য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি/খসড়া

প রি শি ষ্ট

য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি
খসড়া

সবুজ সমুদ্র, নীল তীর, মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। ভারতবর্ষের প্রতি একান্ত আকর্ষণ। ভারতবর্ষ যেন বাহু বাড়িয়ে রয়েছে। জীবনের যত সুখ যত ভালােবাসা ঐখেনেই। বেচারা দরিদ্র অক্ষম স্নেহময় ভারতবর্ষ। ক্রমে সন্ধ্যা। ক্রমে তীর তিরােহিত। Lighthouse―সাগরে ভাসমান সন্তানদের জন্যে ভূমিমাতার জাগ্রত দৃষ্টি। মনে হল মিথ্যা সভ্যতা, মিথ্যা জীবনসংগ্রাম— মিথ্যা য়ুরােপীয় উন্নতিচক্রের আকর্ষণ― নিষ্ফল দুরাশা― বাংলার এক প্রান্তে ভালােবাসার একটু সুরক্ষিত নীড়, এই আমাদের ঢের। এই মহা প্রবহমাণ মানবস্রোতের মধ্যে আমাদের পড়বার কী দরকার ছিল! আমরা চতুর্দিকে মানসিক বেড়া দিয়ে কালস্রোত বন্ধ করে দিয়ে বেশ আরামে গুছিয়ে বসেছিলুম। কোন্ ছিদ্র দিয়ে চির-অশান্ত মানবস্রোত এসে পড়ে আমাদের সমস্ত ছারখার [করে] গুলিয়ে দিয়ে গেল! আজ আমাদের এই মৃদু ক্ষীণ প্রাণের মধ্যে এত দুরাশার আক্ষেপ কেন এনে দিলে? কেন দুরাশা ঐ য়ুরােপীয় বহ্নিশিখার প্রতি আমাদের আকর্ষণ করছে? আমাদের মাথার উপরে হিমালয় এবং পদতলে সমুদ্রবাধা আরও দুর্গম হল না কেন? বেশ অজ্ঞাত নিভৃত বেষ্টনের মধ্যে একদল মানুষ আটকে থাকত। সমুদ্রের এক অংশ কালক্রমে বদ্ধ হয়ে, একটি নিভৃত শান্তিময় সুন্দর একটি হ্রদ যেমন নিস্তরঙ্গভাবে চিরদিন কেবল আকাশের প্রভাত-সন্ধ্যার ছায়া আপনার মধ্যে অঙ্কিত করে।

 ২২ অগস্ট্। শুক্রবার। ১৮৯০। শ্যাম। মঙ্গলবার পর্যন্ত একটা দিন বলে ধরা যেতে পারে। Seasickness। রাত্তিরে পরের ক্যাবিনে ঢুকে পরের কম্বল অপহরণ। স্বপ্ন। লােকেনের প্রতি মানসিক অসদ্ভাব।― মঙ্গলবারে ডেকে উঠে লােকেনের প্রতি অসাধারণ আসক্তি। বুধবারে প্রশান্ত সমুদ্র, উজ্জ্বল সূর্যালােক, কবিত্ব চিন্তা ও তজ্জাতীয় কথােপকথন। বৃহস্পতিবারে চমৎকার দিন— চিঠি লেখা। রাত্রে চন্দ্রালােকে একটা দেড়টা পর্যন্ত আলােচনা। ঘন বৃষ্টি। তার পরদিন সমস্ত দিন বৃষ্টি। সল্লিকে চিঠি। অতি ধীর গতি। দুই-একটা পাহাড়-পর্বতের রেখা। চমৎকার সন্ধ্যা। চন্দ্রালােকে এডেন। হঠাৎ জাহাজ-বদল। দীর্ঘ জাহাজ, সহস্র আলােকচক্ষু। জিনিসপত্র গােলমাল। দুই দল দুই দিকে। মাসেলিয়া জাহাজ। নতুন লােকজন।

 পুরােনাে জাহাজের সহযাত্রী― মাতৃহীন কতকগুলি মেয়ের একটি রুগ্ন বাপ― বেচারা! একটি চিরহস্যময় বালক civilian। Gambling।― নতুন জাহাজের সর্বোচ্চ ছাত। অনেক রাত্রে ছাড়লে। শান্ত সমুদ্র, জ্যোৎস্না রাত, বেশ বাতাস। ডেকে নিদ্রা। নতুন লােক। একটি মেয়ের প্রতি বহু পুরুষের দৃষ্টি। অনেক ছােটো ছােটো ছেলেমেয়ে। আজ শনিবার [৩০ অগস্ট্]। ব্যান্‌ড্‌ বেশ লাগছে। সল্লি ও কুমুদের চিঠি― বেশ রৌদ্র― সবসুদ্ধ বেশ। লােকেন নীরব। দুর সমুদ্রতীরের আরবদেশের পাহাড়গুলাে রৌদ্রে ক্লান্ত ও ঝাপসা দেখাচ্ছে― যেন তন্দ্রার ছায়া পড়ে অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে।


 আমি লােকটা স্বভাবতঃ একটু চুপচাপ এবং একটু কোণ ভালােবাসি। দুই-একজন যাদের ভালােবাসি তাদের কাছের গােড়ায় নিয়ে বেশ একটুখানি সন্ধ্যালােক এবং একটু মধুর চিন্তার মধ্যে থাকা আমার জীবনের একমাত্র সাধ। দুশ্চিন্তা, দুশ্চেষ্টা, প্রবল কর্মপ্রখর আমােদ ―আমার নয়। কিন্তু আমি কাউকে পাই নে। কারও চুপ করে বসে থাকবার সময় নেই, পৃথিবীতে আমি এবং সন্ধ্যা এবং আকাশ এবং সৌন্দর্য ছাড়া আরও ঢের জিনিস আছে, কত কর্তব্য কত উদ্দেশ্য আছে, পৃথিবী খুব বেগে চলছে। কাজেই আমাকে কেবল একলা বসে থাকতে হয়। তাও পেরে উঠি নে— কাজেই যারা উদ্দাম বেগে কর্তব্যের দিকে এবং আমােদর দিকে যাচ্ছে তাদের সঙ্গ রাখবার জন্যে আমার চিন্তা ফেলে, সন্ধ্যা ফেলে, তাড়াতাড়ি ছুটতে হয়। সুতরাং আমার ভাবটা না তাদের মতো, না আমার মতাে; না খাটতে পারি হাসতে পারি, না ভাবতে পারি উপভােগ করতে পারি― না আমি পৃথিবীর সেবক, না আমি পৃথিবীর নবাব।

 আমরা পুরাতন ভারতবর্ষীয়, ভারী প্রাচীন, ভারী শ্রান্ত। আমি অনেক সময়ে নিজের মধ্যে আমাদের জাতীয় প্রাচীনত্ব অনুভব করি— বিশ্রাম এবং চিন্তা এবং বৈরাগ্য। আমাদের যেন এখন ছুটির সময়। যা উপার্জন করা গেছে তারই উপরে নিশ্চিন্তে শেষ বেলাটা কাটাবার সময়। এমন সময় হঠাৎ দেখা গেল অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে―যে ব্রহ্মত্রটুকু পাওয়া গিয়েছিল তার ভালাে দলিল দেখাতে পারি নি বলে নতুন রাজার রাজত্বে ক্রোক হয়ে গেছে। হঠাৎ আমরা গরিব। পৃথিবীর চাষারা যে রকম খাটছে এবং খাজনা দিচ্ছে আমাদেরও তাই করতে হবে। পুরাতন জাতকে নতুন চেষ্টা আরম্ভ করতে হয়েছে। চিন্তা রাখো, বিশ্রাম রাখাে, গৃহকোণ ছাড়ো―কঠিন মাটির ঢেলা ভাঙো— পৃথিবীকে উর্বরা করাে এবং নব মানব -রাজার রাজত্ব দেও। উঠেছি তো, চলেওছি― দেখাচ্ছি খুব কাজের লােক হয়েছি― কিন্তু ভিতরে ভিতরে কতটা নিরাশ্বাস কতটা নিরুদ্যম। থেকে থেকে মনে হয় আমরা কাজের লােকের সঙ্গে কিছুতেই তাল রেখে চলতে পারব না, অথচ আমাদের বিশ্রাম এবং শান্তির অবসর রইল না। হায়, ভারতবর্ষের বেড়া ভেঙে মনুষ্যস্রোত কেন আমাদের মধ্যে এসে পড়ল! কেন আমাদের লজ্জা দিচ্ছে, কেন আমাদের দায়ে ফেলে নিষ্ফল কাজে লাগাচ্ছে― পুরাতন বনেদী বংশের দারিদ্র্য কেন পৃথিবীর সামনে প্রচার করছে! তবে ওঠো- political agitation করাে―joint Stock company খােলো― শিথিল মাংসপেশী নিয়ে মাঞ্চেস্টরের সহস্র লৌহবাহুর সঙ্গে লড়তে আরম্ভ করো― দেখাে কী হয়। কিন্তু আমি যুবা বটে, তােমাদের বয়সী বটে, তবু সভায় যাই নে, চাঁদার খাতা নিয়ে ঘুরি নে, খবরের কাগজে লিখি নে— আমি নিতান্ত জীর্ণ ভারতবর্ষীয়― আমি ভাবি, কী হবে! শেষ রক্ষা করবে কে!

 অথচ ইচ্ছা আছে। যখন দেখি মানবস্রোত চলেছে, বিচিত্র কল্লোল, প্রবল গতি, মহান্ বেগ, অবিশ্রাম কর্ম, তখন আমার মন নেচে ওঠে― তখন ইচ্ছা করে সহস্র বৎসরের গৃহপ্রাচীর ভেঙে ফেলে বেরিয়ে পড়ি। আবার তখনি মনে হয়, যখন পিছিয়ে পড়ব তখন ফিরব কোথায়! যখন সবাই ফেলে যাবে তখন দাঁড়াব কোথায়! তার চেয়ে পৃথিবীপ্রান্তে এই অজ্ঞাতবাস ভালাে, এই ক্ষুদ্র সুখ এবং অগাধ শান্তি ভালাে। তখন মনে হয় আমরা কিছু অসভ্য বর্বর নই; আমরা যন্ত্র তৈরি করতে পারি নে, জগতের সমস্ত নিগূঢ় খবর বের করতে পারি নে, কিন্তু খুব ভালােবাসতে পারি, ক্ষমা করতে পারি, পরস্পরের জন্যে জায়গা ছেড়ে দিতে পারি। অপেক্ষা করে দেখা যাক পৃথিবীর এই নতুন সভ্যতা করে আমাদের কোমলতা দেখে আমাদের ভালােবাসবে, কবে আমাদের দুর্বলতা দেখে অবজ্ঞা করবে না, কবে তাদের নূতন উন্নতি, যৌবনের বলাভিমান এবং জ্ঞানাভিমান কালক্রমে নরম হয়ে আসবে এবং আমাদের স্নেহশীলতা দেখে আমাদের প্রতি স্নেহ করবে― দুর্বল হয়েও, অনেকগুলাে বিষয়ে নূতন সংবাদ না রেখেও, আমাদের কেবল কোমল হৃদয়টুকু নিয়ে মানবপরিবারের মধ্যে স্থান পাব। গােরাদের মােটা মােটা মুষ্টি, প্রচণ্ড দাপট এবং নিষ্ঠুর অসহিষ্ণুতা দেখে আপাতত সে দিন কল্পনা করা দুরূহ হয়ে পড়ে। আচ্ছা, নাহয় তাই হল, আমরা নাহয় এক পাশেই পড়ে রইলুম, Timesএর স্তম্ভে আমাদের নাম নাহয় নাই উঠল― আপনা-আপনি ভালােবেসেই কি যথেষ্ট সুখ পাব না?

 নিদেন আমি তাে আপনাকে তাই বােঝাচ্ছি। তােমরা কাজ করছ বােধ হয় ভালােই করছ— আমি পারি নে, আমার বিশ্বাস এবং উৎসাহ জাগে না, আমি কাছাকাছির মধ্যে ভালােবেসে যতটা পারি সুখে থাকি এবং যতটা পারি সুখে রাখি।

 কিন্তু দুঃখ আছে, দারিদ্র্য আছে, ক্ষমতার অত্যাচার আছে, অসহায়ের অপমান আছে, কোণে বসে ভালােবেসে তার কী করবে! হায়, ভারতবর্ষের সেই তাে দুঃসহ কষ্ট! আমরা কার সঙ্গে যুদ্ধ করব! রূঢ় মানবপ্রকৃতির চিরন্তন নিষ্ঠুরতার সঙ্গে! প্রবলতা চিরদিন দুর্বলতার প্রতি নির্মম, আমরা সেই আদিম পশুপ্রকৃতিকে কী করে জয় করব? সভা ক’রে? দরখাস্ত ক’রে? আজ একটু ভিক্ষে নিয়ে, কাল একটা লাঠি খেয়ে? তা কখনােই হবে না। প্রবলের সমান প্রবল হয়ে? তা হতে পারে বটে। কিন্তু যখন ভেবে দেখি য়ুরোপ কত দিকে প্রবল, কত কারণে প্রবল—যখন এই অসীম শক্তিকে একবার সর্বতােভাবে অনুভব করে দেখি— তখন কি আর আশা হয়? তখন মনে হয়, এসাে ভাই, সহিষ্ণু হয়ে থাকি, প্রবল হতে না পারি তবু ভালাে হবার চেষ্টা করি এবং ভালােবাসি।

 আমি যখন Matthew Arnoldএর কবিতা পড়ি তখন মনে ইয় য়ুরােপীয় সভ্যতার মধ্যে যতটুকু প্রাচীন হয়ে পড়েছে তারই যেন আপনার কথা শুনতে পাচ্ছি। হঠাৎ এই অবিশ্রাম কর্ম এবং জীবনসংগ্রামের মধ্যে একটা শ্রান্তি এবং সন্দেহ এসে ক্ষীণ স্বরে বলছে, ওগাে, একটু রোসো, একটু থামাে― এসব কী হচ্ছে একটু ভাবো, একটু ভাবতে সময় দাও। মানুষ কেবল হাঁস্‌ফাস্ করে খাটবার জন্যে হয় নি, মাঝে মাঝে চুপচাপ করে ভাবা আবশ্যক। যখনি একটা জাত আপনার কাজের হিসেব নিতে যায়, যখনি সে আপনাকে জিজ্ঞাসা করে ‘এতদিন যা করলে তার থেকে অবশেষে হল কী’, তখনি বােঝা যায় তার পাক ধরতে আরম্ভ করেছে। যখন মানুষ কেবল কাজের প্রবাহে প্রাণের উৎসাহে আপনি কাজ করে যায় তখনি তার বল। য়ুরােপে এখন সকল বিষয়েরই নিকেশের খাতা বেরিয়েছে। ধর্ম বলো, মানবহৃদয়ের সহস্র উচ্চ-আশা মহৎপ্রবৃত্তি বলো, সকলেরই খানাতল্লাসি চলছে। একটা বড়াে বিশ্বাসের জায়গায় ছােটো ছােটো সহস্র মত বাস করছে। যেমন একটা বৃহৎ প্রাণীর মৃতদেহে সহস্র ক্ষুদ্র প্রাণী জন্মগ্রহণ করে— কিন্তু সেটা জীর্ণতারই লক্ষণ।

 এমন নয় যে আমাদের কিছুই নেই, আমরা একেবারে বর্বর জাতি। এমন নয় যে বেদুয়িনদের মতাে আমাদের মাথার উপরে কেবল শূন্য আকাশ এবং পায়ের নীচে উদাস মরুভূমি। আমরা একটি অত্যন্ত জীর্ণ প্রাচীন নগরে বাস করি— এত প্রাচীন যে এর ইতিহাস লুপ্তপ্রায় হয়ে গেছে, মানুষের হস্তলিখিত স্মরণচিহ্নগুলি শৈবালে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে— সেই জন্যে ভ্রম হচ্ছে এ নগর যেন মানব-ইতিহাসের অতীত, যেন প্রাচীন প্রকৃতির এক রাজধানী। মানবপুরাবৃত্তের রেখা লুপ্ত করে দিয়ে প্রকৃতি আপন শ্যামল অক্ষর এর সর্বাঙ্গে বিচিত্র আকারে লিখে রেখেছে—সহস্র বৎসরের বর্ষা আপন অশ্রুচিহ্ন রেখে গেছে এবং সহস্র বসন্ত এর প্রত্যেক ভিত্তিছিদ্রে আপন যাতায়াতের তারিখ চিরহরিৎ অঙ্কে অঙ্কিত করে গেছে। এক দিক থেকে একে নগর বলা যেতে পারে, এক দিক থেকে একে অরণ্য বলা যায়। এর মধ্যে কেবল ছায়া এবং বিশ্রাম, চিন্তা এবং বিষাদ বাস করতে পারে— এখানকার ঝিল্লিমুখরিত অরণ্যমর্মরের মধ্যে, এখানকার বিচিত্রভঙ্গী জটিল শাখাপ্রশাখা ও রহস্যময় পুরাতন অট্টালিকাভিত্তির মধ্যে সহস্র সহস্র ছায়াকে কায়াময়ী ও কায়াকে ছায়াময়ী বলে ভ্রম হয়― এখানকার এই প্রাচীন মহাছায়ার মধ্যে সত্য এবং কল্পনা ভাইবােনের মতাে নির্বিবােধে আশ্রয় গ্রহণ করেছে, অর্থাৎ প্রকৃতির বিশ্বকার্য এবং মানবের মানসিক সৃষ্টি পরস্পর জড়িত বিজড়িত হয়ে নানা আকারের ছায়াকুঞ্জ নির্মাণ করেছে, সেখানে ছেলেমেয়েরা সারাদিন খেলা করে এবং বয়স্ক লােকেরা স্বপ্ন দেখে, প্রখর সূর্যালােক ছিদ্রপথে সেখানে প্রবেশ করে ছােটো ছােটো মানিকের মতাে দেখায়। প্রবল ঝড় শত শত সংকীর্ণ শাখাপথের জটিলতার মধ্যে প্রতিহত হয়ে সেখানে এসে মৃদু মর্মরের মধ্যে মিলিয়ে যায়। এখানে জীবনমৃত্যু সুখদুঃখ আশানৈরাশের সীমাচিহ্ন মিলিয়ে এসেছে― অদৃষ্টবাদ এবং কর্মকাণ্ড, বৈরাগ্য এবং সংসারযাত্রা এক সঙ্গে চলেছে। এখানে কি তােমাদের জগৎযুদ্ধের সৈন্যশিবির স্থাপন করবার জায়গা! এখানকার জীর্ণ ভিত্তি কি তােমাদের কলকারখানা, তােমাদের শৃঙ্খলিত অগ্নিগর্ভ দুরন্ত লৌহদৈত্যদের কারাগার নির্মাণের যােগ্য! তােমাদের প্রবল উদ্যমের বেগে এর শিথিল ইষ্টকগুলিকে ভূমিসাৎ করতে পারো বটে, কিন্তু তার পরে পৃথিবীর এই অতি প্রাচীন শ্রান্ত জাতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে! এরা বহুদিন স্বহস্তে গৃহনির্মাণ করে নি― সেই এদের মহৎ গর্ব যে প্রাচীন আদিপুরুষের বাস্তুভিত্তি এদের কখনাে ছাড়তে হয় নি; কালক্রমে অনেক অবস্থাবৈসাদৃশ্য অনেক বংশবৃদ্ধি অনেক নূতন সুবিধে-অসুবিধার সৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু সবগুলিকে টেনে নিয়ে, নূতনকে এবং পুরাতনকে, সুবিধেকে এবং অসুবিধেকে সেই পিতামহপ্রতিষ্ঠিত এক ভিত্তির মধ্যে ভুক্ত করা হয়েছে; সামান্য অসুবিধের খাতিরে এরা কখনাে স্পর্ধিতভাবে নূতন গৃহবৃদ্ধি বা পুরাতন গৃহসংস্কার করে নি; যেখানে গৃহছাদের মধ্যে ছিদ্র হয়েছে সেখানে বটের শাখা অথবা কালসঞ্চিত মৃত্তিকাস্তরে ছায়া দান করেছে। এই মহা নগরারণ্য ভেঙে গেলে একটি বৃহৎ প্রাচীন শ্রান্ত জাতি একেবারে গৃহহীন― কেবল তাই নয়—একটি সহস্র বৎসরের প্রেতাত্মা এখানে যে চিরনিভৃত আশ্রয় গ্রহণ করেছিল সেও নিরাশ্রয়― তার আর-কোনাে ইতিহাস নেই, তার জন্মমৃত্যুর তারিখ নেই, সে কেবল এই প্রাচীন অধিবাসীদের ভগ্ন গৃহের মধ্যে বহুকাল আপন প্রাণহীন প্রাণ বহন করে আসছে। তােমরা হঠাৎ এসে বলছ― ওঠো, তােমরা জেগে ওঠো—এ-সমস্ত ভেঙেচুরে বদলে ফেলাে― ইতিমধ্যে পৃথিবীর অনেক পরিবর্তন হয়েছে এখন কর্মের যুগ পড়েছে, অমূলক চিন্তার সময় নেই। আমরা ভীত হয়ে তােমাদের বলছি এবং আপনাদের বােঝাবার চেষ্টা করছি— ঠিক কথা— মানবের উন্নতি-সাধনের জন্যে কর্ম আবশ্যক, কিন্তু এমন কর্মস্থান আর কোথায় আছে! দেখাে, এইখানেই মানব-ইতিহাসের প্রথম যুগে আর্য-বর্বরের যুদ্ধ হয়ে গেছে― এইখানে কত রাজ্যপত্তন কত নীতিধর্মের অভ্যুদয় কত সভ্যতার সংগ্রাম হয়ে গেছে, এই সমস্ত ভগ্নস্তুপের মধ্যে অনুসন্ধান করলে তার সহস্র চিহ্ন পাওয়া যাবে। অতএব আমাদের সমস্ত প্রস্তুত আছে, কিছুই করবার আবশ্যক নেই। তােমরা শুনে হাসছ, মনে করছ অনেক দিন নিদ্রামগ্ন থেকে ‘ছিল’ এবং ‘আছে’র মধ্যেকার প্রভেদ আমরা ভুলে গেছি— মধ্যে স্বহস্তে কিছু পরিবর্তন করি নি ব’লেই মনে করছি যা ছিল ঠিক তাই আছে। মনে করছ, এ একটা আলস্যের নির্‌বুদ্ধিতামাত্র। কিন্তু আমরা মুখে যাই বলি আমাদের আসল কথাটা বুঝে দেখো। আসল কথাটা হচ্ছে, আমরা কাজ করতে পারব না, কিন্তু তা বলে আমাদের অধিক লজ্জার বিষয় নেই—কেননা, আমরা আমাদের কাজ শেষ করেছি, আজকাল আমাদের কাজ ফুরিয়ে গেছে। আমরা মানবসভ্যতার খানিকটা ভিত্তি গেঁথে বিশ্রাম করতে বসেছি— এখন তােমাদের পালা, তােমরা কাজ করো। অবিশ্বাস কর যদি, অকর্মণ্য বলে যদি লজ্জা দাও, তবে আমরা বলব― তােমাদের ঐ তীক্ষ্ণ ঐতিহাসিক কোদাল দিয়ে ভারতভূমি থেকে যুগসঞ্চিত বিস্মৃতির মৃত্তিকাস্তর উঠিয়ে দেখাে মানবসভ্যতার ভিত্তিতে আমাদের হস্তচিহ্ন আছে কি না। তােমরা যে নতুন কাণ্ড করতে আরম্ভ করে দিয়েছ এখনাে তার শেষ হয় নি, এখনাে তার সমস্ত সত্য মিথ্যা স্থির হয় নি। মানব-অদৃষ্টের যা চিরন্তন সমস্যা এখনাে তার কোনােটার মীমাংসা হয় নি। তােমরা অনেক জেনেছ, অনেক পেয়েছ, কিন্তু সুখ পেয়েছ কি? আমরা যে বিশ্বসংসারকে মায়া বলে বসে আছি এবং তােমরা যে একে ধ্রুব সত্য বলে খেটে মরছ, তােমরা কি আমাদের চেয়ে বেশি সুখী হয়েছ? তােমরা যে বর্তমান সভ্যতাকে পরম জটিল করে প্রচণ্ড জীবিকাসংগ্রাম বাধিয়ে দিয়েছ, এর শেষ ফল কি তােমরা দেখতে পাচ্ছ? তােমরা যে অহর্নিশি নুতন নূতন অভাব আবিষ্কার করে দরিদ্রের দারিদ্র্য উত্তরােত্তর বাড়াচ্ছ, স্বাস্থ্যজনক গৃহের বিশ্রাম থেকে অবিশ্রাম কর্মের উত্তেজনায় টেনে নিয়ে যাচ্ছ, কর্মকে সমস্ত জীবনের কর্তা করে প্রবল উন্মাদনাকে বিশ্রামের স্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছ, এমনকি স্ত্রীলােকদেরও গৃহকর্ম থেকে বের করে হয় আমােদর মত্ততা নয় জীবনের রণক্ষেত্রে টেনে নিয়ে যাচ্ছ, তােমরা কি জেনেছ তােমরা কী করছ? তােমরা কি জানাে তােমাদের উন্নতি তােমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? আমরা জানি আমরা কোথায় এসেছি, আমরা গৃহের মধ্যে অল্প অভাব এবং গাঢ় স্নেহ নিয়ে পরস্পরের সঙ্গে আবদ্ধ হয়ে নিত্যনৈমিত্তিক ক্ষুদ্র নিকটকর্তব্যসকল পালন করে যাচ্ছি। আমাদের যতটুকু সুখসমৃদ্ধি আছে ধনী-দরিদ্রে, দূর ও নিকট সম্পর্কীয়ে, আত্মীয় অতিথি অনুচর ও ভিক্ষুকে মিলে ভাগ করে নিয়েছি; যথাসম্ভবমত লােক যথাসম্ভবমত সুখে কাটিয়ে দিচ্ছে― কেউ কাউকে ত্যাগ করতে চায় না। এবং জীবনঝঙ্কার তাড়নায় কেউ কাউকে ত্যাগ করতে বাধ্য হয় না। এই সহস্র সহস্র বৎসরে ভারতবর্ষ জীবনের এই এক মহৎ তত্ত্ব আবিষ্কার করেছে সুখের যথার্থ উপায় সন্তোষ— এবং সমস্ত সমাজনীতির দ্বারা ভারতের গৃহে গৃহে ও অন্তরে অন্তরে সেই সন্তোষ প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছে। যেটা খুঁজেছে সেটা পেয়েছে এবং সেটা দৃঢ়বদ্ধমূল করে দিয়েছে। তার আর-কিছু করবার নেই। সে বরঞ্চ তার বিশ্রামকক্ষে বসে তােমাদের উন্মাদ জীবন-উপপ্লব দেখে তােমাদের সভ্যতার সফলতা সম্বন্ধে সংশয় অনুভব করতে পারে। মনে করতে পারে, কালক্রমে অবশেষে তােমরা যখন একদিন কাজ বন্ধ করবে তখন কি এমন ধীরে এমন সহজে এমন বিশ্রামের মধ্যে অবতরণ করতে পারবে? আমাদের মতাে এমন কোমল এমন সহৃদয় পরিণতি লাভ করতে পারবে কি? উদ্দেশ্য যেমন ক্রমে ক্রমে লক্ষ্যের মধ্যে নিঃশেষিত হয়, উত্তপ্ত দিন যেমন অবশেষে সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ হয়ে অলক্ষ্যে সন্ধ্যার অন্ধকারের মধ্যে অবগাহন করে, সেই রকম মধুর সমাপ্তি লাভ করতে পারবে কি? না, কল যে রকম হঠাৎ বিগড়ে যায়, উত্তরােত্তর অতিরিক্ত বাষ্প ও তাপ সঞ্চয় ক’রে এঞ্জিন যে রকম সহসা ফেটে যায়, একপথবর্তী দুই বিপরীতমুখী রেলগাড়ি পরস্পরের সংঘাতে যেমন অকস্মাৎ থেমে যায়, সেই রকম প্রবলবেগে একটা নিদারুণ অপখাতসমাপ্তি লাভ করবে? যাই হোক, তোমরা এখন অপরিচিত সমুদ্রে অনাবিষ্কৃত তটের সন্ধানে চলেছ। অতএব তোমাদের পথে তোমরা যাও, আমাদের গৃহে আমরা থাকি এই কথাই ভালো।

