পত্রাবলী (১৯১২-১৯৩২)/১৩০

সত্যেন্দ্রচন্দ্র মিত্রকে লিখিত

১৩০
কেলসল লজ
শিলং
২৫।৭।২৭
সেন্সর কর্ত্তৃক পরীক্ষিত
স্বাক্ষর অস্পষ্ট
ডি আই জি, আই বি, সি আই ডি, বেঙ্গল।

 ২৮।৭।২৭

প্রিয়বরেষু,

 সত্যেনবাবু, আপনার ৫ তারিখের পত্রটি আমার হস্তে আসিয়া পৌঁছিল ১৭ তারিখে এবং দেখিলাম দ্বিতীয় পৃষ্ঠার ও তৃতীয় পৃষ্ঠার অর্ধাংশ নিখোঁজ।

 কয়েকটি বিশেষ কারণ বশতঃ অনেক চিন্তার পর শিলংকেই আমরা স্থান হিসাবে নির্ব্বাচন করি। এই স্থানটি চেরাপুঞ্জির নিকট অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও বৎসরের এই সময়টিতেও দার্জিলিঙ অথবা কার্সিয়াঙের মত বর্ষণমুখর নয়। যাঁহারা এই সব অঞ্চল পরিভ্রমণ করিয়াছেন—এ বিষয়ে তাঁহারা সকলেই মতৈক্য জানাইয়াছিলেন, এখন আমিও সম্যক উপলব্ধি করিতেছি যে তাঁহাদের ধারণা অভ্রান্ত। তদুপরি এখানে সকালে বা সন্ধ্যায় বৃষ্টিপাত হইলেও পরবর্ত্তী সন্ধ্যা ও সকাল যথেষ্টই ঔজ্জ্বল্যে ভরপুর থাকে। প্রকৃতি থাকেন প্রসন্ন, কিন্তু দার্জিলিঙ বা কার্সিয়াঙে এমনটি ঘটে না। শিমলা এবং তাহার নিকটবর্ত্তী স্থানসমূহ অবশ্য ইহাদের তুলনায় বর্ষণমুখর নয় কিন্তু আমার বর্ত্তমান স্বাস্থ্যের পরিপ্রেক্ষিতে অতদূর ভ্রমণ আমার পক্ষে বিধেয় নয় বলিয়াই আমার চিকিৎসকবৃন্দ অভিমত দিলেন। শিলংই এ ক্ষেত্রে প্রকৃতই যথার্থ স্থান কিনা সে সম্বন্ধে সন্দেহ প্রকাশ করিব না। পূর্ব্বে আমার মনে যথেষ্ট সংশয় দানা বাঁধিয়া উঠিয়াছিল কিন্তু এখন স্বীকার করিতে বাধা নাই যে সংশয়গুলি অমূলক। দেখিতেছি স্থান নির্ব্বাচনে বিন্দুমাত্র ভুল হয় নাই। ইহার নেপথ্যে কর্ণেল কেলসলের নামের কিছু রহস্যময় প্রভাব বিদ্যমান এই মর্ম্মে আপনি যে ধারণা পোষণ করিয়াছেন তাহা সম্ভব বলিয়া আমারও মনে হয়।

 আমার চিকিৎসক অগ্রজ এবং ডাক্তার বিধান রায় উভয়েই এখানে ছিলেন। ডাঃ রায় সেদিন চলিয়া গেলেন। আমি স্থির করিয়াছি যতক্ষণ পর্য্যন্ত সম্পূর্ণরূপে আবোগ্যলাভ না করিতেছি ততক্ষণ কোন কাজে হস্তক্ষেপ করিব না। যদিও এখন ইহা স্থির করিয়াছি বটে তবে, ইহাও আপনি আশা করি উপলব্ধি করিবেন যে কর্ম্মহীন অবস্থায় দিনাতিপাতের জ্বালাও কিছুমাত্র কম নয়।

 চক্রবর্ত্তী, ঘোষ ও গঙ্গোপাধ্যায় মহাশয় ত্রয়ের অসুস্থতার সংবাদে উদ্বিগ্ন রহিলাম। তবে ইহাও বুঝি যে, এ বিষয়ে আমি একান্ত নিরুপায়।

