বরেন্দ্র রন্ধন/একাদশ অধ্যায়

একাদশ অধ্যায়

জিরা পর্ব্ব

(৪) কালিয়া (নিরামিষ)

 ‘ঝাল’ রাঁধার প্রণালীতে ব্যঞ্জন রাঁধিয়া তাহাতে অতিরিক্ত গোটা গরম মশল্লা এবং রুচী অনুসারে হিঙ বা পেঁয়াজ ফোড়ন, কিছু অম্ল ও মিষ্ট রস সংযোগ এবং পশ্চাৎ নামাইয়া পুনঃ গরম মশল্লা বাটা, রশুন বাটা এবং আদা বাটা প্রভৃতি মিশাইলে ‘কালিয়া’ প্রস্তুত হইল।

 তৈলের পরিবর্ত্তে ঘৃতে কালিয়া রাঁধাই প্রশস্ত। কালিয়াতে বাটা ঝাল একটু অধিক পরিমাণে দেয়, এমন কি নিরামিষ কালিয়াতেও প্রায় ধনিয়া বাটা এবং হলুদ বাদ দেওয়া হয় না। বাটা ঝাল একটু অধিক পরিমাণে পড়ে বলিয়া কালিয়াতে অনেক স্থলে পিঠালী অথবা চেলেনী জল দেওয়ার প্রয়োজন বোধ হয় না। কালিয়াতে—বিশেষতঃ আমিষ কালিয়াতে সচরাচর তেঁতুল গোলা, আমচূণা বা দহি প্রভৃতি মিশাইয়া একটু অম্লস্বাদ এবং চিনি বা গুড় প্রভৃতি মিশাইরা একটু মধুর স্বাদ বিশিষ্ট করা হইয়া থাকে। কালিয়া রাঁধা পর নামাইয়া একটু গাওয়া ঘি, গরম মশল্লা বাটা, রশুন বাটা, আদা বাটা এবং স্থল বিশেষে নারিকেল-কুড়া-দুগ্ধ, বাদাম বাটা বা পোস্তদানা বাটা প্রভৃতি মিশান হইয়া থাকে। বরেন্দ্রে ‘ডালনার’ প্রচলন নাই, তৎপরিবর্ত্তে ‘ঝাল’ ও ‘কালিয়া’ প্রচলিত আছে।

২০৭। আলু-কোবির কালিয়া

 আলু ডুম ডুমা করিয়া কুট। ঘৃতে কষাও। ফুলকোবি অপেক্ষাকৃত ছোট ছোট করিয়া কুট। ঘৃতে কষাও। এই কষানটা অবশ্য তেলেও চলিতে পারে, তবে কালিয়া রন্ধনে ঘৃত ব্যবহারই প্রশস্ত। ঘৃতে জিরা, তেজপাতা, লঙ্কা ও দুটো গরম মশল্লা ফোড়ন দিয়া লঙ্কা বাটা, ধনিয়া বাটা ও হলুদ বাটা অল্প জলে গুলিয়া ছাড়। আংশাও। মশল্লা ভাজা ভাজা হইয়া সুগন্ধ বাহির হইলে জল দাও। ফুটিলে কষান আলু, ফুলকোবি ও কাঁচা কলাইশুটি ছাড়। নুণ দাও। সিদ্ধ হইলে একটু চিনি দাও। ঝাল-রস ঘন হইলে নামাইয়া জিরা-মরিচ বাটা, গরম মশলা বাটা এবং কিঞ্চিৎ ঘৃত মিশাও। কেহ কেহ ইহার সহিত অম্লরস, যথা দহি, তেঁতুল গোলা প্রভৃতিও মিশাইয়া থাকেন।

 আলুর সহিত পটোল, পক্ষীর ডিম্ব, শালগম, বাঁধাকোবি, ওলকোবি, স্কোয়াস, শুধু পটোল, প্রভৃতির একত্রে বা পৃথক পৃথক ভাবে কালিয়া রাঁধিতে পার। বাঁধাকোবি কুচি কুচি করিয়া কুটিয়া লইবে। বাটীতে অতিথি আসিলে লুচীর সহিত সচরাচর এই প্রকার একটি কালিয়া রাঁধিয়া ‘জল খাইতে’ দেওয়া যায়।

২০৮। ইঁচড়ের কালিয়া

 ইঁচড় ডুম ডুমা করিয়া কুট। একটু ভাপ দিয়া লও। ঘৃতে জিরা, তেজ পাত, লঙ্কা ও গরম মশল্লা ফোড়ন দিয়া ইঁচড় ছাড়। আংসাও। লঙ্কা বাটা নুণ ও হলুদ জলে গুলিয়া ঢালিয়া দাও। ফুটিলে কষান ছোট ডুমা কুটা আলু ও ভিজান বুট ছাড়। আলু ও বুটের পরিবর্ত্তে কষান ছোট ছোট চিঙড়ী মাছ দিলে আস্বাদন অতি উত্তম হয়। সিদ্ধ হইলে জিরা-মরিচ বাটা, তেজপাত বাটা ও একটু চিনি দাও। পরে পিঠালী দিয়া আঁটিয়া থক্‌থকে করিয়া নামাও। ঘি ও গরমমশল্লা বাটা মিশাও। ডুমুরের কালিয়া এই ভাবে রাঁধিবে।

২০৯। মোচার কালিয়া

 মোচা অপেক্ষাকৃত ছোট ছোট করিয়া কুট। ভাপ দিয়া জল গালিয়া ফেলিয়া লও। আলু ছোট ছোট করিয়া কুটিয়া কষাইয়া রাখ। বুট ভিজাইয়া রাখ। ইঁচড়ের ন্যায় কালিয়া রাঁধ। বুটের পরিবর্ত্তে মটর ডালের চাপড়ি ভাজি, নারিকেল কুড়া এবং ছোট চিঙড়ী মাছাদি মিশাইতে পার।

২১০। বেগুণের গলা কালিয়া

 উত্তম লাফা বেগুণ পোড়াইয়া বেশ করিয়া ছানিয়া লও। ঘৃতে বা তৈলে জিরা, তেজপাত, লঙ্কা গরম মশল্লা ও হিঙ বা পেঁয়াজ, ফোড়ন দিয়া বেগুণ ছাড়। আংসাও। জলে নুণ, হলুদ ও বাটা ঝাল গুলিয়া ঢালিয়া দাও। জল শুকাইলে অল্প পিঠালী দিয়া নাড়িয়া চাড়িয়া আঁটিয়া নামাও। একটু ঘৃত, (বা তৈল), আদা বাটা, রশুন বাটা এবং গরম মশল্লা বাটা মিশাইতে পার।

২১১। ছানার কালিয়া

 ছানা ছিপিয়া জল বাহির করিয়া ফেল। ডুম ডুমা করিয়া কাট। ঘৃতে বাদামি রংএ কষাইয়া রাখ। আলু ডুম ডুমা করিয়া অথবা দুই ফাঁক করিয়া কুটিয়া কষাইয়া রাখ। ঘৃতে জিরা, তেজপাত, লঙ্কা ও গরম মশলা ফোড়ন দিয়া লঙ্কা বাটা, ধনিয়া বাটা ছাড়। আংসাও। সুগন্ধ বাহির হইলে নুণ হলুদ সহ জল দাও। ফুটিলে কষান ছানা ও আলু ছাড়। সিদ্ধ হইলে জিরা-মরিচ বাটা, তেজপাত বাটা ও চিনি মিশাও। অতঃপর পিঠালী দিয়া ঝাল রস ঘন করিয়া নামাও। ঘি ও গরম মশল্লা বাটা, (আদা বাটা) মিশাও। ঝুনা নারিকেলের কালিয়া এই প্রকারে রাঁধিবে।

১১২। বুটের ডাইলের জল-বড়ার (ধোকার) কালিয়া

 ছোলা বা তাহার ডাইল ভিজাইয়া রাখিয়া পরে খোসা ছাড়াইয়া বাটিয়া লও। নুণ ও লঙ্কা বাটা মিশাইয়া হাতে টিপিয়া দলা পাকাও। ফুটন্ত জলে ফেলিয়া সিদ্ধ কর। দঢ়াইলে উঠাইয়া ছুরি দিয়া ডুম ডুমা করিয়া কাটিয়া লও। ঘৃতে লাল্‌চে করিয়া কষাও। আলু ডুমা ডুমা করিয়া কাটিয়া কষাইয়া রাখ। ছানার কালিয়ার মত কালিয়া রাঁধ। দক্ষিণ বঙ্গে ইহাকে ‘ধোকা ডাল্‌না’ কহে। ইচ্ছা করিলে পশ্চাৎ পোস্তদানা বাটা মিশাইতে পার।

 মটরের ডাইল বাটা এবং বিলাতী কুমড়ার বীচির শাঁস বাটার এই প্রকারে জল-বড়া প্রস্তুত করিয়া তাহা ছুরি দিয়া ডুমা ডুমা করিয়া কাটিয়া পশ্চাৎ ঘৃতে কষাইয়া লইয়া এই প্রকারে কালিয়া রাঁধিবে।