 কিন্তু গৃহরক্ষা হয় কী করে! যদি বাইরের কোনো উৎপাত থাকত তা হলে তো কোনো কথাই ছিল না। কিন্তু অজানা অচেনা লোক আমাদের এই নিভৃত নগরের মধ্যে প্রবেশ করেছে। আমাদের ইটগুলি খুলে, আমাদের গাছগুলো কেটে, তারা আপনাদের ঘর বানাতে চায়; বহু যত্নে আমাদের ছেলেদের মুখে যে অম্নের গ্লাসটি তুলে দিচ্ছি পরের ছেলের [জোয়ান গোঁয়ার] বাপগুলি এসে তা কেড়ে নিচ্ছে। এখন বিশ্রাম থাকে কোথায়? প্রাচীন হও আর শ্রান্ত হও আর নিজের প্রতি যে রকম স্তোকবাক্যই প্রয়োগ করো, আর প্রাচীন পুথি থেকে প্রমাণ সংগ্রহ করে নিজেকে যতই সম্মান ও সমাদর করে, আহার তোত চাই, অপমান এবং দারিদ্র্য থেকে সন্তানদের রক্ষা করা তো চাই, যখন চার দিকে অসংযত বলের খেলা এবং নিষ্ঠুর জীবিকাসংগ্রাম তখন আত্মরক্ষার জন্যে সক্ষমতা লাভ করা তো চাই। এ কথা তো বললে চলবে না— 'আমরা প্রাচীন হয়েছি অতএব মরণ হলে দুঃখ নেই।

 আরও একটা কথা। সুখ বলে একটা জিনিস কিছুই নেই— সুখটিকে একটি দুর্লভ রত্নের মতো সংগ্রহ করে একটি কৌটোর মধ্যে পুরে ট্যাকের মধ্যে খুঁজে কেউ বলতে পারে না বা হয়ে গেল আমার আর কিছু করবার নেই। বিচিত্র মানবপ্রবৃত্তির চর্চাই সুখ। জীবনের প্রবাহই সুখ। অভাব যত অধিক, জীবিকা সংগ্রাম যত দুরূহ, সভ্যতা যত জটিল, মানবমনের বিচিত্র বৃত্তির আলােড়ন ততই বেশি। সন্তোষ আর সুখ এক নয় সে কথা আমরাও জানি। আমরা যখন বলি সুখের চেয়ে সােয়াস্তি ভালাে তখনই স্বীকার করি সুখ ও সন্তোষ দুই স্বতন্ত্র পদার্থ। কিন্তু সুখের চেয়ে সন্তোষ আমরা প্রার্থনীয় মনে করি। কেননা দুর্বলের জন্য সুখ নয়— সুখ বলসাধ্য, সুখ দুঃখসাধ্য। অক্‌সিজেন যেমন প্রতি মুহূর্তে আমাদিগকে দগ্ধ করিয়া জীবন দেয়, মানসিক জীবনে সুখ সেই রকম আমাদের দাহ করে। যৌবনে এই দাহ যে রকম প্রবল বার্ধক্যে সে রকম নয়― কিন্তু তাই বলে বৃদ্ধেরা বলতে পারে না যে, তাপহ্রাসই যথার্থ জীবন এবং সন্তোষই যথার্থ সুখ। এই পর্যন্ত বলতে পারে ‘আমার পক্ষে আবশ্যক নেই’। অতএব, কোণে বসে য়ুরােপের সুখ য়ুরােপের প্রাণ অস্বীকার করবার কারণ দেখা যায় না।

 কেবল বিচার্য বিষয় এই, এর একটা সীমা আছে কি না। যতই প্রবৃত্তির উত্তেজনা ও আকাঙ্ক্ষার বিকাশ বাড়ছে ততই তার কিয়ৎপরিমাণ চরিতার্থতাও একান্ত দুর্লভ হয়ে উঠছে কি না। ততই জীবনের সফলতা লাভের জন্যে গুরুতর ক্ষমতার আবশ্যক হচ্ছে কি না এবং সে ক্ষমতা স্বভাবতই অপেক্ষাকৃত অল্পতর ও সুযােগ্যতর লােকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হচ্ছে কি না। এই রকমে উত্তরােত্তর দুঃখী লােকের সংখ্যা বাড়ছে কি না। সমাজে সুখবিভাগের যত বৈষম্য হয় ততই তার পক্ষে বিপদ কি না। ভারতবর্ষে যেমন জ্ঞানসম্পদ কেবল ব্রাহ্মণদের মধ্যে বদ্ধ হয়ে পড়েছিল ব’লে জ্ঞানের অনেক বিভাগের আরম্ভ মাত্র হয়েছিল কিন্তু পরিণতি হয় নি, চতুর্দিক্‌বর্তী বিপুল ভ্রান্ত সংস্কারের স্রোত এসে তাকে প্লাবিত কয়ে দিয়েছিল, তেমনি সৌভাগ্য যদি সমাজের এক অংশের মধ্যেই বন্ধ হতে থাকে তা হলে ক্রমে দারিদ্র্যদুঃখের সংঘর্ষে তা বিপর্যস্ত হয়ে যাবে কি না।

 দ্বিতীয় কথা— fittestরাই survive করে, কিন্তু fitness অনেক রকমের আছে। কেউ বা কঠিন ব’লে বাঁচে, কেউ বা কোমল ব’লে বাঁচে। কেউ বা উন্নত হয়ে বাঁচে, কেউবা নত হয়ে বাঁচে। গাছ এক রকম করে বাঁচে, লতা আর-এক রকম করে বাঁচে। আমরা যে মনে করছি বিরােধীপক্ষের সঙ্গে যুদ্ধ করে বাঁচব, বাস্তবিক আমাদের সে যােগ্যতা আছে কি? জাতির মধ্যে কি বৈচিত্র্য নেই? সকলেরই কি টেঁকবার এক রকম উপায়? খুব সম্ভবত সহিষ্ণুতা এবং নম্রতা ছাড়া আমাদের আর বাঁচবার কোনাে উপায় নেই। অতএব আমরা যে য়ুরোপীয়দের সমকক্ষ হবার আকাঙ্ক্ষা পােষণ করছি সে কি বাঁচবার পথে যাচ্ছি না মরবার পথে যাচ্ছি? আমরা যদি আমাদের স্বাভাবিক মৃদু কোমলতা রক্ষা করি তা হলেই কি প্রবলের কঠিনতা সহজে সহ্য করতে পারব না? আমরা যদি কঠিন হই তা হলেই কি কঠিনতরের আঘাতে ভেঙে যাব না? কিন্তু প্রশ্ন উত্থাপন করা বৃথা। স্রোতে আমাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ইংরাজিশিক্ষা যখন স্বভাবতই আমাদের একমাত্র প্রধান শিক্ষা হচ্ছে, দুর্বলের প্রতিও যখন জীবনের প্রবলতার একটা প্রচণ্ড আকর্ষণ আছে, তখন বিজ্ঞ বিবেচনার কথা বলা বাহুল্য— এবং কে জানে সে কথা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত কি না এবং কে জানে ভবিষ্যতে জাতীয় জীবন এবং বহির্‌ঘটনা পরস্পরে মিলে আপনাদের মধ্যে একটি চমৎকার সামঞ্জস্য স্থাপন করবে কি না।


 শনিবারটা [৩০ অগস্ট্] চলছে। খানিকটা ভাবছি খানিকটা লিখছি— খানিকটা ছেলেদের খেলা দেখছি— খানিকটা Band শােনা যাচ্ছে— মাঝে মাঝে জাহাজ, মাঝে মাঝে পাহাড় অনুর্বর কঠিন কালাে দগ্ধ তপ্ত জনহীন, মাঝে মাঝে তীরশূন্য সমুদ্র— এইরকম করে সূর্যাস্তের সময় হল। Band বাজছে। Castle of Indolence যদি কোথাও থাকে তাে সে হচ্ছে জাহাজ― বিশেষতঃ গরম দিনে প্রশান্ত Red Seaর উপরে― ইংরেজ-তনয়রাও সমস্ত দিন ডেকের উপর আরাম-কেদারায় পড়ে দিবাস্বপ্ন দেখছে― কেবল জাহাজ চলছে, এবং তার দুই পাশের আহত নীল জল নাড়া খেয়ে অলস আপত্তির ক্ষীণস্বরে পাশ কাটিয়ে একটুখানি সরে যাচ্ছে― আর বিকেলের দিকে বাতাসও একটু একটু বইতে আরম্ভ করেছে— জগতের আর-সমস্ত স্বপ্ন দেখছে— দুই-একটা শাদা লঘু মেঘখণ্ড তারাও নড়ছে না।—

 সূর্য অস্ত গেছে। আকাশের এবং জলের চমৎকার রঙ হয়েছে। সমুদ্রের জলে একটি রেখা মাত্র নেই। দিগন্তবিস্তৃত অটুট জলরাশি নিটোল সুডোল কোমল পরিপূর্ণ যৌবনের মতাে স্তব্ধ হয়ে রয়েছে। এমন একটা জায়গায় এসেছে যার ঊর্ধ্বে আর গতি নেই, পরিবর্তন নেই, যা অবিশ্রাম চাঞ্চল্যের পরম পরিণতি, চরম নির্বাণ। সন্ধের সময় চিল আকাশের যে-একটা সর্বোচ্চ নীলিমার সীমার কাছে গিয়ে সমস্ত পাখা সমতল রেখায় বিস্তার করে দিয়ে হঠাৎ গতি বন্ধ করে দেয়― চিরচঞ্চল সমুদ্র ঠিক যেন সহসা সেই রকম একটা চরম প্রশান্তির শেষ সীমায় এসে ক্ষণেকের জন্যে পশ্চিম অস্তাচলের দিকে মুখ করে স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছে। জলের যে চমৎকার রঙ হয়েছে তাকে আকাশের ছায়া বললে যেন ঠিক বলা হয় না—যেন এই মাহেন্দ্রক্ষণে সন্ধ্যাকাশের স্পর্শ লাভ করে হঠাৎ সমুদ্রের অতলস্পর্শ অন্ধকার গভীরতার মধ্যে থেকে একটা আকস্মিক প্রতিভার দীপ্তি স্ফূর্তি পেয়েছে― সে কতটা তার কতটা আকাশের বলা যায় না। আমাদের কত কবিতা কত গান আর-এক জনের দুখানি নেত্রের ছায়া― এও সেই রকম। সমুদ্রের এবং আকাশের সেই আশ্চর্য রঙ দেখে কেবল মনে হচ্ছিল ঠিক এইটেকে ব্যক্ত করতে পারি এমন ভাষা কোথায়? আবার তখনি মনে হল দরকার কী? আমার মধ্যে এ চঞ্চলতা কেন? এই সমুদ্রের এবং আকাশেরই মতাে আমার মনের সমুদয় চেষ্টা নির্বাণ লাভ করে না কেন? হৃদয়ের সমুদয় তরঙ্গকে একেবারে থামিয়ে দিয়ে কেন কেবল চেয়ে থাকি নে? এই বৃহৎকে ছােটোর মধ্যে বেঁধে আপন আয়ত্তের মধ্যে পেতে চাই কেন? সবই ধরতে হবে, রাখতে হবে এই কেবল চেষ্টা! অনেক সময় এই রকম দুশ্চেষ্টার বশে, যতটুকু পাওয়া যেতে পারে তাও ভালো করে পাবার সময় থাকে না।

 কিন্তু মনে হয় সমুদ্র এবং আকাশের মধ্যেকার এই দুর্লভ সন্ধ্যাটুকু যদি পারিজাতপুষ্পের মতাে তুলে নিয়ে কারও হাতে না দিতে পারি তবে কিছুই হল না। এই আলাে এই শান্তি কেবল চেয়ে দেখবার এবং মুগ্ধ হবার জন্যে নয়, কিন্তু মানুষের ভালােবাসার উপরে এই আলাে ফেলবার জন্যে। ঠিক এই উজ্জ্বল ম্লান নিভৃত উদার সন্ধ্যার ঠিক মর্মস্থলে যদি আমরা দুজনে দাঁড়াতে পারি তা হলে আমরা যেন আপনাদের আরও বেশি বুঝতে পারি, আরও বেশি ভালােবাসি। কারণ, ভালােবাসা বােঝাতে গেলে সৌন্দর্যের ভাষা চাই এবং চারি দিকের নিস্তব্ধতা চাই। এমন আলােক, এমন বর্ণ, এমন ভাষা আমরা নিজের মধ্যে কোথায় পাব! এই বৃহৎ প্রকৃতি যখন তার একটা চরম মুহূর্তে আমাদের আচ্ছন্ন ক’রে আমাদেরই অন্তরের কথা ব্যক্ত ক’রে বলে তখন আমাদের আর-কোনাে চেষ্টার আবশ্যক করে না— কেবল ভাললবাসবার পূর্ণ অবসর পাওয়া যায়, ভালােবাসা প্রকাশ করবার আবশ্যকটুকুও থাকে না। এ কথা হয়তাে সকলে বুঝতে পারবে না। কিন্তু এ কথা নিশ্চয় সত্যি যে, ঐ আকাশ আমারই অসীম দৃষ্টির মতাে এবং এই সমুদ্র আমারই ভালােবাসামুগ্ধ হৃদয়ের মতাে এই মুহূর্তে এই সমুদ্রে আমার আপনাকে ব্যক্ত করবার জন্যে একটি কথা বলবার আবশ্যক থাকত না। যদি এর অনুরূপ একটি কথা থাকত তা হলে সেইটি লিখে নিয়ে যেতুম, যে শুনত সে সমস্ত বুঝতে পারত। থাক্‌গে—কবিত্ব থাক্। রাত্তিরে ডিনার-টেবিলে Inspector-General of Policeএর সঙ্গে লােকেনের তর্ক, আরও দুই-একজন যােগ দিয়েছিল।

 রবিবার [৩১ অগস্ট্‌]। সকালে Evansএর সঙ্গে জ্ঞানেমােহনের বিষয় এবং ব্রাহ্মবিবাহ সম্বন্ধে অনেক আলােচনা হল, তাতে সে কতকটা আশ্বাস দিলে― কিন্তু ভালাে করে ভেবে দেখলে অনেক ব্যাঘাত দেখা যায়। আজ সকালে এখানে উপাসনা হল। একটা মেয়ে ভারী বিরক্ত করেছিল― একে তাে সে যােগ দেয় নি, তার পরে হো হো করে হাসছিল— এমন খারাপ লাগছিল! যখন উপাসকরা সবাই মিলে গান গাচ্ছিল আমার বেশ লাগছিল। এর মধ্যে সমস্ত মানবের কণ্ঠধ্বনি শােনা যায়, চির-অজ্ঞাত চিররহস্যের দিকে ক্ষুদ্র মানবহৃদয়ের কী-একটা বিশ্বাসের গান উঠছে! আশ্চর্য! ঐ মেয়েটা মাঝে মাঝে যখন সেই গানে যােগ দিচ্ছিল তখন আমার নিতান্ত blasphemous বলে ঠেকছিল, তার অট্টহাস্যও তত খারাপ ঠেকে নি। বিশ্বাস না থাকলে কি হৃদয়ও থাকতে নেই? আজ breakfastএর সময় একটা খবরের সৃষ্টি করা গেল। রুটি কাটতে গিয়ে ছুরিটা ছিটকে সবলে আমার দুটো আঙুলের উপর পড়ল, রক্ত ছিটকে উঠে চার দিকে ছড়িয়ে পড়ল― খানিকটা বরফ দিয়ে ন্যাপ্‌কিনে আঙুল জড়িয়ে ক্যাবিনে ছুট। গা বমি করতে লাগল। অনেক ক্ষণ বাদে ডাক্তারের ঘরে গেলুম, সে আমার হাত বেঁধে দিলে―দিতে দিতে মাথা ঘুরে এল, অন্ধকার দেখতে লাগলুম, কানে শুনতে পেলুম না― এমনি লজ্জা করতে লাগল! অনর্থক অনেক রক্তব্যয় করেছি— না দেশের জন্যে, না ধর্মের জন্যে, না স্বার্থের জন্যে। সমস্ত দিন কিছু-না-কিছু লিখেছি। আমরা এদের সকলকে দূরে পরিহার করে যে রকম একটা কোণ ঘেঁষে আছি তাতে বেশ বােঝা যায় এরা একটু piqued হয়, আমার সেটা মন্দ লাগে না। ভাবে এরা কজন বিদ্রোহী নব্যবঙ্গবাসী।

এমন মধুর ক’রে তুমি ভাবিতে পারাে না মােরে—
এমন স্বপন এমন বেদন এমন সুখের ঘােরে।
এমন বাতাস জলের বিলাস এমন আকাশ -মাঝে,
শুনিতে পাও না কেমন করিয়া উদাস বাঁশরী বাজে!
এমন অলস বেলা, অলস মেঘের মেলা,
সারাদিন ধরে জলেতে আলােতে এমন অলস খেলা!
জীবনতরণী ভাসিয়া চলেছে মরণ-অকূল-বাগে,
দিবসে নিশীথে সুদূর হইতে তােমার বাতাস লাগে।
এমনি করিয়া ধীরে  মিশাব সুদূর নীরে,
যেমন করিয়া সন্ধ্যানীরদ মিশায় নিশীথতীরে।
তখন বারেক চাহিয়া দেখিয়ো করুণ নয়ন তুলি—
বিদায়ের পথ আঁধারে ঢাকিবে, তার পরে যেয়ো ভুলি।
সন্ধ্যা আসিবে যবে  তোমার মধুর ভবে
দিবসের শেষে শ্রান্ত হইবে জীবনের কলরবে—
তখন বারেক আসিয়াে আবার দাঁড়াইয়ো ঐখানে,
ক্ষণেকের তরে চেয়ে দেখাে ঐ অস্ত-অচল-পানে

যেখানেতে শেষ দেখা  রাখিয়া গিয়াছে রেখা
জ্যোতিময় এক অমর অশ্রু তারা-আলােকেতে লেখা―
বাকি আর-সব স্তব্ধ নীরব তিমিরনিরাশ নিশি,
অজানা অপার অকূল আঁধার প্রসারিয়া দশদিশি।
cancelled ..

