জীবনপঞ্জি
১৮৯৫...: ১৬ নভেম্বর (পুরোনো পঞ্জিকা অনুযায়ী ৪ নভেম্বর) মস্কোর দক্ষিণে অবস্থিত ওরেল নামক প্রাদেশিক শহরে মিখায়েল মিখায়েলোভিচ বাখতিনের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম ছিল মিখায়েল ফেড্রোভিচ। বাখতিনেরা ছিলেন নীল রক্তের মানুষ। তবে তাঁদের পারিবারিক আবহ ছিল সাংস্কৃতিক রুচিসম্পন্ন ও উদারনৈতিক। মিখায়েলের দাদা নিকোলাই তাঁর চেয়ে এক বছরের বড়ো ছিলেন। এছাড়া তাঁর তিনজন ছোট বোনও ছিল: একাটেরিনা, মারিয়া ও নাতালিয়া। শৈশবে জার্মান গৃহশিক্ষিকার সাহচর্য তাকে ইউরোপীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে আগ্রহী করে তোলে। মাতৃভাষার সঙ্গে জার্মান ভাষায় তিনি ব্যুৎপত্তি অর্জন। জার্মান অনুবাদে গ্রিক মহাকাব্য ইলিয়াড ও ওডিসি পড়েন। আর, নাটক সম্পর্কে অনুরাগও তৈরি হয় মূলত ঐ গৃহশিক্ষকের উৎসাহে।
১৯০৪...: মিখায়েলের দাদু যে বাণিজ্যিক ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তাঁর বাবা তারই বিভিন্ন শাখায় ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতেন। এবছর তিনি লিথুয়ানিয়ার রাজধানী ভিল্‌নিয়াসে বদলি হন। আরও ছ-বছর বাখতিনের পরিবার সেখানেই ছিলেন। বহু ধরনের সংস্কৃতি পারস্পরিক ভিন্নতা নিয়ে সহাবস্থান করত ঐ শহরে। বিচিত্র কিংবদন্তি ও রহস্য, ভাষা ও ইতিহাস, ধর্মীয় ও বৌদ্ধিক চর্যার সংশ্লেষণে ভিলনিয়াস কিশোর মিখায়েলের পক্ষে হয়ে উঠেছিল বহুস্বরিকতা ও অনেকার্থদ্যোতনার প্রত্যক্ষ প্রেরণা। ফার্স্ট ভিলিনিয়াস জিম্‌নাসিয়াম নামক স্কুলে তিনি যেমন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেন, তেমনই সেখানকার জীবনই তাঁকে ভাষিক ও বৌদ্ধিক বহুবাচনিকতার পাঠ দিয়েছে।
১৯০৭..: নানা ধরনের রাজনৈতিক, নান্দনিক ও ধর্মীয় আন্দোলন তখন স্থিতাবস্থায় আঘাত হানতে শুরু করেছে, দেখা দিচ্ছে নতুন নতুন প্রবণতা। বুর্জোয়া সমাজ ও নৈতিকতা, রাষ্ট্রব্যবস্থা, প্রচলিত ধর্মপ্রকরণ সম্পর্কে প্রতিপ্রশ্ন জেগে উঠেছে। দাদা নিকোলাইয়ের প্রভাবে মিখায়েল সমসাময়িক তরুণদের আলোচনাচক্রের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। তাতে মার্ক্স-এঙ্গেল্‌স-এর বৈপ্লবিক তত্ত্ব চর্চা করা হত। কিছুকাল পরে অবশ্য আলোচনার বিষয় পাল্‌টে গেছে। নীৎশে, বোদলেয়ার, হাগনের, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি এবং প্রতীকবাদী হয়ে উঠছে কবিতা অভিনিবেশের বিষয়।
১৯১০...: মিখায়েলের বাবা ওডেসায় বদলি হচ্ছেন। নিকোলাই তার পড়াশোনার প্রয়োজনে আরো দু’বছর ভিল্‌নিয়াসে রয়ে গেছেন। মিখায়েল ওডেসার স্কুলে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছেন, এখানকার পরিবেশে একদিকে ছিল সমৃদ্ধ। সাংস্কৃতিক জীবন, অন্যদিকে, সমাজ-বহির্ভূত অপরাধপ্রবণ মানুষের জমায়েত। পরবর্তী জীবনে যিনি কার্নিভাল ও অনেকার্থদ্যোতনার দর্শন প্রচার করবেন, ওডেসার যথাপ্রাপ্ত পরিস্থিতিতে তার বীজ নিহিত ছিল। একজন জার্মান শিক্ষকের কল্যাণে তিনি মার্টিন বুবেরকীর্কেগার্দের রচনার প্রতি আকৃষ্ট হন। এত অল্প বয়সেও তার বিপুল পাঠ-অভিজ্ঞতা সবাইকে বিস্মিত করছে। এবছর টলষ্টয়ের মৃত্যু।
১৯১১...: মারাত্মক অস্থি-পীড়ার সূচনা যা তাকে সারা জীবন ধরে কষ্ট দেবে।
১৯১৩...: ওডেসার স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছেন মিখায়েল। এবছর নিকোলাই পিটাসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্রুপদীবিদ্যা বিভাগে উচ্চতর পাঠ শুরু করেছেন।
১৯১৪...: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরু। মিখায়েল চলে আসছেন পিটার্সবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে। এসময় শহরের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পালটে পেট্রোগ্রাদ করা হয়েছে। ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্ব শাখার ধ্রুপদীবিদ্যা বিভাগে মিখায়েল ভর্তি হচ্ছেন। তখন পিটার্সবুর্গের বৌদ্ধিক জীবনে নতুন নতুন আবর্ত তৈরি হচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম পূর্বসূরিদের চিন্তাপ্রণালীকে প্রত্যাহ্বান জানাচ্ছেন। ভবিষ্যবাদী সাহিত্য-আন্দোলন ও শিল্পভাবনা প্রতীকবাদের বিরোধিতা করছে। মায়াকোভস্কির কবিতার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন মিখায়েল। এসময় পেট্রোগ্রাদে টেনিয়ানোভ, আইখেনবাউম, স্কলোভস্কি প্রমুখ বিখ্যাত প্রকরণবাদী ভাবুকেরা উপস্থিত। কাব্যভাষা অধ্যয়নের জন্যে বিখ্যাত Opoyaz গোষ্ঠী উদ্ভূত হচ্ছে।
১৯১৬...: মিখায়েল পিটার্সবুর্গ রিলিজিয়াস-ফিলোসফিক্যাল সোসাইটিতে সদস্য হিসেবে গৃহীত হচ্ছেন। রুশ ঐতিহ্যের সঙ্গে বৃহত্তর ইউরোপীয় প্রেক্ষিত সম্পর্কে গভীর প্রীতি তৈরি হচ্ছে তাঁর। এসময় বিশ্ববিদ্যালয়ে ধ্রুপদী ভাষাতত্ত্বের অধ্যাপক ফাজেই এফ জেলিনস্কির প্রভাব তার ওপর দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। বহু বাখতিনীয় চিন্তাবীজের উৎস জেলিনস্কির ভাবনায় খুজে পাওয়া সম্ভব। এবছর ভিয়াচোশ্লাভ ইভানোভের প্রবন্ধসংকলন Furrows and Boundaries প্রকাশিত হচ্ছে, যার কাছে মিখায়েল ঋণ স্বীকার করেছেন।