কালিয়া—(আমিষ)

১১৩। রুই মাছের কালিয়া

 বড় পাকা লালবর্ণের রুই মাছের দ্বারাই উত্তম কালিয়া প্রস্তুত হইয়া থাকে। মাছ অপেক্ষাকৃত বড় বড় ডুমা আকারে কুটিয়া লও। একটু খর ভাবে নুণ হলুদ মাখ। উত্তপ্ত তেলে বা ঘৃতে ফেলিয়া কষাইয়া তোল। এরূপ ভাবে কষাইবে যাহাতে উপরে বেশ লালচে বর্ণ হইবে অথচ ভিতরে বেশ গদগদে থাকিবে। ছোট ছোট করিয়া মাছ কুটিলে, কষাইলে ভিতরে গদগদে হইবে না। কাঁচা তেলে ছাড়িলে মাছ ভাঙ্গিয়া যাইবে ও ছোবা ছোবা হইবে। অল্প কষাইলে পাকা রুই মাছের স্বাদ সম্যকরূপে পরিস্ফুট হইবে না এবং অতিরিক্ত কষাইলেও মাছ শক্ত ঘুঁটা ঘুঁটা হইয়া যাইবে, ইহা স্মরণ রাখিবে। এক্ষণে ঘৃতে জিরা, তেজপাত, লঙ্কা ও গোটা গরম মশল্লা (এবং রুচী অনুসারে পেঁয়াজ কুচি) ফোড়ন দিয়া ধনিয়া বাটা, লঙ্কা বাটা, আদা বাটা ছাড় (আদা বাটা এক্ষণে না কষাইয়া পরে নামাইয়া গরম মশল্লা বাটার সহিত একত্রে মিশাইলেই ভাল হয়)। আংসাও। মশলা বেশ ভাজা ভাজা হইয়া সুগন্ধ বাহির হইলে জল দাও। নুণ, হলুদ দাও। ফুটিলে কষান মাছ ছাড়। কিছু পরে ইচ্ছা করিলে কষান আলু, ফুলকোবি বা অন্য কোনও প্রকার দেশজ বা হালি আনাজ এবং কাঁচা মটর শুটী (এবং কাঁচা বা কষান কিসমিস) ছাড়িবে। সিদ্ধ হইলে জিরামরিচ বাটা, তেজপাত বাটা, (একটু অম্লরস ও একটু মিষ্টরস) মিশাও। তৎপর প্রয়োজন বোধ করলে পিঠালী দিয়া ঝাল-রস আবশ্যক মত ঘন করিয়া নামাও। ঘি, আদা বাটা, (রশুন বাটা) ও গরম মশল্লা বাটা মিশাও।

 ইচ্ছা করিলে কালিয়াতে হিঙ অথবা পেঁয়াজ, রশুন ফোড়ন দিতে পার। ফোড়নে পেঁয়াজ কুচা দিয়া রশুন বাটিয়া পরে আদা বাটা ও গরম মশলা বাটার সহিত একত্রে মিশাইলে আমার বিবেচনায় স্বাদ অধিক উত্তম হয়।

 কালিয়া অম্ল-স্বাদ বিশষ্ট করিতে হইলে দধি বা তেঁতুল গোলা প্রভৃতি মিশাইবে। মালাই-কালিয়া রাঁধিতে ইচ্ছা করিলে নামাইবার পূর্ব্বে নারিকেল-কুড়া বা দুগ্ধ, বাদাম বা পোস্তদানা বাটা কিম্বা মোয়াক্ষীর মিশাইবে। তৎক্ষেত্রে আর অম্ল-রস সংযোগ করিবে না, এবং জিরা-মরিচ বাটাও অল্প পরিমাণে ব্যবহার করিবে, নচেৎ জিরা-মরিচ বাটার তীব্র গন্ধ নারিকেলের পেলব ঘ্রাণকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিবে।

 ঝাল-রস শুকাইয়া ফেলিয়া শুক্‌না শুক্‌না করিয়া কালিয়া রাঁধিয়া নামাইলে তাহা শুষ্ক-কালিয়া বা এক প্রকার ‘ঝাল-চড়চড়ীই’ হইবে।

 কাৎলা, কালবাউস, মৃগেল, মহাশোল, ভেটকী, তুলাদণ্ডী এবং ইলিশ, চিতল, আইড়, গাগর, রিঠ, বাচা, বোয়াল, সিলঙ (ঢাঁই), মাগুর, কানচ (শিঙ্গী), কৈ, চাঁদা, সুর, সরলী এবং চিংড়ী, কাঁকড়া, শোল, বাইম প্রভৃতি মাছের এই প্রকারে কালিয়া বা শুষ্ক-কালিয়া (ঝাল-চড়চড়ী) রাঁধিবে। তবে মাছ অনুসারে কোনও মাছ অধিক কি কোনও মাছ অল্প কষাইয়া রাঁধিতে হইবে। যেমন-রুই, কাৎলা, কালবাউস, মৃগেল, মহাশোল, শোল প্রভৃতি একটু বেশী কষাইবে এবং ভেটকী, তুলাদণ্ডী, ইলিশ, চিতল, আইড়, গাগর, বাচা, রিঠা, বোয়াল, সিলঙ, মাগুর, কানচ, কৈ, চাঁদা, সুর, সরলী এবং চিঙড়ী প্রভৃতি অল্প মাত্র কষাইবে বা ঝোলে কাঁচাই ছাড়িবে। চিঙড়ী এবং তৈলাক্ত কোমল মাছ অধিক কষাইলে শক্ত হইয়া বিস্বাদ হইয়া যাইবে।

১১৪। রুই মাছের টিকলী-কালিয়া

 পাকা রুই মাছ কষাইয়া বা সিদ্ধ করিয়া কাঁটা বাছিয়া ফেলিয়া নুণ ও লঙ্কা বাটা সহ ছানিয়া লও। একটু চাউলের গুঁড়া মিশাইয়া মাছে বাঁধন দাও। টিকলীর আকারে গড়িয়া ঘৃতে বা তৈলে ভাজিয়া উঠাও। পুনঃ ঘৃতে জিরা, তেজপাত, লঙ্কা, গোটা গরম মশল্লা এবং রুচী হইলে হিং বা পেঁয়াজ ফোড়ন দিয়া লঙ্কা বাটা, ধয়িনা বটা, আদা বাটা, রশুন বাটা ও হলুদ বাটা ছাড়। কষাও। মশলা ভাজা ভাজা হইয়া সুগন্ধ বাহির হইলে, নুণ দিয়া অল্প জল দেও। ফুটিলে কষান আলু ও কাঁচা মটরশুটি (এবং কাঁচা বা কষান কিসমিস) ছাড়। সিদ্ধ হইলে ভাজা টিকলী ছাড়। জিরা-মরিচ বাটা, তেজপাত বাটা ও একটু চিনি মিশাও। পরে পিঠালী দিয়া ঝোল ঘন করিয়া নামাও। ঘৃত (রশুন বাটা, আদা বাটা) ও গরম মশলা বাটা মিশাও।

 একটু দধি বা তেঁতুল গোলা প্রভৃতি মিশাইয়া কালিয়া অম্ল স্বাদ বিশিষ্ট করিতে পার, অথবা নামাইবার পূর্ব্বে নারিকেল দুগ্ধ বা কুড়া, বাদাম বা পোস্ত বাটা অথবা মোয়াক্ষীর মিশাইয়া মালাইকালিয়া রাঁধিতে পার।

 কাৎলা, কালবাউস, মৃগেল, মহাশোল মাছের এই প্রকারে টিকলী কালিয়া রাঁধিবে।

১১৫। চিতল-গাদার জল-বড়ার কালিয়া

 চিতল মাছের পৃষ্ঠদেশ হইতে লম্বা ছাঁদে গাদার (উপরার্দ্ধের) ফালি মাছ কুটিয়া লও। অতঃপর একখানা ধারাল ছুরি বা লৌহ ঝিনুকের সাহায্যে চাঁছিয়া চাঁছিয়া ছাল ও কাঁটা হইতে মাছ কুড়িয়া বাহির করিয়া লও। কুড়া মাছের মধ্যে কাঁটা কুটি থাকিলে তাহা বাছিয়া ফেল। অতঃপর এই কুড়া মাছ নুণ ও লঙ্কা বাটা সহ চটকাইয়া মাখিয়া হাতে করিয়া অপেক্ষাকৃত বড় বড় তাল পাকাইয়া ফুটন্ত জলে ফেলিয়া সিদ্ধ কর। সাবধান, অধিক সিদ্ধ করিলে মাছের মধ্যেকার albumen অধিক দঢ়াইয়া যাইয়া মাছ শক্ত হইয়া যাইবে। সুতরাং সিদ্ধ করিয়া মাছ আঁট বাঁধিলেই নামাইয়া ফেলিবে। অতঃপর ছুরি দিয়া মাছের এই জল-বড়া ডুমা ডুমা করিয়া কাটিয়া ঘৃতে অল্প লালচে করিয়া কষাইয়া রাখ। সাবধান অধিক কষাইও না তাহা হইলে উপরোক্ত কারণে জল-বড়া গুলি এককালে চিমড়া পানা হইয়া যাইবে।