 সোমবার [১ সেপ্‌টেম্বর]। সকালবেলাটা শরীর ভালাে ছিল না, চুপচাপ কাটিয়ে দিয়েছি। দুই-একজন লোক আপনি আলাপ করে গেল। এরা কাল থেকে জানতে পেরেছে আমরা Tagores, তাই কাল থেকে কাছাকাছি ঘুর্‌ঘুর্‌ করছে। [কাল] একটা কবিতা লেখার চেষ্টা করা গেছে, সেটাতে মনের ভাব ভালাে ব্যক্ত হয় নি। বদলাতে হবে। টিফিনের পর সেলুনে বসে বাবিকে চিঠি লিখতে বসেছি— তরঙ্গ উঠে আমাকে এবং আমার চিঠিগুলােকে ভিজিয়ে দিলে, তাতে দুই-একজন এসে আহা-উহু করে গেল। সন্ধের পর আহারান্তে চুপচাপ করে ডেকের উপর জমিয়েছি, লােকেন একটা চৌকির উপরে অগাধ নিদ্রামগ্ন, মেজদাদা চুরট টানছেন― এমন সময়ে নিচেকার ডেকে নাচের বাজনা বেজে উঠল— সকলে মিলে নাচের ধুম পড়ে গেল। মহা-ঘুর্‌পাক মহা-উত্তেজনা চলছে― তখন পূর্বদিকে নবকৃষ্ণপক্ষের ঈষৎ ভাঙা চাঁদ ধীরে ধীরে উঠতে আরম্ভ করেছে— এই তীররেখাশূন্য জলময় মহামরুর পূর্বসীমান্তে চাঁদের পাণ্ডুর আলোেক পড়ে সে দিকটা ভারী একটা অসীম ঔদাস্য এবং নৈরাশ্যের ভাবে পূর্ণ দেখাচ্ছিল। চাঁদের উদয়পথের নীচে থেকে আমাদের জাহাজ পর্যন্ত একটা প্রশস্ত দীর্ঘ আলােকপথ ঝিক্‌ঝিক্‌ করছে— এই বিজন সমুদ্রের মাঝখানে প্রকৃতি চুপিচুপি আপন প্রশান্ত সৌন্দর্যে উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে। সমই ধীরে নীরবে সুন্দর হয়ে উঠছে, রাত্রির সুমধুর শান্তি একটি রজনীগন্ধা-কুঁড়ির শুভ্র পাপড়ির মতাে অলক্ষিত নিঃশব্দে ক্রমশঃ প্রসারিত হয়ে যাচ্ছে― আর মানুষগুলাে পরস্পরকে জড়াজড়ি করে ধরে পাগলের মতাে ঘুরপাক খাচ্ছে― ভারী আমােদ করছে— সর্বাঙ্গের রক্ত গরম হয়ে মাথায় ফেনিয়ে উঠছে, বিশ্বসংসার সমস্ত ঘুরছে, হাঁপাচ্ছে, তপ্ত হয়ে উঠছে― আশ্চর্য কাণ্ড! লােকলােকান্তরের নক্ষত্র স্থিরভাবে চেয়ে রয়েছে এবং দূরদুরান্তরের তরঙ্গ ম্লান চন্দ্রালােকে অনন্তকালের চিরপুরাতন গাথা সমস্বরে গান করছে― এই রজনীতে এই আকাশের নীচে এবং এই সমুদ্রের উপরে কতকগুলি পরিচিত-অপরিচিত লােক জুড়ি-জুড়ি জড়াজড়ি করে লাঠিমের মত বোঁ বোঁ করে ঘুর খাওয়াকে খুব সুখ মনে করছে—একটু লজ্জা নেই, সংযম নেই, চিন্তা নেই, পরস্পরের মধ্যে একটা শােভন অন্তরাল নেই। আমি এটা কিছুতেই ভালাে বুঝতে পারি নে। যাক্‌গে, মরুক্‌গে, যাদের ঘুরুনি পায় ঘুরুক্‌গে— আমার যা আছে তাই আমার থাক্। আমার এই চন্দ্রালােককে নিয়ে কোনাে ইংরেজের ছেলে polka নাচতে পারবে না। কিন্তু বাস্তবিক ভয় হয়, পাছে সর্বজয়ী ইংরেজ-তনয় আমার জীবনের কোনাে-একটি অচল শান্তিসুখকে টেনে নিয়ে এমনি করে polka নাচায়।

 মঙ্গলবার [২ সেপ্‌টেম্বর]। সকালে ডেকে বেড়াবার সময় Evansএর সঙ্গে আমার বেশ দীর্ঘ আলাপ হয়, বেশ লাগে। আজ সকালে দেখলুম সে একটা নিতান্ত বেচারা ইংরেজ-বাচ্ছার কাছে modern thoughts and modern scienceএর কথা পেড়েছে, সে ব্যক্তি নিতান্ত বিক্ষিপ্ত উদ্‌ভ্রান্ত উদ্‌বিগ্ন হয়ে খানিকটা ইতস্তত করে দে-ছুট দিলে। Evans হতাশ্বাস হয়ে চৌকিতে বসে পড়ল। আমি তার কাছে একটা কথা পাড়লুম। আমি বললুম আমি Ibsenএর নাটক পড়ছিলুম, তাতে একটা এই আশ্চর্য ব্যাপার দেখলুম― যত-সব স্ত্রীলােকেরাই সমাজবিপ্লবের জন্যে ব্যাকুল এবং পুরুষেরাই সমাজের প্রাচীন সংস্কারসকলের উপর আকৃষ্ট হয়ে আছে। বরাবর জানি মেয়েরাই সমাজের বন্ধন। আমার বােধ হয় বর্তমান য়ুরােপীয় সভ্যতা এমন আকার ধারণ করেছে যাতে স্ত্রীলােকেরা বিশেষ অসুখী হয়ে আছে। জীবিকাসংগ্রাম এতদূর প্রবল হয়েছে যে, সমস্ত শক্তি তাতেই প্রয়ােগ করতে হচ্ছে, গৃহের জন্যে অতি অল্প অবশিষ্ট থাকে— লােকেরা চতুর্দিকে বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ছে, পুরুষেরা বিয়ে করতে চাচ্ছে না—এ রকম স্থলে স্ত্রীলােকের অবস্থা সেই অনুসারে পরিবর্তিত না হলে তারা সুখী হতে পারে না। এই জন্যে য়ুরােপীয় মেয়েদের মধ্যে একটা বিপ্লবের ভাব দেখা দিয়েছে। নিহিলিস্ট্ সম্প্রদায়ের মধ্যে অনেক মেয়ে আছে, তারা পুরুষের চেয়ে প্রচণ্ড। ক্রমে ভারতবর্ষের কথা উঠল। শিক্ষিত অশিক্ষিত দুই জাত। জনসংখ্যাবৃদ্ধিবশতঃ বেহার প্রভৃতি অঞ্চলের ভবিষ্যৎ -আশঙ্কা। কুলি-চালান নিয়ে বাংলা কাগজের পাগলামি। Elective Principle। আমি বললুম আসল ব্যাপারটা হচ্ছে, তােমরা আমাদের অত্যন্ত নির্দয়ভাবে অবজ্ঞা কর, তােমরা আমাদের প্রতি মনুষ্যোচিত ব্যবহার কর না ব’লেই আজকাল এই-সব গােলমাল উঠেছে— আমরা যদি তােমাদের কাছ থেকে ভদ্রতা, কঞ্চিৎ সম্মান ও সদয় ব্যবহার, পেতুম তা হলে আমরা বেশ সস্তুষ্টচিত্তে কালযাপন করতুম— But the very small courtesy with which you nationally treat us hurts our selfrespect and we try to make up for it by striving to get a larger share in the administration, and by making ourselves thoroughly obnoxious to you। আমি বললুম, অ্যাংলােইন্‌ডীয় সমাজে তােমরা সচরাচর এমনভাবে আমাদের সম্বন্ধে কথাবার্তা কও যে, আমাদের প্রতি রূঢ় হওয়া তােমাদের স্বাভাবিক ও অভ্যস্ত হয়ে যায়। Evans এ কথা খুব মেনে নিলে। সে বললে, এখন যে-সব সিভিলিয়ান আসে তাদের অধিকাংশের কোনাে বংশমর্যাদা নেই, তারা ভদ্রতা কাকে বলে একেবারে জানে না ইত্যাদি। আজ সমস্ত দিন প্রায় চিঠি লিখতে গেল।

 বুধবার [৩ সেপ্‌টেম্বর]। আবার Evansএর সঙ্গে পূর্বোক্ত বিষয়ে কথাবার্তা। Lord Riponএর policyর নিন্দা, Lord Dufferinএর প্রশংসা, ডফারিন সম্বন্ধে আমাদের পেট্রিয়ট্‌দের ব্যবহার নিতান্ত নির্বোধ ও আত্মঘাতী। দশটার সময় সুয়েজ খালের মুখে এসে জাহাজ থামল। চমৎকার রঙের খেলা― কত রকম নীল এবং কত রকম হলদে— পাহাড়ের উপর রৌদ্রছায়া এবং নীলবাষ্প, বালির তীররেখা ঘন হলদে, ঘন নীল সমুদ্রের ধারে চমৎকার দেখাচ্ছে। খালের মধ্যে দিয়ে সমস্ত দিন জাহাজ অতি ধীর গতিতে চলছে, দু ধারে তরুহীন বালি― কেবল মাঝে মাঝে এক-একটি ছােটো ছােটো কোটা বহুযত্নবর্ধিত গাছপালায় বেষ্টিত হয়ে বড় আরামজনক দেখাচ্ছে। আজও সমস্ত দিন চিঠি লেখা। অনেক রাত্তিরে অর্ধচন্দ্র উঠল— চন্দ্রালােকে দুই তীর অস্পষ্ট, ধুধু করছে—কাল অনেক রাত জেগেছি― কেবল বাড়ির জন্যে প্রাণ টানে― আমার মতাে গৃহপােষ্য জীব পাওয়া যায় না। রাত ২।৩টের সময় পাের্ট্ সৈয়েদে পৌঁছনো গেল― সেখানে কয়লা তােলার ধুম। বিশেষ দ্রষ্টব্য শহর নয়।

 বৃহস্পতিবার [৪ সেপ্‌টেম্বর]। Mediterranean। এই আসলে য়ুরােপে পড়লুম। ঈষৎ ঠাণ্ডা বাতাস দিচ্ছে। সমস্ত দিন Spectator প্রভৃতি কাগজ পড়েই কেটে গেল। Mediterranean চমৎকার নীল।

 শুক্রবার [৫ সেপ্‌টেম্বর]। দিনটা লিখতে লিখতেই কেটে গেল। আজ আর ডেকে শােওয়া হল না। ঠাণ্ডা পড়ে আসছে। ক্যাবিনে শয়ন। আজ জাহাজের ডেকে stage বেঁধে একটা entertainment হবে তার উদ্যোগ। Baldwinএর দল অভিনয় করবে। প্রথমে amateurদের কাণ্ড, কারও বা পিয়ানাে টিং টিং, কারও বা ক্ষীণ কণ্ঠে গান। তার পরে Mrs Baldwin প্রথমে পুরুষ masher সেজে তার পরে midshipmanএর বেশ ধ’রে বেশ comic গান গেয়েছিল এবং বেশ নেচেছিল। তার পরে ব্যালে নাচ, নিগ্রোর গান, জাদু, একটা ছােটো প্রহসন প্রভৃতি বহুবিধ কাণ্ড হয়েছিল। মাঝে Sailors’ Homeএর জন্যে চাঁদা-আদায়ও হল। সকলে খুব আমােদ পেয়েছিল। আজ বিকেলে Crete দ্বীপের তীরপর্বত দেখা দিয়েছিল।

 শনিবার [৬ সেপ্‌টেম্বর]। আজ ব্রেক্‌ফাস্ট্ খেয়ে অবধি বাড়িতে চিঠি লিখছি। শুনলুম ইতিমধ্যে একটা জলস্তম্ভ দেখা দিয়েছিল। গ্রীসের তীর আমাদের দক্ষিণে দেখা দিয়েছে। লােকেনের টানাটানিতে একবার চিঠি রেখে উঠে গিয়ে দেখে এলুম। এই সেই গ্রীস! —লিখতে লিখতে এক সময়ে বাঁয়ে চেয়ে দেখি lonian Islands দেখা দিয়েছে। পাহাড়ের মাঝে মাঝে ছােটা ছােটো সাদা বাড়ি— আরও একটু এসে পাহাড়ের কোলের মধ্যে সমুদ্রের ধারে একটি বড়ো শহর, মানুষের শ্বেত মৌচাক—সন্ধান করে জানলুম দ্বীপের নাম Zanthe, শহরের নামও তাই। উপরে গিয়ে দেখি আমরা দুই শৈলশ্রেণীর মাঝখান দিয়ে সংকীর্ণ সমুদ্রপথে চলেছি— আকাশে মেঘ করে এসেছে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, ঝড়ের সম্ভাবনা। আমাদের দোতালা ডেকের চাঁদোয়া খুলে ফেললে। পর্বতের উপর ঘন মেঘ নেবে এসেছে— কেবল দূরে একটা পাহাড়ের উপর মেঘছিদ্রমুক্ত অস্পষ্ট সন্ধ্যালােক পড়েছে, আর সবগুলাে আসন্ন ঝটিকার ছায়ায় আচ্ছন্ন। হঠাৎ একটু প্রবল বাতাস এবং খুব বৃষ্টি আরম্ভ হল― তাতেই কেটে গেল আর ঝড় এল না। ভূমধ্যসাগরে আকাশের অবস্থা অনেক সময়ে অনিশ্চিত। আমরা যেখান দিয়ে এলুম এ জায়গা দিয়ে সচরাচর জাহাজ আসে না। জায়গাটা নাকি ভারী ঝােড়াে। রাত্তিরে ডিনারে Woodroff কাপ্তেনের Health-প্রস্তাব ও সকলে মিলে তার গুণগান করলে। আজ রাত্তিরে জিনিসপত্র বাঁধতে হবে, কাল ব্রিন্দিসি পৌঁছব।

 রবিবার [৭ সেপ্‌টেম্বর]। সকালে ব্রিন্দিসি পৌঁছনো গেল। লাগেজ-তদারক এক বিষম ল্যাঠা। এক প্রকাণ্ড omnibus― দুটি রােগা ঘােড়া। লােকে ও মালে পরিপূর্ণ। আস্তে আস্তে চলল। রাস্তা পাথরে বাঁধানাে। এক জায়গায় লােকে পরিপূর্ণ— আজ হাট― ব্যান্‌ড বাজছে—খুব যেন একটা-কিছু ধুমধামের ব্যাপার আছে। বিবিধ রকমের ফলের ঝুড়ি― সারি সারি জুতো সাজানাে দেখলুম। স্টেশনে এসে লােকেন আমাদের চিঠিগুলাে এবং তার মাশুল একজন লােকের হাতে দিলে কিন্তু সে ব্যক্তি যে রীতিমত মাশুল লাগিয়ে পােস্ট করবে আমার বিশ্বাস হল না। অবশেষে একটা গাড়ি নিয়ে আবার বেরােলুম। ডাকঘরে চিঠি দিয়ে বাঁচলুম। জ্যোৎস্নাকে meet করবার জন্যে সতুকে একটা এবং তারকবাবুকে একটা পৌঁছসংবাদ টেলিগ্রাফ করা গেল। দুই-এক থােলাে আঙুর পথ থেকে কিনে আবার স্টেশনে ফিরলুম। এখন তাে পুল্‌মান গাড়িতে চড়েছি। একটা মস্ত গাড়ি— ডাইনে বাঁয়ে সারি-সারি কতকগুলাে মক্‌মল-মােড়া জোড়া জোড়া মুখোমুখী ছােটো seats― মাথার উপরে শােবার বন্দোবস্ত লট্‌কানো, বােধ হয় রাত্তিরে টেনে দিয়ে বিছানা করে দেবে। গাড়িতেই খাবার সেলুন। একটা মাত্র নাবার ঘর আছে বােধ হয়— এত লােকে মিলে হাত মুখ ধােওয়া নাওয়া নিয়ে বোধ হয় কিঞ্চিৎ গােল বাধবে। যা হােক, ট্রেনে চড়ে বসে বেশ নিশ্চিন্ত বােধ হচ্ছে। মেঘ করে টিপ্‌টিপ্‌ বৃষ্টি হচ্ছে। আহার করে এলুম। প্রথমে দুই দিকে কেবল আঙুরের ক্ষেত। তার পরে olive-বাগান। বামে দূরে পর্বত, দক্ষিণে সমুদ্র, মধ্যে কেবল অলিভ-বন। বাঁকাচোরা, গ্রন্থি ও ফাটল-বিশিষ্ট, বলি-অঙ্কিত গাছ―পাতাগুলাে যেন ঊর্ধ্বমুখ― খুব যত্নে যেন চাষ করা― আমাদের দেশের মতাে জঙ্গল নয়― ফাঁক ফাঁক পোঁতা― পাহাড়ে জায়গা― চষা জমির মধ্যে পাথরের কুচি— এক-এক জায়গায় গাছতলায় ভেড়া চরছে। মাঝে মাঝে সমুদ্রের ধারে এক-একটি ছােটো শহর আসছে― চর্চচুড়া-মুকুটিত শাদা ধব্‌ধবে নগরটি সমুদ্রের নীল চিত্রপটের উপর চমৎকার দেখাচ্ছে। (ব্রিন্দিসিতে নাববার সময় Evans আমাকে দেখালে ইটালীয় পুলিসম্যানেরা সৈনিকবেশে তলােয়ার নিয়ে বেড়ায়। বললে, এর থেকে বােঝো এখানকার গবর্মেন্ট্ কিরকম; এদের অনেক রকমের institutions আছে, কিন্তু freedom নেই। আমরা সাড়ে-এগারােটার সময় ব্রিন্দিসি ছাড়ি।) এক-একটা অলিভ গাছ এমন বেঁকে ঝুকে পড়েছে যে পাথর উচু করে করে তাকে ঠেকো দিয়ে রাখতে হয়েছে। শীত তেমন বেশি নয়। আমাদের পৌষের চেয়ে কম বােধ হয়, তবে শীত গ্রীষ্ম সম্বন্ধে তুলনা ভারী শক্ত। প্রায়ই একটা-না-একটি সমুদ্রতীরের শহর। ঐ সামনের শহরটা মস্ত মনে হচ্ছে।― দু ধারে কেবল ফলের বন এবং আঙুরের ক্ষেত― মাঝে মাঝে এক-একটা পাথরের বাড়ি। ছােটোখাটো শহর, শাদা সােজা রাস্তা। ক্ষেতগুলাে পাথরের টুকরাে উচু উচু ক’রে বেড়া-দেওয়া। এখনাে ডাইনে সমুদ্র দেখা যাচ্ছে— বামের পর্বত গেছে। ক্ষেতের মাঝে মাঝে পাথর উঁচু করে গােলাঘরের মতাে করে রেখেছে বােধ হল। মাঝে মাঝে কূপ, চক্রযন্ত্রে জল তােলে। থোলো থোলো বেগুনি আঙুর ফলে রয়েছে। সমুদ্র আর দেখতে পাচ্ছি নে, ডাইনে বাঁয়ে তরুহীন অপার সমতল চষা মাঠ। ডাইনে খুব দূরদিগন্তে পাহাড়ের নীল রেখা। অবিচ্ছিন্ন অলিভের বন আঙুরের ক্ষেত আর দেখছি নে― চষা মাটি, এক-এক জায়গায় ঘাস। দূরে দূরে মাঠের মধ্যে মধ্যে এক-একটা শাদা বাড়ি। আবার আঙুর এবং অলিভ― বামে ঈষদ্‌দূরে এক শহর। এক-এক জায়গায় ভুট্টার চাষ। সূর্যাস্তের সময় হয়ে এল, ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। দু ধারে চষা মাঠ, সমভূমি, শূন্য― দক্ষিণ বাম দিগন্তে দুই পর্বতশ্রেণী।

 আমাদের দু ধারে জমি উঁচুনিচু তরঙ্গিত হয়ে এসেছে। দূরে একটা নীল হ্রদ দেখা যাচ্ছে, তার এক ধারে একটি ছোটো শহর। আমি বসে বসে যে আঙুর খাচ্ছি তার গন্ধ অনেকটা গােলাবজামের মতাে। আঙুরের থােলো কী চমৎকার দেখতে। রেলোয়ে স্টেশনে একটি ইতালীয়া যুবতীকে দেখে আমার মনে হল ইতালিয়ানীরা এখানকার আঙুরের মতাে নিটোল সুগােল টস্‌টসে, যৌবনের রসে যেন পরিপূর্ণ এবং ঐ আঙুরেরই মত তাদের মুখের রঙ― খুব বেশি শাদা নয়। একটি মেয়ে দেখলুম প্রায় আমাদেরই মতাে কালাে, কিন্তু দেখতে মিষ্টি, এখানকার বেগনি আঙুরের মতো। আবার সমুদ্র দেখা দিয়েছে― বােধ হয় যাকে হ্রদ মনে করেছিলুম তা হ্রদ নয়, সমুদ্রের একটা বাহু। তীরে বালির উপর অযত্নজাত গুল্ম উঠে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। আমাদের ঠিক নীচেই সমুদ্র― আমরা তার একটা উঁচু তটের উপর দিয়ে চলেছি। গােটা চার-পাঁচ পাল-মােড়া নৌকো ডাঙার উপর তােলা রয়েছে, ভাঙা জমি ঢালু হয়ে সমুদ্রে গিয়ে প্রবেশ করেছে― সে জমিটুকু চাষ-করা― দুটো ছেলে খেলা করছে। নিচেকার তীরপথ দিয়ে গাধার উপর চড়ে লােক চলেছে। এক-একটা গাধার উপর দুটো লােক। আমাদের বাঁ দিকে পাহাড়। সূর্য অস্ত গেছে। এখনাে সমুদ্রতীরে কতকগুলাে গােরু চরছে; কী খাচ্ছে তারাই জানে, মাঝে মাঝে শুক্‌নাে খড়কের মতাে দেখা যাচ্ছে মাত্র― একটা বাছুর রেলগাড়ির সঙ্গে পাল্লা দেবার জন্যে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটেছে। এখানকার সমুদ্র তেমন নীল দেখাচ্ছে না, মেটে রকমের। ঢেউগুলো ফেনিয়ে ফেনিয়ে পা টিপে টিপে এগিয়ে আসছে।