১৯১৭...: রাশিয়ায় লেনিনের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটছে।
১৯১৮...: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হচ্ছে। মিখায়েল বাখতিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ সাঙ্গ করছেন। এবছরের গোড়ায় নিকোলাই পেট্রোগ্রাদ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন; তাঁর প্রতিবিপ্লবী পর্যায় শুরু হচ্ছে। মিখায়েল তাঁর দাদার দীর্ঘায়ত ছায়া থেকে বেরিয়ে আসছেন। নিজস্ব ভাববৃত্ত রচনার সূচনা হচ্ছে। বছরের শেষে তিনি পেট্রোগ্রাদের তিন শ’ মাইল দক্ষিণে, নেভেল নামে ছোট্ট মনোরম শহরে, চলে যাচ্ছেন। ইতিহাসই দুই ভাইয়ের মধ্যে বিচ্ছেদ এনে দিয়েছে। এবছর অভূতপূর্ব শীত সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটকে ভয়াবহ করে তুলেছে।
১৯১৯...: ‘শিল্প ও প্রত্যুত্তরযোগ্যতানামক প্রথম প্রবন্ধ প্রকাশিত হচ্ছে দি ডে অফ আর্ট পত্রিকায়। সোভিয়েট রাশিয়ায় গৃহযুদ্ধ ক্রমশ ঘোরালো হয়ে উঠছে। বিদেশি শক্তির আক্রমণে সামাজিক ভারসাম্য বিচলিত হচ্ছে। এই অস্থির পরিবেশে ম্যাক্সিম গোর্কির চেষ্টায় লেখক-গবেষক-বুদ্ধিজীবীদের জন্যে বিশেষ আশ্রয়স্থল গড়ে উঠেছে। খাদ্য-বস্ত্র-জ্বালানির যোগান পাচ্ছেন তাঁরা। কাগজের অভাবে প্রকাশনার ব্যবস্থা না হওয়াতে বিতর্ক ও মৌখিক প্রতিবেদনের ওপর গুরুত্ব বাড়ছে। এসময় ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে ইভানোভের সঙ্গে লুনাচারস্কির প্রকাশ্য বিতর্ক হচ্ছে। রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার মাত্রা বাড়ছে। বিপ্লব-বিরোধী বা সংশয়ী বুদ্ধিজীবীরা হাজতবাস এড়ানোর জন্যে মহানগর ছেড়ে মফস্বলে চলে যাচ্ছেন। বাখতিনের জীবিকা ও চিন্তা-জীবনের দীর্ঘ সংঘর্ষ শুরু হচ্ছে। সমকালীন মাক্সীয় ভাবনা ও আভাঁ গার্দ চিন্তাধারা: দুটি প্রবণতাই তাকে আকৃষ্ট করেছে অথচ কোনও পক্ষে তিনি যোগ দেননি। দু’বছর ধরে তিনি নেভেলের একটি জিমনাসিয়ামে শিক্ষকতা করেছেন। সেখানকার কয়েকজন তরুণ চিন্তাবিদদের নিয়ে বিচিত্র দার্শনিক বিতর্ক সংগঠিত করেছেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা হচ্ছেন ভ্লাদিমির জিনোভিয়োভিচ রুগেভিচ, ভ্যালেণ্টিন নিকোলায়োভিচ ভোলোশিকোভ, বোরিস মিখায়েলোভিচ জুবাকিন, লেভ ভ্যাসিলিয়েভিচ পুমপিয়ানস্কি, মারিয়া ভেনিয়ামিনোভনা যুদিনা, মাটভেই ইসায়েভিচ ফাগান প্রমুখ। এঁরা প্রত্যেকে বহুমুখী আগ্রহ সম্পন্ন ও বিচিত্র প্রতিভার অধিকারী।
১৯২০...: নেভেলের সত্তর মাইল দক্ষিণে অবস্থিত ছোট জনপদ ভিটেব্‌স্ক-এ চলে আসছেন বাখতিন। সেখানে সাংস্কৃতিক জীবন ঋদ্ধতর ছিল, আর খাদ্য সংকট তত তীব্র ছিল না। পরের বছর নেভেলের বৌদ্ধিক সমাবেশ পুরোপুরি ভেঙে যাচ্ছে কেননা নানা প্রয়োজনে কয়েকজন বিভিন্ন জায়গায় চলে যাচ্ছেন। বাখতিন-চিন্তাবৃত্ত অবশ্য ভিটেব্‌স্ক-এ পুনর্গঠিত হচ্ছে। সেখানকার ভূমিপুত্র মার্চ শাগালের নেতৃত্বে দু’বছর আগে বামপন্থী শিল্পের চর্চাকেন্দ্রও গড়ে উঠেছে। বিপ্লবোত্তর জীবন ও জগৎ রূপান্তরের ভাবনা গৃহযুদ্ধের নৈরাজ্যের মধ্যেই সেখানে বিকশিত হয়েছে। বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার আইজেনস্টাইন এবছর ভিটেব্‌স্ক শহরে এসেছেন। ইভান ইভানোভিচ সোলেরটিনস্কিপাভেল নিকোলায়েভিচ মেডভেডেভ—এই দু’জন বাখতিন-চিন্তাবৃত্তে বড়ো স্তম্ভ হয়ে উঠেছেন। শহরের উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাখতিন শিক্ষকতা করছেন। এছাড়া সেখানকার কমিউনিস্ট পার্টি, ট্রেড ইউনিয়ন ও শ্রমজীবীদের বিভিন্ন সংগঠনে তিনি সাহিত্য সহ নানা বিষয়ে বক্তৃতা দিচ্ছেন। যে-বাড়িতে বাখতিন ঘর ভাড়া নিয়েছেন, সে-বাড়িতেই আরেকটি ঘরে রয়েছেন এলেনা আলেকজান্দ্রাভনা ওকোলোভিচ। ভিটেব্‌স্ক-এর পাবলিক লাইব্রেরিতে কাজ করছেন তিনি। এবছর বাখতিনের অস্থিপীড়া এমন চরম আকার ধারণ করছে যে তিনি প্রায়-পঙ্গু হয়ে যাচ্ছেন। ডান পায়ের শল্য-চিকিৎসা করতে হচ্ছে, টাইফয়েডেও আক্রান্ত হচ্ছেন। কঠিন পীড়ায় এলেনের শুশ্রূষা দু’জনকে কাছাকাছি এনে দিচ্ছে। বছরের শেষ দিকে তাঁরা বিয়ে করছেন। এলেনার ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে উঠছেন বাখতিন। এসময় ‘নান্দনিক প্রক্রিয়ায় লেখক ও নায়ক’ বিষয়ে একটি লিখন-প্রকল্প শুরু করেছেন তিনি।
১৯২১...: বাখতিনের দেখা-শোনা করার জন্যে নেভেল থেকে ভিটেবস্ক-এ আসছেন ভোলোশিনোভ। তাঁর ভাবী স্ত্রী নিনা আর্কাডিয়েভ্‌না আলেক্সিভ্‌স্কায়ার সঙ্গে দেখা হচ্ছে। নিনা ছিলেন তার গৃহস্বামীর মেয়ে। রুগ্ন বাখতিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী-সত্তা হিসেবে তাঁর ভূমিকার নতুন পর্যায় শুরু হচ্ছে। এবছর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্যে সরকারি অনুদান বিপুল মাত্রায় কমতে শুরু করেছে। অতএব বেসরকারি প্রতিবেদনের বহুমাত্রিক গুরুত্ব স্পষ্ট হচ্ছে। অসুস্থ শরীর নিয়েই প্রচুর পড়ছেন, নানা বিষয়ে অসংখ্য খসড়া তৈরি করছেন, বক্তৃতা দিচ্ছেন, লাগাতার চা ও সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস গড়ে উঠছে। ফেব্রুয়ারি মাসে কাগানকে চিঠিতে জানাচ্ছেন, ‘শাব্দিক সৃষ্টির বিভিন্ন আকল্প' সম্পর্কিত বই লিখছেন তিনি। ভিটেব্‌ক্স-এর সংবাদপত্রে (মার্চ মাসে) জানানো হচ্ছে, বাখতিন নৈতিক দর্শন বিষয়ে বই লিখছেন।