 এক্ষণে ঘৃতে জিরা, তেজপাত, লঙ্কা, গোটা গরম মশল্লা এবং রুচী অনুসারে হিঙ বা পেঁয়াজ কুচা ফোড়ন দিয়া ধনিয়া বাটা, লঙ্কা বাটা, আদা বাটা এবং রুচী হইলে রশুন বাটা অল্প জলে গুলিয়া ঢালিয়া দাও। আংসাও। মশলা ভাজা ভাজা হইয়া বেশ সুগন্ধ বাহির হইলে অল্প জল দাও। নুণ হলুদ দাও। ফুটিলে কষান আলু ও কলাই-শুটী ছাড়। সিদ্ধ হইয়া ঝাল-রস শুকাইয়া আসিলে মাছের কষান জল-বড় বা ধোকাগুলি ছাড়। জলবড়া আর সিদ্ধ করার প্রয়োজন নাই। জিরা-মরিচ বাটা, তেজপাত বাটা মিশাও। কালিয়া অম্ল স্বাদ বিশিষ্ট করিতে ইচ্ছা হইলে এই সময়ে দহি, তেঁতুল গোলাদি এবং একটু চিনি মিশাইবে। এবং প্রয়োজন বোধ করিলে পিঠালী মিশাইবে। নামাইয়া গরম মশল্লা বাটা, (রশুন বাটা, আদা বাটা) এবং একটু গাওয়া ঘি মিশাও।

 মালাই-কালিয়া রাঁধিতে ইচ্ছা করিলে নামাইবার পূর্ব্বে নারিকেল দুগ্ধ বা কুড়া, বাদাম বা পোস্ত বাটা অথবা মোয়াক্ষীর মিশাইবে। তৎক্ষেত্রে অবশ্য অম্লরস দিবে না। কষাইবার সময় আদাবাটা, রশুন বাটা না দিয়া কালিয়া নামাইবার পর মিশাইতে পার। ইহার ‘ঝাল’ও উত্তম হয়।

১১৬। পক্ষীর কলার (জল-বড়)—(বৈদেশিক)

 পক্ষীর পিঠ লম্বালম্বি ভাবে চিরিয়া ফেল। বুক ডানা এবং পায়ের মাংস চিরিয়া ভিতর হইতে হাড় বাহির করিয়া ফেল। ‘চপার’ দ্বারা পেটের ভিতর দিকের মাংস থুর। খবরদার য়েন বুকের উপরের চামড়াটি কাটিয়া বা ছিঁড়িয়া না যায়। নুণ, গোলমরিচের গুড়া, পেঁয়াজ বাটা, আদা বাটা, ওয়ারসেষ্টারসায়ার সস্ ও সালাদ ওয়েল (এবং তৎসহ গুটি দুই ডিমের শাঁস) একত্রে মিশ্রিত করিয়া মাংসের উপর মাখিয়া পুনরায় আস্তে আস্তে থুরিয়া উহা মাংসের গায়ে বসাইয়া দাও। এক্ষণে নিচে হইতে চাম্‌ড়া সহ সমস্ত পাখীটা সাবধানে জড়াইয়া ফেল। এক খণ্ড পাৎলা ন্যাক্‌ড়া দ্বারা এই মাংসপিণ্ডটি উত্তমরূপে জড়াইয়া বাঁধ। ন্যাক্‌ড়ার উভয় মুড়াও বাঁধিয়া দাও, যেন মাংস খসিয়া না আসে। সমস্তটা ফুটন্ত জলে ফেলিয়া সিদ্ধ কর। দঢ়াইলে জল হইতে উঠাইয়া ন্যাক্‌ড়া খুলিয়া ফেলিয়া ঢাকিয়া রাখ।

 এক্ষণে ফ্রাইপ্যানে ঘি তাতাইয়া তাহাতে ঐ মাংস-পিণ্ডটি ছাড়িয়া সোণার বর্ণ করিয়া ভাজিয়া উঠাও। ঐ ঘৃতে কিছু পেঁয়াজ কুচি ভাজ। লালচে হইলে নামাইয়া কিছু ময়দা মিশাও। পুনরায় আগুণে ধরিয়া নাড়িয়া চাড়িয়া মাংসের সুরুয়া বা অভাব পক্ষে ঐ মাংস সিদ্ধ করা জল দাও। ফুটিলে নুণ, মরিচের গুঁড়া, টোমেটো বা ওয়ারসেষ্টারশায়ার সস ও কেরামেল রঙ্গ মিশাও। ঝোল গাঢ় হইলে নামাইয়া ছাকনায় ছাকিয়া লও। এক্ষণে ঐ মাংস-পিণ্ড এক আঙ্গুল পুরু চাকা চাকা করিয়া কাটিয়া এই ঝোল বা সসের সহিত মাখিয়া লইয়া খাও।

১১৭। গ্যালেণ্টাইন (জল-বড়া)—(বৈদেশিক)

 পক্ষী রোষ্টের উপযোগী করিয়া বানাইয়া লইয়া বুকের চাম্‌ড়াটা ধীরে ধীরে, উজার দিক হইতে উঠাইয়া ঘাড়ের দিকে বাধাইয়া রাখ। তৎপর পিঠ চিরিয়া বুক, ডানা ও পায়ের হাড় বাহির করিয়া ফেল। মাংস উত্তমরূপে কিমা কর। নুণ, মরিচ গুঁড়া, আদা কুচি, পেঁয়াজ কুচি, পার্শলি কুচি এবং ইচ্ছা করিলে, তৎসহ ট্রাফল্‌স্, মাসরুম, মেষ-জিহ্বা ও সছেজেস্‌ কুচি এবং শক্ত সিদ্ধ ডিমের কুচি (এবং বাঁধন দিবার নিমিত্ত তিন চারিটা কাঁচা ডিমের শাঁস) মিশাইয়া লইয়া ঐ কিমা মাংসের সহিত বেশ করিয়া থুরিয়া মিলাও। অতঃপর এই মিশ্রিত কিমা মাংস পক্ষীর ঐ চাম্‌ড়ার মধ্যে ভরিয়া দিয়া শেলাই করিয়া দাও। সমস্তটা ন্যাক্‌ড়া দ্বারা জড়াইয়া বাঁধ। ফুটন্ত জলে ফেলিয়া সিদ্ধ কর। জমাট বাঁধিলে মাংসপিণ্ড নামাইয়া ন্যাক্‌ড়া খুলিয়া লইয়া এক আঙ্গুল পুরু চাকা চাকা করিয়া কাট। হোয়াইট্‌, ব্রাউন, ব্রেড বা এগ্‌ প্রভৃতি সসের সহিত মাখিয়া খাও। (এই সমস্ত সসের সহিত দুগ্ধের ক্রিম মিশাইয়া লইলে আরও সুস্বাদু হইবে।)

১১৮। পাঁঠার কালিয়া

উচ্ছে বীচি, পটোল কচি। শাকের ছা, মাছের মা।
কচি পাঁঠা, বৃদ্ধ মেষ। দধির অগ্র, ঘোলের শেষ।”

 অতএব কচি পাঁঠার দ্বারাই উত্তম কালিয়া পাক হইয়া থাকে। মাংস অপেক্ষাকৃত ছোট ছোট ডুমা করিয়া কুটিয়া লও। নুণ, হলুদবাটা, সরিষার তৈল, লঙ্কা বাটা, ধনিয়া বাটা, আদা বাটা, (রশুন বাটা,—আদা ও রগুন পরে দিতে পার), (দধি) দিয়া উত্তমরূপে ছানিয়া ছানিয়া মাখ। ঘণ্টা দুয়েক মত ঢাকিয়া রাখ। এক্ষণে ঘৃতে জিরা, তেজপাত, লঙ্কা ও গোটা গরম মশল্লা এবং রুচী অনুসারে হিঙ্ বা পেঁয়াজ কুচি ফোড়ন দিয়া মাংস ছাড়। আংসাও। ঢাকিয়া দেও। মাংসের নিজের জল মরিয়া গেলে এবং ভাজা মশল্লার বেশ সুগন্ধ বাহির হইলে গরম জল দেও। মাংস সিদ্ধ হইলে কষান আলু ছাড়। আবশ্যক হইলে আর একটু নুণ দাও। ঝোল আন্দাজ মত শুকাইলে জিরা-গোলমরিচ বাটা, তেজপাত বাটা, একটু চিনি (এবং পূর্ব্বে দধি না দিলে রুচী হইলে কিছু অম্লরস) মিশাও। প্রয়োজন বোধ করিলে কিঞ্চিৎ পিঠালী দিয়া ঝোল ঘন করিয়া নামাও। একটু ঘি, গরম মশল্লা বাটা (ও আদা বাটা, রশুন বাটা) মিশাও।

