিন্তু কোন ব্যবস্থা করিলেন না। আমার নীলকর অত্যাচারে অন্নাভাব দেখে ক্ষেত্রমনির নাম করে ডাকার বাবু আমারে দুই টাকা দিয়া গিয়েছেন।

 কবি। দুঃশাসন ডাক্তার হলে হাত না ধরে বল্তো, বাঁচবে না; আর তোমার গোরু বেচে টাকা লইয়া যাইত।

 রেবতী। মুই সর্ব্বস্ব বেচে টাকা দিতে পারি মোর ক্ষেত্রকে যদি কেউ বেঁচ্‌য়ে দেয়।

(চাল লইয়া রাইচরণের প্রবেশ)

 কবি। চাল গুলিন প্রস্তরের বাটিতে ধৌত করিয়া জল আনয়ন কর।

(রেবতীর তণ্ডুল গ্রহণ)

জল অধিক দিও না—এ বাটিটীতো অতি পরিপাটী দেখিতেছি।

 রেবতী। মাঠাকুরুণ গয়ায় গিয়েলেন, অনেক বাটি এনেলেন, মোর ক্ষেত্রকে এই বাটিডে দিয়েলেন। আহা! সেই মাঠীকুরুণ মোর ক্ষেপে উটেচেন, গাল্ চেপ্‌ড়ে মরেন বলে, হাত দুটো দড়ি দিয়ে বেঁদে এখেচে।

 কবি। সাধু! খল আনয়ন কর, আমি ঔষধ বাহির করি।

(ঔষধের ডিপা খুলন)

 সাধু। কবিরাজ মহাশয়! আর ঔষধ বাহির করিতে হইবে না, চক্ষের ভাব দেখুন দিকি; রাইচরণ এ দিকে আয়।

 রেবতী। ওমা মোর কপালে কি হলো! ওমা মুই হারাণের রূপ ভোল্বো কেমন করে, বাপো! বাপো!—ও ক্ষেত্র, ও ক্ষেত্র, ক্ষেত্রমণি! মা—আর কি কথা কবা না, মা মোর বাপো, বাপো, বাপো!  (ক্রন্দন)

 কবি। চরম কাল উপস্থিত।

 সাধু। রাইচরণ ধর্‌ ধর্‌।

(সাধুচরণ রাইচরণ দ্বারা শয্যা সহিত ক্ষেত্রকে বাহিরে লইয়া যাওন)

 রেবতী। মুই সোণার নক্কি ভেস্‌য়ে দিতি পার্বো না! মারে মুই কনে যাবরে! সাহেবের সঙ্গি থাকা যে মোর ছিল ভাল মারে! মুই মুখ দেখে জুড়োতীম মারে! হো, হো হো!

(পাছা চাপড়াইতে চাপড়াইতে ক্ষেত্রমণির পশ্চাৎ ধাবন)

 কবি। মরি, মরি, মরি, জননীর কি পরিতাপ—সন্তান না হওয়াই ভাল!

(প্রস্থান)

পঞ্চম অঙ্ক।

চতুর্থ গর্ভাঙ্ক।

গোলোক বসুর বাটীর দরদালান।

(নবীন মাধবের মৃত শরীর ক্রোড়ে করিয়া সাবিত্রী আসীনা)