 রাত্রে টঙের উপর চড়ে তো বেশ নিদ্রা দেওয়া গেল। আজ সােমর [৮ সেপ্‌টেম্বর]। সকালে উঠে দেখা গেল চার দিকে সুন্দর শ্যামল— পরিপাটি রকম চাষ-করা ভুট্টার ক্ষেত— প্রত্যেকের ক্ষেত বড় অলিভ গাছ দিয়ে ঘেরা, তাই পাশাপাশি দুই ক্ষেতের মাঝখানের ব্যবধানটুকু বেশ সুন্দর ছায়াপথের মতাে দেখাচ্ছে। কোথাও তিলমাত্র জঙ্গল নেই। কাল যে রকম আঙুরের ক্ষেত দেখেছিলুম আজ সে রকম দেখছি নে। সে আঙুরগুলাে ছােটো ছােটো গুল্মের মতো― আজ দেখছি লম্বা লম্বা এক-একটা কাঠি পোঁতা, তার উপরে আঙুর লতিয়ে উঠেছে। উঁচুনিচু জায়গা, ছােটো ছােটো ভুট্টার ক্ষেত, তার চার দিকে আঙুরের বেড়া― এবং এক-এক জায়গা কেবলই আঙুর। মাঝে মাঝে দুটো-একটা বাড়ি, এক-আধটা চার্চ্, বেশ দেখাচ্ছে। পাহাড়ের উপর থেকে নীচে পর্যন্ত ভ্রাক্ষাদণ্ডে কণ্টকিত হয়ে উঠেছে, তারই মাঝখানে একটি শহর। তুঁতের ক্ষেত। ছােটো ছােটো চতুষ্কোণ তৃণক্ষেত্র এবং তাকে বেষ্টন করে বেঁটে বেঁটে পল্লবিত তুঁত গাছের শ্রেণী। কোথাও ভুট্টাক্ষেতে তুঁতের বেড়া। কোথাও তুঁত এবং দ্রাক্ষা এক সার বেঁধে চলেছে। আমরা অ্যাড্রিয়াটিক তীরপ্রদেশ ছাড়িয়ে এখন লম্বার্ডির মধ্য দিয়ে চলেছি। এখানে রেশম ভুট্টা এবং আঙুরের চাষ। রেলের লাইনের ধারে দ্রাক্ষাক্ষেত্রের পাশে একটি কুটীর; এক হাতে তারই একটি দুয়ার ধরে এক হাত কোমরে দিয়ে একটি ইটালিয়ান যুবতী সকৌতুক কৃষ্ণনেত্রে আমাদের গাড়ির গতি নিরীক্ষণ করছে। একটি ছােটো বালিকা একটা প্রখরশৃঙ্গ প্রশস্তস্কন্ধ প্রকাণ্ড গােরুর গলার দড়িটি ধরে চরিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে— কী বল, এবং তার কী বন্ধন! তার থেকে আমাদের বাংলাদেশের নবদম্পতি মনে পড়ল। মস্ত একটা গ্রাজুয়েট্‌পুঙ্গব এবং ছােট্ট একটি বারাে-তেরাে বৎসরের নববধূ— দিব্যি পােষ মেনে চরে বেড়াচ্ছে এবং মাঝে মাঝে ড্যাবাড্যাবা নেত্রে তার প্রতি সস্নেহ দৃষ্টিপাত করছে। ট্যুরিন স্টেশনে আসা গেছে। এদেশে পুলিসম্যানের আচ্ছা সাজ যা হােক! মস্ত-চূড়া-ওয়ালা টুপি, অনেক জরিজরাও, মস্ত তলােয়ার―খুব একটা সেনাপতির মতাে। আমাদের দেশে এ রকম পাহারাওয়ালা থাকলে তাদের চেহারা দেখে আমরা ডরিয়ে ডরিয়ে আরও কাহিল হয়ে যেতুম। চোরে যত চুরি করে এদের কাপড়চোপড়ে তার চেয়ে ঢের বেশি যায়।― আমাদের বাঁয়ের পাহাড়ের সর্বোচ্চ শিখরে একটু-একটু বরফের শ্বেত চিহ্ন পড়েছে। বেশ ঠাণ্ডা বােধ হচ্ছে, কিন্তু কিছুমাত্র শীত করছে না। (কাল রাত্তিরে আমরা যখন ডিনার খাচ্ছিলুম, এক দল লােক প্ল্যাট্‌ফর্মে দাঁড়িয়ে বিশেষ কৌতুহলের সঙ্গে আমাদের দেখছিল। তার মধ্যে দুটি-একটি বেড়ে সুন্দর মেয়ের মুখ দেখা যাচ্ছিল— তাতে করে ভােজনপাত্র থেকে আমাদের চিত্ত অনেকটা বিক্ষিপ্ত করে দিয়েছিল। ট্রেন ছাড়বার সময় আমাদের সহযাত্রী পুরুষগণ তাদের প্রতি অনেক টুপি ও রুমাল আন্দোলন, অনেক চুম্বনসঙ্কেত -প্রেরণ, অনেক তারস্বরে উল্লাসধ্বনি -প্রয়ােগ করলে; তারাও গ্রীব-আন্দোলনে আমাদের অভিবাদন করতে লাগল।) আমাদের দক্ষিণে বামে তুষাররেখাঙ্কিত সুনীল পর্বতশ্রেণী। বামে অরণ্য এবং ডাইনে পাহাড়ের তলদেশে শহর ও শস্যক্ষেত্র। কী ঘন ছায়াস্নিগ্ধ অরণ্য! যেখানে অরণ্যের বিচ্ছেদ সেইখান থেকে অমনি একটা দৃশ্য খুলে যাচ্ছে― শস্যক্ষেত্র তরুশ্রেণী ও পর্বত। একটা পর্বতশৃঙ্গের উপরে একটা পুরােনাে দুর্গ দেখা যাচ্ছে। এবং তলদেশে একটি ছােটো গ্রাম। যত এগােচ্ছি অরণ্যপর্বত খুব ঘন হয়ে আসছে। গাড়িতে আলাে দিয়ে গেল। এইবার বােধ হয় পর্বতভেদী মন্ট্‌সেনিস গহ্ব‌র আসবে। আজ রীতিমত পর্বতের জায়গায় এসে পড়েছি। এই অরণ্যপর্বতের মাঝে মাঝে যে গ্রামগুলি আসছে সেগুলাে তেমন উদ্ধত শুভ্র পরিপাটি নয়— একটু যেন ম্লান, দরিদ্র, নিভৃত। একটি-আধটি চর্চের চূড়া আছে মাত্র, কিন্তু কারখানার ঊর্ধ্বমুখী ধূমােদ্‌গারী ব্যংহিতশুণ্ড নেই। আর-একটা ভাঙা দুর্গ। শাদা উপলপথের মধ্যে দিয়ে একটি ছােটো অগভীর নদীস্রোত চলেছে। ক্রমে একটু একটু করে পাহাড়ের উপর ওঠা যাচ্ছে। সাপের মতাে পর্বতপথ একে বেঁকে চলেছে। চষা ক্ষেত ঢালু পাহাড়ের উপর সােপানের মধ্যে থাকে থাকে উঠেছে। পর্বতস্রোত স্বচ্ছ সলিলরাশি নিয়ে সংকীর্ণ উপলপথ দিয়ে ঝরে পড়ছে। মাঝে মাঝে প্রায়ই একটা একটা রেলোয়ে গহ্বর এসে প্রাণ হাঁপিয়ে দিচ্ছে। মন্ট্‌সেনিস টানেল এখনি আসবে— বােধ হয় দম আটকে মরব। দু ধারে fir গাছ দেখা দিয়েছে। আমাদের ডান পাশে বালি ও পাথরের শাদা প্রশস্ত জলপথ। তারই এক ধার দিয়ে জল নেবে আসছে― তার পরপারে দীর্ঘ fir গাছের অরণ্য, তারই পর থেকে পর্বত উঠেছে। এইবার টানেলে ঢুকছি। ১ বাজতে ১৮ মিনিট। ১ বেজে দশ মিনিটে বেরোলুম। ফ্রান্‌স। দক্ষিণে এক জলস্রোত ফেনিয়ে ফেনিয়ে চলেছে। ফরাসী জাতির মতাে দ্রুত, চটুল, চঞ্চল, উচ্ছ্বসিত, হাস্যপ্রিয়, কলভাষী― কিন্তু তাদের চেয়ে অনেক বিমল এবং শিশুস্বভাব। মাশুল নিয়ে বেশি উপদ্রব করলে না। একবার একজন এসে আমাদের জিজ্ঞাসা করে গেল মাশুল দেবার মত কিছু আছে কি না। আমরা তামাকের কৌটো দেখালুম, সে চলে গেল। ইটালিয়ান ডাকাতরা এইটুকু তামাকের জন্যে ৫ শিলিং এবং দুটো বাক্স ব্রেকে নিয়ে ৩১ ফ্রাঙ্ক্ নিয়েছে। এ জাতের মধ্যে যে ডাকাতের সংখ্যা বেশি হবে তার আর আশ্চর্য কী! সেই স্রোতটা এখনাে আমাদের পাশ দিয়ে ছুটেছে― তার দক্ষিণেই fir-অরণ্য নিয়ে পাহাড় উঠেছে― বেঁকে-চুরে, ফেনিয়েফুলে, নেচে, পাথরগুলােকে ঠেলে, রেলগাড়ির সঙ্গে race দিয়েছে। এক জায়গায় খুব সংকীর্ণ হয়ে এসেছে― তার দু ধারে সারি সারি সরল দীর্ঘ গাছ উঠেছে, মাথায় মাথায় ঠেকাঠেকি করে আছে। মাঝে মাঝে লােহার সাঁকো। উপর থেকে ঝর্‌না নেবে তার সঙ্গে মিশছে। ডান দিকে পাহাড়ের উপর দিয়ে একটা পার্বত্যপথ স্রোতের পাশ দিয়ে সমরেখায় একে বেঁকে চলেছে। এতক্ষণ পরে আমাদের নির্ঝরিণী সহচরীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হল। সে আমাদের বাঁ দিক দিয়ে কোন্-এক অজ্ঞাত সংকীর্ণ শৈলপথ দিয়ে অন্তর্হিত হল। শ্যামল তৃণাচ্ছন্ন পর্বতের মধ্যে এক-একটা পাহাড় তৃণহীন রেখাঙ্কিত পাষাণচূড়া প্রকাশ করে নগ্নভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে, কেবল মাঝে মাঝে এক-এক জায়গা খানিকটা করে fir-অরণের শ্যামল আবরণ রয়েছে। ঠিক মনে হচ্ছে, যেন একটা দৈত্য তার সহস্র নখ দিয়ে ওর শ্যামল ত্বক্ ছিঁড়ে নিয়েছে এবং সহস্র বিদারণরেখা রেখে দিয়ে গেছে। আবার হঠাৎ ডান দিকে আমাদের সেই পূর্বসঙ্গিনী মুহূর্তের জন্যে দেখা দিয়ে বাঁ দিকে চলে গেল। একবার দক্ষিণে একবার বামে একবার অন্তরালে— যেন ফরাসী ললনার মতাে কৌতুকপ্রিয়া, বিবিধ বিলাসচাতুরী জানে। ঐ দু-তিন শাখায় বিভক্ত হয়ে সুদূর দক্ষিণে চলে গেল। আবার পর্বতের এক জায়গায় মােড় ফিরে ওর সঙ্গে দেখা হবে কি না কে জানে। সেই প্রত্যাশায় রইলুম।― ফ্রান্‌সের গাড়ি ইটিলির চেয়ে অনেক বেগে চলে— আমার লেখা দায় হয়ে এসেছে। বহুকষ্টে লিখতে হচ্ছে।

 আবার সে বাঁয়ে এসেছে। দক্ষিণে পর্বতগুলাে একেবারে হঠাৎ উঁচু হয়ে উঠেছে। বিচিত্র শস্যক্ষেত্র। মাঝে মাঝে ক্ষেতের মধ্যে খড়ের গাদা, পাহাড়ের গায়ে বিরলসন্নিবিষ্ট বাড়ি। স্রোত এখনাে বাঁ দিকে চলেছে। সেই অলিভ এবং দ্রাক্ষাকুঞ্জ অনেক কমে গেছে। বিচিত্র শস্যক্ষেত্র এবং সুদীর্ঘ poplar-শ্রেণী। ভুট্টা, তামাক, নানা শাক-সবজি। মনে হয় কেবলই বাগানের শ্রেণী। এই কঠিন পর্বতের মধ্যে মানুষ বহুদিন থেকে বহু যত্নে প্রকৃতিকে বশ করে তার উচ্ছৃঙ্খলতা হরণ করেছে। প্রত্যেক ভূমিখণ্ডের উপরে মানুষের কত যত্ন ও ভালােবাসা প্রকাশ পাচ্ছে। প্রকৃতিও তার প্রচুর প্রতিদান দিচ্ছে। এখানকার লােকেরা যে আপনার দেশকে ভালােবাসবে তার আর কিছু আশ্চর্য নেই। কত যত্নে আপনার দেশকে তারা আপনার করছে, একটি বিঘাও যেন অনাদরে ফেলে রাখে নি। আপন বাসস্থানকে কানন করে তুলেছে। এর জন্যে যদি প্রাণ না দেবে তাে কিসের জন্যে দেবে! আমাদের দেশ অযত্নে অনাদরে পড়ে আছে― কোথাও জঙ্গল হচ্ছে, কোথাও পাষাণস্তূপে কঠিন হয়ে আছে, কত ধনরত্ন গুপ্ত পড়ে রয়েছে। আমাদের কাছে আমাদের দেশের কোনাে মূল্য নেই।― চমৎকার ব্যাপার! এ কেবলই বাগান। পর্বতের মধ্যে, নদীর ধারে, হ্রদের তীরে পপলার-উইলো-বেষ্টিত বাগান—সমস্ত ছবির মতাে। এইমাত্র বামে পর্বতের পদতলে এক হদ দেখা গেল। বিস্তীর্ণ, চলেছে। প্রকৃতি এবং মানুষে মিলে কেবল সাজাচ্ছে এবং উৎপন্ন করছে।― সেই হ্রদ চলেছে। দশ মাইল আয়ত। কিন্তু আর কী লিখব! কত অরণ্য, কত পর্বত, কত নদী, কত শহর।

 আমাদের প্যারিসে নাববার কথা হচ্ছে। কিন্তু প্যারিসে আমাদের ট্রেন যায় না, একটু পাশ দিয়ে চলে যায়। যে স্টেশন দিয়ে প্যারিসে যায় সেইখানে একটা স্পেশ্যাল ট্রেন রাখবার জন্যে টেলিগ্রাফ করা হয়েছে। একবার শােনা যাচ্ছে রাত এগারােটার সময় ট্রেন বদলাতে হবে, একবার শুনছি একটা, একবার দুটো, একবার সাড়ে-তিন, একবার সাড়ে-চারটে। কাপড়-চোপড় পরেই শুয়ে রইলুম। রাত দুটোর সময় জাগিয়ে দিলে। জিনিস-পত্র বেঁধে উঠে পড়লুম। বিষম ঠাণ্ডা। দুরে একটা প্ল্যাট্‌ফর্মে একটি গাড়ি দাঁড়িয়ে― কেবল একটি এঞ্জিন, একটি ফাস্ট্‌ক্লাস, এবং একটি ব্রেক্‌-ভ্যান— আমরা তিনটি ভারতবর্ষীয় চললুম। রাত তিনটের সময় শূন্য প্ল্যাট্‌ফর্মে পৌঁছনো গেল―সুপ্তোত্থিত দুটো-একটা মশিয়াে আলাে নিয়ে উপস্থিত। অনেক হাঙ্গাম করে কাস্টম হৌস এড়িয়ে গাড়িতে উঠলুম। তখন প্যারিস দ্বার রুদ্ধ করে সহস্র দীপশ্রেণী জালিয়ে দিয়ে নিদ্রিত। আমরা Hotel Terminusএ হাজির হলুম। liftএ ক’রে চতুর্থ তলায় শয়নকক্ষে প্রবেশ করা গেল। পরিপাটি পরিচ্ছন্ন বিদ্যুদ্দীপ্ত কার্পেটাবৃত দর্পণশােভিত নীলবর্ণযবনিকা-খচিত চিত্রিতভিত্তি নিভৃত কক্ষ, বিহঙ্গপক্ষসুকোমল শয্যা। জিনিস-পত্র পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখি, একটি পরের overcoat নিয়ে এসেছি। চিন্তা করে দেখা গেল সম্ভবতঃ যার কম্বল আমি রাত্তিরে নিয়েছিলুম তারই overcoat— সে বেচারা বৃদ্ধ, শীতপীড়িত, বাতে পঙ্গু অ্যাংলােইন্‌ডীয় পুলিশ-অধ্যক্ষ; পুলিশের কাজ করে যদি তার পৃথিবীর উপরে অবিশ্বাস জন্মে থাকে তা হলে আজ প্রাতঃকালে উঠে আমাদের চরিত্র সম্বন্ধে তার বড় ভালাে opinion হবে না। সে এতক্ষণে কত swear কত curse করছে।

 মঙ্গলবার [৯ সেপ্‌টেম্বর]। লােকেনের পাের্ট্‌ম্যান্টো পাওয়া যাচ্ছে না। ভারী গােল বাধিয়ে দিয়েছে। আমার বিশ্বাস সেটা রেলগাড়ির বেঞ্চির নীচে রয়ে গেছে। সকালে আমরা তিন মূর্তি পদব্রজে বেরােলুম। প্যারিসের কী বর্ণনা করব! প্রকাণ্ড কাণ্ড। রাস্তা বাড়ি গাড়ি ঘােড়া দোকান বাগান প্রাসাদ প্রস্তরমূর্তি ফোয়ারা ইত্যাদি। অনেক ঘুরে ঘুরে এক বইয়ের দোকানে গেলুম। সেখানে গােটাকতক বই কিনে এক খাবারের জায়গায় যাওয়া গেল― সুসজ্জিত চিত্রিত স্বর্ণপত্রমণ্ডিত স্ফটিকখচিত প্রকাণ্ড ঘরের একটি প্রান্তটেবিলে আহারাদি করে এক গাড়ি নিয়ে ইফেল টাউয়ার দেখতে বেরােলুম। এক মস্ত দৈত্য তার সহস্র লৌহকঙ্কাল নিয়ে আকাশে মাথা তুলে চার পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে আছে। liftএ করে প্রথমে আমাদের এক তলায় চড়িয়ে দিলে—চতুর্দিকে প্যারিস উদ্ঘাটিত হয়ে গেল। ক্রমে আমরা চতুর্থ তলায় উঠলুম, সমস্ত বিরাট প্যারিসের উপরে একবার চোখ বুলিয়ে নিলুম— আশ্চর্য ব্যাপার। টাউয়ারে চড়ে বাবি সল্লি আর ছোটোবউকে তিনটে পােস্ট্‌কার্ড্‌ পাঠিয়ে দিলুম। সন্ধের সময় hippodrome দেখতে গেলুম। তখন আরম্ভ হয়ে গেছে। বাদ্যি বাজছে। প্রকাণ্ড জায়গা। চার দিকে গ্যালারি উঠেছে। রােমান নাট্যশালার মতাে মনে হয়। লােক গিস্‌গিস্‌ করছে। নিদেন দশ হাজার লােক হয়েছিল― তবু এখন season নয়। দুটো মেয়ে tight প’রে barএর উপর যে কাণ্ড করলে সে আশ্চর্য। তার পরে Jeanne d’arc ব’লে একটা pantomime হল। প্রথমে একটা গ্রামের দৃশ্য করেছিল, সেটা বেড়ে লেগেছিল— তার পরে বিদেশী সৈন্য লুটপাট করতে এল, তার পরে Jeanne দৈববাণী শুনলে, সবশেষে তার চিতাশষ্যা। তার পরে সমস্ত ফ্রান্‌সের সৈন্য এবং ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশের মূর্তি-স্বরূপ মেয়েরা ত্রিবর্ণ ফ্ল্যাগ হাতে ঘােড়ায় চড়ে একটা মহাসমারােহ করে দাঁড়ালাে। আগাগােড়া সমস্ত বাজনা এবং গান চলছে। বেশ বুঝতে পারছিলুম ফরাসী দর্শকদের মনটা কিরকম হচ্ছিল।

 বুধবার। লন্‌ডন-অভিমুখে চললুম। Charing Crossএ পৌঁছে দেখি Mrs. Palit ও লিল অপেক্ষা করছেন। জিনিস-পত্র Custom Houseএর মধ্য দিয়ে নিয়ে আসতে ঘণ্টাখানেক হয়ে গেল। হােটলে জায়গা নেই। Mrs. Mullএর ওখানে Mrs. Palit থাকেন, সেইখানে এসে আড্ডা করা গেল। সুবিধেমত জায়গা নয়। Miss Mullকে দেখা গেল। এই সেই বিখ্যাত Miss Mull! সন্ধের সময় লােকেন তার এক বন্ধুর বাড়ি নিয়ে গেল। বিপদ!

 বৃহস্পতিবার। সকালে বেরােনাে গেল― এক hansomএ চড়ে প্রথমে সতুকে খুঁজতে বেরােলুম। তাদের বাড়ি গিয়ে শুনলুম তারা বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে, বাড়ি বিক্রি হয়ে গেছে। কেউ তাদের ঠিকানা জানে না। তার পরে Miss Sharpeএর ওখানে গিয়ে শােনা গেল— তিনি engaged, visitors receive করবেন না। আমরা ম্লানমুখে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লুম, তার পরে সৌভাগ্যক্রমে আবার ডাক পড়ল। ঢুকে দেখি Miss Sharpe নিতান্ত বৃদ্ধা হয়ে গেছে। engagement কিছুই বিশেষ নেই, একটি পীড়িত কুকুরশাবকের সেবা করছেন। জল বায়ু, স্বাস্থ্য, কালের পরিবর্তন প্রভৃতি সম্বন্ধে দু-চারটে কথা কয়ে বেরিয়ে পড়া গেল। আমার প্রাচীন বন্ধু Scottএর বাড়ি গিয়ে শুনলুম তারা সেখানে নেই, তারা New Malding গেছে। সেখেনে Gower Street Stationএ এক পাতাল-বাষ্পযান নিয়ে বাসায় ফেরবার চেষ্টা করা গেল— কিন্তু যা চেষ্টা করা যায় তা সব সময়ে সফল হয় না। Hammersmith স্টেশনে পৌছে চৈতন্য হল যে ক্রমেই গম্যস্থান থেকে দূরে যাচ্ছি। একজনকে জিজ্ঞাসা করা গেল; সে বললে, ভুল গাড়িতে উঠেছ, আবার ফিরে যেতে হবে। আবার ফিরলুম। অনেক হাঙ্গাম করে সাড়ে-তিনটের সময় বাড়ি পৌঁছলুম। তখন এখানকার আহারের সময় উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। আবার আমাদের জন্যে কুড়িয়ে-বাড়িয়ে একটু-আধটু এনে দিলে। খেয়ে-দেয়ে আরএক চোট রাস্তায় বেড়িয়ে আসা গেল। ডিনারের পর Miss Mullএর সহযােগে খানিকটা গানবাজনা হল। Miss Mull মন্দ গায় না।

 শুক্রবার। চিঠি লেখবার দিন। চিঠি লিখতে বসলুম। লােকেন ভারী উৎপাত বাধিয়ে দিলে। জোর করে চিঠি সংক্ষেপ করে দিয়ে বের করে নিয়ে গেল। ’busএ চড়ে প্রথমে Grindlay আফিসে যাওয়া গেল। সেখান থেকে মেজদাদা এক dentistএর দোকানে দাত বাঁধাবার বন্দোবস্ত করতে গেলেন। সেখান থেকে এক প্রকাণ্ড জাঁকালাে আহারস্থলে গিয়ে খাওয়া গেল। তার পরে National Galleryতে ছবি দেখতে গেলুম। অনেক ছবি, অল্প সময় দেখে মনে বসে না। এক-একটা খুব ভালাে লেগেছিল, কিন্তু সেগুলাে হয়ত কোনাে যথার্থ চিত্র-সমজ্‌দারের ভালাে লাগে না— বােধ হয় অনেক বিখ্যাত ভালাে ছবি আমার কিছুই ভালাে লাগে নি। ’busএ চড়ে বাড়ি ফেরা গেল। Miss Mull আমার উপর কতকটা অভিমান প্রকাশ করলে। বললে— Mr. T, কেন তুমি সমস্ত দিন বাইরে কাটালে, ঘরে থাকলে আমরা বেশ গানবাজনা নিয়ে থাকতে পারতুম। আমি বললুম, বেশ, আজ সন্ধের সময় কোথাও বেরোব না। সে বললে, সন্ধের সময় বেশি সময় হাতে থাকে না। যা হােক, সন্ধের সময় আর-একবার গানবাজনা নিয়ে বসা গেল। Walter Mull বেশ piano বাজায়। Miss Mullএ আমায় মিলে অনেকগুলাে গান গেয়েছি। সে আমাকে নাচাবার চেষ্টায় ছিল, সেটা আমার পােষালো না। এরা আমার গলার অনেক তারিফ করছে। Mull বলছিল, আমি যদি গলার চর্চা করি তা হলে St. James Hall Concertএ গাইতে পারি, আমার রীতিমত উচ্চ-শ্রেণীয় গলা আছে। তা আছে বােধ হয়।

 শনিবার। আজ জ্যোৎস্না আসবে। কিন্তু কখন জাহাজ আসবে তার স্থিরতা নেই, তাই docksএ যাওয়া হল না। তাকে সমস্ত directions দিয়ে এক মস্ত চিঠি লিখে দেওয়া গেছে।

 বলতে বলতে জ্যোৎস্না উপস্থিত। খুব শক্ত, সমর্থ, সপ্রতিভ। নির্ভয়, নির্লজ্জ, নিরাপদ। যেখানে যা করা উচিত তা ঠিক করেছে। King Companyর উপর লাগেজের ভার দিয়ে special train নিয়ে Liverpool Street Stationএ পৌঁছে underground রেলপথে ঠিক গাড়ি নিয়ে ঠিক জায়গায় পৌছে এক hansom ভাড়া করে আমাদের বাড়ির দরজার কাছে এসে হাজির। এ ছেলের কোথাও হারাবার আশঙ্কা নেই। চুরি যাবার সম্ভাবনা নেই। আমাদের উপরে এর ভার দেওয়া নিতান্ত উপহাসের মতাে দেখায়। ―Coppe পড়া গেল। একটা ভুলেছি—জ্যোৎস্না আসবার আগে আমরা সকলে মিলে গ্রুপ বেঁধে এক ছবি নিয়েছি। Mr. রাজনারায়ণ ছবি নিলেন। বিকেলের দিকে বেরিয়ে পড়া গেল। Holborn Restaurantএ গিয়ে আহার। সে এক অদ্ভুত ব্যাপার। সমস্ত শ্বেত প্রস্তরের― চার তলা, মস্ত প্রাঙ্গণ, ব্যান্‌ড্‌ বাজছে, নিদেন হাজার লােক খেতে বসে গেছে। সেখেন থেকে Oswaldদের ওখানে যাওয়া গেল। আমাদের ইংরিজি accentএর অনেক তারিফ হল। সেখেন থেকে রাত্রি সাড়ে-এগারােটার সময় বাড়ি ফিরে দেখি তখনাে Miss Mull জেগে। তার সঙ্গে একটু-আধটু গল্প হল। কথায় কথায় উঠল তার বােন নেই; সে বললে: I am glad of it. I hate having sisters, brothers are ever so much nicer। এ দেশে বােনে বােনে competition কিনা, উভয়ের মধ্যে বােধ হয় খিটিমিটি চলে। আমার বােধ হয় আমাদের দেশে যদি ভাইবােনদের বেশি দিন একসঙ্গে থাকবার সম্ভাবনা থাকত তা হলে দুই বােনের চেয়ে ভাইবােনের মধ্যে বেশি ভাব হত।

 রবিবার। গান বাজনা। Miss M. একটুখানি flirt করেছিল: Don't you think of me Mr. T. when you sing ‘Riez riez’ &c.? I did laugh when I had my photo taken, didn't I?