 কেহ কেহ পূর্ব্বেই জিরা, লঙ্কা প্রভৃতি ফোড়ন না দিয়া ঘৃতে প্রথমেই লঙ্কা বাটা, ধনিয়া বাটা ও আদা বাটা মাখান মাংস ছাড়িয়া কষাইয়া তৎপর নুণ হলুদ, দিয়া জল দেন। জল ফুটিলে কষান আলু ছাড়িয়া হাঁড়ির মুখ ঢাকিয়া দেন। মাংস সিদ্ধ হইলে নামাইয়া জিরা-গোলমরিচ বাটা, তেজপাত বাটা, চিনি ও পিঠালী মিশাইয়া থাকেন। পরে হাঁড়িতে ঘৃতে তেজপাত, লঙ্কা, জিরা ও রুচী অনুসারে হিঙ্ বা পেঁয়াজ কুচি ফোড়ন দিয়া ঐ রাঁধা মাংস সম্বারা দেন। অবশেষে নামাইয়া গরম মশলা বাটা ও রুচী হইলে রশুন বাটা মিশান।

 পাঁঠার খাশির, মেষের, সজারুর এবং খরগোসাদির মাংস এইরূপে রাঁধা যাইতে পারে। হরিণ মাংসও এইরূপে রাঁধিবে, কিন্তু তাহা অমনি ঝুলাইয়া রাখিয়া বাসী করিয়া অথবা কুটিয়া মশল্লাদি দ্বারা মাখিয়া চব্বিশ ঘণ্টা মত ঢাকিয়া রাখিয়া তবে রাঁধিতে হয়। ধান্যের ‘পোয়ালের’ সহিত একযোগে সিদ্ধ করিলে হরিণ মাংসের ভিতরের ‘মাটি’ দুর হইয়া বেশ কোমল হয়।

 পাঠক পাঠিকা লক্ষ্য করিবেন, মাংস রাঁধিবার কালে উহা যেমন লঙ্কা বাটা, ধনিয়া বাটা প্রভৃতি দ্বারা মাখিয়া লইয়া আংসাইতে পারা যায়, মৎস্য রাঁধিবার কালে তদ্রূপ করিতে পারা যায় না,মৎস্য কেবল মাত্র নুণ হলুদ যায় মাখিয়া কষাইতে হয়। ইহার কারণ, মাছে বাটনা মাখিয়া আংসাইতে গেলে মাছ ভাঙ্গিয়া যায়, কিন্তু মাংস সেরূপে ভাঙ্গিয়া যাইবার কোন সম্ভাবনা নাই; পরন্তু মাংস পুর্ব্বে মাখিয়া ঢাকিয়া রাখিলে ঝাল-নুণ-তৈলাদি মাংসের ভিতরে প্রবেশ করিয়া তাহার স্বাদ বৃদ্ধি হয়। মাংসে বাটা ঝাল মাখিবার সময় তৎসহ আবশ্যক মত তৈল, (রশুন বাটা) এবং অম্ল যথা—দধি প্রভৃতি মিশাইয়া ঘণ্টা কয়েক ঢাকিয়া রাখিয়া রাঁধিলে উহার আস্বাদন আচারের ন্যায় মধুর হয়। বস্তুতঃ এই স্বভাবের অনুসরণেই মোগলাই ‘কোর্ম্মা’ পাক হইয়া থাকে।

১১৯। কেঠোর কালিয়া

 বরেন্দ্র-ভূমে ‘কেঠো’ খাওয়া খুব চলন। কেঠো বলিলে যে সে কচ্ছপকে বুঝাইবে না, নদীতে সাধারণতঃ সর্ব্বভুক থল্‌থলে-পার্শ্ব-চেড়ো (খোল) বিশিষ্ট অপেক্ষাকৃত বড় বড়, চ্যাপ্টা গোছের যে কচ্ছপ পাওয়া যায়, ইহা সে জাতীয় নহে, এই নদীর কচ্ছপ অতিশয় দুর্গন্ধ বিশিষ্ট ও অখাদ্য। এই জাতীয় অন্য এক প্রকারের অপেক্ষাকৃত ছোট কচ্ছপ আছে যাহাকে সাধারণতঃ ‘উগ্‌লা কেঠো’ বা ‘সিম কেঠো’ বলে, ইহা তাহাও নহে। সিম কেঠো খায় বটে, কিন্তু তাহার স্বাদও আঁষটে। আমি যে জাতীয় কেঠোর কথা বলিতেছি তাহা সাধারণতঃ কার্ত্তিক অগ্রহায়ণ মাসে বিলে, খালে পাওয়া যায়। ইহার চেড়োর সমস্তটাই খুব শক্ত এবং ‘কুরুম পিঠে’ (কূর্ম্ম পৃষ্ঠ) বলিলে যেরূপ আকার বুঝায় সেইরূপ আকার বিশিষ্ট। এই কেঠো কেবলমাত্র জলজ উদ্ভিদ্ খাইয়া জীবন ধারণ করে। ইহারা নদীর কচ্ছপের ন্যায় সর্ব্বভুক্ অথবা তাদৃশ হিংস্র স্বভাব সম্পন্ন নহে। ইহা আকারে তাদৃশ বৃহৎও হয় না,—মুঠম হাতের অধিক লম্বা কেঠো প্রায়ই দেখা যায় না। ইহার বুকের খোলাও কঠিন ও হরিদ্রা বর্ণ এবং তদুপরি কাল কাল দাগ বিশিষ্ট। আর এক প্রকার কেঠো আছে তাহা অতি ক্ষুদ্র, এমন কি অর্দ্ধ হস্ত পরিমিতও নহে; ইহাকে ‘কড়ি বা কড়ুই কেঠো’ বলে। ইহা পুকুরে, বিলে বা প্রায় নদীর স্থির জলে পাওয়া যায়। ইহারাও উদ্ভিদাহারী, ইহাও খাওয়া যায়। এই শেষোক্ত উভয় কেঠো আঁষটে গন্ধ বিশিষ্ট নহে।

 কেঠো কুটা কিছু শক্ত। ইহারা মস্তক বাহির করিলে ধাঁ করিয়া তাহা কাটিয়া ফেলিবে, কেন না সামান্য ভয় পাইলেই ইহারা মস্তক লুকাইয়া ফেলে। অতঃপর কেঠো চিৎ করিয়া ফেলিয়া বুকের খোলার ধার দিয়া একখানি সূঁচাল ডগা বিশিষ্ট হাত-দা’র দ্বারা ঠুকিয়া ঠুকিয়া বুকের খোলাটি কাটিয়া উঠাইয়া ফেলিতে হয়। পরে ধারাল ছুরি দ্বারা ভিতর হইতে মাংস কাটিয়া বাহির করিয়া লইয়া কুটিতে হয়। অনেক কেঠোর পেটে বহু ডিম্ব এবং থলথলে গোছ তেল পাওয়া যায়। কেঠোর ডিম্ব খাইতে পক্ষীর ডিম্ব অপেক্ষা নীরস হইলেও নিতান্ত মন্দ নহে,—সিদ্ধ ডিম্ব একটু বেলে বেলে স্বাদ বিশিষ্ট হয়। কেঠোর তৈলও খাওয়া যায়, কিন্তু ইহার মেটেই খাইতে সর্বাপেক্ষা স্বাদু ও চমৎকার মোলায়েম। কেঠোর কালিয়া পাঁঠার কালিয়ার ন্যায়ই রাঁধিবে। কেঠোতে পেঁয়াজ রশুনের পরিবর্তে হিঙ্ ব্যবহার করিতেই সাধারণত দেখা যায় এবং দধি প্রভৃতিও প্রায় ইহাতে দেওয়া দেখা যায় না। ডিম্বগুলি না কষাইয়া আলাহিদা কাঁচা রাখিয়া দিবে এবং মাংস পাক প্রায় শেষ হইয়া আসিলে তখন তাহাতে ছাড়িবে। ডিম অধিক সিদ্ধ করিলে শক্ত হইয়া অখাদ্য হইয়া যায়।