১৯২২...: শাগালের পর যিনি ভিটেব্‌ক্স আর্ট আকাদেমির কর্ণধার হয়েছিলেন; সেই কাসিমির মালেভিচ সংস্থা থেকে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে সমাজতান্ত্রিক শিল্পচেতনার প্রায়োগিক ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে অভিজ্ঞ হচ্ছেন বাখতিন। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন-পরিসরে স্ত্রী এলেনা ক্রমশ সঞ্চালক হয়ে উঠছেন। জানুয়ারিতে কাগানকে চিঠিতে জানাচ্ছেন বাখতিন যে নৈতিক জীবন ও আইন পরিসরে বিষয়ীর ভূমিকা সম্পর্কে প্রবন্ধ লিখছেন তিনি, যা নৈতিক দর্শন সম্পর্কিত বইয়ের ভূমিকা হিসেবে পরিকল্পিত। পেট্রোগ্রাদ থেকে প্রকাশিত পত্রিকা ‘দি লাইফ অফ আর্ট’-এর আগস্ট সংখ্যায় জানানো হচ্ছে যে বাখতিন ডস্টয়েভস্কি সম্পর্কিত বই এবং শাব্দিক সৃষ্টির নন্দন বিষয়ে পুস্তিকা লেখা শেষ করেছেন।
১৯২৪...: বাখতিনের চিন্তা-জীবনে আদিপর্যায় শেষ হচ্ছে। পরবর্তী কালে যেসব রচনা ‘প্রত্যুত্তরযোগ্যতার নির্মিতিবিজ্ঞান’ নামক সামূহিক অভিধায় উপস্থাপিত হয়েছে, তাদের বয়ান নিরবচ্ছিন্ন অধ্যবসায়ের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে এই সময়পর্বে। নিত্য সঙ্গী অসুস্থতা নিয়েই সৃষ্টিমুখর হতে পারছেন বাখতিন। কিন্তু নানা ধরনের জীবিকা সত্ত্বেও ছোট্ট শহরে খুব বেশি আয় করতে পারছেন না। এসময় তার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়াতে পরিবার বাখতিনের ওপর নির্ভরশীল। হয়ে পড়েছে। গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত দেশে উপার্জনের পথও খুব সহজ ছিল না। মস্কো, পেট্রোগ্রাদ বা অন্য কোনও মাঝারি মাপের শহরে বন্ধুদের চেষ্টা সত্ত্বেও শৈক্ষিক জীবিকার ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হচ্ছেন তিনি। তবু প্রতিকূল পরিবেশেও অক্ষুণ্ণ থাকছে নতুন নতুন চিন্তাবীজের অঙ্গুরায়ন। এবছর, প্রয়াত হচ্ছেন লেনিন। বাখতিন ফিরে আসছেন লেনিনগ্রাদে
১৯২৫...: পাঁচ বছর ব্যাপী বিপুল সৃষ্টিশীলতার সূচনা। এই সময়পর্বে ফ্রয়েডীয় মতবাদ: মার্ক্সীয় সমালোচনা, সাহিত্যিক গবেষণায় প্রকরণবাদী পদ্ধতি, মার্ক্সবাদ ও ভাষাদর্শন এবং ডস্টয়েভস্কি ও তাঁর নন্দন—এই চারটে প্রধান গ্রন্থ ছাড়াও বেশ কিছু প্রবন্ধ লিখেছেন তিনি। এসময় বাখতিন-চিন্তাবৃত্ত সমৃদ্ধির শিখরে পৌঁছেছে। তবে সহযোগী সত্তাদের মধ্যে বৌদ্ধিক দ্বিরালাপের কোনও অভাব নেই। বাখতিনের অস্থিপীড়া এমন মারাত্মক পর্যায়ে পৌছেছে যে দ্বিতীয় শ্রেণীর রাষ্ট্রীয় ভাতার জন্যে তিনি মনোনীত হয়েছেন। তবু জীবিকার চিন্তা থেকে তিনি রেহাই পাননি কারণ বার্ষিক পুনর্বিবেচনায় ভাতা ক্রমাগত কমে যাচ্ছিল। গৃহযুদ্ধের অবসান হওয়াতে শিল্প-সাহিত্য ও বৌদ্ধিক চর্চার জন্যে অবশ্য আর্থিক অনুদান পাওয়া যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় উদ্যমের বাইরেও কিছু কিছু প্রকাশন সংস্থা সক্রিয় থাকতে পারছে। কিন্তু নেভেল ও ভিটেব্‌স্ক-এর পরিস্থিতির প্রতিতুলনায় লেনিনগ্রাদের বৌদ্ধিক বর্গের মধ্যে বাখতিন প্রায় সম্পূর্ণ অপরিচিত তখন। কোনও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নেই। তাই সহযোগী বন্ধুদের নামে তাঁকে লেখা প্রকাশ করতে হচ্ছে। কিন্তু তাতে উপার্জনের ক্ষেত্রে কোনও ইতর-বিশেষ হয়নি। লেনিনগ্রাদে আসার কয়েক মাস পরেই তাঁর ভাতা কমিয়ে তৃতীয় শ্রেণীতে নিয়ে আসা হয়; আর ১৯২৯-এ চতুর্থ শ্রেণীতে। এসময় তার মা প্যারিতে বড়ো ছেলে নিকোলাইকে বারবার চিঠিতে লিখছেন: মিশাকে (মিখায়েলের বাড়ির নাম) যতটা পারো সাহায্য করো। বেচারা বক্তৃতা দিয়ে ও ছাত্র পড়িয়ে মাসে পনেরো থেকে পঁচিশ রুবাল মাত্র আয় করতে পারছে। ১৯২৭ পর্যন্ত লেনিনগ্রাদ রাষ্ট্রীয় প্রকাশন সংস্থায় অনিয়মিত কাজ পেয়েছেন বাখতিন। এছাড়া নানা বেসরকারি সভা-সমিতিতে বিভিন্ন বিষয়ে বক্তৃতা দিয়ে কিছু কিছু রোজগার হচ্ছে। ১৯২৭ পর্যন্ত বন্ধুদের বাড়িতে তাঁর থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। এর পরে নির্দিষ্ট একটা বাসস্থান অবশ্য হয়েছে। এত অস্থিরতা ও দুর্বিপাক সত্ত্বেও বাখতিন-চিন্তাবৃত্তের বৌদ্ধিক অবস্থান ক্রমশ দৃঢ়তর হচ্ছে।
১৯২৮...: স্ট্যালিনের নেতৃত্বে সোভিয়েত রাশিয়ার প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সূচনা। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে দ্রুত পরিবর্তনের জন্যে কিছু কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। বিশেষত শিল্পায়ন ও কৃষিক্ষেত্রে যৌথ খামারের ব্যবস্থা সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে। নিরক্ষরতা দূর করার জন্যে ও মদ্যপানের মতো কুপ্রথা নিবারণের উদ্দেশ্যে যে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, ক্রমশ তার পরিধি নানাদিকে বিস্তৃত হচ্ছে। বুর্জোয়া মতবাদ ও অভ্যাসের বিরুদ্ধে যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে তাতে বহু সাহিত্যিক ও সাহিত্যতাত্ত্বিকেরা প্রতিক্রিয়াশীলতার অভিযোগে অভিযুক্ত হচ্ছেন।