 তার Shelleyর কবিতা খুব ভালাে লাগে ইত্যাদি। কবিতার কথা পাড়বার উদ্যোগ করেছিল, আমি তাতে বড়াে গা লাগালুম না। আমাকে পীড়াপীড়ি করছে তার confession bookএ লিখতে। তার মধ্যে দেখলুম একজন বাঙালী favourite poetsএর মধ্যে আমার নাম লিখেছে। আমার autograph বাংলা ও ইংরিজিতে লিখে নিয়েছে। সমস্তদিন প্রায় গানবাজনায় কেটেছে।

 সােম। সল্লির জন্যে বেহালা কেনা গেল। ভয় হচ্ছে পাছে কাল আমার নামে বাড়ির চিঠি না আসে― তা হলে আমি এ দেশে টিঁকতে পারব না। আজ Savoy Theatreএ Gondoliers দেখবার জন্য টিকিট কেনা গেল। সে চমৎকার কাণ্ড। স্বপ্নের মত বােধ হল, এমন সুন্দর। এমন সুন্দর নাচ! মনে হল যেন আমার চার দিকে সৌন্দর্যের পুষ্পবৃষ্টি হয়ে গেল। Miss Oswald প্রভৃতি আরএক দল আমাদের সঙ্গে ছিলেন। supper খেয়ে রাত্তির একটার সময় ফেরা গেল।

 মঙ্গল। আজ সকালে উঠে যখন কেবল একখানি ছোটবউয়ের চিঠি পাওয়া গেল তখন মনটা নিতান্ত দমে গেল। আর একদণ্ড এখানে টিঁকতে ইচ্ছে করছিল না। তার পরে যখন breakfast খেতে গেলুম তখন মেজদাদা বাবির একখানি খােলা চিঠি দিলেন। খােলা চিঠির চেয়ে লেফাফাবদ্ধ চিঠি অনেক ভালাে লাগে। Miss Mullএর সঙ্গে আমাদের বেশ চলছে যা হােক। সে আমাকে Robin Adair বলে। কাল রাত্তিরে যখন আমি তাকে good night বললুম সে আপনার মনে মনে একটু আস্তে আস্তে বললে: Good night, good night Beloved! সে বলে রবিবারে churchএ যাওয়া সে sinful মনে করে― তার চেয়ে বাড়িতে থেকে কাজকর্ম করা ঢের উচিত, অধিকাংশ মেয়ে কেবল নতুন কাপড় দেখাতে যায় এবং যন্ত্রের মতাে মন্ত্র আউড়ে আসে এবং মনে করে পরিত্রাণের পথ খােলসা হয়ে এল। জ্যোৎস্না এসরাজ বাজিয়েছিল। অনেকগুলাে Chopinর বাজনা হল। আমার বাবির বাজনা মনে পড়ে। আমার মনটা বড়াে খারাপ হয়ে আছে―কে জানে জীবনটা কেন ভারী শূন্য এবং নিষ্ফল মনে হচ্ছে। আসছে বৎসরে বাবিরা বিলেতে আসবে এই প্রস্তাবটা উত্তরােত্তর পাকা হয়ে আসছে।

 বুধবার। দর্‌জির দোকানে গিয়ে দু সুট কাপড় হুকুম করে এলুম। ভয়ানক দাম। ফোটোগ্রাফের দোকানে গেলুম― বাবির একটা ছবি porcelainএর উপর আঁকাবার ব্যবস্থা করা গেল, ৪ পাউন্‌ড্ ৪ শিলিং লাগবে। আমার একটা ছবি নেওয়া গেল। আজ মেঘ করে রয়েছে, সূর্যালােক নেই। কোথাও বেরােতে ইচ্ছে নেই। মেজদা বেরােবার প্রস্তাব করছেন। কী সুখে লন্‌ডনে আছি কে জানে। খুব খরচ হচ্ছে, বাড়ির জন্যে present কেনবার টাকা আর রইল না। মনে করছি কেবল সুরি-বাবির জন্যে কিছু নিয়ে যাব। ধার করতে হবে দেখছি।― ‘Niagara Falls’ দেখতে গিয়েছিলুম— চমৎকার কাণ্ড। রাত্তিরে গানবাজনা জমাচ্ছিলুম, এমন সময় এক প্রচণ্ড জ্যাঠা ছেলে এসে রাত এগারােটা পর্যন্ত বকাবকি করে গেল।

 বৃহস্পতি। আজ সতুর সঙ্গে দেখা করতে যেতে হবে। অনেক রাস্তা ভুলে লােকজনকে জিজ্ঞাসা করতে করতে Eastbourne সতুর ওখানে পৌঁছলুম। বেচারা একলা পড়েছে দেখে দুক্ষু হল। সেখানে ডিনার খেয়ে রাত্তির সাড়ে দুপুরের সময় বাড়ি ফিরলুম। বাড়ির কাছাকাছি এসে অনেক ঘুরতে হয়েছিল।

 শুক্রবার। সুরিকে চিঠি লিখে দিলুম। confession albumএ লিখলুম। দর্‌জির দোকানে গেলুম। আজ Scottএর ওখানে যাবার ইচ্ছে ছিল— লােকেন গেল না, তার অন্য স্ত্রীবন্ধুর সঙ্গে engagement আছে। Miss Mull গান শোনালে। তার সঙ্গে Kensington Parkএ বেড়াতে যাবার জন্যে অনুরােধ করেছিল, কিন্তু আমার ইচ্ছে হল না— তাই কিঞ্চিৎ অভিমান করেছে। একটুখানি একলা হবার জন্যে ভারী ইচ্ছে করছে। এদের কাজকর্ম এদের আমােদপ্রমােদের মধ্যে যখন ভালাে করে চেয়ে দেখি তখন মানুষের ক্ষমতার অন্ত দেখা যায় না। এরাই রাজা বটে। এরা অল্পে সন্তুষ্ট হবার নয়; এদের সুবিধে করবার এবং এদের আমােদ দেবার জন্যে মানুষের চরম শক্তি অবিশ্রাম খেটে মরছে। এরা গান শুনবে তাই সহস্র যন্ত্রের সহস্র তাল আশ্চর্য সংগতি রক্ষা করে ধ্বনিত হচ্ছে। কোথাও তিলমাত্র অসম্পূর্ণতা নেই। অসীম যত্ন, অসীম অভ্যাস। নাট্যশালায় কী অদ্ভুত বিচিত্র ব্যাপার, কী আশ্চর্য সৌন্দর্যের মরীচিকা― কোনােখানে সামান্য ত্রুটি বা অশােভনতা নেই। দোকানে জিনিসপত্র কেবল সাজাতে ও সুন্দর করে রাখতে কত দুরূহ পরিশ্রম ও চেষ্টা করতে হয়েছে। জাহাজে যখন ছিলুম তখন ভাবতুম যে, এই জাহাজ চালানাে কী বিপুল ব্যাপার। আমরা তো ডেকের উপর বসে হাওয়া খাচ্ছি, সূর্যোদয় সূর্যাস্ত দেখছি, কিন্তু কতশত লােক দিনরাত্রি অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে কী অসহ্য পরিশ্রম করছে— এক তাে অবিশ্রাম যন্ত্র চালনা করে দীর্ঘ পথকে সংক্ষিপ্ত করা সেই যথেষ্ট, তার উপরে আরাম এবং সুখের জন্যে কী তীব্র চেষ্টা! জাহাজযাত্রীর সেবার জন্যে শত শত ভৃত্য অবিরত নিযুক্ত― খাবার ঘর, music saloon শাদা পাথর দিয়ে মােড়া, সুন্দর করে সাজানাে, শত শত বিদ্যুদ্দীপ জ্বলছে। চর্ব্য চোষ্য লেহ পেয়ের সীমা নেই। জাহাজ পরিষ্কার রাখবার জন্যে কত নিয়ম, কত বন্দোবস্ত। জাহাজের প্রত্যেক দড়িটুকু যথাস্থানে শোভনভাবে গুছিয়ে রাখবার জন্যে কত দৃষ্টি! আমাদের দেশের লােকের ধ্যানের অতীত— এ রকম বিপুল-চেষ্টা-চালিত যন্ত্রকে আমাদের দেশের লােক failure মনে করত। কিন্তু ভেবে দেখলে এর একটা অন্ধকার দিক আছে― Song of Shirt পড়লে তা টের পাওয়া যায়। এই সুখসমৃদ্ধির অন্তরালে কী অসহ্য দারিদ্র্য আপনার জীবনপাত করছে সেটা আমাদের চোখে পড়ে না, কিন্তু প্রকৃতির খাতায় উত্তরােত্তর তার হিসেব জমা হচ্ছে। প্রকৃতিতে উপেক্ষিত ক্রমে আপনার প্রতিশােধ নেবেই। যদি টাকার প্রতি বহু যত্ন করে পয়সার প্রতি নিতান্ত অনাদর করা যায় তা হলে কমে সেই অনাদৃত পয়সা বহু যত্নের ধন গৌরাঙ্গ টাকাকে বিনাশ করে। আমাদের ভারতবর্ষে অনাদৃত, দুর্বল, অজ্ঞান, বহুযত্নলব্ধ জ্ঞানকে বিনাশ করেছে। যদি সভ্যতা আপনাকে রক্ষা করতে চায় তো প্রতিবেশীকে আপনার সমান করে তুলুক। দুটো শক্তি যত একসঙ্গে সাম্য রক্ষা ক’রে কাজ করে ততই মঙ্গল— যেমন আকর্ষণ বিপ্রকর্ষণ, স্বার্থ এবং পরার্থ, আপনার উন্নতি ও চতুষ্পার্শের উন্নতি। নইলে চতুষ্পার্শ তার প্রতিশোধ তোলে, বর্বরতা সভ্যতাকে ধ্বংস করে। আমার তো সেই জন্যে মনে হয়— আশ্চর্য নেই যে ভবিষ্যতে কাফ্রিরা য়ুরোপ জয় করবে, কৃষ্ণ অমাবস্যা দিনের আলোকে গ্রাস করবে, আফ্রিকা থেকে রাত্রি এসে য়ুরোপের শুভ দিনকে আচ্ছন্ন করবে। য়ুরোপীয় সভ্যতার আদিজননী গ্রীসকে যে তুর্ক জাতি অভিভূত করবে এ কি পেরিক্লীসের সময়ে কেউ কল্পনা করতে পারত? আলোকের মধ্যে ভয় নেই, কেননা তার উপরে সহস্র চক্ষু পড়ে আছে— কিন্তু যেখানে অন্ধকার জমা হচ্ছে, বিপদ সেইখানেই গোপনে বল সঞ্চয় করছে, সেইখানেই প্রলয়ের গুপ্ত জন্মভূমি।

 সন্ধের সময় মেজদাদা হঠাৎ নাচের প্রস্তাব করলেন। Miss Mull তাঁর সঙ্গে খানিকটা নেচে আমাকে নাচবার জন্যে পীড়াপীড়ি করতে লাগল, আমি কাটাবার অনেক চেষ্টা করলুম, কিন্তু ক্রমে দেখলুম অভদ্র হয়ে পড়ছে। দু-চার পা নেচে থেমে গেলুম— এমন দু-তিন বার নাচিয়েছে। আমি বাজনার মাঝখানে থেমে যাই, এরকম জড়াজড়ি নৃত্য আমার ভারী বর্বর মনে হয়।

 শনিবার। সকালে দোকানে বেরোনো গেল। অনেক জিনিসপত্র কেনা এবং সুন্দর মুখ দেখা গেল। আজ আবার রাত্তিরে Drury Laneএ Million of Money দেখতে যেতে হবে। M. Theatre দেখে আসা গেল। scenery খুব আশ্চয্যি। race course, সত্যিকার ঘােড়দৌড়, চৌঘুড়ি, সমুদ্রের মধ্যে পর্বত।

 রবিবার। Oswaldদের বাড়ি গিয়েছিলুম, এক ফরাসি মেয়ে দেখলুম― অদ্ভুত। সে আমার সঙ্গে খুব আলাপ করলে। বললে, Indianদের বড়াে ভালােবাসে। মেজদাদারা Kew Gardens দেখতে গেছেন। আমাকে নিয়ে যাবার জন্যে Miss Mull অনেক পীড়াপীড়ি করলে। রাজনারায়ণ আমাদের নিয়ে বড়াে বাড়াবাড়ি রকম ঠাট্টাঠুট্টি আরম্ভ করেছে, সে কথঞ্চিৎ jealous হয়েছে।

 সােমবার। ছােটবউ সল্লি আর বাবির চিঠি পেলুম। মনটা একান্ত অস্থির হয়ে আছে— বেঁচে থাকতে ভালো লাগছে না। বাবিকে চিঠি লিখতে আরম্ভ করা গেল। Richmondএ ইন্দুর মেয়েদের দেখতে যাবার জন্যে মেজদা টানাটানি করছেন। চিঠি কাল শেষ করা যাবে। নােয়েল বেশ মােটামােটা শক্ত হয়ে উঠেছে। লীলাকে তেমন ভালাে দেখতে নেই। রানী আমার সঙ্গে ভাব করে নিয়ে zoological Gardensএর গল্প জুড়ে দিলে। ভারী মজা করে মিষ্টি করে ইংরিজি কথা কয়। ফিরে এসে ভাবে বােধ হল Miss M আর রাজনারানে একটু ঝগড়া হয়ে গেছে। আমাকে নিয়ে এই পুরাতন বন্ধুদের মধ্যে একটু খিটিমিটি বেধে গেছে। রাজনারায়ণ এমন স্পষ্ট করে তার jealousy প্রকাশ করে যে আমাকে ভারী অপ্রস্তুতে পড়তে হয়। রাত্তিরে অনেকগুলাে বাংলা গান গাইলুম। ‘অলি বারবার’টা Miss Mএর ভয়ানক ভালো লেগেছে: It is so sweetly pretty, so quaintly beautiful and it sounds so pathetic with its minor tones! ওর নীচেই ‘দে লাে সখী দে’, তার পরে ‘কী হল তােমার’।

 মঙ্গল। আজ সকাল থেকে shopping। সল্লি আর ছোটবউয়ের জন্যে দুটো আয়না কিনেছি। সুরির জন্যে একটা ইলেকট্রিক-আলাে-জ্বালা ঘড়ি কেনা গেল। কাল বাবির জন্যে একটা কিনলেই আমার মন নিশ্চিন্ত হয়। সমস্ত দিন জিনিসপত্র কিনে একান্ত শ্রান্তভাবে সন্ধের সময় ’busএর মাথার উপরে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বাড়ি আসা গেল। একজোড়া eye glasses কেনা গেল। আজকাল এখানে পথে-ঘাটে অগণ্য চশমাপরা মেয়ে দেখতে পাই। আমার বিশ্বাস তাদের ভালাে দেখতে হবে ব’লে তারা চশমা পরে। Miss M একজোড়া চশমা কিনে রেখেছে, কিন্তু তার চোখ খুব ভালাে। কতকগুলাে নতুন গান কিনে এনেছি, সেগুলো গেয়ে দেখা গেল। Miss M আবার ‘অলি বারবার’টা গাওয়ালে। সেটা তার অত্যন্ত ভালাে লেগেছে। লােকেন Maryর সঙ্গে দেখা করতে গেছে— রাত দুপুর বাজে, এখনাে সে ফেরে নি। আমার বিশ্বাস, Maryকে লােকেন একটু বিশেষ ভালােবাসে। মনটা এমন শূন্য উদাস হয়ে আছে! ইচ্ছে করছে এই ঘুমােতে গিয়ে আর যদি ঘুম না ভাঙে তত বেশ হয়—ঠিক বেশ হয় না, সকলকে একবার দেখতে এবং সকলের কাছে একবার মাপ চাইতে ইচ্ছে করে। আজ বাবির ছবির যতটা এঁকেছে দেখে এলুম— বােধ হয় রঙ দিলে বেশ হবে। শুক্রবারে দেবে।··· এখানে রাত দুপুর, কলকাতায় ছটা···

 বুধবার। সকালে আবার দোকানে বেরোলুম। বাবির জন্যে একটি বেশ ভালাে lamp পছন্দ করবামাত্র লােকেন সেটার জন্যে পীড়াপীড়ি করে দাবি করতে লাগল। তাকে ছেড়ে দিলুম, কিন্তু মনটা ভারী খারাপ হয়ে রইল। তখনি মনে মনে স্থির করলুম, কতকগুলাে জিনিসপত্র কিনেই একেবারে পরের স্টীমার নিয়ে লন্‌ডন থেকে P & O জাহাজে চড়ে বসব— কিছু ভালাে লাগছে না। Maple এবং Spriggsএর দোকানে গিয়ে বাবির জন্যে কতকগুলাে জিনিস কিনে নিলুম― আমার যা-কিছু সম্বল ছিল সমস্ত ফুরিয়ে গেল। Oswaldsএর ওখানে গেলুম, তারা আমাদের একটা tennis clubএর মতাে জায়গায় নিয়ে গেল। পথে যেতে যেতে Miss O বলছিল, একজনের পক্ষে এক sisterই ঢের, কিন্তু আমার ইচ্ছে করে আমার আরও ভাই থাকত। tennis খেলে Oswaldeএর ওখানে গান গেয়ে এবং গানবাজনা শুনে বাড়ি এসে খেয়ে পুনশ্চ গানবাজনা করে শােবার ঘরে এসেছি। Good night! Good night!···

 বৃহস্পতি। আবার আমার সমস্ত plan ভেঙে গেল। মেজদার কিছুতে ইচ্ছে নয় যে আমি যাই, কাজেই থাকতে হচ্ছে। মাঝে মাঝে এরকম আত্মসম্বরণ করা আবশ্যক। অনেকবার তাে দায়ে পড়ে করতে হয়েছে— কিন্তু অভ্যেস হল কৈ? Miss Mকে নিয়ে, Oswaldsদের ওখানে গিয়ে তাদের কুড়িয়ে নিয়ে, French Exhibition দেখতে গিয়েছিলুম। পথে আসতে আসতে Miss M আমাকে নিয়ে একটু এগিয়ে গেল। কথায় কথায় বলছিল: I am quick at everything। আমি ঈষৎ সহাস্যে বললুম: Quick to forget? সে সেই উপলক্ষে অনেক কথা বললে। কিন্তু ব’লেই তৎক্ষণাৎ আমার মনে মনে এমন ধিক্কার উপস্থিত হল! কথাটা এমনি আমার-মতন-নয় ব’লে মনে হল। মনে হল, আমি অজ্ঞাতসারে লােকেনকে নকল করছি— সে যে রকম মেয়েদের সঙ্গে ঠাট্টার সঙ্গে flirt করে আমিও সেই চাল অবলম্বন করছি। কিন্তু তার সেটা বেশ স্বভাবতঃ আসে, তাকে বেশ মানায়। কিন্তু আমার মুখ থেকে আমার নিজের কানে ওটা এমন বিশ্রী শোনালো তার একটা কারণ বােধ হয়, Miss M আমার প্রতি কতটা serious ভাব ধারণ করেছে। সে আমাকে আরও কিছুদিন থাকবার জন্যে পীড়াপীড়ি করছিল, এবং ভবিষ্যতে ইংলন্‌ডে এলে তার সঙ্গে দেখা করবার জন্যে অনুরােধ করছিল। একটু বিষণ্ণ নম্র বিগলিত ভাব। তাই আমার আরও তীব্র অনুতাপ উপস্থিত হল।···

 French Exhibitionএ যাওয়া গেল। অনেক ক্রেতব্য জিনিস দেখলুম। ডিনারে আমাদের পাশের টেবিলে একটা পার্টি আমাদের দিকে ভারী rudely stare করছিল— আমার সহ্য হল না— যখন ভেঙে গেল আমি তাদের সামনে দাঁড়িয়ে deliberately তাদের out-stare করলুম। British stareএর মতো insolent জিনিস পৃথিবীতে অল্পই আছে।

 আমার ধারণা ছিল ইংরেজ মেয়েদের ভ্রূ এবং চোখের পাতা বিরল, কিন্তু সেটা ভয়ানক ভুল— বরঞ্চ বিপরীত।

 শুক্রবার। সকালে মেজদাদার সঙ্গে Regent Street এ বেরিয়েছিলুম। বাবির ছবি চমৎকার হয়েছে। ফিরে এসে সল্লিকে চিঠি লিখলুম। Brandএর বােনের ওখেনে সন্ধেবেলায় নিমন্ত্রণ ছিল। গেলুম। তাকে বেশ লাগল, বেশ refined। চমৎকার harp এবং পিয়ানাে বাজায়। ‘অলি বারবার’ গানটা খুব তার ভালাে লেগেছে। বলছিল, যদি আমাদের ঐরকম কতকগুলাে দিশি গান Sullivanকে শােনাই তা হলে সে একটা Oriental Opera লিখতে পারে। আমার composition শুনে আশ্চর্য। আমি musicএর grammar কিছু না জেনে compose করতে পারি এতে সে অবাক।···

 শনিবার। সকালে আবার Regents Streetএ যাওয়া গেল। সমস্ত দিন ঘুরে ভয়ানক শ্রান্ত হয়ে গাড়ি করে আমি ফিরে এলুম। আমার বাঁ পায়ের শিরায় বড্ড ব্যথা হয়েছে। লােকেন আমাকে সন্ধের সময় বললে, আমার বাংলা গান শুনতে আজকাল বড়ো ভালাে লাগছে, তুমি কতকগুলাে বাংলা গান গাও। জ্যোৎস্নার কাছে একটা ‘মায়ার খেলা’ ছিল, সেইটে নিয়ে প্রথম থেকে একটা একটা করে অনেকগুলাে গাওয়া গেল। আমার বেশ লাগছিল, লােকেনেরও ভালাে লাগল।··· Lyceum Theatreএ যাওয়া গেল। Bride of Lammermoor অভিনয় হল। চমৎকার লাগল। কী সুন্দর scene! অভিনয়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রায় বরাবর ধীর স্বরে বিচিত্র ভাবের concert বাজে, সেটাতে খুব জমিয়ে তােলে। Ellen Terry খুব ভালাে অভিনয় করেছিল, Irvingএর অভিনয়ও খুব ভালাে— কিন্তু এমন mannerism, এমন অস্পষ্ট উচ্চারণ, এমন অসুন্দর অঙ্গভঙ্গী! কিন্তু তবুও ভালাে অভিনয়— সেই আশ্চর্য। একটি boxএ দুটি মেয়ে বসেছিল, তার মধ্যে একটিকে চমৎকার দেখতে। একেবারে নিখুঁৎ ছােটো সুন্দর মুখখানি, অল্প বয়স, দীর্ঘ বেণী পিঠে ঝুলছে, বেশভূষায় আড়ম্বর নেই, কিন্তু সবসুদ্ধ যাকে dainty বলে তাই। অভিনয়ের সময় রঙ্গভূমির সমস্ত আলাে নিবিয়ে দিয়ে কেবল স্টেজে আলাে জ্বলে— সে স্টেজের উপরকার বক্‌সে বসেছিল, তার মুখের উপর স্টেজের আলাে পড়ছিল, কী সুন্দর দেখাচ্ছিল! সমস্ত backgroundটা অন্ধকার, কেবল তার অর্ধেক মুখ আলােকিত— কী সুকুমার সুন্দর মুখের রেখা! কী চমৎকার গ্রীবাভঙ্গী! আমি অভিনয়ের সময় প্রায় তার মুখের বিচিত্র ভাবের খেলা দেখছিলুম। সেও দূরবীন দিয়ে আমাদের অনেক ক্ষণ দেখেছে, কিন্তু নিঃসন্দেহ ততটা আনন্দ লাভ করে নি। কিন্তু নাট্যশালায় একান্ত নির্লজ্জ স্পর্ধার সঙ্গে পরস্পরের প্রতি দূরবীন কষা আমার নিতান্ত খারাপ লাগে। আমি তাে কিছুতেই পারলুম না, ভারী অভদ্র মনে হয়। এদের মধ্যে অনেকগুলাে প্রথা আছে যা প্রকৃতপক্ষে অভদ্র, সে আমাদের কিছুতেই অভ্যেস হয়ে যাওয়া উচিত না― যেমন নাচ― দূরবীন করা― গান-বাজনার সময়ে গল্প জুড়ে দেওয়া।