১২০। পক্ষীর কালিয়া

 ঘুঘু, হরিয়া, পায়রা, বগেড়ী প্রভৃতি ছোট জাতীয় মেঠো পক্ষী; বটের, তিত্তীর, কুক্কুট বন্ধ, কুলাঙ, হুবরা, চিরাত, লিখ, গগনভেড় প্রভৃতি বড় জাতীয় মেঠো পক্ষী; কাম, কচুয়া, ডাহুক, বাটাম প্রভৃতি কালী-খোঁচা জাতীয় বিলের পক্ষী; এবং রাজহাঁস, বালিহাঁস, বতক, চৈতী, নারিয়াল, সরাইল প্রভৃতি নানাবিধ বড় ও ছোট হাঁসজাতীয় জলচর পক্ষী অনেকেই শিকার করিয়া আহার করিয়া থাকেন। ইহাদের কালিয়া পাঁঠার কালিয়ার ন্যায় রাঁধা যায়; তবে পক্ষী মাংসে (হিঙের পরিবর্তে) পেঁয়াজ, রশুন সংযোগ করিলে তবে আস্বাদন উত্তম হয়, এবং বাটনা প্রভৃতি পাঁঠার মাংসের অপেক্ষা কিঞ্চিৎ কম দেওয়া হইয়া থাকে। দধি (অম্নরস) রুচি অনুসারে ব্যবহার করিবে।

 মাছের কালিয়াতে আলু, বেগুন, মূলা, লাউ, কুমড়া, শশা, স্কোয়াস, ফুলকোবি- বাঁধাকোবি, ওলকোবি, সালগম, গাজর, কলাইশুটী, বীন প্রভৃতি যে সমস্ত দেশজ এবং হালি আনাজ ব্যবহারের বিষয় লিখিত হইয়াছে মাংসের কালিয়াতেও ঐ সমস্ত আনাজ বেশ মজে। তবে মাংস ভেদে আনাজও অবশ্য ভেদ করিতে হইবে।—আলু এবং ফুলকোবি প্রায় সব মাংসেই দেওয়া যায়। কলাইশুটী মেষ ও পক্ষী মাংসেই ভাল মজে। লাউ খাসীতে এবং ডাহুক পাখীতে ভাল মজে,—“এক ডাহুক সাত লাউ মজায়।” ফুলকোবি, বাঁধাকোবি ও সালগম প্রভৃতি পাঁঠাতে এবং মেষে বেশ মজে।

কারী—বৈদেশিক)।

 বৈদেশিক ‘কারী’ কালিয়ারই সংক্ষিপ্ত সংস্করণ। কারীতে কেবল কালিয়ার ন্যায় জিরা, লঙ্কা ফোড়ন দেওয়া হয় না—শুধু তেজপাত, গোটা গরম মশলা এবং পেঁয়াজকুচা ফোড়ন দেওয়া হইয়া থাকে। কারীর বাটনায় জিরা-মরিচ বাটা অপেক্ষা হলুদ, লঙ্কা ও ধনিয়া বাটারই প্রাধান্য দেওয়া হয় এবং পশ্চাৎ সরিষা বাটাও কোন কোন ক্ষেত্রে মিশান হইয়া থাকে। নচেৎ কারীর সহিত কালিয়ার আর কোনই বিশেষ পার্থক্য নাই। কালিয়া এবং তৎপর্য্যায়ভুক্ত কারীতে ঝাল নুণ একটু খরভাবে (অধিক পরিমাণে) দিবে। “ঝাল-ঝাল, নুণ-নুণ, পেঁয়াজ পেঁয়াজ, রশুন-রশুন” গোছ হইলে তবে মাংসের কালিয়া ও কারী মুখরোচক হইবে। কারীতে জিরা ফোড়ন দেয় না সুতরাং জিরাবাটা পশ্চাৎ না মিশাইয়া ধনিয়া বাটার সহিত একত্রে পূর্ব্বেই কষাইতে পার। ঝালরস শুকাইয়া ফেলিয়া কারী নামাইলে ‘শুষ্ক কারী’ হইবে।

 কালিয়ার ন্যায় কারীতেও লাউ, কুমড়া, শশা, স্কোয়াস, আলু, কলাইশুটী, ফুলকোবি, বাঁধাকোবি, ওলকোবি, সালগম, গাজর, মূলা, বীন, টোমেটো, প্রভৃতি আনাজ দেওয়া যায়। তবে ‘মাদ্রাজ’ বা ঝালকারী এবং মালাইকারী ব্যতীত অপর কোন কারীতে আনাজ দেওয়ার বড় একটা প্রয়োজন হয় না।

 অনেক প্রকার কারী প্রচলিত আছে, তন্মধ্যে নিম্নে সচরাচর ব্যবহৃত গোটা কয়েক কারীর রন্ধন প্রণালী লিখিত হইল।

১২১। মেষের ‘মাদ্রাজ’ বা ঝাল-কারী

 পাঁঠার অপেক্ষা মেষের কারীই সমধিক উত্তম হয়। পাকা চর্ব্বিওয়ালা মেষই (বৃদ্ধ মেষ) খাইতে ভাল। মাংস অপেক্ষাকৃত কিছু বড় বড় খণ্ডে কুটিয়া লও। নুণ, হলুদ বাটা, লঙ্কাবাটা, ধনিয়া বাটা, আদা বাটা ও রশুন বাটা দিয়া উত্তম রূপে মাখ। রুচি অনুসারে একটু সরিষার তৈল ও একটু অম্লরস যথা, দধি প্রভৃতি ইহার সহিত মিশাইয়া লইতে পার। খানিকক্ষণ ঢাকিয়া রাখ। এক্ষণে ঘৃতে তেজপাত, গোটা গরমমশল্লা,(গুজরতীর ভাগ কিঞ্চিৎ পরিমাণে বেশী) ফোড়ন দিয়া কুচান পেঁয়াজ ছাড়। পেঁয়াজের বর্ণ লালচে হইলে মাংস ছাড়। আংসাও। ঢাকিয়া দেও। মাংসের নিজের জল সম্পূর্ণ মরিয়া গেলে এবং মশল্লা ভাজা-ভাজা হইয়া সুগন্ধ বাহির হইলে গরম জল ঢালিয়া দেও। সিদ্ধ হইলে কষান আলু এবং সুবিধা হইলে তৎসহ কষান ফুলকোবি, সালগম এবং কাঁচা কলাই-শুটি প্রভৃতি দুই তিন রকম আনাজ ছাড়। সুসিদ্ধ হইলে জিরা-গোলমরিচ বাটা, তেজপাত বাটা ও একটু চিনি মিশাও। আবশ্যক বোধ করিলে সামান্য একটু পিঠালী দিয়া ঝাল-রস ঘন করিয়া নামাও। একটু গাওয়া ঘি,(আদা বাটা, রশুনবাটা) ও গরম মশল্লা বাটা মিশাও।

 ফুলকোবি প্রভৃতি উত্তমরূপে কষান না থাকিলে তাহা হইতে প্রচুর পরিমাণে জল-বাহির হইয়া কারীর স্বাদ পান্‌সে করিয়া ফেলিবে। এই নিমিত্ত অনেকে কারীতে কোন রূপ তরকারী না দিয়াই পাক করা পছন্দ করেন। দধির পরিবর্তে অনেকে কারী পাক করিয়া নামাইয়া একটু ওয়ারসেষ্টারশায়ার, টোমেটো বা তৎবৎ কোন প্রকার সস্‌ অথবা আমের ভিনিগার-চাট্‌নী মিশাইয়া থাকেন। জিরা-মরিচ বাটা পুর্ব্বেও কষিতে পার এবং নামাইবার অব্যবহিত পূর্ব্বে ইচ্ছা করিলে অল্প সরিষা বাটা মিশাইতে পার। কিস্‌মিস্ কাঁচা বা ঘৃতে কষাইয়া কারীতে মিশাইতে পার।

 পাঁঠার, খরগোসাদির মাংসের, ডিম্বের এবং মোটা মাছের কারী এই ভাবে রাঁধিবে; এবং যে সকল পক্ষীর মাংস অপেক্ষাকৃত শক্ত এবং রক্তবর্ণের তাহার কারীও এই ভাবে রাঁধিবে; যে সব পক্ষীর মাংস অপেক্ষাকৃত কোমল এবং শ্বেতবর্ণের তাহাতে জিরা-গোলমরিচ বাটার ভাগ কিছু কম দেওয়া হইয়া থাকে এবং তাহাতে দুটো মেথি ফোড়ন দিয়া পশ্চাৎ সরিষা বাটা মিশান যাইতে পারে। পক্ষীর কারীতে কলাইশুটি এবং চিঙড়ী, কাঁকড়া, শোল মাছ, পাঁঠার খাসী ও ডাহুক পক্ষীর কারীতে লাউ বেশ মজে।

১২২। মেষের মিন্স্‌ড্‌ কারী

 ক। পূর্ব্বে সিদ্ধ বা রোষ্ট করা মেষ মাংস লইয়া ছোট ছোট ডুমা করিয়া কুট। ঘৃতে লঙ্কা বাটা, ধনিয়া বাটা, জিরা-মরিচবাটা, আদাবাটা, পেঁয়াজবাটা, রশুনবাটা, হলুদবাটা ছাড়িয়া কষাও। ভাজা মশল্লার বেশ সুগন্ধ বাহির হইলে ও একটু চিনি দিয়া জল দাও। (অধিক জল দিতে হইবে না)। জলের পরিবর্ত্তে মাংসের সুরুয়া দিলেই ভাল হয়। ফুটিয়া জল বা সুরুয়া শুকাইয়া থকথকে হইয়া আসিলে মাংস ছাড়। নাড়িয়া চাড়িয়া নামাও। একটু ঘৃত ও গরম মশল্লা বাটা মিশাও। উপরে ঘৃতে-ভাজা পেঁয়াজ কুচা ছড়াইয়া দিয়া খাইতে দাও।