 সাবি। আয়রের আমার জাদুমণির ঘুম্ আয়—গোপাল আমার বুক জুড়ানে ধন, সোণার চাঁদের মুখ দেখ্লে আমার সেই মুখ মনে পড়ে (মুখ চুম্বন) বাছা আমার ঘুমায়ে কাদা হয়েছে (মস্তকে হস্তামর্ষণ) আহা মরি, মরি, মশায় কাম্ড়ে করেছে কি?—গর্মি হয় বলে কি কর্বো, আর মশারি না খাট্য়ে শোব না। (বক্ষঃস্থলে হস্তামর্ষণ) মরে যাই, মার প্রাণে কি সয়, ছারপোকায় এমনি, কামড়েচে, বাছার কচি গা দিয়ে রক্ত ফুটে বেরুচ্চে। বাছার বিছানাটা কেউ করে দেয় না; গোপালেরে শোয়াই কেমন করে। আমার কি আর কেউ আছে, কর্ত্তার সঙ্গে সব গিয়েচে। (রোদন) ছেলে কোলে করে কাঁদিতেছি, হা পোড়া কপালি! (নবীনের মুখাবলোকন করে) দুঃখিনীর ধন আমার দয়ালা করিতেছে। (মুখ চুম্বন করিয়া) না বাবা তোমারে দেখে আমি সব দুঃখ ভুলে গিয়েছি, আমি কাঁদিতেছি না (মুখে স্তন দিয়া) মাই খাও গোপাল আমার, মাই খাও—গস্তানি বিটির পায় ধর্লাম তবু কত্তারে এক বার এনে দিলে না, গোপালের দুদ যোগান করে দিয়ে আবার যেতেন; বিটির সঙ্গে যে ভাব, চিটি লিখ্লিই যমরাজা ছেড়ে দিত। (আপনার হস্তে রজ্জু দেখিয়া) বিধবা হয়ে হাতে গহনা রাখিলে পতির গতি হয় না। চীৎকার করে কাঁদিতে লাগলাম, তবু আমারে শাঁকা পর্য়ে দিলে—প্রদীপে পুড়য়ে ফেলিচি তবু আছে (দন্ত দ্বারা হস্তের রজ্জু ছেদন) বিধবা হয়ে গহনা পরা সাজেও না, সয়ও না, হাতে ফোস্কা হয়েচে। (রোদন) আমার শাঁকা পরা যে ঘুচ্য়েচে, তার হাতের শাঁকা যেন তেরাত্রের মধ্যে নাবে (মাটিতে অঙ্গুলি মট্কায়ন) আপনিই বিছানা করি (মনে মনে শয্যাপাতন) মাজুরটো কাচা হয় নাই (হস্ত বাড়াইয়া) বালিস্টে নাগাল পাইনে—কাঁতা খানা ময়লা হয়েচে, (হস্ত দিয়া ঘরের মেজে ঝাড়ন) বাবারে শোয়াই (আস্তে আস্তে নবীনের মৃত শরীর ভূমিতে রাখিয়া) মার কাছে তোমার ভয় কি বাবা! সচ্চন্দে শুয়ে থাক থুথকুড়ি দিয়ে যাই (বুকে থুথ দেওন) বিবি বিটি আজ যদি আসে, আমি তার গলা টিপে মেরে ফেল্বো—বাছারে চোক ছাড়া করবো না, আমি গণ্ডি দিয়ে যাই (অঙ্গুলি দ্বারা নবীনের মৃত শরীর বেড়ে ঘরের মেজেয় দাগ দিতে দিতে মন্ত্র পঠন)

সাপের ফেনা বাঘের নাক।
ধূনোর আগুন চড়োক্‌ পাঁক॥
সাত সতিনের সাদা চুল।
ভাঁটির পাতা ধুতরো ফুল॥
নীলের বিচি মরিচ পোড়া।
মড়ার মাথা মাদার গোড়া॥
হন্নে কুকুর চোরের চণ্ডী।
যমের দাঁতে এই গণ্ডি॥

(সরলতার প্রবেশ)

 সর। এঁরা সব কোথায় গেলেন—আহা! মৃত শরীর বেষ্টন করিয়া ঘুরিতেছেন—বোধ করি প্রাণকান্ত পথশ্রান্তে নিতান্ত ক্লান্তিবশতঃ ভূমিতে পতিত হইয়া শোকদুঃখবিনাশিনী নিদ্রাদেবীর শরণাপন্ন হইয়াছেন। নিদ্রে! তোমার কি লোকাতীত মহিমা! ভুমি বিধবাকে সধবা কর, বিদেশীকে দেশে আন, তোমার স্পর্শে করাবাসিদের শৃঙ্খল ছেদ হয়, তুমি রোগীর ধন্বন্তরি, তোমার রাজ্যে বর্ণভেদে ভিন্নতা নাই, তোমার রাজনিয়ম জাতিভেদে ভিন্ন হয় না; তুমি আমার প্রাণকান্তকে তোমার নিরপেক্ষ রাজ্যের প্রজা করিয়াছ, নচেৎ তাঁহার নিকট হইতে পাগলিনী জননী মৃতপুত্রকে কিরূপে আনিলেন। জিবীতনাথ পিতা ভ্রাতাবিরহে নিতান্ত অধীর হইয়াছেন। পূর্ণিমার শশধর যেমন কৃষ্ণপক্ষে ক্রমে ক্রমে হ্রাস প্রাপ্ত হয়, জীবিতনাথের মুখল৩াবণ্য সেইরূপ দিন দিন মলিন হইয়া একেবারে দূর হইয়াছে। মা গো, তুমি কখন উঠিয়া আসিয়াছ? আমি আহার নিদ্রা পরিত্যাগ করিয়া সতত তোমার পেবায় রত আছি, আমি কি এত এচৈতন্য হয়ে পড়েছিলাম? তোমাকে সুস্থ করিবার জন্যে আম তোমার পতিকে যমরাজার বাড়ী হইতে আনিয়া দিব স্বীকার করিয়াছি, তুমি কিঞ্চিৎ স্থির রহিয়াছিলে। এই ঘোর রজনী, সৃষ্টী সংহারে প্রবৃত্ত প্রলয়কালের ভীষণ অন্ধতামসে অবনী আবৃত, আকাশমণ্ডল ঘনতর ঘনঘটায় আচ্ছন্ন; বহ্নিবাণের ন্যায় ক্ষণে ক্ষণে ক্ষণপ্রভা প্রকাশিত; প্রাণি মাত্রেই কালনিদ্রানুরূপ নিদ্রায় অভিভূত; সকলি নীরব; শব্দের মধ্যে অরণ্যাভ্যন্তরে অন্ধকারকুল শৃগালকুলের কোলাহল এবহ তস্করনিকরের অমঙ্গলকর কুক্কুরগণের ভীষণ শব্দ; এমত ভয়াবহ নিশীথ সময়ে জননি! তুমি কিরূপে একাকিনী বহির্দ্বারে গমন করিয়া মৃত পুত্ত্রকে আনয়ন করিলে?