১৯২৯...: খ্রিষ্টীয় যাজকেরা বিশেষভাবে পীড়নের শিকার হচ্ছেন। লেনিনগ্রাদের বৌদ্ধিক কেন্দ্রগুলিতে প্রকরণবাদীরা সবচেয়ে বেশি বিপন্ন। অন্যান্য লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি অত্যন্ত প্রতিকূল হয়ে পড়েছে। বাখতিন-চিন্তাবৃত্তের শরিকেরাও নিপীড়ন এড়াতে পারেননি। ৭ জানুয়ারি স্বয়ং বাখতিন গ্রেপ্তার। তার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ: তিনি তরুণ প্রজন্মের মনকে বিদূষিত করছেন এবং রাশিয়ার সাম্যবাদী সরকারের পক্ষে তিনি আশঙ্কার কারণ। যখন তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে, তাঁর স্বাস্থ্যের এতদূর অবনতি ঘটছে যে শল্য-চিকিৎসার প্রয়োজনে তাঁকে হাসপাতালে স্থানান্তরিত করতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে গোর্কির প্রাক্তন স্ত্রীর সাহায্য নিয়ে য়ুদিনা বাখতিনের ওপর আরোপিত শাস্তির মাত্রা কিছুটা কমিয়ে আনতে সক্ষম হচ্ছেন। গোর্কি ও ঔপন্যাসিক অ্যালেক্সেই টলস্টয় বাখতিনের মুক্তির জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে তারবার্তা পাঠাচ্ছেন। ফলে শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে তাঁকে বছরের শেষে বাড়িতে অন্তরীণ করা হচ্ছে। এসময় এলেনাও চেষ্টার কোনও ত্রুটি করেননি যাতে বাখতিনকে দশ বছরের জন্যে সোলোভেৎস্কি দ্বীপপুঞ্জে নির্বাসিত না করা হয়। শেষ পর্যন্ত, তাঁকে কাজাখস্তানে কুস্তানাই শহরে ছ’বছরের জন্যে নির্বাসিত করা হচ্ছে।
১৯৩০...: বাখতিন স্ত্রীকে নিয়ে কুস্তানাই শহরে উপস্থিত হচ্ছেন। এসময় টলষ্টয়ের তেরো খণ্ডে বিন্যস্ত সমগ্র সাহিত্য-রচনার দুটি খণ্ডের ভূমিকা লিখছেন বাখতিন। এই দুটি রচনায় তাঁর মার্ক্সীয় যুক্তিবিন্যাসের পরিচয় পাওয়া যায়। ঠিক আগের বছর প্রকাশিত ভ্লাদিমির প্রোপের Morphology of the Folkale বইয়ের যুক্তি-বিন্যাস বাখতিনের চিন্তা-প্রণালীকে কিছুটা প্রভাবিত করে থাকবে। সর্বতোভাবে প্রতিকূল পরিবেশে বাখতিন জীবিকার ব্যবস্থা করতে পারেননি কেননা শিক্ষকতার বৃত্তি তাঁর জন্যে নিষিদ্ধ ছিল। স্ত্রী এলেনা নানা ধরনের কাজ করে সংসার চালানোর ব্যবস্থা করছেন।
১৯৩১...: এপ্রিল মাসের শেষে সরকার-নিয়ন্ত্রিত সমবায় কার্যালয়ে বাখতিন হিসাব-রক্ষকের কাজ পাচ্ছেন।
১৯৩৩...: জেলাপর্ষদে পরামর্শদাতার অতিরিক্ত কাজও তাঁকে দেওয়া হচ্ছে। ধীরে ধীরে তাঁর উপর নিয়ন্ত্রণও কিছুটা শিথিল হয়ে আসছে। সাহিত্য ও দর্শন সম্পর্কে বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ না পেলেও অন্যান্য প্রায়োগিক বিষয়ে বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। গৃহযুদ্ধের প্রাক্তন যোদ্ধা লালরক্ষীদের মধ্যে জনপ্রিয়তাও অর্জন করতে পারছেন। যৌথখামারের কৃষিজীবীদের মধ্যে নানা বিষয়ে ভাষণ দিয়ে নিঃসন্দেহে বৃহত্তর জীবন সম্পর্কে অভিজ্ঞ হয়ে উঠছেন তিনি।
১৯৩৪...: সোভিয়েত ট্রেড নামক সরকারি পত্রিকায় নবার্জিত অভিজ্ঞতা-নির্ভর একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হচ্ছে। ৪ আগস্ট সরকারিভাবে তাঁর নির্বাসনদণ্ড শেষ হলেও তিনি আরও কিছুদিন কুস্তানাইতে থাকছেন। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি চিকিৎসার প্রয়োজনে শুধু কিছুদিনের জন্যে লেনিনগ্রাদে যাচ্ছেন। ততদিনে তাঁর দুটি পা-ই পীড়ায় আক্রান্ত।
১৯৩৬...: লেনিনগ্রাদে দু’মাসের জন্যে গ্রীষ্মকালে আসার অনুমতি পাচ্ছেন বাখতিন। আগস্টে আবার মস্কো হয়ে কুস্তানাই-তে ফিরে আসছেন। উপন্যাসের প্রতিবেদন সম্পর্কে তাত্ত্বিক প্রবন্ধ রচিত হয়েছে ইতিমধ্যে। সেপ্টেম্বরের শেষে কুস্তানাই-এর সরকারি সমবায় কার্যালয়ে ইস্তফা দিয়ে তাঁর প্রিয় শিক্ষকতার কাজে যোগ দিচ্ছেন সারান্‌স্ক শহরে। মুখ্যত পাভেল মেডভেডেভ-এর চেষ্টায় সেখানকার মোর্দোভিয়া পেডাগগিক্যাল ইন্‌স্টিটিউট-এ যোগ দিতে পেরেছেন। তখন সোভিয়েত পার্টির মধ্যে বিরাট উথাল-পাথাল শুরু হয়েছে। জিনোভিয়েভট্রটস্কির মতাবলম্বীর বিরুদ্ধে দমনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সাংস্কৃতিক সাহচর্য সেই পর্যায়ে পাওয়া খুবই কঠিন ছিল, নতুন পরিস্থিতিতে তা আরও দুরূহ হয়ে উঠছে। বিশ্বসাহিত্য বিভাগে বাখতিন একাই পাঠদান করছেন এবং নিজের পছন্দ অনুযায়ী পাঠ্যবস্তুও তিনি নির্বাচন করতে পারছেন। লক্ষণীয়ভাবে শহরের পার্টি কমিটি দ্বারা আমন্ত্রিত হয়ে তিনি সাহিত্যে ও শিল্পে পার্টি মানসিকতা সম্পর্কে লেনিন ও স্ট্যালিনের বক্তব্য বিশ্লেষণ করছেন।
১৯৩৭...: বাখতিনের পরিচিত জনেরা আন্তঃপার্টি সংগ্রামে ক্ষমতাচ্যুত হওয়াতে অবস্থার গুণগত পরিবর্তন হচ্ছে। বাখতিনের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা যদিও নেওয়া হয়নি, নতুন পরিস্থিতিতে খুব বেশি ভরসা রাখাও সম্ভব ছিল না। তাই ২০ জুলাই ইস্তফা দিয়ে সারান্‌স্ক থেকে চলে যাচ্ছেন বাখতিন। ২৬ ডিসেম্বর প্রয়াত হচ্ছেন বাখতিনের দীর্ঘদিনের বন্ধু কাগান। মস্কো হয়ে লেনিনগ্রাদে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, নতুন ভাবে গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কা খুব প্রবল। তাই বছরের শেষে মস্কোর কাছাকাছি সাভেলোভো শহরে চলে যাচ্ছেন। জীবিকাহীন অবস্থায় কপর্দকশূন্য বাখতিন একমাত্র বন্ধুদের পাঠানো সাহায্যের ওপর ভিত্তি করে অত্যন্ত কষ্টে জীবন নির্বাহ করেছেন।