 খ। পূর্ব্বে সিদ্ধ বা রোষ্ট করা মেষ মাংস লইয়া ছোট ডুমা ডুমা করিয়া কুট। ঘৃতে তেজপাত ও পেঁয়াজ কুচা ফোড়ন দিয়া মাংসের সুরুয়া ছাড়। ফুটিলে নুণ, হলুদ ও একটু চিনি মিশাও। ঝোল থকথকে হইলে মাংস ছাড়িয়া নাড়িয়া চড়িয়া নামাও। অপর হাঁড়িতে লঙ্কা, জিরা-মরিচ, ধনিয়া, আদা, রশুন গরম মশল্লা, বাদাম ঘৃতে ভাজিয়া লইয়া পিষিয়া লও। অতঃপর তা ঐ মাংসে মিশাইয়া লও।

১২৩। ড্রাই (শুকনা) কারী

 পক্ষীর মাংসেরই ড্রাই কারী উত্তম হয়। ঘৃতে তেজপাত ও গোটা গরম মশল্লা ফোড়ন দিয়া লঙ্কা বাটা, ধনিয়া বাটা, জিরা-মরিচ বাটা, হলুদ বাটা, আদা বাটা, পেঁয়াজ বাটা ও রশুন বাটা ছাড়িয়া কষাও। মশল্লা ভাজা হইয়া বেশ সুঘ্রাণ বাহির হইলে মাংস ছাড়। আংসাও। মাংসের জল, মরিয়া গেলে গরম জল মিশাও। একটু চিনি ও নুণ দাও। সুসিদ্ধ হইয়া জল শুকাইলে নামাও। উপরে লালচে ভাজা পেঁয়াজ কুচা ছড়াইয়া দাও।

 ধনিয়া বাটা, জিরা-মরিচ বাটা ঘৃতে না কষিয়া এক সাথে কাট-খোলায় ভজিয়া ‘ফাকী’ করতঃ কারী নামান পর তাহাতে মিশাইয়া লইতে পার।

১২৪। ‘কান্‌ট্রী-কাপ্‌তান’ কারী

 পক্ষী মাংস কুটিয়া লও। ঘৃতে কুচান পেঁয়াজ ভাজিয়া উঠাইয়া রাখ। পরে পুনরায় ঘৃতে তেজপাত ফোড়ন দিয়া পেঁয়াজ বাটা, রশুন বাটা, লঙ্কা বাটা ও হলুদ বাটা ছাড়িয়া কষাও। মশল্লা ভাজা হইয়া বেশ সুঘ্রাণ বাহির হইলে মাংস ছাড়। আংসাও। মাংসের নিজ জল শুকাইলে গরম জল দাও। ফুটিলে নুণ দাও। মাংস সিদ্ধ হইয়া জল শুকাইলে নামাও। এক্ষণে ভাজা পেঁয়াজ মাংসের উপর ছড়াইয়া দাও। লেবুর রস চিপিয়া দাও।

 এই কারী ভুনিখিচুড়ীর সহিত খাইতে ভাল।

 কান্‌ট্রী-কাপ্‌তান কারীর সহিত আদা বাটা, ধনিয়া বাটা ও সামান্য জিরা বাটা কষিলে এবং শেষ পর্যন্ত অম্লবস যথা-আমের চুণা, জলপাই বা আমড়াদি ফল মিশাইয়া মাংসের সহিত সিদ্ধ করিয়া নামাইলে তাহা ‘দো-পিঁয়াজা’ কারী হইবে।

১২৫। ‘আলু-মখল্লা’ কারী—(ইহুদীয়)

 ঘৃতে তেজপাত ও গোটা গরম মশল্লা ফোড়ন দিয়া অল্প অল্প পরিমাণে লঙ্কা বাটা, ধনিয়া বাটা, পেঁয়াজ বাটা, রশুন বাটা, আদা বাটা ও হলুদ বাটা ছাড়িয়া কষাও। ভাজা মশল্লার সুগন্ধ বাহির হইলে মাংস ছাড়। আংসাও। মাংসের নিজ জল মরিলে খানিকটা ভিনিগার (সির্কা) ও চিনি মিশাও। নাড়িয়া চাড়িয়া গরম জল দাও। মাংস সিদ্ধ হইলে ঘৃতে কড়াগোছ কষান গোটা কয়েক আস্ত আলু এবং আস্ত পেঁয়াজ ছাড়। আগুনের আঁচ কমাইয়া মাংস দমে বসাইয়া রাখ। ঝোল থক্‌থকে গোছ হইলে নামাও।

১২৬। ‘হোসেঙ্গা’ কারী (বা কাবাব)

 কোমল পক্ষীর মাংস ছোট ডুমা ডুমা করিয়া কুটিয়া লও। আদা ছুলিয়া চাকা চাকা করিয়া কুটিয়া লও। পেঁয়াজও ছুলিয়া চাকা চাকা করিয়া কুটিয়া লও। পাঁচ ইঞ্চি পরিমিত কতকগুলি বাঁশের সরু কাটি বা খিল চাঁছিয়া লও। এক্ষণে একখণ্ড মাংস, এক চাকা আদা ও এক চাকা পেঁয়াজ পর পর ক্রমান্বয়ে এক একটী কাটিতে ফুঁড়িয়া গাঁথিয়া যাও। এক কাটি ভর্তি হইলে অপর কাটিতে ঐরূপ ভাবে গাঁথ। ঘৃতে গোটা গরম মশল্লা ও পেঁয়াজ ফোড়ন দিয়া তাহাতে হলুদ বাটা, লঙ্কা বাটা, ধনিয়া বাটা, আদা বাটা ও রশুন বাটা ছাড়। আংসাও। ভাজা মশল্লার সুগন্ধ বাহির হইলে জল দেও। ফুটিলে মাংসপূর্ণ কাটি গুলি ছাড়। সিদ্ধ হইলে নুণ, জিরা-মরিচ বাটা, তেজপাত বাটা ও একটু চিনি মিশাও। ঝোল ঘন গা-মাখা গা-মাখা করিয়া নামাও। একটু ঘি ও গরম মশল্লা বাটা মিশাও।

১২৭। ‘সিলোন’ বা মালাই-কারী

 ক। মালাই-কারীতে নারিকেলের দুগ্ধই প্রধান উপকরণ, সুতরাং সর্ব্ব প্রথমেই উহা সংগ্রহ করিবে। উত্তম ঝুনা নারিকেল লইয়া উপরের ছোবা উঠাইয়া ফেলিয়া মালা দ্বিখণ্ডিত কর। নারিকেল-কোড়নার সাহায্যে নারিকেলের শাঁস কুড়িয়া উঠাও। একটা পাত্রে এই নারিকেল-কুড়া রাখিয়া উপরে ফুটন্ত গরম জল ঢাল পনর কুড়ি মিনিট ভিজাইযা রাখিয়া একখানি পরিষ্কার নেকড়ার সায্যে চিপিয়া ‘দুগ্ধ’টুকু ছাঁকিয়া লও। ইহা আলাহিদা রাখ। ঐ নারিকেল কুড়াতে পুনরায় গরম জল ঢাল। আধ ঘণ্টা খানেক ভিজাইয়া রাখ। একখানা নেকড়ার সাহায্যে উত্তমরূপে চিপিয়া পুনরায় অবশিষ্ট ‘দুগ্ধ’টুকু বাহির করিয়া লও। আলাহিদা রাখ। তেজপাত, গোটা গরম মশলা ও পেঁয়াজ কুচা ফোড়ন দিয়া হরিদ্রা বাটা, লঙ্কা বাটা, ধনিয়া বাটা, অল্প জিরা-মরিচ বাটা, আদা বাটা (ও রশুন বাটা) ছাড়িয়া কষাও। সুঘ্রাণ বাহির হইলে মাংস ছাড়। আংসাও। মাংসের নিজ জল শুকাইলে দ্বিতীয় বারের নারিকেল-দুগ্ধ মিশাও। ফুটিলে কষান আনাজ, নুণ ও চিনি মিশাও। মালাইকারীতে জিরা-মরিচ বাটা অল্প পরিমাণে দিতে হয়। নচেৎ নারিকেল-দুগ্ধের ‘লজ্জৎ'টুকু নষ্ট হইয়া যায়। মাংস সিদ্ধ হইয়া জল শুকাইলে প্রথমবারের নারিকেল-দুগ্ধ ঢালিয়া দেও। আবশ্যক মনে করলে একটু পিঠলী দিয়া ঝোল ঘন করিয়া নামাও। একটু ঘৃত ও গরম মশল্লা বাটা মিশাও।

