মা/দ্বিতীয় খণ্ড/পনেরো

—পনেরো—

 মামলা শুরু হলো···বিচাবকদের একজন একটা কাগজ নিয়ে পড়তে লাগলেন। উকিলেরা যেন তা শোনার তেমন দরকার বোধ না ক’রে আসামীদের সঙ্গে কথা বলতে লাগলো।

 হঠাৎ পেভেলের তেজোদৃপ্ত কণ্ঠস্বরে সবাই চমকিত হ’য়ে নির্বাক হ’য়ে গেলো—এখানে কোন আসামী বা জজ নেই···এখানে আছে শুধু বন্দী এবং বিজেতা।···

 জজ যেন উদাসভাবে বললেন, তারপর, এণ্ড্রি, নখোদ্‌কা, তুমি কি তোমার অপরাধ স্বীকার করছ?

 এণ্ড্রি সটান দাড়িয়ে গোঁফে তা দিয়ে চোখের কোণ দিয়ে চেয়ে বললো, আমার অপরাধ? কি করেছি আমি? চুরিও করিনি, খুনও করিনি! আমি শুধু বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি তেম্‌নি জীবন-যাত্রার, যাতে মানুষ বাধ্য হয় পরস্পর হানাহানি এবং রাহাজানি করতে।

 জজ বললেন, সংক্ষেপে জবাব দাও, ‘হাঁ’ কি ‘না’?

 এণ্ড্রিও সমান স্পর্ধার সঙ্গে কি একটা জবাব দিলো। শ্রোতৃমণ্ডলী তাতে বেশ একটু চঞ্চল হ’য়ে উঠলো। আসামীদের দিকে সবারই প্রশংসমান দৃষ্টি।

 ফেদিয়া মেজিন, তুমি জবাব দাও।

 মেজিন একলাফে উঠে দাঁড়ালো···জবাব আমি দেবোনা, দিতে চাইনে। আত্মপক্ষ সমর্থন করতে আমি অস্বীকৃত।···কোন-কিছু বলার ইচ্ছে নেই আমার। তোমাদের আদালতকে আইনসঙ্গত ব’লে আমি মনে করিনে। কে তোমরা? তোমাদের কি এক্তার আছে আমাদের বিচার করার? সে অধিকার কে দিয়েছে তোমাদের? জন-সাধারণ? না। আমি তোমাদের চিনিনে।···ব’লে সে টপ ক’রে ব’সে পড়লো।

 এরপর অভিনয়ের অন্যান্য দৃশ্যগুলি পর-পর অভিনীত হ’তে লাগলো। জজদের মন্তব্য, সরকারি উকিলের আলোচনা, শেখানো-পড়ানো সাক্ষীদের সাক্ষ্য!···কিছুকালের জন্য আদালত ভঙ্গ···তারপর সেসন আরম্ভ।

 শুরুতেই সরকারি উকিলের চার্জ-সীট দাখিল। অভিযুক্ত আসামীরা সদাহাস্য, নির্বিকার, তেজস্বী। জজরা যেন অসীম ঔদাসীন্য এবং নির্বিকারিতার এক-একটি ডিপো। সরকারি উকিলের লম্বা বক্তৃতা শোনার ধৈর্য যেন তাদের ছিল না।

 সরকারি উকিলের পর আসামীপক্ষের উকিলের ডাক পড়লো।

 একজন উকিল উঠে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, জীবন্ত শক্তিমান পুরুষ যে, যার অনুভূতি আছে, সাধুতা আছে, সে কখনও যথাশক্তি বিদ্রোহ না ক’রে পারে না, এই প্রাণহীন, প্রবঞ্চনাময়, মিথ্যাভরা জীবনের বিরুদ্ধে, সে কখনও না দেখে পারে না এই জ্বলন্ত বৈষম্য···

 সাবধান হ’য়ে কথা বলুন।

 উকিল বিন্দুমাত্র না দমে সমানভাবে বক্তৃতা চালাতে লাগলেন। ফলে সরকারি উকিল বেশ একটু গরম হ’য়ে উঠলেন, আর সঙ্গে সঙ্গে মেতে উঠলো আসামীদের প্রতি সহানুভূতি-সম্পন্ন শ্রোতৃদল।