১৯৩৮...: অস্থিপীড়া এত মারাত্মক হয়ে পড়ছে যে ১৩ ফেব্রুয়ারি ডান-পা কেটে বাদ দিতে হচ্ছে। দু’মাস পরে হাসপাতাল থেকে যখন ছাড়া পাচ্ছেন, তিনি তখন অবশিষ্ট জীবনের জন্যে পঙ্গু। বছরের শেষে দমন-পীড়ন মোটামুটি কমে আসছে।
১৯৩৯...: সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু। এবছরের গোড়া থেকেই বাখতিনের বৌদ্ধিক জীবন আবার গতিময় হয়ে উঠেছে। ইতিমধ্যে বিল্‌ডুঙ্গস্‌রোমান বা শিক্ষা বিষয়ক উপন্যাস ও বাস্তবতাবাদের ইতিহাসে তার তাৎপর্য সম্পর্কিত বইটি সম্পূর্ণ হয়েছে। এ ছাড়া উপন্যাসে সময়ের বিভিন্ন প্রকরণ ও ক্রনোটোপ এবং মানবিকী বিদ্যার দার্শনিক ভিত্তি সম্পর্কিত দুটি প্রবন্ধ তিনি সম্পূর্ণ করেছেন।
১৯৪০...: বিভিন্ন প্রকাশন সংস্থার জন্যে সমালোচনা লেখার কাজ পেয়েছেন বাখতিন। গবেষকদের মধ্যে তাঁর মর্যাদা বাড়ছে। মস্কোর বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কিত গোর্কি ইন্‌স্টিটিউটের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। এপ্রিলের শেষে শেক্সপীয়র আলোচনা- চক্রে আমন্ত্রিত হচ্ছেন। এমনকী ১৪ অক্টোবর ঐ প্রতিষ্ঠানের সাহিত্যতত্ত্ব ও নন্দনতত্ত্ব বিভাগে উপন্যাসের প্রতিবেদন সম্পর্কে বক্তৃতা দিচ্ছেন। ঔপন্যাসিক প্রতিবেদনের প্রাক্‌-ইতিহাস সম্পর্কিত বিখ্যাত প্রবন্ধটি লিখছেন।
১৯৪১...: মার্চের শেষে বিশিষ্ট সাহিত্য-মাধ্যম হিসেবে উপন্যাসের গুরুত্ব নিয়ে বক্তৃতা দিচ্ছেন। মহাকাব্য ও উপন্যাস সম্পর্কিত প্রবন্ধ লিখছেন। আর, গোর্কি ইন্‌স্টিটিউটের দাখিল করার জন্যে বাস্তবতাবাদের ইতিহাসে রাবেলের স্থান সম্পর্কে ডিগ্রির ডক্টরেট অভিসন্দর্ভ লিখছেন। ইতিমধ্যে জুন মাসে রাশিয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে। এতদিন নির্দিষ্ট কোনও জীবিকা ছিল না তাঁর। যুদ্ধ তাঁর অভিসন্দর্ভ রচনার কাজে সাময়িক ছেদ ঘটিয়ে দিচ্ছে যদিও, স্থানীয় স্কুলগুলিতে জার্মান পড়ানোর জন্যে তিনি নিয়োজিত হচ্ছেন। ২৭ সেপ্টেম্বর চার মাসের মধ্যেই তিনি রুশ ভাষা শেখানোর সুযোগও পেয়ে যাচ্ছেন। যদিও মাতৃভাষায় শিক্ষকতা করার অনুমতিপত্র তাঁর ছিল না, যুদ্ধপরিস্থিতি এই সুযোগ এনে দিচ্ছে।
১৯৪২...: ১৯ জানুয়ারি থেকে জার্মানের সঙ্গে রুশ ভাষায় শিক্ষকতা করার যে সুযোগ তিনি পেয়েছেন, ১৯৪৫-এর ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তা বহাল থাকছে। এতে অবশ্য লেখার সময় অনেকটা কমে যাচ্ছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁর মর্যাদা অনেকটা বাড়ছে।
১৯৪৪...: স্থানীয় পার্টি কমিটি তাঁকে বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।
১৯৪৫...: যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে সারান্‌স্কের পেডাগগিক্যাল ইন্‌স্টিটিউটে পুরোনো পদে যোগ দিচ্ছেন। এমনকী ৬ জুলাই পদোন্নতি হচ্ছে তাঁর। সাধারণ সাহিত্য বিভাগের সভাপতি হিসেবে নিযুক্তি পাচ্ছেন। আর, ১৮ সেপ্টেম্বর আরও উচ্চতর পদে তাকে উন্নীত করা হচ্ছে। বাসস্থানের সমস্যা থাকলেও কর্তৃপক্ষ তার জন্যে বিশেষ পরিবহনের ব্যবস্থা করছে।
১৯৪৬...: সাহিত্য ও সংস্কৃতির পরিসরে ঝ্‌দানোভের যুগ শুরু। নভেম্বরে বাখতিন আবার রাবেলে সম্পর্কিত গবেষণার মৌখিক পরীক্ষা দিতে তৈরি হচ্ছেন। কার্নিভাল ও লোকায়ত হাস্যরস সম্পর্কে তার তাত্ত্বিক বয়ান পরীক্ষকদের মতাদর্শগত রক্ষণশীলতার জন্যে সমস্যা তৈরি করছে। এক ধরনের উগ্র রুশ জাতীয়তাবাদ প্রতীচ্যের তত্ত্বভাবনা সম্পর্কে অযৌক্তিকভাবে সন্দিহান হয়ে পড়ছে। ফলে বাখতিনের অভিসন্দর্ভ সম্পর্কে নানা ধরনের আপত্তি উঠছে।
১৯৪৭...: মে মাসের শেষে বাখতিনকে যখন অভিসন্দর্ভ সম্পর্কে উত্থাপিত আপত্তিগুলির প্রত্যুত্তর দেওয়ার জন্যে আহ্বান করা হচ্ছে, ততদিনে সাংস্কৃতিক উদারনীতির অবসান হয়ে গেছে। সরকারি মতাদর্শের বিরোধিতা সম্পর্কে অতিরিক্ত স্পর্শকাতরতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। বাখতিনের অভিসন্দর্ভ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তাই ১৯৫১-এর জুন পর্যন্ত স্থগিত রাখা হচ্ছে। ১২ সেপ্টেম্বরের আগে জানানো হয়নি যে কর্তৃপক্ষ বাখতিনকে ডক্টরেট ডিগ্রির পক্ষে অনুপযুক্ত বিবেচনা করে তাঁকে ক্যাণ্ডিডেট ডিগ্রি দিতে মনস্থ করেছে। আবার অক্টোবরে মরডোভিয়ার সুপ্রিম সোভিয়েত বাখতিনকে দীর্ঘ পরিষেবার জন্যে শংসাপত্র দিয়ে সম্মানিত করছে।
১৯৫২...: এবছর ২ জুনের আগে ক্যাণ্ডিডেট ডিগ্রিও তাকে দেওয়া হয়নি। ইতিমধ্যে বাখতিন তার জীবিকা ক্ষেত্রে অসামান্য দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব নির্বাহ করছেন। বহু শৈক্ষিক সম্মেলনে তিনি যোগ দিয়েছেন এবং অজস্র সরকারি অনুষ্ঠানে বক্তৃতাও দিয়েছেন। বিশিষ্ট বাগ্মী হিসেবে তাঁর খ্যাতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। লক্ষণীয়ভাবে স্ট্যালিনের সপ্তদশ পার্টি কংগ্রেসের বক্তৃতাও তিনি মনোযোগ দিয়ে পড়ছেন এবং মার্ক্স-এঙ্গেলস্‌-স্ট্যালিন সম্পর্কে বিভিন্ন সভায় বক্তৃতা দিয়েছেন। ছাত্রদের কাছে তিনি শিক্ষক হিসেবে অসাধারণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। দান্তে-শেক্সপিয়র-সার্ভেন্তেস-সোফোক্লিস্‌ এবং নন্দনতত্ত্ব ও নাট্য ইতিহাস সম্পর্কে তার বক্তৃতা বিশেষ আকর্ষণীয় হত।