 খ। নারিকেল কুড়াতে গরম জল ঢালিয়া দিয়া উপরোক্ত বিধানে ‘দুগ্ধ’ বাহির করিয়া রাখ। অবশিষ্ট কুড়াটুকু লইয়া পাটায় মিহি করিয়া বাটিয়া লও। এক্ষণে ঘৃতে তেজপাত, গোটা গরম মশল্লা এবং পেঁয়াজ কুচা ফোড়ন দিয়া লঙ্কা বাটা, ধনিয়া বাটা, জিরা-মরিচ বাটা (অল্প), আদা বাটা, (রশুন বাটা) ও নারিকেল-কুড়া বাটা ছাড়। আংসাও। মাংস ছাড়। আংসাও। মাংসের নিজ জল মরিয়া ভাজা মশল্লার সুঘ্রাণ বাহির হইলে গরম জল দাও। ফুটিলে কষান আনাজ ছাড়। সিদ্ধ হইলে নারিকেল-দুগ্ধ দাও। নুণ হলুদ ও চিনি দাও। ঝোল গাঢ় হইলে নামাও।

 নারিকেলের দুধের পরিবর্ত্তে মিষ্ট বাদাম বাটা, পোস্তদানা বাটা অথবা মোয়া ক্ষীর মিশাইয়া মালাইকারী রাঁধিতে পার।

১২৮। বাগ্দা চিঙড়ীর মালাই-কারী

 অপরাপর চিঙড়ী অপেক্ষা বাগ্দা চিঙড়ীর মালাই-কারীই উৎকৃষ্ট হয়। চিঙড়ী মাছ খুব টাটকা হওয়া প্রয়োজন, কিছুমাত্র পচা হইলেও তাহা খাইলে খুব অসুখ করিতে পারে, ইহা স্মরণ রাখিবে। টাট্‌কা চিংড়ী মাছ লইয়া উহার বুকের ও পিঠের দাঁড়ার কাল রগটী উঠাইয়া ফেলিয়া বেশ পরিষ্কার করিয়া ধুইয়া লও। আলু, কলাইশুটী, লাউ, শশা, ফুলকোবি, সালগম, ওলকোবি, স্কোয়াস চিংড়ী মাছের মালাইকারীর সহিত চমৎকার মজিয়া উপরের লিখিত বিধানে কষান আনাজ সহ চিংড়ী মাছের মালাইকারী রাঁধিবে। চিংড়ী মাছ অধিক কষাইলে শক্ত হইয়া যায় স্মরণ রাখিবে। ইচ্ছা করিলে আনাজ বাদ দিয়াও মালাইকারী রাঁধিতে পার।

 কাঁকড়ার মালাইকারী এইভাবে রাঁধিবে। কই, মহাশোল, শোল, আইড়, শিঙ, বাচা, বাইম, মাগুর, কানচ, ইলিশ, ভেট্‌কী, সুর, সরলী, তুলাদণ্ডী প্রভৃতি মাছেরও এই প্রকারে উত্তম মালাইকারী রাঁধা যায়।

১২৯। চিঙড়ী মাছের শুষ্ক-কারী

 পক্ষী-কারী রাঁধার বিধানে চিঙড়ী প্রভৃতি মাছেরও উত্তম শুষ্ক-কারী রান্না হইয়া থাকে। কিন্তু চিংড়ী মাছ অধিক কষাইলে শক্ত হইয়া যায় বলিয়া ঘৃতে পুর্ব্বে গোটা গরম মশল্লা ও পেঁয়াজ কুচি ফোড়ন দিয়া তাহাতে হলুদ বাটা, লঙ্কা বাটা, ধনিয়া বাটা, আদা বাটা, রশুন বাটা, ছাড়িয়া কষাইয়া লও। ভাজা মশল্লার সুগন্ধ বাহির হইলে জল দাও। ফুটিলে কাঁচা, চিঙড়ী মাছ, কলাইশুটি এবং কষান ফুলকোবি, সালগম, ওলকোবি, আলু, স্কোয়াস, লাউ, শশা প্রভৃতি মধ্যে এক বা একাধিক আনাজ ছাড়। নুণ ও একটু চিনি দাও। সিদ্ধ হইলে জিরা-মরিচ বাটা, তেজপাত বাটা ও প্রয়োজন হইলে একটু পিঠালী দিয়া শুক্‌না শুক্‌না করিয়া নামাও। একটু ঘি ও গরম মশল্লা বাটা মিশাও। আলু, ফুলকোবি, কলাইশুটি প্রভৃতির যোগে চিঙড়ী মাছের বা কাঁকড়ার এই প্রকার শুষ্ক-কারী অতি উপাদেয় হয়।

 রুই, আইড়, মাগুর প্রভৃতি মৎস্যেরও উত্তম শুষ্ককারী রাঁধা হইয়া থাকে। মাছ পুর্ব্বে নুণ হলুদ মাখিয়া ঘৃতে কষাইয়া রাখ। পরে ঘৃতে গোটা গরম মশলা ও পেঁয়াজ কুচা ফোড়ন দিয়া হলুদ বাটা, লঙ্কা বাটা, ধনিয়া বাটা, আদা বাটা ও রশুন বাটা ছাড়িয়া কষাও। জল দাও। ফুটিলে কষান মাছ ও তৎপর কষান আলু, কষান ফুলকোবি প্রভৃতি এবং কাঁচা কলাইশুঁটি ছাড়। সিদ্ধ হইলে নুণ, জিরা-মরিচ বাটা, তেজপাত বাটা মিশাইয়া পরে পিঠালী দিয়া ঝোল ঘন করিয়া অথবা এককালে শুকাইয়া নামাও। ঘি ও গরম মশল্লা বাটা মিশাও।

১৩০। কোপ্তা (Ball) কারী

 ‘ভাজি’ অধ্যায়ে (৭০পৃষ্ঠায়) লিখিত বিধানে মৎস্য মাংসাদির ‘কোপ্তা’ ভাজিয়া রাখ। ঘৃতে তেজপাতা, গরম মশল্লা ও পেঁয়াজ কুচা ফোড়ন দিয়া লঙ্কা বাটা, ধনিয়া বাটা, জিরা-মরিচ বাটা, হলুদ বাটা, আদা বাটা ও রশুন বাটা ছাড়। কষ। মশল্লা ভাজা হইয়া সুঘ্রাণ বাহির হইলে জল বা সম্ভবপর হইলে সুরুয়া দাও। ফুটিলে কোপ্তা ছাড়। নুণ, একটু মিষ্ট এবং রুচী হইতে অম্লরস মিশাও। উপরে ভাজা পেঁয়াজ কুচা ছড়াইয়া দাও। মালাই কারী রাঁধিতে হইলে জিরা-মরিচ বাটা কম দিয়া এবং অম্লরস বাদ দিয়া শেষে নারিকেল-দুগ্ধ পোস্ত বাটা প্রভৃতি মিশাইবে।

 ভাজা কোপ্তার পরিবর্ত্তে শক্তসিদ্ধ ডিম দ্বিখণ্ডিত করিয়া ঝোলে ছাড়িলে ডিমের কারী হইবে।

১৩১। ঝাল ফ্রেজী

 মাংস অপেক্ষাকৃত ছোট ছোট ডুমাকারে কুটিয়া লও। আদা ও রশুন পাৎলা স্লাইস করিয়া কুটিয়া মিশাও। নুণ, গোটা তেজপাত ও একটু তেল মিশাও। হাঁড়ি করিয়া জ্বালে চড়াও। গরম জল দাও। মাংস সিদ্ধ হইয়া জল মরিয়া গেলে একটু ঘি মিশাও। পেঁয়াজ ও কাঁচা বা শুক্না লঙ্কা স্লাইস করিয়া কুটিয়া ছাড়। বেশ করিয়া নাড়িয়া চাড়িয়া কষ। তলায় ধরিয়া যাইবার উপক্রম হইলে একটু একটু জলের ছিটা দাও। বেশ বাদামী রঙ্গ হইয়া সুঘ্রাণ বাহির হইলে নামাও।

১৩২। কোর্ম্মা

 অধিক ঘৃতে জল সংস্পর্শ না করিয়া কেবল অম্ল রস (দধির) দ্বারা মৃদু আঁচে পক্ব অপেক্ষাকৃত বৃহৎ মাংসখণ্ডকে কোর্ম্মা বলে।

 কোমল পক্ষীর এবং পাঁঠা, মেষাদির শিরদাড়ার মাংসেই উত্তম কোর্ম্মা হয়। বড় চিঙড়ী এবং রুই প্রভৃতি মোটা মাছেরও কোর্ম্মা রাঁধা যায়। ধীরে মৃদু আঁচে ঢাকিয়া অম্লরসে পাক করা হয় বলিয়া জল সংস্পর্শ না এলেও মাংস সুসিদ্ধ হয়। এক সের মাসে আধ সের পরিমিত অম্ল দধি লাগিবে। দধি স্বয়ং অম্ল না হইলে একটু তেঁতুল গোলা মিশাইয়া লইবে।