(মৃত শরীরের নিকট গমন)

 সাবি। আমি গণ্ডি দিইচি, গণ্ডির ভিতর এলি?

 সর। আহা! এমত দেশ বিজয়ী জীবনাধিক সহোদর বিচ্ছেদে প্রাণনাথের প্রাণ থাকিবে না।

(ক্রন্দন)

 সাবি। তুই আমার ছেলে দেখে হিংসে কচ্ছিস্? ও সর্ব্বনাশি, রাঁড়ী, আঁট্কুড়ির মেয়ে, তোর ভাতার ঘরে—বার হ, এখান থেকে বার হ, নইলে এখনি তোর গলায় পা দিয়ে জীব টেনে বার্ কর্‌বো।

 সর। আহা! আমার শ্বশুর শাশুড়ির এমন সুবর্ণষড়ানন জলের মধ্যে গেল!

 সাবি। তুই আমার ছেলের দিকে চাসনে, তোরে বারণ কচ্চি—ভাতারখাগি। তোর মরণ ঘুন্য়ে এয়েচে দেখ্‌চি।

(কিঞ্চিৎ অগ্রে গমন)

 সর। আহা! কৃতান্তের করাল কর কি নিষ্ঠুর আমার সরল শাশুড়ির মনে তুমি এমন দুঃখ দিলে, হা যম!

 সাবি। আবার ডাক্চিস, আবার ডাক্চিস। (দুই হস্তে সরলতার গলা টিপে ধরিয়া ভূমিতে ফেলিয়া) পাজিবিটি, যমসোহাগি, এই তোরে মেরে ফেলি (গলায় পা দিয়া দণ্ডায়মান) আমার কত্তারে খেয়েচে, আবার আমার দুদের বাছাকে খাবার জন্যে তোমার উপপতিকে ডাক্চো—মর্ মর্ মর্ মর্ (গলার উপর নৃত্য)।

 সর। গ্যা—অ্যা, অ্যা, অ্যা—

(সরলতার মৃত্যু)
(বিন্দুনাধবের প্রবেশ)

 বিন্দু। এই যে এখানে পড়িয়া রহিয়াছে—ওমা! ও কি! আমার সরলতাকে মেরে ফেলিলে জননি! (সরলতার মস্তক লইয়া) আমার প্রাণের মলা যে এ পাপ পৃথিবী পরিত্যাগ করিয়াছেন (রোঁদনাস্তর সরলতার মুখচুম্বন)

 সাবি। কাম্‌ড়ে মেরে ফেল নচ্ছার বিটিকে—আমার কচি ছেলে খাবার জন্যে যমকে ডাকছেল, আমি তাই গলায় পা দিয়ে মেরে ফেলিচি।