১৯৫৩..: এই সময় থেকে ১৯৬১ পর্যন্ত বাখতিন অধ্যয়ন ও অধ্যাপনার নিরিখে উত্তরোত্তর বিশেষ মর্যাদা অর্জন করছেন। বক্তৃতা ও প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত থাকার ফলে খুব বেশি লেখার সময় তিনি পাননি। তবে The problem of speech genres শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রস্তুত হয়েছে। এ ছাড়া ‘বাচনিক সৃষ্টির নন্দনতত্ত্ব’ সম্পর্কে বেশ কিছু খসড়াও পঞ্চাশের দশকের শেষে তৈরি হয়েছে। এবছর মার্চে স্ট্যালিনের মৃত্যু হওয়ার পরে বৌদ্ধিক পরিবেশ অনেকটা পাল্টে গেছে। বিশেষত নিকিতা ক্রুশ্চেভের সময় থেকে বৌদ্ধিক বর্গের মধ্যে নতুন পর্যায়ের সূত্রপাত হয়েছে। তবে বাখতিন সহজে মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে আসতে পারেননি। রাজধানী মস্কো থেকে বহুদূরে থাকার ফলে মহানাগরিক বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে তার পরিচিতিও ঈপ্সিত মাত্রায় বিস্তৃত হতে পারেনি। কিন্তু যে-অভূতপূর্ব সম্মান তিনি সারান্‌স্কে পেয়েছিলেন, অন্য কোথাও তা পাননি। মাঝেমাঝে মস্কোর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার সুযোগ তাঁর হত, পুরোনো দিনের সহযোগী বন্ধুরা সারান্‌স্কে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক মান্যতা পাওয়ার উদ্যম তিনি কখনো গ্রহণ করেন নি।
১৯৫৫...: এবছর ছাপার অক্ষরে বাখতিন সম্পর্কে প্রথম উল্লেখ করছেন ভ্লাদিমির সেডুরো; এই মার্কিন গবেষক তাঁর একটি বইতে বাখতিনের ডস্টয়েভস্কি বিষয়ক বইটির আলোচনা করেছেন।
১৯৫৬...: প্রকরণবাদী হিসেবে একদা-সুপরিচিত রোমান য়্যাকবসন মে-মাসে অনুষ্ঠিত ইণ্টারন্যাশনেল কমিটি অফ শ্লাভিস্ট দ্বারা প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক আলোচনাচক্রের একটি প্রস্তুতিসভায় বাখতিনের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন।
১৯৫৭...: বাখতিন যে-প্রতিষ্ঠানে পড়াতেন, সেই মোর্ডোভিয়ার পেডাগগিক্যাল ইনস্টিটিউট এবছর ১ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে উন্নীত হয়েছে। এর নতুন নামকরণ হয়েছে মোর্ডোভিয়ার ওগারেভ বিশ্ববিদ্যালয়। প্রখ্যাত প্রকরণবাদী ভিক্টর স্কলোভস্কি এসময় Pro and Contra: Notes on Dostoevksy বইতে বাখতিনের ডস্টয়েভস্কি-বিশ্লেষণের সপ্রশংস সমালোচনা করছেন। এভাবে তিন দশক পরে স্কলোভস্কি ও বাখতিনের সৃজনশীল দ্বিরালাপ নতুনভাবে শুরু হচ্ছে। বস্তুত এই প্রথম কোনও সোভিয়েট রাশিয়ার চিন্তাবিদ বাখতিনের উল্লেখ করছেন।
১৯৫৮...: ১৪ মার্চ নবোন্নীত ওগারেভ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাখতিন রুশ ও বৈদেশিক সাহিত্য বিভাগের সভাপতি পদে উন্নীত হচ্ছেন। নতুন বাসস্থান তাঁর জন্যে নির্দিষ্ট হচ্ছে। নিজের লেখাপত্র সম্পর্কে আরও সময় দেওয়ার কথা ভাবছেন। এমনকী, মস্কো বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার বিষয়ও বিবেচনা করছেন। কিন্তু অন্যদিকে তাঁর ব্যাধিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্ত্রী এলেনার হৃৎ-পীড়ার সূচনা হচ্ছে। কয়েক বছর ধরেই তাঁরা স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্যে মস্কো-সংলগ্ন স্বাস্থ্যনিবাসে গ্রীষ্মের ছুটি কাটিয়ে আসছেন। অতএব সারান্‌স্ক শহর ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না। এবছর সেপ্টেম্বরে মস্কোয় অনুষ্ঠিত শ্লাভ-বিদ্যা অধ্যয়নের আন্তর্জাতিক আলোচনাচক্রে য়্যাকবসন তার একটি প্রকাশিতব্য গ্রন্থসমালোচনার বয়ান সভ্যদের মধ্যে বিলি করেন। স্কলোভস্কির প্রাগুক্ত বইটি সমালোচনা করতে গিয়ে আলোচক বাখতিন সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করেছিলেন, তাতে প্রথম সোভিয়েত বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বাখতিনের নাম বিপুল ভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
১৯৫৯...: এবছর য়্যাকবসনের নিবন্ধটি International Journal of Slavic Linguistics and Poetics-এর প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়ার পরে মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতম শ্রেণীর ছাত্রদের মধ্যে বাখতিন আলোচিত হতে শুরু করেন। প্রকাশিত হওয়ার তিন দশক পরে ডয়েভস্কি সম্পর্কিত বইটিও যেন পুনর্জন্ম লাভ করে। এই ছাত্রদের মধ্যে সর্বাগ্রগণ্য ভাডিম ভালোরিয়ানোভিচ কোঝিনোভ, যিনি পরে রুশ কবিতা ও সাহিত্যতত্ত্ব সম্পর্কে প্রচুর বই রচনা করেন। গোর্কি ইনস্টিটিউটে স্নাতক শ্রেণীতে পড়ার সময় তিনি ডস্টয়েভস্কি ও তাঁর নন্দন বইটি খুঁজে পান। বাখতিন সম্পর্কে কৌতুহলী হয়ে জানতে পারেন যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ঐ শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে বাখতিন শিক্ষক ছিলেন। সেখানকার পুরোনো নথিপত্র ঘেঁটে কোঝিনোভ বাখতিনের রাবেলে-সম্পর্কিত অভিসন্দর্ভটিও আবিষ্কার করেন। তিনি অবশ্য ধরে নিয়েছিলেন, বাখতিন আর বেঁচে নেই।