 সেদিন French Exhibitionএ একজন বিখ্যাত artistরচিত একটি উলঙ্গ সুন্দরীর ছবি দেখলুম। কী আশ্চর্য সুন্দর! দেখে কিছুতেই তৃপ্তি হয় না। সুন্দর শরীরের চেয়ে সৌন্দর্য পৃথিবীতে কিছু নেই― কিন্তু আমরা ফুল দেখি, লতা দেখি, পাখি দেখি, আর পৃথিবীর সর্বপ্রধান সৌন্দর্য থেকে একেবারে বঞ্চিত। মর্তের চরম সৌন্দর্যের উপর মানুষ স্বহস্তে একটা চির অন্তরাল টেনে দিয়েছে। কিন্তু সেই উলঙ্গ ছবি দেখে যার তিলমাত্র লজ্জা বােধ হয় আমি তাকে সহস্র ধিক্কার দিই। আমি তাে সুতীব্র সৌন্দর্য-আনন্দে অভিভূত হয়ে গিয়েছিলুম, আর ইচ্ছে করছিল আমার সকলকে নিয়ে দাঁড়িয়ে এই ছবি উপভােগ করি। বেলি যদি বড়ো হ’ত তাকে পাশে নিয়ে দাঁড়িয়ে আমি এ ছবি দেখতে পারতুম। এ রকম উলঙ্গতা কী সুন্দর! এই ছবি দেখলে সহসা চৈতন্য হয়— ঈশ্বরের নিজহস্তরচিত এক অপূর্ব সৌন্দর্য পশু-মানুষ একেবারে আচ্ছন্ন করে রেখেছে এবং এই চিত্রকর মনুষ্যকৃত সেই অপবিত্র আবরণ উদ্‌ঘাটন করে সেই দিব্য সৌন্দর্যের একটা আভাস দিয়ে দিলে। এই দেহখানির শুভ্র কোমলতা এবং প্রত্যেক সুঠাম ভঙ্গিমার উপর বিশ্বকর্মার, সেই অসীমসুন্দরের, অঙ্গুলির স্পর্শ দেখা যায় যেন। এ কেবলমাত্র দেহের সৌন্দর্য নয়— একটি প্রেমপূর্ণ সুকোমল নারীহৃদয়, একটি অমর সুন্দর মানবাত্মা এরই মধ্যে বাস করে। তারই ভালােবাসা, তারই লাবণ্য এর সর্বত্র উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে। এই উলঙ্গ চিত্রে রমণীর সেই হৃদয়ের কোমলতা এবং আত্মার শুভ্র জ্যোতি ব্যক্ত করছে, মানব-অন্তঃকরণের চিরপ্রচ্ছন্ন রহস্য কতকটা প্রকাশ করে দিচ্ছে।

 রবিবার। আজ সতুর সঙ্গে churchএ যাবার কথা ছিল। খোঁড়া পা নিয়ে সমস্ত দিন পড়ে আছি। বাবির porcelainএর ছবিটা পাঠিয়ে দিয়েছে, সুন্দর লাগছে। কিন্তু মেজদাদা সেটা দখল করে রেখেছেন, আমার ভয় হচ্ছে পাছে আমাকে না দেন। রাত্তিরে গান হল। Miss Oswald সতুর হাত দিয়ে আমাকে একটা ওষুধ পাঠিয়ে দিয়েছেন।

 সােমবার। পা অনেকটা ভালাে বােধ হচ্ছে। বিকেলের দিকে লােকেনের সঙ্গে Walleryর ওখানে গিয়ে একটা cabinet ছবি নেওয়া গেল। তারা অনেক যত্ন করে নানা positionএ নিলে। বললে splendid head— বােধ হয় আমার মুখ প্রসন্ন করবার জন্যে। Miss Oswaldএর ওখানে যাওয়া গেল। সে আমার একটা ছবি চাইলে― দিলুম। কতকগুলাে বাংলা গান গাওয়ালে― বিশেষ রকম ভালাে লাগল, বিশেষতঃ ‘অলি বারবার’টা। ভরসা করি, এর মধ্যে চালাকি কিছু নেই। চাণক্য বলেছেন: বিশ্বাসং নৈব কর্তব্যং ত্রিষু রাজকুলেষু চ। এরা একে স্ত্রী তাতে রাজকুল। একজন musical পুরুষ বসে ছিল, সেও অনেক তারিফ করলে। birthday book এবং autograph bookএ নাম লিখে দিয়ে National Liberal Clubএ সিন্ধি বন্ধু আধ্বানির নিমন্ত্রণ উপলক্ষে dinner খেতে গেলুম। সেখানে Voyseyর সঙ্গে দেখা। তাকে বেশ লাগল, সে বাবামশায়ের প্রতি খুব ভক্তি প্রকাশ করলে। তার নিজের ইতিহাস অনেক শােনা গেল। Christianity ত্যাগ করার দরুন ঘরে বাইরে তাকে অনেক উপদ্রব সইতে হয়েছে। বললে, সব চেয়ে কষ্ট যখন নিজের ঘরের মধ্যে sympathyর অভাব দেখা যায়। আমাকে দেখে দেখে বললে, তােমার বােধ হয় কথাটা খুব নতুন বােধ হবে, কিন্তু তােমাকে দেখবামার আমার মনে হয়েছিল যিশুখৃস্টকে যে রকম আঁকে তােমাকে ঠিক সেই রকম দেখতে। আমি বললুম, এ কথা আমার পক্ষে নতুন নয়। clubটা একটা রাজপ্রাসাদ বললেই হয়― চমৎকার পাথরের সিঁড়ি, খুব জমকালাে, এবং যত রকম আরাম কল্পনা করা যেতে পারে তার বন্দোবস্ত আছে।

 মঙ্গলবার। চিঠি পাওয়া গেল। বাবি লিখেছে, আর চিঠি লিখবে না। মেজদাদার কাছে আমার একলার বাড়ি পালাবার প্রস্তাব করা গেল, কিছু ফল হল না। বাবিকে চিঠি লিখতে বসা গেল।

 বুধবার। কাল সন্ধে থেকে লোকেন Margateএ তার বন্ধুসন্দর্শনে। আমি বসে বসে চিঠি লিখছি। Miss Mullএর কাছে একটু গান শিখলুম। ‘যদি আসে’ গানটা তার ভালাে লাগল। লােকেন ফিরে এসেছে। আজ পয়লা অক্‌টোবর— এ মাসটা শেষ হয়ে গেলে বাঁচা যায়। কাল থেকে ঝেড়াে বাতাস বচ্ছে, মেঘ করে রয়েছে, শীতও বেড়েছে। বােধ হয় রীতিমত বিলিতী weather আরম্ভ হল। মেজদার কেন এ দেশ ভালাে লাগে আমি তাে কিছুই বুঝতে পারি নে— তিনি তাে এখানকার হুড়োমুড়িতে তেমন যােগ দেন না। ইচ্ছে করলেই একটা-কিছু করা যেতে পারে, নিদেন রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে দোকানগুলাে ঘুরে আসা যেতে পারে— এইটে মনে করেই মন অনেকটা নিশ্চিন্ত থাকে বােধ হয়।

 বৃহস্পতি। নারায়ণ হেমচন্দ্রের সঙ্গে দেখা— আশ্চর্য অধ্যবসায়। বেচারার কাপড়-চোপড়ের অবস্থা দেখে আমি তাকে আমার একসুট গরম কাপড় দিলুম। India Officeএ হয়ে দোকান হয়ে শ্রান্তভাবে বাড়ি প্রত্যাগমন। মেজদা কাল আমাকে Birminghamএ নিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কাজেই এখনি বসে বসে সল্লিকে তাড়াতাড়ি এক চিঠি লিখে দেওয়া গেল। আদবে ভালো লাগছে না।

 শুক্র। Birmingham-যাত্রা। ইংলন্‌ড দেখতে বড়াে সুন্দর। Lee stationএ উপস্থিত ছিল। শহর দেখতে আমার আদবে ভালাে লাগে না। electric tram চড়া গেল। electric tramএর কলকারখানার মধ্যে নিয়ে গেল, নির্বোধের [মতাে] ঘুরে ঘুরে বেড়িয়ে হাঁ করে দেখতে লাগলুম। কিছুই বুঝলুম না, কেবল একান্ত শ্রান্ত হয়ে Mrs. Leeর ওখানে ডিনার খেয়ে হােটেলে এসে নিদ্রা।

 শনিবার সকালে আবার বিবিধ দ্রষ্টব্য বিষয়ের সন্ধানে বেরোনাে গেল। এটা পােস্ট্ আপিস, ওটা ম্যুনিসিপাল আপিস, সেটা আদালত, এই করতে করতে একটা ছাপাখানায় যাওয়া গেল― সেখানে রঙিন ছবি ছাপা দেখা গেল। এটা দেখবার জিনিস বটে। সন্ধের সময় লন্‌ডনে ফিরে এসে Walleryদের ওখেন থেকে আমার ছবির প্রুফ পাওয়া গেল।

 রবিবার। voyseyর churchএ গিয়েছিলুম। বেশ লাগল। মনটা অনেকটা ভালাে বােধ হল। ফিরে এসে লােকেনের ঘরে বসে গল্প করছি— খানিক বাদে Mrs. Palit এসে বললেন drawing roomএ রাজনারান আর Miss Mullএ খুব scene হয়ে গেছে। Miss Mull বসে বাজাচ্ছিল— তার বােধ হয় ইচ্ছে ছিল তার বাজনা শুনে আমি drawing roomএ যাই, অনেক ক্ষণ গেলুম না দেখে সে রাজনারায়ণকে জিজ্ঞাসা করছিল: Is Mr. Tagore out I wonder? রাজনারান বললে: No. Evidently your signal has not attracted him। Mrs. Palit তাকে বললেন: Is that your signal Miss Mull? সে রাগ করে piano বন্ধ করে বললে: I don't understand what you say! ব’লে ঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেল। আমাকে নিয়ে রাজনারানের সঙ্গে তার ক্রমিক খিটিমিটি চলছে। Oswaldদের ওখেনে বিকেলে গিয়েছিলুম, বাংলা গান হল। Mrs. Oswaldএর ভালো লাগল। এখেনে ফিরে এসে সন্ধের সময় গান। Miss Mull ‘অলি বারবার’টা আবার গাইতে বললে, সেটা তার ভারী ভালাে লাগে। সে বললে: I don't know what is in it― it is so very pathetic! আজ বিকেলে লোকেনে আমাতে দুজনেই পাগড়ি প’রে বেরিয়েছিলুম। রাস্তার লােকের খুব মজা লেগেছিল। আমরা কালাে মানুষ ঠিক যদি ইংরেজের ছদ্মবেশ ধারণ করি তাতে এ দেশের লােকের অদ্ভুত মনে হয় না। যখন রাস্তার মেয়েরা আমাকে দেখে হাসে তখন আমার চেহারার গর্ব অনেকটা চলে যায়। আজ ৫ই। এখনাে পাঁচ সপ্তাহ।

 সােমবার। কাল সমস্ত রাত ধরে ভয়ানক স্বপ্ন দেখেছি। ঠিক এই রকমের স্বপ্ন আমি কতবার দেখেছি তার ঠিক নেই, মনে হয় কোন্‌দিন সত্যি হয়ে দাঁড়াবে। এই এক রাত্তিরের মধ্যে ঠিক যেন মাসখানেক অসহ্য কষ্ট পেয়েছি এমনি মনে হচ্ছে। আজ চিঠি আসবার দিন। বাবির চিঠি পাওয়া যাবে না। আমি ঠিক করেছি বাড়ি ফিরব— আর নয়।

 মঙ্গলবার। Savoy Hotelএ মনােমােহনের ওখানে lunch খেয়ে P & O আফিসে Thames Steamerএ passage engage করে নিশ্চিন্ত। বৃহস্পতিবারে ছাড়বে। কাল রাত্তিরে Carlyle Societyতে গিয়েছিলুম। চুরোটের ধোঁওয়ার মধ্যে John Stirbingএর life সম্বন্ধে প্রশ্নোত্তর। মেজদাদা Newman সম্বন্ধে একটুখানি বললেন, সকলের খুবই ভালো লেগেছে। রাত্তির দুটো পর্যন্ত আমার দেশে ফেরা সম্বন্ধে সমালোচনা করা গেছে। মঙ্গলবার রাত্তিরে লোকেন আমাকে Oswaldদের ওখানে নিয়ে গিয়েছিল।

 বুধবার। সমস্ত দিন হিসেব করতে এবং জিনিস কিনতে গেল। মেজদাদার কাছে অনেক ধার হয়ে গেছে— তিনি আমাকে অমনি দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সে আমার ইচ্ছে হল না। মেজদাদার টাকাতেই যদি বাবিদের জন্যে জিনিস কিনলুম তা হলে আমার আর দেওয়া হল কই? অল্পে অল্পে শুধে ফেলব। কেন মরতে বিলেতে এসেছিলুম কে জানে। বাড়িতে চিঠি লিখলুম। Miss Mull আমাকে সব গানগুলো গাওয়ালে। ‘Remember me’ বলে একটা গানের পর সে আস্তে আস্তে আমাকে বললে: Mr. T, I shall remember you। আমি অপ্রতিভ হয়ে নিরুত্তর বসে রইলুম।

 বৃহস্পতি। আজ তো Thames জাহাজে উঠলুম। আমার cabinএ একজন civilianএর জিনিসপত্র দেখে মন বিগড়ে গিয়েছিল। তার পরে দেখলুম সে নেহাত কাঁচা, এই প্রথম ভারতবর্ষে যাচ্ছে। আমাকে দেখে ভারী খুশী। জাহাজে কখন কী করতে হয়, কোথায় কী, আমাকে সমস্ত জিজ্ঞাসা করে নিলে। আমি তার মুরুব্বি হয়ে দাঁড়িয়েছি। মল্লিক এবং বাঁড়ুজ্জের ভারী প্রশংসা করলে। Lord Riponএর দলের লোক। সেখেনে গেলে কী হয় কে জানে। বোধ হচ্ছে Irishman। জাহাজে ভয়ানক ভিড়। dinner tableএ আমার ঠিক সামনেই রাঙা টুক্‌টুকে ঠোঁট- জ্বল্‌জ্বলে চোখ- এবং মিষ্টি হাসি-ওয়ালা একটি মুখ পাওয়া গেছে। আমাকে সকলেই পরম বিস্ময়ের সঙ্গে নিরীক্ষণ করছে।

 শুক্রবার। চমৎকার সকাল হয়েছে। সমুদ্র স্থির, আকাশ পরিষ্কার, সূর্য উঠেছে। কন্‌কনে ঠাণ্ডা। আমাদের দক্ষিণে ভােরের বেলা অল্প অল্প তীরের চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল। অল্পে অল্পে কোয়াশার আবরণ উঠে গেল, Isle of Wightএর পার্বত্য তীর এবং Ventnor শহর ক্রমে ক্রমে প্রকাশ হয়ে পড়ল। পর্বতের ঢালুর উপরে সমুদ্রের তীরে শাদা শাদা বাড়ি বিজ্‌বিজ্‌ করছে― লিলিপুট শহরের মতাে। এ জাহাজে বিষম ভিড় এক কোণে নিরিবিলি চৌকি নিয়ে বসে লেখবার যাে নেই এবং জায়গাও নেই। Brindisi থেকে আরও অনেক লােক উঠবে। ভরসা করি আমাদের cabinএ আর কেউ আসবে না। আমাদের Massilia জাহাজের purserকে এ জাহাজে দেখলুম। সে আমাকে বললে, তােমার যখন যা আবশ্যক হবে আমাকে জানিয়াে। ডিনার-টেবিলে আমার পাশেই সে আসন গ্রহণ করেছে; ডেকের উপর আমাকে পাশে নিয়ে হট্‌ হট্‌ করে বেড়াতে চায় এবং বিস্তর গল্প বলে। লােক খুব ভালাে সন্দেহ নেই, নইলে আমাকে বেছে নিলে কেন সমজ্‌দার বটে। কিন্তু সর্বদা আমার প্রতি মনােযােগ দিলে আমার লেখাপড়া বন্ধ করতে হয়। Wallaceএর Darwinism পড়ছি, বেশ লাগছে— ইচ্ছে করছে বাংলায় তর্জমা করতে। কিন্তু আমার দ্বারা হয়ে উঠবে না।

 আজ ডেকে বেড়াতে বেড়াতে একটি লােকের সঙ্গে আলাপ হল, সে কর্তাদাদামশায়কে জানত। একটা বড় সেনাপতি গােছের লােক, Egyptএ যাচ্ছে। অনেক কথা হল। English Govemmenটের কথা হতেই আমি ইংরেজের ব্যবহার সম্বন্ধে দু-একটা কথা বললুম। সে আশ্চর্য হয়ে গেল। সে বললে, আমাদের সময়ে ঐরকম ছিল বটে, কিন্তু এখনাে আছে না কি? শুনে স্বজাতির উপর ভারী চোট প্রকাশ করলে। বললে, লােকে বলে ভারতবর্ষের বাজারে ভারী ঠকায়, কিন্তু Bond Streetএর চেয়ে ঢের ভালাে; নিম্নশ্রেণীয় ভারতবর্ষীয়েরা নিম্নশ্রেণীয় ইংরেজদের চেয়ে যে কত ভালাে; তা বলতে পারি নে। বললে, হিন্দুরাই যথার্থ Christian; তাদের ক্ষমাপরায়ণ সহিষ্ণু নম্রতা, তাদের আন্তরিক সহৃদয়তা, খৃস্টানদের অনুকরণীয়। লােকটা খুব ধার্মিক, আমাকে খৃস্টধর্মে লওয়াবার কতকটা চেষ্টা করলে। আমার ইংরিজি ভাষা শুনে খুব বিস্ময় প্রকাশ করলে। জিজ্ঞাসা করলে আমি Oxfordএ পড়েছি কি না। আমি বললুম, না। —কোনাে দেশের কোনাে কলেজে পড়েছি কি না? ―না। শুনে অবাক্‌। সে বললে, আমি India Officeএ থাকি— অনেকটা জানতে পারি― আমাদের সময়ের চেয়ে এখনকার ভারতবর্ষীয় ইংরেজরা ভারতবর্ষ এবং ভারতবর্ষীয়ের প্রতি অনেক বেশি মনােযােগ দেয়। আমি বললুম, আমার উল্টো বিশ্বাস। দৃষ্টান্তস্বরূপ কর্তাদাদামশায়ের সঙ্গে ইংরেজের মেশামিশির কথা বললুম। সে বললে: His was the only solitary instance। আমাকে বললে, যদি কখনাে পুনশ্চ ইংলন্‌ডে আসি তা হলে India Officeএ তাকে সন্ধান করে যেন look up করি।― সমুদ্র আশ্চর্য শান্ত এবং সমস্ত দিন রৌদ্রোজ্জ্বল পরিষ্কার। একটা নিরিবিলি কোণ পেলে কবিতা লিখতুম। জাহাজে ক্রমে আমার বন্ধুবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছি।

 ইংরেজ মেয়েদের চোখ আমার ক্রমে ভালাে লাগছে— মেঘমুক্ত নীলাকাশের মতো এমন পরিষ্কার এবং উজ্জ্বল, প্রায়ই ঘন পল্লবে আচ্ছন্ন। আমাদের দেশের মেয়েদের চোখে এক রকম আবেশের ভাব আছে, এদের তা মােটে নেই।

 শনিবার। Bay of Biscayতে পড়া গেছে। সমুদ্র কিঞ্চিৎ অশান্ত। সকালে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ছিল, এখন পরিষ্কার হয়ে গেছে। আর-একজন সহযাত্রীর সঙ্গে পরিচয় হল, তাকে Archer -এর studioতে দেখেছিলুম― টেরা। Turnbull― ভূতপূর্ব ম্যুনিসিপাল সেক্রেটারি। সে বলছিল, আমাকে যদি কেউ দশ হাজার টাকা দেয় তা হলেও আমি কলকাতা ছেড়ে ইংলন্‌ডে বসতি করি নে। আমি জিজ্ঞাসা করলুম, কেন? সে বললে, ইংরাজ জাত বড়াে উদ্ধত, স্বার্থপর, গর্বিত ইত্যাদি― ফরাসীরা ওদের চেয়ে ঢের ভালাে। আজ কখনাে রোদ্‌দুর কখনাে মেঘ করছে, খুব ঠাণ্ডা বােধ হচ্ছে। কাল চমৎকার সূর্যাস্ত দেখা গিয়েছিল, আকাশের পশ্চিমপ্রান্তে এমন সুন্দর রঙ হয়েছিল। আজ মেঘের মধ্যে সূর্য অস্ত গেল। সমুদ্র মাঝে মাঝে ফুলে ফুলে উঠছে।

 রবি। কাল রাত্তিরে আবার সেই রকমের স্বপ্ন দেখেছিলুম। স্বপ্নে বােধ হচ্ছিল মনের কষ্টে আমি যেন ঊর্ধ্বশ্বাসে চীৎকার করে কোথায় ছুটে চলেছি। ঠিক এই ধরণের স্বপ্ন কতবার দেখেছি তার ঠিক নেই। সকালে আমার সহযাত্রী Connollyর সঙ্গে ভারতবর্ষ নিয়ে কথা হচ্ছিল। সে বললে, আমি ভারতবর্ষে কখনো Anglo Indian দলে ভিড়ব না, আমি সেখানকার দেশের লােকের সহায় এবং বন্ধু হব। আসবার আগে Lord Ripon এবং তার private secretaryর সঙ্গে এ বিষয়ে তার অনেক কথা হয়ে গেছে। আজ সকালবেলা কুয়াশাচ্ছন্ন। কুয়াশা কেটে গিয়ে বেশ রোদ্‌দুর উঠেছে। ছাতের চাঁদোয়া খাটিয়ে দিয়েছে, তাই আজ অনেকটা snug বােধ হচ্ছে― আজ তেমন ঠাণ্ডা নেই। এ জাহাজে একটি মেয়ের সুন্দর নীল চোখ এবং চমৎকার ঠোট—হাসলে বেড়ে দেখায়। আমার ডিনার টেবিলের সঙ্গিনীর চেয়ে একে অনেক ভালাে দেখতে। এর মুখের ভাবে বেশ একটু কোমল নম্রতা আছে, উগ্রতা কিছুমাত্র নেই। আজ আর-এক ব্যক্তি আমার সঙ্গে আলাপ করে নিলে: You belong to the great Tagore family of Calcutta? আমি গান গাইতে পারি কি না জিজ্ঞাসা করলে আমি বললুম, হাঁ। সে বললে Colonel Chatterton ব’লে এক মস্ত musician Brindisi থেকে আমাদের জাহাজে উঠবে, সে এলে আমাদের অনেক রকম আমােদ প্রমোেদ হবে; আমাকেও গাওয়াবে। Darwinism শেষ করা গেল। খুব ভালাে লাগল, বিশেষতঃ শেষ chapter। Spiritual Manএর মধ্যেও survival of the fittest নিয়ম বােধ হয় চলছে— তবে তার জীবন মৃত্যু অন্য রকমের। যখন ঋষিরা প্রার্থনা করেছিলেন ‘মৃত্যোর্মামৃতং গময়’ তখন এই spiritual survival প্রার্থনা করেছিলেন। আমরা যে আত্মা পেয়েছি তারই সফলতা চেয়েছিলেন।— চমৎকার সূর্যাস্ত। সন্ধ্যার রঙে জল এবং আকাশে এক রকম শারীরিক লাবণ্য প্রকাশ পায়, মনে হয় যেন তার মধ্যে জীবনের এবং যৌবনের পরিপূর্ণতা পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে।— Wallace পড়ে আমার মনে এই একটা চিন্তার উদয় হয়েছে যে, আমাদের যে অংশ জন্তু সেই অংশই আমাদের জীবনধারণের পক্ষে একান্ত আবশ্যক এবং natural selectionএর নিয়ম অনুসারে সেই অংশ ক্রমশঃ উদ্ভূত হয়েছে, কিন্তু আমাদের অনেকগুলি মানবচিত্তবৃত্তি আছে যা আমাদের জীবনরক্ষার পক্ষে কিছুমাত্র আবশ্যক নয়। সুতরাং জীবনসংগ্রামের নিয়মানুসারে সেগুলাে কী করে উদ্ভাবিত হল কিছু বােঝবার যাে নেই। আমাদের ধর্মভাব জীবনরক্ষার পক্ষে অনাবশ্যক, এমনকি অনেক স্থলে বাধাজনক। উদ্ভিদ এবং জন্তুদের যা-কিছু আছে সমস্তই তাদের আবশ্যক, অথবা অতীত আবশ্যকের অবশেষ, কিন্তু আমাদের প্রধান চিত্তবৃত্তিসকল আমাদের আবশ্যকের অতিরিক্ত। এ পর্যন্ত প্রমাণ হয় নি সৌন্দর্য আমাদের জীবনের পক্ষে আবশ্যক, যে জাতির মধ্যে শিল্পচর্চা অধিক তারা অন্য জাতির চেয়ে বলিষ্ঠ বা তাদের জীবনীশক্তি অধিক। গ্রীকরা রােমের কাছে পরাভূত হয়েছিল। যারা সংগীতচর্চা করে জীবনসংগ্রামে তাদের বিশেষ কী সুবিধে বােঝা যায় না। অতএব এসকল মনােবৃত্তি আবশ্যকের নিয়মানুসারে আবির্‌ভূত হয় নি― সৌন্দর্যপ্রিয়তা মানবের অন্তঃকরণে স্বাভাবিক ব’লে ধরে নিতে হবে। এই-সকল আপাততঃ অনাবশ্যক চিত্তবৃত্তি আমাদিগকে কোন্ উচ্চতর আবশ্যকতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে কে বলতে পারে।