 যখন আমি কলিকাতায় ছিলাম তখনই আমার রেশমী লুঙ্গি ম্যাণ্ডেলে হইতে ফেরৎ পাইয়াছিলাম। ইহা আমি আশাই করি নাই এবং সেইরূপ চিন্তা করিয়া তথায় আমার পরিচর্য্যাকারী বন্দী মং টিনকে দান করিয়া আসিয়াছিলাম। এ বিষয়ে আমি তথাকার তত্ত্বাবধায়ককে বলিয়াই আসিয়াছিলাম যে মং টিনের মেয়াদ সমাপ্ত হওয়ার পর ঐ লুঙ্গিটি যেন তাহাকে দেওয়া হয়। অথচ সেই লুঙ্গিটি আমাকেই ফেরৎ পাঠাইয়া দেওয়া হইল। লোকটি যখন মুক্তিলাভ করিয়া বিষয়টি জানিতে পারিবে তখন সে যে কি পরিমাণে আশাহত হইবে ইহা ভাবিয়া আমার মন যথেষ্ট ভারাক্রান্ত হইয়া উঠিতেছে। লুঙ্গিটি আমি ইচ্ছা করিয়াই মং টিনের জন্য রাখিয়া যাইতেছি···ম্যাণ্ডেলে পরিত্যাগের পূর্ব্বে এই কথাটি কি আপনাকে বলিতে বিস্মৃত হইয়াছিলাম? আমার প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য ঐ লুঙ্গি পুনরায় মং টিনের জন্যই ম্যাণ্ডেলে প্রেরণ করিতে প্রস্তুত আছি। যতদূর মনে পড়ে উহার সহিত একটি পুস্তকও পাইয়াছি কিন্তু পুস্তকটির নাম কিছুতেই মনে করিতে পারিতেছি না। আপনি যদি পুস্তকের নামটি পাঠাইতে পারেন তাহা হইলে এখানেই আমার সংগ্রহ দেখিয়া মিলাইয়া লইতে পারি যে উহা আমার নিকট এখানে আছে কি না।

 হ্যাঁ, ভাল কথা, মাইকেল মধুসূদন দত্তের গ্রস্থগুলি এবং দুই খণ্ডের “বিবিধ প্রবন্ধ” সহ ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের গ্রন্থগুলি কি ফেলিয়া আসিয়াছি? বইগুলি যদি ওখানেই থাকে তাহা হইলে আমার মনে হয় যে উহা সুরেনবাবুর কাছে থাকিতে পারে। অনুগ্রহপূর্ব্বক এ বিষয়ে তাঁহাকে একটু জিজ্ঞাসা করিয়া আমাকে জানাইতে অনুরোধ করি।

 সি আই ডি বিভাগের ডি আই জি অনুগ্রহপূর্ব্বক অনুমোদন করায় গত ২২শে তারিখে “ফরোয়ার্ড”-এর বর্ত্তমান বর্ষের দেশবন্ধু সংখ্যার একটি কপি আপনার নিকট পাঠাইয়াছিলাম। ডঃ টেগোরের কোন অনুগামী দ্বারা পরিচালিত “বিচিত্রা” নামক সম্প্রতি প্রকাশিত একখানি মাসিক পত্রিকা পাঠানোর সম্পর্কে ডি আই জি-র নিকট অনুসন্ধান করিয়াছিলাম। উহার প্রথম সংখ্যাটি আমার নিকটেই আছে, প্রয়োজনীয় অনুমতি পাইলেই উহা আপনার নিকট পাঠাইয়া দিব।

 বর্ত্তমানে আর অধিক কিছু লিখিবার নাই। আমার মধ্যম অগ্রজ (ব্যবস্থা পরিষদের সদস্য) এখানে সপ্তাহকালের জন্য আসিয়াছিলেন। তিনি সপরিবারে ফিরিয়া গিয়াছেন।

 অন্যান্যদের নিকট হইতে পত্র পাইলে যথেষ্ট পরিমাণে আনন্দ লাভ করিব এবং অঙ্গীকার করিতেছি যে তাঁহারা লিখিলে সেই পত্রের উত্তর অবশ্যই দিব। বর্ত্তমানে আমি পৃথকভাবে তাঁহাদের কাহাকেও লিখিতেছি না, তবে আমি আশা করি যে এ জন্য তাঁহারা কিছু মনে করিবেন না।

 সরকারী প্রস্তাব সম্পর্কে আপন অনুগামীদের নিকট লিখিত বিপিনবাবুর পত্রটি দেখিলাম সংবাদপত্রে গ্রকাশিত হইয়াছে।

 আমি ক্রমশঃই আরোগ্যলাভ করিতেছি এবং ইচ্ছা আছে আরও কিছু অধিককাল এই স্থানে অতিবাহিত করিব।

 সকলের উদ্দেশে আস্তরিক শুভ কামনা নিবেদন করি।

আপনার গুণমুগ্ধ 
সুভাষচন্দ্র বসু 
এস সি মিত্র মহাশয়, এম এল এ

পুনশ্চ:

 আমি কলিকাতায় থাকাকালীন আপনার উদ্দেশ্যে ইলাস্ট্রেটেড উইকলি, টাইমস অফ ইণ্ডিয়া এবং ইণ্ডিয়ান পিকটোরিয়াল ম্যাগাজিনের এক-একটি কপি পাঠাইয়াছিলাম। আপনি কি সেগুলি পাইয়াছিলেন? সেগুলি জেল তত্ত্বাবধায়ককে পাঠানো হইয়াছিল।

এস. সি. বি. 

(ইংরাজী হইতে অনূদিত)