২৭

শান্তিনিকেতন

 আজকের তোমাকে সব খবরগুলি দেওয়া যাক্। অনেক দিন পরে আজ আমার ইস্কুল খুলেচে, আজ থেকে ইস্কুল-মাষ্টারি ফের শুরু হ’লো। আজ সকালে তিনটে ক্লাস নিয়েচি। কিন্তু ছেলেরা সব আসেনি, খুব কম এসেচে। বোধ হয়, ব্যামোর ভয়ে আস্‌চে না। আমার বৌমা হঠাৎ কোথায় হারিয়ে গেছেন, জিজ্ঞাসা ক’রেচো। তিনি পাড়াতেই আছেন। আমি যে-ঘরে থাকি—তার সামনে এক লাল রাস্তা আছে, তা’র ঠিক ওধারেই এক দোতলা ইমারৎ তৈরি হচ্চে—তা’রই একতলা ঘরে তিনি বাস করেন। শ্রীমতী তুলসীমঞ্জরী তাঁকে অচ্ছী অচ্ছী কাহিনী শুনাতী হৈ, কিন্তু আমি সেটা আন্দাজে ব’ল্‌চি। কিছুকাল থেকে তা’র কণ্ঠস্বরও শুনিনি, তাকে দেখ্‌তেও পাইনি—তাই আশঙ্কা হ’চ্চে সে হয় তো তা’র সেই রূপকথার “কদু”র মধ্যে ঢুকে প’ড়েচে। যাই হোক্, পাড়ার সমস্ত খবর রাখ বার সময় আমি পাইনে, আমি কখনও বা আমার সেই কোণের ডেক্সে কখনও বা সেই লাইব্রেরি ঘরের টেবিলে ঘাড় হেঁট ক’রে কলম চালিয়ে দিনযাপন ক’র্‌চি। সামনেকার খাতা-পত্রের বাইরে যে-একটি প্রকাণ্ড জগৎ আছে, তা’র প্রতি ভালো ক’রে চোখ তুলে—যে দেখা, সে আর দিনের আলো থাক্‌তে ঘটে উঠ্‌চে না। সন্ধ্যার পরে সেই নীচের বারান্দায় খাবার টেবিলটা ঘিরেই বৈঠক হয়, সেখানে তর্ক হয় বিতর্ক হয় এবং মাঝে মাঝে গানও হ’য়ে থাকে। কারণ—আজকাল ফের আবার দুটি একটি ক’রে গান জ’ম্‌চে। সন্ধ্যার পরে সেই আমার কোণের বিছানায় তাকিয়া ঠেস্ দিয়ে কেরোসিনের আলোয় মৃদুমন্দস্বরে খাতা পেন সিল হাতে গান করি আর পশ্চিমের উন্মুক্ত বাতায়ন থেকে— তুমি ভাব্‌চো সেই বাতায়ন থেকে স্বর্গের অপ্সরীরা আমার গান শুন্‌তে আসেন—ঠিক তা নয়—সেই উন্মুক্ত বাতায়ন থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে কীটপতঙ্গ আস্‌তে থাকে,তাও যদি তারা আমার গান শুনে মুগ্ধ হ’য়ে আস্‌তো তা হলেও আমি মনে মনে একটু অহঙ্কার ক’র্‌তে পার্‌তুম,—তা’রা আসে ঐ ডীট্‌জ্ লণ্ঠনের কেরোসিন আলোটা লক্ষ্য ক’রে। উন্মুক্ত বাতায়ন থেকে হঠাৎ এক-একবার— আন্দাজ ক’রে বলো দেখি কী শুন্‌তে পাই? তুমি ভাব্‌চো, নক্ষত্র-লোক থেকে অনাহত বীণার অশ্রুত গীত-ধ্বনি? তা নয়;—এক সঙ্গে ভোঁদা, দানু, টম, রঞ্জু এবং এ মুল্লুকের যত দিশি কুকুরের তুমুল চীৎকার-শব্দ। যদি এরা আমার গান শুনে বাহবা দেবার জন্য এই আওয়াজ ক’র্‌তো তা হলেও বুঝ্‌তুম—কবির গানে চতুষ্পদ জন্তুরা পর্য্যন্ত মুগ্ধ—কিন্তু তা নয়, তা’রা স্বজাতি আগন্তুকের প্রতি অসহিষ্ণুতা প্রকাশ ক’রে স্বর্গ-মর্ত্ত্যকে চঞ্চল ক’রে তোলে—কবির গানে তা’রা কর্ণপাতও করে না। যাই হোক্, ভূতলের কুকুর থেকে আকাশের তারা পর্য্যন্ত সবাই যদিচ উদাসীন তবুও দুটো একটা ক’রে গান জ’ম্‌চে। ১৭ই অগ্রহায়ণ, ১৩২৫।