 সােমবার। আজ চৌকিতে আরামে বসে Modern Thoughts & Modern Science পড়ছিলুম— এক দল লােক এসে আমাকে quoits খেলতে নিয়ে গেল। stupid খেলা। আজ রাত্তিরে বােধ হয় নৃত্য হবে। ইংরেজ-সমাজের একটা আমার চোখে খুব ঠেকে— এখানে মেয়েরা পুরুষদের প্রতি অনায়াসে rude হতে পারে, public opinion তাতে কোনাে বাধা দেয় না। ভদ্রতার নিয়ম যে স্ত্রী-পুরুষ-ভেদে বিশেষ তফাত হবে তার কারণ আমি বুঝতে পারি নে। হয়তাে হতে পারে গােলাপের যে কারণে কাঁটা থাকা আবশ্যক, যেখানে স্ত্রীপুরুষে বেশি মেশামিশি সেখানে স্ত্রীলােকের সেই কারণে কতকটা প্রখরতা থাকা আবশ্যক। যাই হােক, তার চেয়ে আমাদের মেয়েদের সর্বাঙ্গীণ কোমলতা এবং মমতার ভাব আমার ঢের বেশি ভালাে লাগে।— এরা সবাই মিলে আমার কোণ থেকে আমাকে উপ্‌ড়ে বের করবার চেষ্টায় আছে।

 Concert আমাকে গান গাওয়ালে। বিস্তর বাহবা পাওয়া গেল। অনেক মেয়ে আমার সঙ্গে আলাপ করলে। পরিচিতসংখ্যা ক্রমে বেড়ে উঠছে। গানের পর খুব এক-চোট নাচ হয়ে গেল। আমি নাচি কি না অনেকে সন্ধান নিলে। আমি বললুম: I used to dance― but I am out of it now― I am sure to come to grief if I attempt it। মিস্ ঠিক নামটা মনে পড়ছে না, বলে: Do try! আমি বললুম: Excuse me! I belong to the obscure genus of wall-flowers। নাচ দেখলে আমার মন খারাপ হয়ে যায়। একটি অত্যন্ত মােটা মেয়ে চমৎকার গান করলে। সেই আমার গানের accompaniment বাজিয়েছিল। Gounodর Serenade এবং If গেয়েছিলুম। আজকাল আমি অনেকটা সাহসপূর্বক গলা ছেড়ে গান গাই―বাবি শুনলে বােধ হয় অনেক উৎসাহ দিত।

 আজ দুপুরবেলা Portugalএর একটুখানি রেখা দেখা গিয়েছিল।

 মঙ্গল [১৪ অক্‌টোবর]। Gibএ পৌঁছনো গেল। ভয়ানক বৃষ্টি হচ্ছে। Gibralterএর পাহাড় মেঘে অনেকটা ঢেকে ফেলেছে। দুটি Sisters of Mercy ‘alms for the poor’ ব’লে সকলের কাছে কাছে ভিক্ষে চেয়ে চেয়ে বেড়াচ্ছিল। আমি তাদের একটি অর্ধ স্বর্ণমুদ্রা দিলুম, একটু আশ্চর্যভাবে আমার মুখের দিকে চেয়ে দেখলে— অধিকাংশ ইংরেজসন্তান প্যান্ট্‌লুনের পকেটে হাত গুঁজে এমনভাবে দাঁড়িয়ে রইল যেন ক্রোশ তিনেকের মধ্যে আর কোনাে জনমানবের সম্পর্ক নেই।


 মানুষের সবলতা দুর্বলতা সম্বন্ধে ভাবতে ভাবতে একটা দৃষ্টান্ত আমার মনে উদয় হল। নিম্নশ্রেণীয় জন্তুরা ভূমিষ্ঠকাল অবধি মানবশিশুর চেয়ে অধিকতর পরিণত ও বলিষ্ঠ। মানবশিশু একান্ত অসহায়। ছাগশিশুকে চলবার আগে পড়তে হয় না, মানুষকে সহস্রবার পড়তে হয়। জন্তুদের জীবনের প্রসারতা সংকীর্ণ, এই জন্যে আরম্ভকাল থেকেই তারা শক্ত সমর্থ। মানুষের জীবনের পরিধি বহুবিত্তীর্ণ, এই জন্যে সে বহুকাল পর্যন্ত অপরিণত দুর্বল। যেসকল মানুষের অত্যন্ত অবিচলিত সংকর, প্রচণ্ড strong will, যারা কখনাে ভ্রমে পড়ে না, চিরদিন শক্তভাবে চলে, তাদের জীবনের মধ্যে নিশ্চয়ই অনন্ত প্রসারতার ব্যাঘাতজনক কঠিন সংকীর্ণতা আছে― তাদের জীবনের পরিণতি অতি শীঘ্রই বন্ধ হয়ে যায়। instinct ঠিক পথে চলে, কিন্তু বুদ্ধি ইতস্ততঃপূর্বক ভ্রমের মধ্যে দিয়ে যায়। instinct পশুদের এবং বুদ্ধি মানুষের। instinctএর গম্যস্থান সামান্য সীমার মধ্যে, বুদ্ধির শেষলক্ষ্য এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয় নি। আবশ্যকের আকর্ষণ অতি সাবধানে আমাদের সুবিধার রাস্তা দিয়ে নিয়ে যায়― স্বার্থপরতার মধ্যেই তার সীমা— সৌন্দর্য ও ভালােবাসার আকর্ষণ আমাদের সহস্রবার ধুলায় ফেলে দেয়, অশ্রুসাগরে নিমগ্ন করে, কিন্তু তার সীমা কোথায় কে জানে। অনন্তের দিকে যার স্বাভাবিক আকর্ষণ আছে সেই আপনাকে পদে পদে দুর্বল বলে অনুভব করে― ক্ষুদ্র সীমা ও সংকীর্ণ সুখস্বচ্ছন্দতার মধ্যে যার জীবনের স্বাভাবিক বিলাস সে যতটুকু মৎলব করে ততটুকু ক’রে ওঠে, যতটুকু চায় ততটুকু আদায় করে নেয়। সেই সবল— তার সবলতা দেখে আমরা আপাততঃ হিংসা করি, কিন্তু চিরজীবনের raceএ একদিন হয়তাে তাকে আমরা অবহেলে ছাড়িয়ে যাব। মানবসন্তান ব’লে বহুকাল আমাদের শারীরিক মানসিক দুর্বলতা, বহুকাল আমরা পড়ি, বহুকাল আমরা ভুলি, বহুকাল আমাদের শিখতে যায়। অনন্তের সন্তান ব’লে এতকাল ধরে আমাদের আধ্যাত্মিক দুর্বলতা, পদে পদে আমাদের দুঃখ কষ্ট পতন। কিন্তু সেই আমাদের সৌভাগ্য। সেই আমাদের চিরজীবনের লক্ষণ। তাতেই আমাদের ব’লে দিচ্ছে এখনাে আমাদের বৃদ্ধি ও বিকাশের শেষ হয় নি। শৈশবই যদি মানুষের শেষ হত তা হলে মানুষের মতাে অপরিস্ফুটতা প্রাণীসংসারে কোথাও পাওয়া যেত না, আমাদের এই অপরিণত পদস্খলিত ইহজীবনই যদি আমাদের শেষ হত তা হলেই আমরা একান্ত দুর্বল সন্দেহ নেই। কিন্তু শৈশবের দুর্বলতাই যেমন প্রকাশ করছে তার উন্নততর ভবিষৎ আছে, তেমনি মানুষের এই দুর্বল ইহজীবনই তার ভবিষ্যৎ উন্নততর জীবনের সূচনা।

 পৃথিবীর কত দুর্বল, কত পতিত, কত অপরাধী, পৃথিবীর কত বলিষ্ঠহৃদয় সাধুর চেয়ে প্রকৃতপক্ষে মহৎ এবং কুলীনবংশােদ্‌ভব তা চিরজীবনের হিসাবে ক্রমশঃ ব্যক্ত হবে।


 natural selectionএর নিয়ম মানুষ পর্যন্ত এগিয়ে এক রকম বন্ধ হয়ে গেছে— তার শেষ ফল কী ভালাে করে বুঝে ওঠা যায় না। দেখা যাচ্ছে সৌন্দর্যপ্রেম অনেক স্থলে আমাদের প্রাকৃতিক জীবনের হানিজনক। শিল্পচর্চার ইতিহাস অধ্যয়ন করলে দেখা যায়—অনেক বড়ো বড়ো শিল্পী বিস্তর দারিদ্র্যকষ্ট এবং জীবনের ক্ষতি স্বীকার করে শিল্পচর্চা করেছে এবং এই রকম ক’রেই অল্পে অল্পে শিল্পবিদ্যার উন্নতি হয়েছে, natural selectionএর নিয়মে এর কোনাে কারণ পাওয়া যায় না। জীবনের ক্ষতির মধ্যে দিয়েই উন্নতি— এ কেবল মানুষের মানসিক ও আধ্যাত্মিক জগতে দেখা যায়। বিজ্ঞান সম্প্রতি মানুষের কাজে লেগেছে, কিন্তু তার আরম্ভকালে কেবলমাত্র নিস্বার্থ জ্ঞানস্পৃহা থেকে যখন বিবিধ শারীরিক দুর্গতি এবং প্রাণপণ স্বীকার ক’রে বহুকাল ধ’রে মানুষ বিজ্ঞানের চর্চা করে এসেছে তার কারণ কী? দুয়ের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে রহস্যের প্রতি মানবমনের অসীম আকর্ষণ— এমন-কি অনেক স্থলে তা জীবনাসক্তিকেও ছাড়িয়ে ওঠে। আমাদের যা প্রকৃত মনুষ্যত্ব তা এই ‘natural selection’ নিয়মের উপর প্রতিষ্ঠিত জীবনাসক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম ক’রে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। আমরা প্রাণ সমর্পণ করে জ্ঞান পেয়েছি, ধর্ম পেয়েছি, শিল্প রচনা করেছি। সভ্যতার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মধ্যে ভালােবাসা যে ক্রমে বাড়ছে তা অনেক পরিমাণে তার অকারণদুঃখ-জনক এবং তার জীবনরক্ষার বিরােধী, কিন্তু তবু কোন্ নিয়মানুসারে আমরা উত্তরােত্তর তাকে এত উচ্চ আসন দিচ্ছি?


 পৃথিবীতে কোনো-একটা সীমায় এসে নিশ্চিন্ত হয়ে থেমে থাকবার যাে নেই— তা হলেই আবার হুহু করে পিছিয়ে পড়তে হয়। আপনাকে কোনাে-এক স্থানে বজায় রাখতে হলেও অবিশ্রাম চেষ্টার আবশ্যক। আমরা ভারতবর্ষীয়েরা সেই চেষ্টার বাইরে এসে পড়ে যা পেয়েছিলুম তা উত্তরােত্তর হারাচ্ছি। Australia, apteryx পাখির মতাে আমাদের ডানা ক্রমশই সংকীর্ণ হয়ে এসেছে —কিন্তু এখনকার জীবনসংগ্রামের মধ্যে পড়ে আবার কি সেই ডানা আমরা ফিরে পাব? কিম্বা আত্মরক্ষার উপযােগী আর কোনাে রকম নতুন ইন্দ্রিয় উদ্‌ভূত হবে?


 আমাদের ভারতবর্ষের প্রাচীন বিদ্যা, প্রাচীন সভ্যতা, প্রাচীন প্রাণ, খনির ভিতরকার পাথুরে কয়লার মতো সঞ্চিত হয়ে রয়েছে। তার মধ্যে বহুযুগের উত্তাপ এবং আলােক প্রচ্ছন্ন আছে— কিন্তু আমাদের কাছে তা ঘাের অন্ধকারময়, শীতল, নিবিড়কৃষ্ণবর্ণ অহংকারের স্তূপ। অগ্নিশিখা যদি না থাকে তা হলে গবেষণাদ্বারা পুরাকালের মধ্যে গহ্বর খনন করে যতই প্রাচীন খনিজপিণ্ড তুলে আনাে-না কেন তা নিতান্ত অকর্মণ্য। বরঞ্চ য়ুরোপীয়েরা তাকে ব্যবহারের মধ্যে আনতে পারে, কারণ তাদের হাতে সেই অগ্নিশিখা আছে। আমরা তাকে নিয়ে কেবল খেলা করব, কিন্তু তার যথার্থ ব্যবহার করতে পারব না। বর্তমানকালে প্রাচীন আর্যশাস্ত্র নিয়ে আমরা যে রকম খেলা আরম্ভ করেছি তাই দেখে আমার মনে এই কথা উদয় হল। আমরা মনে করছি পুনর্বার মস্তকের পশ্চাদ্‌ভাগে টিকি প্রচলিত করে এবং হবিষ্যান্ন খেয়ে আমরা প্রাচীন আর্যজাতি হব। এ দিকে য়ুরোপীয়েরা আমাদের শাস্ত্র থেকে প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাস ও শব্দবিজ্ঞান উদ্ধার করছে, আমরা যে যার ঘরে বসে নবােদ্‌ভূত টিকি -আন্দোলন-পূর্বক তাদের পরম মূর্খ বলে বিদ্রূপ করছি।


 আজ আর-একজন সহযাত্রীর সঙ্গে বহুক্ষণ আলাপ হল। নতুন ভারতবর্ষে যাচ্ছে। ভারতবর্ষীয় ইংরেজের আচরণ সম্বন্ধে তাকে অনেক কথা বললাম। সে বললে: English people are very selfish, they can be very nice and all that so long as their self-interest is untouched but ....

 আজ ডিনার-টেবিলে একটা মস্ত জোয়ান, মােটা আঙুল এবং ফুলে গোঁফ-ওয়ালা, গােরা তার সুন্দরী পার্শ্ববর্তিনীর সঙ্গে ভারতবর্ষীয় পাখাওয়ালার গল্প করছিল। সুন্দরী উল্লেখ করলে, পাখওয়ালারা পাখা টানতে টানতে ঘুমােয়। গৌরাঙ্গ বললে, তার উপায় হচ্ছে লাথি কিম্বা লাঠি। এবং তাই নিয়ে উভয়ে মিলে ঘোঁট চলতে লাগল। আমার এমন অন্তর্দাহ হচ্ছিল বলতে পারি নে। এদের এমন সভ্যতা যে, এদের মেয়েদের পর্যন্ত দয়ামায়া নেই। এই-রকমভাবে যারা সর্বদা কথা কয় তারা যে অনায়াসে পরম ঘৃণার সঙ্গে আমাদের দেশের গরিব দুর্বল বেচারাদের খুন করে ফেলবে তার আর বিচিত্র কী? আমি তো সেই অপমানিত পদদলিত জাতির একজন। কোন্ লজ্জায় কোন্ মুখে আমি এদের সঙ্গে এক টেবিলে বসে খাই এবং ভদ্রতার দন্তবিকাশ করি! আমার নবপরিচিত বন্ধু আমার পাশে বসেছিল তাকে আমি বললুম, আমার এই ভারী আশ্চর্য মনে হয়, তােমাদের মেয়েদের মনেও দয়া নেই? সে বললে: Our women are quite callous and indifferent. Where it is fashionable to show pity they perform their part beautifully well— where it is just the other way they show an amazing lack of the so-called womanly quality। এ দিকে সভা ক’রে, সমিতি করে, চাঁদা তুলে মহাসমারােহের সঙ্গে দয়া করে থাকেন, অথচ উপস্থিত ক্ষেত্রে যেখানে তাঁদের চোখের সামনে একান্ত অসহায় দুর্বলের প্রতি সবলের উৎপীড়ন চলছে সেখানে দয়ার উদ্রেক নেই এবং তাই নিয়ে এই রকম নির্লজ্জ নিষ্ঠুর বর্বরভাবে আন্দোলন! ইংরিজি ভাষা আমার তাড়াতাড়ি আসে না, বিশেষতঃ মন যখন অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়। আমি বসে বসে মনে মনে ইংরিজি বানাতে লাগলুম; A gentleman is a gentleman whatever inconveniences he may have to put up with. And I think it is a gross act of cowardice to hit a fellow who can't return you blow for blow. Yes, admittedly we are a weaker people and you are very strong with your brute strength. But muscular superiority is not a thing to be particularly proud of. Perhaps you will say, ‘Aren't we your superior in any other respect? Well, you may be for aught I know but certainly you don't show it when you strike a weak helpless poor man. And for what? Imagine a miserable creature who has been working all day with perhaps only one meal in the early morning, gives up his night's rest for the chance of earning a few more pice, and can you wonder that he should doze off to sleep and couldn't keep himself awake even to save his life? And punkhapulling is the sovran remedy for insomnia. If ever you are troubled with sleeplessness just take your punkhawalla's place and pull your own punkha. It will do you more good than any medicine in the world. If the author of Vice Versa could write a story reversing the positions of the punkhapuller and his master it could be made a source of infinite amusement and I hope, of instruction to the Anglo-Indian.

 You always try to set our social shortcomings against our political aspirations and say ‘The people who have early marriage is not fit for self-government.’ We may with greater justice say, people who bully their weaker fellow-beings, who habitually ill-treat their servants who have not the power to retaliate, who indulge in barbarous exercise of brute power whenever they imagine themselves perfectly secure, are not fit to govern any nation. Of course, moral retribution comes very slowly, but surely― it very often has no immediate means of revenge like the cowardly kick that ruptures spleen, but it is all the more thorough and unrelenting in its action. Even if these repeated insults do not arouse our miserable people from their lethargy and goad them to take God's revenge in their own hands, this unbridled exercise of tyranny is sure to react on your national character; this growing habit of revelling in the wild display of gross physical power will be one of the potent sources of your national downfall. It will undermine the true love of freedom on which your greatness rests― and maltreated humanity will thus have its awful revenge by depriving you for ever of the only source of all real powers.

 What I cannot understand is how that your ladies, who are ever ready with their noisy demonstrations of pity where their pity is very often superfluous and even harmful, do not feel for the wretches who are treated in such heartless manner by their husbands and brothers before their eyes. We thank God that our early marriages and myriad other social evils have not produced such utter heartlessness in our women.

 যা হােক আমার বুদ্ধি যতই বাড়তে লাগল চোর ততই দূরবর্তী হতে লাগল। তারা অন্য নানা কথায় গিয়ে পড়ল, আমি আর কিছু বলবার সময় পেলুম না― কেবল নিষ্ফল আক্রোশে রক্ত গরম হয়ে উঠতে লাগল। আমার ইংরিজি শিক্ষার অভাব আর কখনো এমন অনুভব করি নি। কোনাে কিছু শিক্ষা সম্বন্ধে আমার নিজেকে এমন stupid বলে মনে হয়! কিন্তু মজা দেখেছি এক-একজন লােকের সঙ্গে এবং এক-একটা বিষয়ে আমি বেশ বলে যেতে পারি। Evansএর সঙ্গে যখন আমার আলােচনা চলত আমি নিজে আশ্চর্য হয়ে যেতুম, বেশ গুছিয়ে বলতে পারতুম। কিন্তু যখন excited হয়ে ওঠা যায় এবং যখন ভালাে রকম করে বা বিশেষ আবশ্যক হয় তখন অনেকগুলাে কথা এক সঙ্গে উঠে কণ্ঠরােধ করে দেয়― গুছিয়ে নেবার সময় পাওয়া যায় না। এই অবসরে কিছু বলে নিতে পারলুম না বলে আমার নিজের উপর এমন বিরক্ত বােধ হচ্ছে! আমি সত্যি সত্যি এমন stupid, অথচ আমার বুদ্ধি নেই এ কথা বলতে পারি নে। ঘরে বসে বসে অনেক বুদ্ধি জোটে, কিন্তু ঠিক আবশ্যকের সময় কোনােটাকে ডেকে পাওয়া যায় না।― cabinএ ফিরে এসে Connollyর কাছে আমার মনের আক্ষেপ ব্যক্ত করতে লাগলুম। আমি বললুম: It makes me feel wild। সে বললে: I can quite understand your feeling। ব’লে অনেক ক্ষণ দুজনে কথা হল। তার পরে ছাতে গিয়ে আমার বন্ধুর সঙ্গেও এই নিয়ে আন্দোলন করে মন কথঞ্চিৎ ঠাণ্ডা হল। এমন সময়ে একজন lady এসে আমাকে গান গাইতে ডেকে নিয়ে গেল। Good Night— Chantez— Ave Maria গাইলুম। আমার গলার জন্যে খুব প্রশংসা পেয়েছি। আমাকে একজন জিজ্ঞাসা করলে কোথায় আমার শিক্ষা। আমি বললুম মস্ত professor আমার nieceএর কাছে। তার পরে ‘অলি বারবার’টা গাইতে হল। খুব ভালাে বললে।

 বুধবার [১৫ অক্‌টোবর]। সেই সুন্দরী মেয়েটি যাকে আমার খুব ভালাে লাগে আমি দেখছিলুম ক’দিন ধরে সেও আমার সঙ্গে আলাপ করবার অনেক চেষ্টা করছিল, কিন্তু আমার stupidityবশতঃ আমি ধরা দিই নি। সে কাল রাত্তিরে আপনি এসে বললে: Aren’t you going to sing? আমি কেবল বললুম: Yes। ব’লে গান গাইতে গেলুম। আজ সকালে তার সঙ্গে আলাপ করলুম। তার মুখে এমন একটি প্রশান্ত গম্ভীর সুমিষ্ট earnestness আছে— এমন সুন্দর চোখ নাক এবং ঠোঁট— আমার ভারী ভালাে লাগে। আমার বােধ হয় আমাকেও তার মন্দ লাগে না। একজন Australian মেয়ে আজ আমার সঙ্গে আলাপ করলে। তার সঙ্গে প্রায় ঘণ্টাদুয়েক ধরে গল্প চলেছিল। ক্রমেই গরম পড়ছে। আজ পরিষ্কার দিন, যার সঙ্গে দেখা হচ্ছে সেই বলছে: what a lovely morning! আমি বলছি: Isn’t it! দক্ষিণে আফ্রিকার উপকূল একটু-একটু দেখা যাচ্ছে। আমাকে বারবার quoits খেলতে অনুরােধ করেছিল, আমি অনেক করে এড়ালুম। এরা সকল বিষয়েই gambling ধরেছে।

 আমার নববন্ধুর সঙ্গে ইংরাজ-সমাজ সম্বন্ধে অনেক কথা হল। Anglo-Indian মেয়েদের হৃদয়হীনতার প্রসঙ্গে বলছিল, এখনকার মেয়েরা বড় হৃদয়হীন হয়ে গেছে― মেয়েদের সম্বন্ধে আমাদের সকলেরই মনে একটা ideal আছে, কিন্তু উত্তরােত্তর ক্রমশই তাতে আঘাত লাগছে। বলছিল, ‘ছােটো ছােটো বিষয়ে দেখা যায় একজন মেয়ে একটা গাড়ির ঘােড়াকে যত হয়রান করে ঘুরিয়ে বেড়াতে পারে একজন পুরুষ তেমন পারে না। তাদের সমস্ত হৃদয় অসীম কাপড়-চোপড় সাজসজার মধ্যে অহর্নিশি এত ব্যস্ত থাকে যে বাস্তবিক কোনাে রকম অসুবিধাজনক বা আরামের-ব্যাঘাত-জনক দয়ার কাজ করা তাদের অনভ্যস্ত হয়ে আসছে। ভারতবর্ষীয়ের প্রতি দয়া প্রকাশ করার মানে অসুবিধে সহ্য করা, চক্ষুপীড়ক দারিদ্র্যের মধ্যে প্রবেশ করা, ফ্যাশানের বিরুদ্ধাচরণ করা― সুতরাং তা লেডির পক্ষে অসম্ভব। যাকে বলে luxury of sentiment, আরামসংগত অশ্রুবর্ষণ, সুশােভন দয়া, তাই তাদের স্বভাবসিদ্ধ।’— লােকটা বােধ হয় কোনাে মেয়ের কাছে আঘাত সহ্য করেছে, খুব যেন অন্তর্ববদনার সঙ্গে কথা কচ্ছিল।— আর-এক সময়ে কথায় কথায় বলছিল তার এক ছােটো বােন boyদের সঙ্গে বেশি মেশে, তার ভাইদের সঙ্গেই বেশি বন্ধুত্ব। আমি জিজ্ঞাসা করলুম, কেন বলাে দেখি; আরও অনেকের কাছে ঐ কথা শুনেছি। সে বললে: I suppose girls find their brothers much nicer than their sisters. Sisters are so spiteful to each other। বলছিল মেয়েদের বিরুদ্ধে মেয়েরা যেমন তীব্র হতে পারে এমন আর কেউ নয়: However I have my ideal of a woman somewhere in my heart— a fellow must have something of that kind— but I have given up all hopes of meeting her in the region of Reality। লোকটাকে আমার বেশ লাগছে—খুব অল্প বয়স, পড়াশুনাে ভালােবাসে, মন খুলে কথা কয়। আমার সঙ্গে খুব বনে গেছে। শেষটাই সব চেয়ে মহৎ গুণ। এ লােকটা কারও সঙ্গে মেশে না। একলা একলা বসে বসে বই পড়ে এবং ভয়ানক হাসে।