 মাংস অপেক্ষাকৃত বড় বড় খণ্ডে কুটিয়া লও। ধুইয়া পরিষ্কার কর। ন্যাকড়ার দ্বারা মুছিয়া শুষ্ক কর। নুণ, হলুদ, লঙ্কা বাটা, ধনিয়া বাটা, জিরা-মরিচ বাটা, আদা বাটা, রশুন বাটা এবং অম্ল দধির দ্বারা মাখ। বাটা মশল্লাগুলি জলের পরিবর্ত্তে দধির দ্বারা বাটিয়া লইতে পারিলেই ভাল হয়। অতঃপর কিছু তৈল মিশাইয়া একটি চীনামাটির বা পাথরের পাত্রে পাঁচ ছয় ঘণ্টাকাল ঢাকিয়া রাখিয়া দাও। অতঃপর ঘৃতে তেজপাত, গোটা গরম মশল্লা (ও পেঁয়াজ কুচা) ফোড়ন দিয়া ঐ মাখা মাংস ছাড়। (ধৃত কিছু অধিক পরিমাণে দিবে।) আংসাও। ঢাকিয়া দাও। যখন মাংসের নিজ জল মরিয়া মশল্লা ভাজা হইয়া সুঘ্রাণ বাহির হইবে তখন পুনরায় দধি, একটু চিনি ও জাফরান দিয়া নাড়িয়া চাড়িয়া আগুনের আঁচ কমাইয়া মৃদু আঁচে ধীরে ধীরে আংসাইয়া পাক করিবে। হাঁড়ীর মুখ বরাবর বন্ধ করিয়া রাখিবে। মাংস কোমল হইয়া কেবল, যখন ঘৃতের উপর থাকিবে তখন নামাও। ইচ্ছা করিলে শেষে কিছু বাদাম বা পোস্তদানা বাটা মিশাইতে পার।

 ঘৃতে কষান বা কাঁচা বাদাম, পেস্তা, কিসমিস এবং খুর্ম্মা ফেলিয়া কোর্ম্মা রাঁধিতে পার।

১৩৩। ভিণ্ডালু

 ভিণ্ডালু প্রকৃত পক্ষে কোর্ম্মারই রূপান্তর মাত্র। কোর্ম্মা মোগলাই আর ভিণ্ডালু পর্টুগীজ। কোর্ম্মাতে দধি অম্লরস রূপে ব্যবহৃত হয়, ভিণ্ডালুতে ভিনিগার (সির্কা) তৎস্থান অধিকার করে। কোর্ম্মা পাকের মাংস মশল্লায় মাখিয়া অধিকক্ষণ রাখিয়া দেওয়া চলে না, কিন্তু ভিনিগার থাকা প্রযুক্ত ভিণ্ডালু পাকের মাংস মশল্লায় মাখিয়া এমন কি বার ঘণ্টা ঢাকিয়া রাখাও হইয়া থাকে। পক্ব ভিণ্ডালু দুই তিন দিবস পর্য্যন্তও রাখিয়া খাওয়া চলে। জল বর্জ্জিত করিয়া পাক করা হয় বলিয়া এইরূপ অধিক দিন রাখিয়া খাওয়া চলে—নষ্ট হয় না। তবে অবশ্য গ্রীষ্ম-প্রধান দেশে গ্রীষ্ম ও বর্ষা কালে এরূপ ভাবে অধিক দিন রাখা নিরাপদ নহে।

 মাংস বড় বড় খণ্ডে কুটিয়া ধুইয়া পরিষ্কার করিয়া শুষ্ক নেকড়ার দ্বারা মুছিয়া উত্তম রূপে শুষ্ক করিয়া লও। সমস্ত মশলা ভিনিগারে (সির্কায়) বাটিয়া লইতে পারিলেই ভাল হয়। অর্থাৎ যতটা সম্ভব জল সংস্পর্শ করিবে না। এই প্রকারে বাটা লঙ্কা, ধনিয়া, জিরা-মরিচ, আদা, পেঁয়াজ, রশুন (একটু বেশী পরিমাণে), হলুদ ও নুণ দিয়া মাংস মাখ। অতঃপর একসের মাংসে এক পোয়া হিসাবে ভিনিগার (সির্কা) ও ঐ পরিমাণে তেল মিশাও। সমস্ত উত্তম রূপে চটকাইয়া মাখ। একটি চীনামাটি বা পাথরের আসনে এই মাখা মাংস বার ঘণ্টা ঢাকিয়া রাখিয়া দাও। গ্রীষ্ম বা বর্ষাকালে এতটা সময় ঢাকিয়া রাখা হয়ত সম্ভবপর হইবে না—ছয় ঘণ্টা মত রাখিয়াই পাক করিতে হইবে। অতঃপর একটি উত্তম কলাই করা হাঁড়িতে মাংস জ্বালে উঠাও। আংসাও। ঢাকিয়া দাও। মাংস হইতে বহির্গত সমস্ত জল শুকাইয়া ভাজা মশল্লার সুঘ্রাণ বাহির হইলে আগুনের আঁচ কমাইয়া মৃদু আঁচে ধীরে ধীরে পাক কর। মাংস কেবল তেলের উপর থাকিলে নামাও। মেষাদির মাংসে শেষের দিকে মধ্যে মধ্যে একটু জলের ছিটা দিলে তবে সুসিদ্ধ হইবে। অবশ্য সে জলটুকু সমস্ত এককালে শুকাইয়া ফেলিয়া নামাইতে হইবে।

 কেহ কেহ আদা, পেঁয়াজ, রশুন ও লঙ্কা (পৃথক ভাবে) অধিক আধ কচড়া করিয়া বাটিয়া মাংসে মাখেন। এবং ধনিয়া ও জিরা কাঁচা বাটিয়া না দিয়া খেলায় ভাজিয়া ফাকী করিয়া মিশাইয়া থাকেন।

১৩৪। বাফাদু—(ইহুদীয়)

 মাংস অপেক্ষাকৃত বড় বড় খণ্ডে কুটিয়া লও। ঘৃতে তেজপাত, গোটা গরম মশল্লা ফোড়ন দিয়া পেঁয়াজ কুচা ছাড়। পেঁয়াজ লাল্‌চে হইলো লঙ্কা বাটা, ধনিয়া বাটা, জিরা-মরিচ বাটা, হলুদ বাটা, আদা বাটা কিঞ্চিৎ রশুন বাটা ছাড়। কষ। মাংস ছাড়। আংসাও। মাংসের নিজ জল মরিয়া গেলে দহি সির্কা (ভিনিগার), নুণ, চিনি এবং গোটাকয়েক রশুনের কোয়া ছাড়। পুনঃ কষ। ভাজা মশলার বেশ সুঘ্রাণ বাহির হইলে গরম জল দাও। ফুটিলে ঘৃতে কষান আস্ত পেঁয়াজ ও আলু ছাড়। অতঃপর আঁচ মৃদু করিয়া দিয়া ধীরে ধীরে জ্বাল দাও। মাংস সিদ্ধ হইয়া ঝাল রস গা-মাখা গা-মাখা গোছ হইলে নামাও।

১৩৫। মালগোবা—(ইহুদীয়)

 মাংসের হাড় বাছিয়া ফেলিয়া নুণ ও পেঁয়াজ সহ জলে সিদ্ধ বা ঘৃতে চম্‌কাইয়া লইয়া উত্তমরূপে কিমা কর। ঘৃতে পেঁয়াজ কুচা ছাড়িয়া কষ। লাল্‌চে হইবার পূর্ব্বেই কিমা মাংস ছাড়। নুণ ও মরিচ গুঁড়া মিশাও। জল মরিয়া গেলে নামাইয়া তৎসহ দুধের ক্রিম, দুধে ভিজান পাঁউরুটীর শাস এবং কাঁচা ডিমের শাস মিশাও। (এক সের মাংসে তিনটা হিসারে ডিম মিশাইবে।) অতঃপর এই কিমা মাংস দ্বারা ইচ্ছানুরূপ আকারে কোপ্তা গড়। কোপ্তাগুলি ময়দার উপর গড়াইয়া লইয়া ঘৃতে ভাজ। লালচে হইবার পূর্ব্বেই নামাও। এক্ষণে ঘৃতে তেজপাত ও গোটা গরম মশল্লা ফোড়ন দিয়া লঙ্কা বাটা, ধনিয়া বাটা, জিরা-মরিচ বাটা, আদা বাটা ও জাফরান ছাড়িয়া কষ। মশল্লা ভাজা হইয়া সুঘ্রাণ বাহির হইলে দহি দাও। একটু সুরুয়া বা জল দাও। ফুটিলে নুণ ও চিনি দাও। তৎপর কোপ্তা ছাড় ঝোল থক্‌থকে গোছ হইলে নামাও।