১৯৬০...: বাখতিনের অনন্য বিশ্লেষণ-পদ্ধতি কোঝিনোভ-কে এতই চমৎকৃত করে যে তিনি বাখতিনের বইগুলি পুনঃপ্রকাশ করার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করতে শুরু করেন। তাঁর সব চেষ্টাই সেবছর ব্যর্থ হয়। তবে একাজে তিনি দু’জন সতীর্থকে সঙ্গে পান: সের্গেই জর্জিভিচ বোচারোভ ও জর্জি ডিমিট্রিয়েভিচ গাচেভ।
১৯৬১...: বছরের গোড়ায় কোঝিনোভ আবিষ্কার করেন যে বাখতিন এখনও জীবিত। তখন শুরু হয় চিঠিপত্রে যোগাযোগ করার চেষ্টা। নিজের স্বভাব অনুযায়ী বাখতিন অবশ্য উত্তর দেননি। কিন্তু সংবেদনশীল এলেনা এই যোগাযোগের সম্ভাবনা বুঝতে পারেন। ৬ জুন কোঝিনোভ এলেনার কাছ থেকে চিঠি পাচ্ছেন। তার অনুরোধে কোঝিনোভ, বোচারোভ ও গাচেভ বাখতিনের সঙ্গে দেখা করতে সারান্‌স্কে যান। এরপর তারা আরও বহুবার বাখতিন-দম্পতির সঙ্গে দেখা করতে গেছেন। বাখতিনের রূপকথাতুল্য পুনরুজ্জীবনের পালা শুরু। ধীরে ধীরে এই তিনজন গুণমুগ্ধ ছাড়াও নতুন নতুন তরুণ ভক্তেরা সারান্‌স্কে যেতে শুরু করছেন। ২৪ জুলাই বাখতিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেওয়ার জন্যে কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমতি চাইছেন। ইতিমধ্যে কোঝিনোভের সঙ্গে বাখতিনের আলোচনা শুরু হয়েছে কীভাবে ডস্টয়েভস্কি বিষয়ক বইটি পুনঃপ্রকাশ করা যায়। সুতরাং অবসরের জন্যে স্বাস্থ্যহানি কারণ হলেও বাখতিন আসলে পুনর্লিখনের জন্যে সময় দিতে চাইছিলেন। ডিসেম্বরের গোড়ায় রাবেলে-সম্পর্কিত অভিসন্দর্ভ নিয়েও দুজনের আলোচনা হচ্ছে। কোঝিনোভ অবশ্য ভাবছিলেন, আগে ‘ডক্টয়েভস্কি ও তাঁর নন্দন’ প্রকাশিত হলে দ্বিতীয় বইটি প্রকাশ করা সহজ হবে। কেননা তৎকালীন পরিস্থিতিতে সরকারি অনুমোদন ছাড়া বই প্রকাশ করার পক্ষে বাধা ছিল অনেক।
১৯৬২...: সে-সময়কার বিখ্যাত সাহিত্য-গবেষক ভ্লাদিমির নিকোলায়েভিচ টারবিন সারান্‌স্কে যাচ্ছেন। বাখতিনের সঙ্গে আলাপ করে এত অভিভূত হচ্ছেন যে কিছুদিন পরে মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও সাফল্যপ্রসূ আলোচনাচক্রে তিনি বাখতিনের কথা বিশদভাবে বিশ্লেষণ করছেন। ফলে তাঁর ছাত্রী এল. এম. মেলিখোবা নিয়মিত ভাবে বাখতিনের কাছে যেতে শুরু করছেন। এবছর বাখতিনের লেখাপত্র প্রকাশ করার তাগিদ গুণমুগ্ধদের মধ্যে বহুগুণ বেড়ে গেছে। তাঁরা নিজেদের মধ্যে কিছু কিছু দায়িত্ব ভাগ করে নিচ্ছেন। কোঝিনোভ ও বোচারোভ বাখতিনের বই প্রকাশ এবং তাঁর খসড়া পাণ্ডুলিপি দেখাশোনার কাজ করছেন, টারবিন তাঁকে মস্কোয় পুনর্বাসন দেওয়ার সমস্যা নিয়ে ভাবছেন এবং মেলিখোবা বাখতিন-দম্পতির স্বাস্থ্য সংক্রান্ত প্রয়োজন দেখাশোনা করছেন। এর আগের বছর কোঝিনোভ ডস্টয়েভস্কি বিষয়ে পরিমার্জিত বইটি প্রকাশ করার জন্যে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে চেষ্টা করে গেছেন। ইতালীয় প্রকাশন সংস্থার সঙ্গে চুক্তিপত্র মস্কোর কর্তৃপক্ষকে দেখিয়ে তাঁদের প্রভাবিত করতে পর্যন্ত দ্বিধা করেননি। নানা টালবাহানার পরে শেষপর্যন্ত তাঁর উদ্যম সার্থক হচ্ছে। বইটির প্রকাশ ত্বরান্বিত করার জন্যে কোঝিনোভ সংবাদপত্রের মধ্য দিয়েও প্রচার চালিয়েছেন।
১৯৬৩...: ২৬ সেপ্টেম্বর বাখতিন কোঝিনোভকে একটি চিঠিতে জানাচ্ছেন যে তিনি ডস্টয়েভস্কি ও তার নন্দন-এর নতুন সংস্করণের আগাম কপি পেয়ে যাবেন। কোঝিনোভের অদম্য চেষ্টার ফলে এই আশ্চর্য ঘটনা ঘটতে পেরেছে।
১৯৬৪...: একটি বিশেষ সন্ধ্যায় মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রন্থ প্রকাশ সম্পর্কিত অনুষ্ঠান করা হচ্ছে। ধীরে ধীরে রাবেলে-সম্পর্কিত বইটি সহ অন্যান্য রচনা প্রকাশের উদ্যমও চলছে। পরিমার্জনের কাজে কোঝিনোভ সবচেয়ে বেশি সাহায্য করছেন।
১৯৬৫...: বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেওয়ার পরেও সারান্‌স্কের বাইরে আসা সম্ভব হয়নি মূলত আবাসন সম্পর্কিত সোভিয়েত নিয়মের জন্যে। ততদিনে তিনি অবশ্য ছাত্র ও সমকর্মীদের কাছে ঈশ্বরপ্রতিম হয়ে পড়েছেন। বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার জন্যে বাখতিন তাদের সময় দিতে কার্পণ্য করেননি। এদিকে স্বাস্থ্য ক্রমশ বেশি উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। এবছর নভেম্বরে কোঝিনোভকে লেখা একটি চিঠিতে পরিমার্জনের জন্যে তাঁকে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন বাখতিন।
১৯৬৬...: বাখতিন ও এলেনা—দুজনেরই স্বাস্থ্যর দ্রুত অবনতি ঘটছে। বাড়ির বাইরে যাওয়া ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে আসছে। তাঁর অন্য পা-ও পুরোপুরি অকেজো হয়ে গেছে। এবছর দু’জনকেই বেশ কয়েকবার হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে গুণমুগ্ধদের সাহায্য যদিও অবারিত ছিল। মস্কোর তরুণ, শিষ্যেরা বুঝতে পারছেন যে দম্পতিকে এবার মস্কোয় উপযুক্ত পরিচর্যার মধ্যে রাখতে হবে। নিজের উদ্বেগজনক হৃদ্‌পীড়া সত্ত্বেও এলেনা সমস্ত কাজই নিজে করতে চাইতেন। গার্হস্থ্য কাজে গুণমুগ্ধদের কোনও ধরনের সাহায্য তিনি নিতে চাইতেন না। এই দম্পতির পারস্পরিক অনুরাগ এত প্রগাঢ় ছিল যে চিকিৎসার প্রয়োজনেও দু’জনে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চাইতেন না।
১৯৬৭-৬৮ : একদিকে দম্পতির পীড়া বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং অন্যদিকে সারান্‌স্ক থেকে তাঁদের মস্কোয় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলেছে। এই অবস্থাতেও বাখতিন পড়ছেন, পুরোনো খসড়া সংশোধন করছেন।