 হঠাৎ সব চুপচাপ পেভেল উঠে দাঁড়িয়েছে। মা সাম্‌নের দিকে ঝুঁকে পড়লেন।

 পেভেল বলতে লাগলো, দলের লোক হিসেবে আমি মানি একমাত্র আমাদের দলের আদালতকে। এই আদালতে তাই আমি আত্মপক্ষ সমর্থন করবো না। আমি শুধু আপনাদের বোঝাতে চেষ্টা করবো, যা আপনারা বোঝেন না। সরকারি উকিল বলেন, সাম্যবাদের পতাকাতলে আমাদের এ জাগরণ নাকি কর্তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। আমরা নাকি জার-দ্রোহী ছাড়া কিছুই নই। আমি আজ আপনাদের কাছে বলতে চাই যে আমাদের দেশের বন্ধন-শৃঙ্খল একমাত্র জার নয়···তবে সর্বপ্রথম এবং সর্বঘনিষ্ট বন্ধন হিসাবে তাকে আমরা সরিয়ে ফেলতে বাধ্য। আমরা সাম্যবাদী··· অর্থাৎ ব্যক্তিগত সম্পত্তি, যার ফলে মানুষে মানুষে বৈষম্য, হানাহানি, স্বার্থের সংঘাত···এবং এই স্বার্থ-সংঘাত মিথ্যা দিয়ে ঢাকার অথবা সমর্থন করার চেষ্টা···অসত্য, শঠতা, ঈর্ষা-দুষ্ট সমাজেব আবির্ভাব···আমরা সেই ব্যক্তিগত সম্পত্তির শত্রু। যে-সমাজ মানুষের দাম কষে শুধু ধনোৎপাদনের যন্ত্র হিসাবে, সে-সমাজকে আমরা বলি অমানুষিক, সে সমাজ আমাদের বিরোধী, এর নীতির সঙ্গে আমরা বনিবনাও ক’রে চলতে পারিনে, এর দু’মুখো মিথ্যাবহুল হৃদয়হীনতা, মানুষের ওপর এর নিষ্ঠুর সম্পর্ক আমাদের কাছে অসহ্য। আমরা যুদ্ধ ক’রতে চাই···যুদ্ধ করব···এ সমাজের প্রত্যেক কায়িক এবং নৈতিক দাসত্বের বিরুদ্ধে: স্বার্থান্বেষীদের বৈষম্যমূলক সমাজ-ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। আমরা মজুর···দুনিয়ার সমস্ত কিছু সৃষ্টির মূলে আমাদের শ্রম···বিবাট যন্ত্র থেকে শুরু করে শিশুর হাতের খেলনাটি পর্যন্ত আমাদেরই তৈরি। সেই আমরা মনুষ্যোচিত মর্যাদারক্ষাকল্পে যুদ্ধ করার অধিকার থেকে বঞ্চিত। সবাই আমাদের খাটিয়ে নিতে চায়, খাটিয়ে নিতে পারে—স্বার্থসিদ্ধির যন্ত্র-হিসাবে। আমরা চাই সেই সমস্ত বিরুদ্ধ-শক্তিকে জয় করবার মতো স্বাধীনতা। আমাদের মন্ত্র সহজ। মানুষের জন্য সমস্ত শক্তি, মানুষের জন্য সমস্ত উৎপাদন-যন্ত্র, সমস্তের ওপর বাধ্যতা-মূলক কাজ, ব্যক্তিগত সম্পত্তির অবসান।···আপনারা দেখতে পাচ্চেন, আমরা আইনদ্রোহী নই।