 বিন্দু। হে মাতঃ, জননী যেমন যামিনীযোগে অঙ্গচালনা দ্বারা স্তনপানাসত্ত বক্ষঃস্থলস্থ দুগ্ধপোষ্য শিশুকে বধ করিয়া নিদ্রাভঙ্গে বিলাপে অধীরা হইয়া আত্মঘাত বিধান করে, আপনার যদি এক্ষণে শোকদুঃখবিস্মারিকা ক্ষিপ্ততার অপগম হয়, তবে আপনিও আপনার জীবনাধিক সরলতা বধজনিত মনস্তাপে প্রাণ ত্যাগ করেন। মা! তেমার জ্ঞানদীপের কি আর উন্মেষ হইবে না—আপনার জ্ঞানসঞ্চার আর না হওয়াই ভাল। আহা, মৃত পতিপুত্রা নারীর ক্ষিপ্ততা কি সুখপ্রদ! মনোমৃগ ক্ষিপ্ততা-প্রস্তরপ্রাচীরে বেষ্টিত, শোক-শার্দ্দূল আক্রমণ করিতে অক্ষম। মা! আমি তোমার বিন্দুমাধব।

 সাবি। কি,কি বলো?

 বিন্দু। মা! আমি যে আর জীবন রাখিতে পারিনে—জননি পিতার উদ্বন্ধনে এবৎ সহোদরের মৃত্যুতে আপনি পাগল হইয়া আমার সরলতাকে বধ করিয়া আমার ক্ষত হৃদয়ে লবণ প্রদান করিলেন।

 সাবি। কি? নবীন আমার নেই, নবীন আমার নেই!—মরি মরি বাবা আমার! সোণার বিন্দুমাধব আমার! অমি তোমার সরলতারে বধ করিয়াছি—ছোট বউমাকে আমি পাগল হয়ে মেরে ফেলিচি, (সরলতার মৃত শরীর অঙ্কে ধারণ করিয়া আলিঙ্গন) আহা, হা! আমি পতিপুত্ত্রবিহীন হয়েও জীবিত থাকিতে পারিতাম, কিন্তূ তোমাকে স্বহস্তে বধ করে আমার বুক ফেটে গেল—হো, ও, মা! (সরলতাকে আলিঙ্গন পূর্ব্বক ভূতলে পতনান্তনর মৃত্যু)

 বিন্দু। (সাবিত্রীর গাত্রে হস্ত দিয়া) যাহা বলিলাম তাহাই ঘটিল! মাতার জ্ঞান সঞ্চারে প্রাণনাশ হইল! কি বিডম্বনা! জননী আর ক্রোড়ে লয়্যে মুখ চুম্বন করিবেন না! মা! আমার মা বলা কি শেষ হইল? (রোদন) জন্মের মত জননীর চরণধুলি মস্তকে দি। (চরণের ধূলি মৃত্তকে দেওন) জন্মের মত জননীর চরণরেণু ভোজন করিয়া মানব দেহ পবিত্র করি।

(চরণের ধূলি ভক্ষণ)
(সৈরিন্ধ্রির প্রবেশ)

 সৈরি। ঠাকুর পো! আমি সহমরণে যাই আমারে বাধা দিও না! সরলতার কাছে বিপিন আমার পরম সুখে থাঁকবে—একি, একি! শাশুড়ি বয়ে এরূপ পড়ে কেন?

 বিন্দু। বড়বউ, মাতাঠাকুরাণী সরলতাকে বধ করিয়াছেন, তৎপরে সহসা জ্ঞান সঞ্চার হওয়াতে, আপনিও সাতিশয় শোকসন্তপ্তা হইয়া প্রাণ ত্যাগ করিয়াছেন।

 সৈরি। এখন! কেমন করে? কি সর্ব্বনাশ! কি হলো, কি হলো! আহা, আহা! ও দিদি আমার যে বড় সাঁধের চুলের দড়ি, তুমি যে আজো খোঁপায় দেউনি, আহা, আহা! আর তুমি দিদি বলে ডাকবে না (রোদন) ঠাকুরুণ, তোমার রামের কাছে তুমি গেলে আমায় যেতে দিলে না। ও মা! তোমায় পেয়ে আমি মায়ের কথা যে এক দিনও মনে করিনি।
(আদুরীর প্রবেশ)

 আদু। বিপিন ডরয়ে উটেচে, বড়হালদার্নী তুমি শীগ্গির এস।

 সৈরি। তুই সেইখান হতে ডাক্তে পারিসনি, একা রেখে এইচিস্?