১৯৬৯...: পরবর্তীকালে সোভিয়েত রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি আন্দ্রোপোভ তখন রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা কে জি বি-এর প্রধান। তাঁর মেয়ে টারবিনের আলোচনাচক্রে বাখতিনের কথা জেনেছেন। তিনি বাবাকে রাজি করালেন যাতে মস্কোর ক্রেমলিন হাসপাতালে বাখতিন ও এলেনাকে চিকিৎসা করানো যায়। স্পষ্টত তা ছিল বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জন্যে সংরক্ষিত। অক্টোবরে বাখতিন-দম্পতিকে ক্রেমলিন হাসপাতালে নিয়ে আসা হচ্ছে। এই অবস্থাতেও বাখতিন তাঁর লেখার কাজ অক্ষুণ্ণ রেখেছেন।
১৯৭০...: নিয়ম অনুযায়ী বাখতিনদের দীর্ঘদিন ক্রেমলিন হাসপাতালে রাখা সম্ভব হয়নি। ১৫ মে তাঁরা মস্কোর খুব কাছেই একটি বৃদ্ধাবাসে স্থানান্তরিত হচ্ছেন। এই নতুন বাসস্থান খুব সুবিধাজনক না হলেও যথারীতি বাখতিনের পড়াশোনা অব্যাহত। এবছর তাঁর পচাত্তরতম জন্মদিনে তিনি প্রচুর শুভেচ্ছাবার্তা পেয়েছেন। ফলে স্থানীয় মানুষদের কৌতুহল মেটাতে এত অসুস্থ অবস্থাতেও তাঁকে বক্তৃতা দিতে হয়েছে। আগস্টের এই বক্তৃতাই তার জীবনের শেষ প্রকাশ্য অনুষ্ঠান।
১৯৭১...: এলেনার হৃদ্‌পীড়া গুরুতর আকার ধারণ করছে। নভেম্বরের শেষে তাঁকে নিকটবর্তী একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে। সেখানেও দম্পতিকে একসঙ্গে রাখার জন্যে বিশেষ ব্যবস্থা করতে হয়েছে। অবশেষে ১৩ ডিসেম্বর রাত্রে বাখতিনের চিরসঙ্গিনী এলেনা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করছেন। মৃত্যুর একটু আগেও স্বামীর জন্যে চা তৈরির কথাই ভাবছিলেন তিনি। এলেনার মৃত্যু বাখতিনের বেঁচে থাকার ইচ্ছাই শুষে নিয়েছে। শুভানুধ্যায়ীরা তাঁকে সোভিয়েত লেখক সংঘের সদস্য হতে অনুরোধ করছেন। কেননা এতে আবাসন ও চিকিৎসার সমস্যা অনেকটা সমাধান হবে। বছরের শেষে নতুন বাসস্থানে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
১৯৭২...: মস্কোয় বাখতিনকে যাতে স্থায়ী আবাসিক বলে গণ্য করা হয় এজন্যে শুভানুধ্যায়ীরা রীতিমতো প্রচার আন্দোলন চালাচ্ছেন। তাঁদের চেষ্টায় শেষপর্যন্ত ৩১ জুলাই বাখতিনের বাসস্থান নির্দিষ্ট হচ্ছে। বই থেকে পাওয়া লভ্যাংশ এবং এলেনা দ্বারা সঞ্চিত অর্থের সাহায্যে লেখক সংঘের একটা বাসগৃহ কিনে নেওয়া হচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের সমস্ত সাহিত্যবোদ্ধার কাছে বাখতিন কার্যত ভাববিগ্রহে পরিণত হয়েছেন।
১৯৭৩...: মুখ্যত কোঝিনোভের চেষ্টায় সারান্‌স্ক থেকে আরও কিছু পুরোনো পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। শুভানুধ্যায়ীদের সমবেত চেষ্টায় কিছু কিছু প্রবন্ধ সংকলন প্রকাশিত হচ্ছে। অসুস্থতার মধ্যেও বাখতিন নিজে পরিমার্জনের কাজ করছেন। এবছর গ্রীষ্মে সময়-প্রকরণ ও ক্রনোটোপ সম্পর্কিত প্রতিবেদনের উপসংহার লিখেছেন। গোর্কি ইনস্টিটিউটের পত্রিকা কনটেক্সট-এর কর্ণধারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হচ্ছে। স্কলোভস্কি তখনও জীবিত; বাড়ি কাছাকাছি বলে প্রায়ই বাখতিনের সঙ্গে দেখা করতে আসছেন।
১৯৭৪...: সাহিত্য-গবেষণার পদ্ধতি সংক্রান্ত প্রবন্ধ লিখছেন তিনি। এবছরেই তা কনটেক্সট পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এটাই তার জীবিত অবস্থায় প্রকাশিত শেষ নিবন্ধ। বছরের শেষে তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হওয়ায় বাড়িতে দিন-রাত নার্সের ব্যবস্থাও করতে হচ্ছে। তা সত্ত্বেও তিনি গোগোল সম্পর্কিত একটি নতুন বইয়ের কাজ শুরু করেছেন। এবং ডস্টয়েভস্কি সম্পর্কিত আরেকটি বইয়ের প্রাথমিক খসড়া তৈরি করছেন। স্বভাবত এই দুটি রচনাপ্রকল্পের কিছু কিছু খসড়া মাত্র পাওয়া গেছে। এসময় নানা বিষয়ে বহু চিন্তা তিনি সূত্রাকারে রেখে গেছেন। তা সত্ত্বেও এদের মধ্যে মৌলিক চিন্তনের গভীরতা আশ্চর্যভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। আগস্ট মাসের পরে অবশ্য বাখতিনের ফুসফুসের পীড়া এত সঙ্কটজনক হয়ে উঠছে যে তিনি আর লেখার কাজ চালিয়ে যেতে পারছেন না।
১৯৭৫...: ৭ মার্চ রাত দুটোয় বাখতিনের দেহাবসান। মৃত্যুর আগে তাঁর অন্তিম উচ্চারণ ‘আমি তোমার কাছে যাচ্ছি।’ সারা জীবন ধরে দ্বিবাচনিকতার কর্ষণ যাঁর একমাত্র ধর্ম, তাঁর উচ্চারণে অমেয় ঈশ্বর নয়, প্রত্যুত্তর-যোগ্যতা সম্পন্ন অপর পরিসরের সঙ্গে সংযোগের অন্তহীন সম্ভাবনাই দ্যোতিত হয়েছে। দু’দিন পরে ৯ মার্চ, তাঁকে এলেনার পাশেই সমাহিত করা হয়। শেষকৃত্যে উপস্থিত রয়েছেন স্কলোভস্কি এবং বাখতিনের প্রিয় শিষ্য-ত্রয়ী কোঝিনোভ, বোচারোভ ও গাচেভ। তরুণ প্রজন্মের কাছে বাখতিন যুগস্রষ্টা গুরুর মর্যাদা পেয়েছেন বলে তাঁর মৃত্যু আলোড়ন তৈরি করেছে। যিনি বিশ্বাস করতেন, দ্বিবাচনিকতার পরিসর অনন্ত, তাঁর মরজীবনের অবসান হওয়ার পরেও অক্ষুণ্ণ রয়েছে চিন্তাজীবনের পরম্পরা। তাই বিশ শতকের শেষ দশক পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে তাঁর বইয়ের প্রকাশনা— রুশ ও ইংরেজি সহ পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায়।