 একজন জজ ব’ললেন, কাজের কথা বল।

 পেভেল স্পষ্টস্বরে বলতে লাগলো: আমরা বিদ্রোহী। ততদিন বিদ্রোহী থাকবো, যতদিন ব্যক্তিগত সম্পত্তি আছে,···যতদিন কেউ শুধু হুকুম চালায়, কেউ কেবল তার হুকুমে খাটে। যে-সমাজের স্বার্থরক্ষাকল্পে আপনারা নিযুক্ত, আমরা তার মরণ-শত্রু। আমরা জয়ী না হওয়া পর্যন্ত তার সঙ্গে কোন আপোস আমাদের হ’তে পারে না। আমরা···মজুররা জয়ী হবোই। সমাজ নিজেকে যতখানি শক্তিমান মনে করে, আদৌ সে ততখানি শক্তিমান নয়। যে সম্পত্তি সৃষ্টি এবং রক্ষাকল্পে লক্ষ লক্ষ লোক আজ দাসত্ব-নিগড়ে আবদ্ধ, যে বলপ্রভাবে সমাজ আজ মানুষের ওপর এতো শক্তিসম্পন্ন, তা-ই শ্রেণীতে শ্রেণীতে আজ জাগিয়ে তুলেছে এতো সংঘাত, ব’য়ে আনছে মানুষের কায়িক এবং নৈতিক মৃত্যু। দুনিয়ায় আজ যে এতো শক্তির অপব্যবহার তা শুধু এই ব্যক্তিগত সম্পত্তি রক্ষার দুরূহ চেষ্টার দরুণ। বাস্তবপক্ষে আমাদের চাইতে বড় গোলাম আপনারা—আমাদের বদ্ধ দেহ, আর আপনাদের বদ্ধ মন। সংস্কার এবং অভ্যাসের যে জগদ্দল পাথরের তলে প’ড়ে মন আপনাদের পিষ্ট, তা থেকে মুক্ত হবার সাধ্য আপনাদের নেই; কিন্তু মনকে মুক্ত করার পক্ষে কোনো বাধাই নেই আমাদের। আপনারা বিষ ঢেলেছেন আমাদের বাইরে, কিন্তু আমাদের মনে চলেছে তার চেয়েও প্রবলতর এক প্রতিক্রিয়া···তাই-ই আজ ক্রম-বর্ধমান অগ্নিশিখায় জ্ব’লে উঠেছে আমাদের মধ্যে; শুধু তাই নয়, আপনাদের শক্তিও নিচ্ছে শুষে। তার ফলে, মানুষ আদর্শের জন্য যেমনভাবে লড়াই করে, আপনাদের ক্ষমতার জন্য তা আপনারা পারছেন না। ন্যায়দণ্ড থেকে আত্মরক্ষার যত রকম যুক্তি হ’তে পারে, সব আপনাদের এরি মধ্যে নিঃশেষ হয়ে গেছে। ভাবের জগতে নতুন কোন-কিছু আর সৃষ্টি করতে পারেন না আপনারা, ভাবজগতে আপনারা দেউলে। নব-ভাবের ভাবুক আমরা, উত্তরোত্তর দীপ্ত হ’য়ে উঠছে আমাদের মন, আমাদের উদ্বুদ্ধ ক’রে তুলছে মুক্তি-সংগ্রামে! সুমহান্ পবিত্র ব্রতের কথা স্মরণ ক’রে দুনিয়ার সকল মজুব আজ একপ্রাণ হ’য়ে দাঁড়িয়েছে। নিষ্ঠুরতা এবং হৃদয়হীনতা ছাড়া আপনাদের আর কিছু নেই, যা এই নব-জাগ্রত জীবনের পথে তুলে ধরতে পারেন বাধার মতো। কিন্তু আমরা জানি যে-হাত দিয়ে আজ আপনারা আমাদের কণ্ঠরোধ করতে যাচ্ছেন, তাই-ই কাল এসে মিলবে আমাদের হাতে বন্ধুর মতো। আপনাদের শক্তি স্বর্ণশক্তি, একান্তই প্রাণহীন···আপনাদের তা শুধু বিভক্ত করছে পরস্পর-বিধ্বংসী দলে। আর আমাদের শক্তি জীবন্ত-শক্তি— মজুরদের ক্রমবর্ধমান আত্মসংবিতের ওপর তার প্রতিষ্ঠা। আপনারা যা করেন সবই অন্যায়; কারণ সবেরই উদ্দেশ্য মানুষের চার পাশে দাসত্বের বেড়াজাল সৃষ্টি করা। আমাদের কাজ পৃথিবীকে মুক্ত করবে আপনাদের লোভ এবং বিদ্বেষ-প্রসূত ভ্রান্তি ও বিভীষিকা হ’তে। মানুষকে আপনারা টেনে ছিঁড়ে নিয়েছেন তার জীবন থেকে, তাকে আপনারা করেছেন শতধা-বিভক্ত। সাম্যবাদ এই বিছিন্ন জগতকে এক ক’রে জুড়ে এক বিরাট শ্রেণীহীন-সমাজের সৃষ্টি করবে। এ হবে, হবে।···

 পেভেল থামলো। জজরা দস্তুরমতো উষ্ণ হ’য়ে উঠলেন। পেভেলের সঙ্গে বেশ কড়া ভাষায় এবং চড়া সুরে একজন জজ কথা বলায় পেভেল শান্ত কিন্তু শ্লেষ-ভরা কণ্ঠে জবাব দিলো: আমার বক্তব্য শেষ হয়ে এসেছে। আপনাদের ব্যক্তিগত অপমান করা আমার ইচ্ছা ছিল না। সত্য কথা বলতে কি, এই যে রঙ্গাভিনয়···যাব নাম আপনারা দিয়েছেন বিচার, তার অনিচ্ছুক দর্শক হিসাবে আপনাদের অবস্থা দেখে আমার কষ্টই হয়! শত হ’লেও আপনারা মানুষ···আর মানুষ, তা হ’ক না সে আমাদের শত্রু, তাকে পশুবলের কাজে এমন নির্লজ, হীন, আত্মমর্যাদাবোধশৃন্য দেখতে প্রাণে লাগে।···

 জজের দিকে দৃকপাত না ক’রে সে বসে পড়লো।

 এণ্ড্রি এবং অন্যান্য সঙ্গীরা পেভেলকে আনন্দে অভিনন্দিত করলো।