(আদুরীর সহিত বেগে প্রস্থান)

 বিন্দু। বিপিন আমার বিপদসাগরে ধ্রুব নক্ষত্র। (দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া) বিনশ্বর অবনিমণ্ডলে মানবলীলা, প্রবল প্রবাহ-সমাকুলা গভীর স্রোতস্বতীর অত্যুচ্চ কূলতুম্য ক্ষণভঙ্গুর। তটের কি অপূর্ব্ব শোভা! লোচনা-নন্দপ্রদ নবীন দূর্ব্বাদলাবৃত ক্ষেত্র, অভিনব পল্যব-সুশোভিত মহীরূহ, কোথাও সন্ত্বোষসঙ্কুলিত ধীবরের পর্ণকূটীর বিরাজমান, কোথাও নব দূর্ব্বাদললোলূপা সবৎসা ধেনু আহারে বিমুগ্ধা; আহা! তথায় ভ্রমণ করিলে বিহঙ্গমদলের সুললিত ললিত তানে এবং প্রস্ফূটিত বনপ্রসূনসৌরভামৌদিত মন্দ মন্দ গন্ধবহে পূর্ণানন্দ আনন্দময়ের চিন্তায় চিত্ত অবগাহন করে। সহসা ক্ষেত্রোপরি রেখার স্বরূপ চিড়্ দর্শন, অচিরাৎ শোভাসহ কূল ভগ্ন হইয়া গভীর নীরে নিমগ্ন। কি পরিতাপ! স্বরপূরনিবাসী বসুকূল নীলকীর্ত্তিনাশায় বিলুপ্ত হইল—আহা! নীলের কি করাল কর!

নীলকর বিষধর বিষপোরা মূখ।
অনলশিখায় ফেলে দিল যত সুখ॥
অবিচারে কারাগারে পিতার নিধন।
নীলক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা হলেন পতন॥
পতি পুত্রশোকে মাতা হয়ে পাগলিনী।
স্বহস্তে করেন বধ সরলা কামিনী॥
আমার বিলাপে মার জ্ঞানের সঞ্চার।
একেবারে উথলিল দুঃখ পারাবার॥
শোকশূলে মাখা হলো বিষ বিড়ম্বনা।
তখনি মলেন মাতা কে শোনে সান্ত্বনা॥
কোথা পিতা কোথা পিতা ডাকি অনিবার।
হাস্য মূখে আলিঙ্গন কর একবার॥
জননি জননি বলে চারি দিকে চাই।
আনন্দমময়ীর মূর্ত্তি দেখিতে না পাই॥
মা বলে ডাকিলে মাতা অমনি আসিয়ে।
বাছা বলে কাছে লন মূখমূছাইয়ে॥
অপার জননীস্নেহ কে জানে মহিমা।
রণে বনে ভীতমনে বলি মা, মা, মা মা,॥
সুখাবহ সহোদর জীবনের ভাই।
পৃথিবাতে হেন বন্ধু আর ছুটি নাই॥
নয়ন মেলিয়া দাদা দেখ এক বার।
বাড়ী আসিয়াছে বিন্দুমাধব তোমার॥

আহা! আহা! মরি মরি বুক ফেটে যায়!
প্রাণের সরলা মম লুকালো। কোথায়॥
রূপবতী গুণবতী পতিপরায়ণা।
মরালগমনা কান্তা কুরঙ্গ নয়ন॥
সহাস্য বদনে সতী সুমধুর স্বরে|
বেতাল করিতে পাঠ মম করে ধরে॥
অমৃত পঠনে মন হতো বিমোহিত।
বিজন বিপিনে বন বিহঙ্গসঙ্গীত॥
সরলা সরোজ কান্তি কিবা মনোহর।
আলো করেছিল মম দেহ সরোবর॥
কে হরিল সরোরুহ হইয়া নির্দ্দয়।
শোভাহীন সরোবর অন্ধকারময়॥
হেরি সব শবময় শ্মশান সংসার।
পিতা মাতা ভ্রাতাা দারা মরেছে আমার॥

 |আহা! এরা সব দাদার মৃত দেহ অণ্বেষণ করিতে কোথায় গমন করিল—তাহারা আইলে জাহ্নবীযাত্রার আয়োজন করা যায়—আহা! পুরুষসিংহ নবীনমাধবের জীবন-নাটকের শেষ অঙ্ক কি ভয়ঙ্কর!

(সাবিত্রীর চরণ ধরিয়া উপবেশন)
সমাপ্তমিদং নীলদর্পণং নাম নাটকং।