 ডিনারের পর আজ আবার নাচ আরম্ভ হল। খানিকটা দেখে আমার মন বিগড়ে গেল। আমি একটা ঘাের অন্ধকার কোণে বেঞ্চির উপর বসে নানা কথা ভাবছিলুম, মন্দ লাগছিল না। সমুখে অন্ধকার রাত্রি এবং অন্ধকার সমুদ্র থেকে থেকে phosphorescence ঢেউয়ের মাথার উপরে অগ্নিরেখা এঁকে যাচ্ছিল― এমন সময়ে ধীরে ধীরে সেই Australian মেয়েটি আমার পাশে এসে বসল এবং অল্পে অল্পে গল্প জুড়ে দিলে। ক্রমে নাচ বন্ধ হয়ে গেল। সে আমাকে বললে, চলাে music saloonএ গিয়ে আমরা গান বাজনা করিগে। সেখেনে গিয়ে গান আরম্ভ করে দেওয়া গেল। ক্রমে ক্রমে লােক জড়াে হতে লাগল। আজ আমাকে বারবার করে অনেক রাত্তির পর্যন্ত গাইয়েছে। Ave Maria এবং আর দুয়েকটা গান বেশ রীতিমত ভালাে করে গেয়েছিলুম। বিস্তর অপরিচিত মেয়ে জানলার ভিতর থেকে মুখ বাড়িয়ে আমাকে বহুল সাধুবাদ দিয়ে গেল। আজ ভাবে বােধ হল আমার গান এদের বাস্তবিক ভালাে লেগেছে—Indianএর গান ব’লে কেবলমাত্র বিস্ময় নয়। এইমাত্র Connolly এসে আমাকে বলে গেল: I say, Tagore, you sang awfully well this evening। আমি আগে যে রকম গলা চেপে গাইতুম এখন দেখছি সেটা ভারী ভুল। Then [you'll] remember me ব’লে একটা গান গাইলুম। আমার নববন্ধুর সেটা ভারী ভালাে লেগেছে, বােধ হয় তার ইতিহাসের সঙ্গে এর কোনাে যােগ আছে। Brindisiতে শুনছি ৮৫জন লােক উঠছে— আমাদের cabinএ আর দুটো berth আছে, সে দুটোতেও লােক আসছে। শুনে অবধি বিষম চিন্তিত হয়ে আছি। Connollyর সঙ্গে যেমন বনে গেছে এমন বােধ হয় কারও সঙ্গে সম্ভাবনা নেই। এক রকমে ভালাে— এই রকম করে experience লাভ হয়। যে মেয়েকে আমার বেশ লাগে তার নাম Miss Long। সে Indiaতে বিয়ে করতে যাচ্ছে, একজন কার সঙ্গে engaged। তিন Australian বোনকে মন্দ লাগছে না― তার প্রধান কারণ, আমাকে তারা বিশেষ করে বেছে নিয়েছে, এবং মন্দ দেখতে না, এবং বেশ piano বাজায়। সেদিন একটা সুর বাজাচ্ছিল আমার খুব পরিচিত, যেটা নিয়ে Park Stএ থাকতে প্রায় parody করতুম— বোধ হয় কী-একটা Cavatina কিম্বা Estudiantina কিম্বা Dames de Seville কিম্বা ঐরকম একটা বিদিগিচ্ছি ব্যাপার। কিন্তু পরিচিত বলেই আমার ভারী ভালো লাগল। Australian মেয়েদের নাম Misses Bayne।

 আমি মজা দেখেছি, অধিকাংশ ইংরেজ পুরুষ তাদের স্বদেশী সুন্দরীদের ছেড়ে এই অস্‌ট্রেলিয়ান মেয়েদের সঙ্গলালসায় ব্যস্ত। সকলেই বলে: They are very nice। আমি জিজ্ঞাসা করলুম: কেন বল দেখি। তারা বলে: They are so unaffected, childlike, they are not at all smart। বাস্তবিক ইংরেজ অল্পবয়সী মেয়েরা বড্ড বেশি smart। বড্ড চোখ মুখ নাড়া, বড্ড নাকে মুখে কথা, বড্ড খরতর হাসি, বড্ড চোখাচোখা জবাব। কারও কারও হয়তো লাগে ভালো, কিন্তু সাধারণ লোকের পক্ষে একান্ত শ্রান্তিজনক। মেয়েদের বেশ unaffected simplicity এবং earnestness দেখলে বেশ একটু আরাম পাওয়া যায়, যথার্থ স্থায়ী সুখ অনুভব করা যায়।

 বৃহস্পতিবার ১৬ অক্‌টোবর]। মেজদাদা আর লোকেনকে চিঠি লিখলুম― চিঠির কাগজ সঙ্গে ছিল না, কনলির কাছে ধার করতে হল। লেখা শেষ করে টেবিল থেকে উঠবার সময় টেবিলের চাদরে টান প’ড়ে দোয়াত চিঠি সমস্ত নীচে পড়ে গেল— চিঠির উপরে এবং চতুর্দিকে কালী ছিটকে পড়ল— অস্থির কাণ্ড! আমার মতো যথার্থ clumsy লোক দুনিয়ায় নেই।

 উপরে গিয়ে বেড়াচ্ছিলুম, একজন অস্‌ট্রেলিয়ান মেয়ে আমার সঙ্গ নিলে। আমি দেখেছি এ রকম মেশামেশি বেশিক্ষণ আমি সইতে পারি নে। আজ সন্ধের সময় সুন্দরীর সঙ্গে দুদণ্ড কথাবার্তা কয়ে এমনি শ্রান্তি এবং বিরক্তি বােধ হতে লাগল, যে, কোনাে ছুতােয় পালাতে পারলে বাঁচি এমনি মনে হল। সৌন্দর্য দেখতে এবং কল্পনা করতে বেশ লাগে, কিন্তু সৌন্দর্যের সঙ্গে পায়চারি করে small talk করতে আদবে ভালাে লাগে না। আমি মনে মনে মেয়েদের এত ভালােবাসি, কিন্তু তাদের সঙ্গে ভাব করতে পারি নে— আশ্চয্যি! আমার আপনা-আপনি ছাড়া আর কারও সঙ্গে কখনাে বন্ধুত্ব হবে না। আজ এদের অভিনয় হয়ে গেল। আমার সেই সুন্দরী বন্ধু চমৎকার অভিনয় করেছিল, তাকে ভারী সুন্দর দেখাচ্ছিল। সে আমার সঙ্গে এমন এক রকম করুণ মমতার সঙ্গে কথা কয়, এমন এক রকম পূর্ণ ঊর্ধ্ব দৃষ্টিতে মুখের দিকে চায়, আমার বেশ লাগে— যদিও তার সঙ্গে যে বেশি মিশি তা নয়। আজ রাত্তিরেও আমাকে গান গাইতে হল। তার পরে নিরালায় অন্ধকারে জাহাজের কাঠরা ধরে সমুদ্রের দিকে চেয়ে যখন গুন্ গুন্ করে একটা দিশি রাগিণী ভঁজছিলুম ভারী মিষ্টি লাগল। ইংরিজি গান গেয়ে গেয়ে শ্রান্ত হয়ে গিয়েছিলুম, হঠাৎ দিশি গানে প্রাণ আকুল হয়ে গেল। যত দিন যাচ্ছে ততই আবিষ্কার করছি আমি বাস্তবিক আন্তরিক দিশি, বাঙালী, ঘােরো, কুনো, সেকেলে, শ্রান্ত, অকর্মণ্য— এখনকার লােক অতি শীঘ্র আমাকে ছাড়িয়ে এগিয়ে চলে যাবে― আমি আমার জনশূন্য কোণে চিরকাল মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকব। অনেক রাত হয়ে গেছে।

 যে দুটো নাটক অভিনয় হয়ে গেল তার মধ্যে একটা নাম হচ্ছে Our Bitterest Foe— দ্বিতীয়টা Fast Friends। প্রথমটা ভালাে রকম দেখতে শুনতে পাই নি― একজন দূরস্থিত লেডিকে আমার চৌকি ছেড়ে দিয়েছিলুম। প্রথমটা নেহাত অসম্ভব-রকম sentimental, বিশেষ কিছু নয়। দ্বিতীয়টা ভারী মজার, আর বেশ অভিনয় হয়েছিল। ছবি-আঁকা programmeগুলাে বেশ করেছিল।

 আজ একজন সেনাধ্যক্ষের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। সে Christianityর অনেক প্রশংসা করে বলছিল, আশ্চর্য দেখেছি তােমাদের মধ্যে যদিও খৃস্টানধর্ম প্রচলিত নেই তবু তােমাদের নিম্নশ্রেণীয় লােকেরাও এমন gentle এবং refined! ইংরেজ ছােটোললাকের আস্ত brute। তার থেকে আমি Anglo-Indianদের কথা তুলে আমার মনের সাধ মিটিয়ে কতকগুলাে কথা বলে নিলুম। আমার ইচ্ছে আছে আমাদের টেবিলের সুন্দরীকে এ সম্বন্ধে একবার ভালাে করে বলব― আগে তাকে মিষ্টি দিয়ে সম্পূর্ণ বশ করে আনা যাক। কাল তাকে এক প্যাকেট butterscotch দিয়েছি। আমি যে ভালাে রকম করে মেয়েদের সাহচর্য করতে পারি নে― সে আমাকে অনেক অবসর দিয়েছিল।

 শুক্রবার [১৭ অক্‌টোবর]। আজ সকালে আর-একজন Anglo-Indianএর সঙ্গে কথা হল, তাকেও মনের সাধে অনেক কথা বলেছি। সে Northwestএর কোন্-এক জায়গার ম্যাজিস্‌ট্রেট। সে অনেক দুঃখ প্রকাশ করলে; সে বললে, ভারতবর্ষীয়দের প্রতি সদ্ব্যবহার করলে তারা ভারী বাধ্য হয়। আজ বিকেলে Maltaয় জাহাজ পৌছবে― নাবব না মনে করছি। জাহাজে একলা বসে আরামে পড়ব। হাতে টাকা থাকলে এখান থেকে বাড়ির জন্যে কিছু কিনে নিয়ে যেতুম। এখনাে বম্বে পৌছতে দিন পনেরাে-ষোলাে লাগবে―এক-এক সময়ে মনের মধ্যে এমন ছেলেমানুষের মত অধৈর্য উপস্থিত হয়! আমার নিজেকে আলােচনা করলে আমার নিজের হাসি পায়। আমার অস্‌ট্রেলিয়ান বন্ধু আজ প্রায় সমস্ত দিন আমার সঙ্গে আছে, আমাকে আজ পড়তে দিলে না। বিকেলের দিকে Malta দেখা দিলে— কঠিন দুর্গপ্রাকারে বেষ্টিত অট্টালিকাখচিত শহর, দূর থেকে দেখে নাবতে ইচ্ছে করে না। অস্‌ট্রেলিয়ান মেয়েদের এইখেনে নেবে যাবার কথা। অনেক লােক এইখেনে নাববে। তাই জিনিসপত্র তােলা নিয়ে বিষম হট্টগােল বেধে গেছে। আমি মাল্টা দেখতে যাব না শুনে আমার অস্‌ট্রেলিয়ান বান্ধবী ভারী পীড়াপীড়ি করছে। আমার নববন্ধু Gibbsকে বলছিল: Do induce him to come on shore, then we shall meet again at the Grand Hotel। শেষকালে রাজি হলুম। Gibbsএ আমাতে মিলে বেরােনাে গেল। সমুদ্রের ধার থেকে সুরঙ্গপথের মধ্যে দিয়ে দীর্ঘ ঘাটের মতে উঠেছে― সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে শহরে উঠলুম। চার দিক থেকে guideএর দল ছেঁকে ধরলে। Gibbs তাদের তাড়িয়ে দিলে। একজন কিছুতেই সঙ্গ ছাড়লে না― সে যত আমাদের এটা ওটা দেখায়, পথ বাৎলে দেয়, Gibbs ততই বলতে থাকে: Don't want your service― Won't pay you। সে যে দিকে যেতে বলে তার উলটো দিকে যায়। কিন্তু তবু সে সন্ধে সাতটা পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে লেগে ছিল— তার পরে যখন তাকে নিতান্ত তাড়িয়ে দিলে তখন সে চলে গেল। আমার ভারী মায়া করছিল, কিন্তু আমার সঙ্গে পাউন্‌ড্‌ ছাড়া কিছুই ছিল না। Gibbs বললে, আমি ওকে এক ফার্দিংও দেব না— কোনাে Englishman হলে প্রথমবার বললেই চলে যেত। Gibbs মহা চটে গেল― আমার ভারী মায়া করতে লাগল। ইংরেজে বাঙালীতে এমনি জাতীয় প্রভেদ। অথচ বুঝতে পারছি কেন সে চটছে। আমি দেছি লােটার আচরণ যেমনি হােক-না কেন, বড্ড গরিব এবং বড়ো আশা করে সঙ্গে সঙ্গে চলেছে। Gibbs বলছে: He must be very hard up to follow us thus but no Englishman would do it। তার আচরণ এত খারাপ লাগল যে তার দারিদ্র্য দেখে দয়া হল না। বেশ বােঝা যায় একজন ইংরেজ ভারতবর্ষে গিয়ে আমাদের দিশি লােকের প্রতি ক্রমে ক্রমে কিরকম করে চটে যায়― বিলিতি নিয়মানুসারে যেগুলাে ক্রটি সেইগুলাে এত দিক থেকে এত চোখে পড়ে যে, আমাদের জাতির যেগুলাে বিশেষ গুণ সেগুলাে তারা দেখতে পায় না। বিলিতি দোষ দেখলে তারা এত আপত্তি করত না, কিন্তু অপরিচিত দোষ তাদের অসহ্য বােধ হয়। শহরটা নতুন রকমের। পাথরে বাঁধানাে সরু রাস্তা—একবার পাহাড়ের উপরে উঠছে একবার নীচে নাবছে— বিশ্রী গন্ধ― গােলমাল― কী এক রকমের। একটা Roman Catholic Churchএর মধ্যে প্রবেশ করে দেখলুম— প্রকাণ্ড ঘর, চারি দিকে খৃস্ট এবং সেন্ট্‌দের মূর্তি, বেদীর সামনে বাতি জ্বলছে; এক রকম গাম্ভীর্যজনক অন্ধকার, ঘর গম্‌ গম্ করছে, বেদীর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে মেয়ে পুরুষে গুন্ গুন্ স্বরে স্তব পাঠ করছে। সবসুদ্ধ জড়িয়ে মনকে যেন কী এক রকম oppress করতে থাকে। এখানকার মেয়েদের শিরােভূষা অদ্ভুত রকমের, গাড়ির hoodএর মতাে এক রকম overhanging ঘােমটা। খুব ছােটো হােটো মেয়েদের বেশ দেখতে― জ্বল্‌জ্বলে কালাে চোখ― দেখে বেলিকে মনে পড়ছিল― কিন্তু একটিও ভালাে দেখতে বড় মেয়ে দেখলুম না। পথে যেতে যেতে Australian বন্ধুর সঙ্গে দেখা হল। বলে: Grand Hotelএ এসে dinner কোরো, তা হলে আরএকবার দেখা হবে। একটা দোকানে গিয়ে পলার গয়না এবং রুপাের brooch কেনা গেল। Gibbsএর চিঠি post করবার ছিল, তাই post officeএ যাওয়া গেল। একটি সুন্দর দেখতে ইংরেজ মেয়ে টিকিট বিক্রি করছে, Gibbs তার সঙ্গে খানিক ক্ষণ কথাবার্তা কইলে; বেরিয়ে এসে বলছে: Isn't she awfully nice looking? Grand Hotelএ এসে তার মনে পড়ল একটা পার্শেল পােস্ট্‌ করবার আছে, মনে পড়তেই হুর্‌রে ব’লে নাচ আরম্ভ করে দিলে― আমরা তখন নাবার ঘরে: So I am going to have another chance of seeing her। কিন্তু বেচারার অদৃষ্টে সে chance জুটল না। ফিরে গিয়ে দেখা গেল post office বন্ধ। Hotelএ গিয়ে দেখি আমাদের জাহাজের বিলকুল লোক সেখেনে জুটেছে, জাহাজের ডিনার-টেবিলের সঙ্গে কোনাে তফাত নেই। কিন্তু অতি যাচ্ছেতাই খেতে দিলে― বদ গন্ধ, বদ জিনিস, অল্প পরিমাণ, বেশি দাম। আমি তাে আর্ধেক জিনিস মুখে দিয়ে ফেলে দিলুম। বন্ধুদের কাছে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়া গেল। Government Houseএর সামনে একটা বড়াে বাঁধানো square আছে― সেইখানে সন্ধের সময় লােকসমাগম হয়, band বাজে। সেইখানে আমরা জুটলুম। পরিষ্কার রাত্রি, কিছুমাত্র শীত নেই, সুন্দর band বাজছে― বেশ লাগছিল। চার দিকে বাগান থাকত তাে আরও ভালো হত। এ কেবল একটা প্রকাণ্ড বাঁধানাে প্রাঙ্গণের মত। এক দিকে Government House, এক দিকে Grand Hotel, এক দিকে রক্ষকশালা, আর-এক দিকে কী মনে পড়ছে না। রাত যখন দশটা বাজে তখন জাহাজ-অভিমুখে ফেরা গেল— দুই-এক জায়গায় সিঁড়ি দিয়ে নেমে, দুই-এক জায়গায় উঁচু রাস্তা দিয়ে উঠে, নিচু রাস্তা দিয়ে নেমে, সমুদ্রতীরে পৌঁছে নৌকো নিয়ে জাহাজে যাওয়া গেল। পথের মধ্যে একদল পথপ্রদর্শক আমাদের টানাটানি লাগিয়ে দিয়েছিল― Gibbs দুজন সৈন্য ডেকে তাদের তাড়িয়ে দিলে এবং সৈন্য দুজন আমাদের বরাবর পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল। নৌকোওয়ালা বললে, ১৮ পেনির কমে যাব না। Gibbs নাছােড়বান্দা— P & O Officeএ গিয়ে জিজ্ঞাসা করলে কত ভাড়া। তারা বললে, যদি P & O Passenger হও তা হলে ৪ পেনি দিতে হবে। বলে সে নিজে এসে আমাদের নৌকোয় তুলে দিলে। Gibbs ভারী রাগান্বিত যে বিদেশী দেখে আমাদের ঠকাবার চেষ্টা। কাজেই আমাকে গল্প করতে হল একজন লন্‌ডন-গাড়িওয়ালা কী করে আমাদের কাছে পাঁচ শিলিঙের জায়গায় আঠারাে শিলিং নিয়েছিল। সে সম্বন্ধে সে কোনাে উত্তর করলে না। বােধ হয় বা বিশ্বাস করে নি।

 শনিবার [১৮ অক্‌টোবর]। আজ সমস্ত সকাল Gibbsএর সঙ্গে গল্প হচ্ছিল। সে একজন bankএর কর্মচারী। সে বলছিল, তুমি কল্পনা করতে পারো না young clerkরা কী জঘন্য কথাবার্তা এবং গল্প করে! বললে, ইংলন্‌ডে smutty talk সর্বত্র প্রচলিত। এমন-কি, মেয়েদের মধ্যেও। সে যা বললে শুনে অবাক্ হয়ে গেলুম। সে বললে sober এবং decent fellowদের বিষম মুশকিল, সর্বদা এমন দলে মিশে থাকতে হয় যে সে অতি ভয়ানক। সে বলে, আমরা নিতান্ত hypocrite জাত— বাইরে ভারী respectable,, ফরাসি নভেলের নিন্দে করে থাকি, কিন্তু সর্বদা যে রকম কথাবার্তা এবং আমােদপ্রমোদ চলে সে আর বলার বিষয় নয়। আমি বেশ বুঝতে পারলুম আমাদের দিশি যারা বিলেতে যায় তারা কোথা থেকে বদ্ কথা এবং জঘন্য গল্প শিখে আসে। আমাদের lunchএর পরে মেয়েরা উঠে গেলে টেবিলে Bayleyর সঙ্গে Gibbsএর লন্ডনের city-অঞ্চলে কিরকম কাণ্ড চলে তাই গল্প চলছিল। Bayley বলছিল:I am sorry to say আমার young days আমিও অনেক কাণ্ড করেছি। ইত্যাদি। Gibbs লােকটাকে বেড়ে লাগছে মদ খায় না, gamblingএ যােগ দেয় না, মেয়েদের সঙ্গে সর্বদা রহস্যালাপ করে না, অথচ কড়া ধার্মিকতা বা গোঁড়া ক্রিশ্চানি কিছুমাত্র নেই। বেশ সচরাচর ভদ্রলােকের স্বভাবতঃ যেমন হওয়া উচিত সেই রকম। তার একটা আচরণ আমার সব চেয়ে ভালাে লেগেছিল― কাল post officeএর সেই মেয়ের সঙ্গে কেমন বেশ সহজ ভদ্র ভাবে কথাবার্তা কইলে। লােকেরা যেমন দোকানদার সুন্দরীদের সঙ্গে ইয়ার্কি দেবার চেষ্টা করে Gibbsএর আচরণে তার লেশমাত্র ছিল না। সৌন্দর্যের প্রতি এই রকম সসম্মান আনন্দের ভাব আমার ভারী ভালাে লেগেছিল― এ লােকটার সঙ্গে আমার ঠিক মনের মিল হয়েছে। সমস্ত ক্ষণ গল্প করতে আমার কিছুমাত্র কষ্ট বােধ হয় না। Conolly বােধ হয় ভারতবর্ষে গিয়ে দেখতে দেখতে বদলে যাবে। এরই মধ্যে সে একটা দলের মধ্যে পড়ে কেবল তাস খেলছে, চুরোট খাচ্ছে, gamble করছে—একটা আবর্তের মধ্যে ঘুরছে। Gibbs বলছিল সকলে মিলে Conollyর মাথা খাচ্ছে।

 আজ ডিনার-টেবিলে smugglingএর গল্প হচ্ছিল। কে কখন কী কৌশলে কত smuggle করেছিল তাই নিয়ে জাঁক করছিল। Mrs Smallwood একবার ইংলন্‌ডের custom houseকে ফাঁকি দিয়েছিল শুনে Bayley বলছিল: Don't you think that was wrong? Mrs Smallwood বললে: No, I am proud of it। এ রকম জুয়াচুরিতে এদের conscience কিম্বা সত্যপ্রিয়তায় আঘাত লাগে না। এরা বুঝতে পারে না এক-এক জাতের একএক বিষয়ে নীতিজ্ঞানের জড়তা থাকে। কৌশলে মিথ্যাচরণপূর্বক smuggle করা সম্বন্ধে ইংরেজদের এখনাে ধর্মবুদ্ধির উদ্রেক হয় নি; কিন্তু তার থেকে কেউ যদি মনে করে, তবে ইংরেজরা মিথ্যাচারী এবং জোচ্চোর, তা হলেই ভুল করা হয়। আমাদের জাতের দোষগুণ সম্বন্ধে যখন ইংরেজরা generalize করে তখন এইটে তারা ভুলে যায়।

 Miss Hedistedকে আজ সেদিনকার পাখাওয়ালা সম্বন্ধে বলেছি। সে বললে, ভারতবর্ষে অনেক cads যায় যারা এই রকম করে― ভারী অন্যায়— ইত্যাদি। যা হােক, ব’লে মন খােলসা হল। Miss Long যখন কথা কয়, হাসে, এমন চমৎকার দেখতে হয়— আমার দেখতে ভারী ভালাে লাগে— যেমন সুন্দর দেখতে তেমনি intellectual মুখের ভাব।

 রবিবার [১৯ অক্‌টোবর]। আজ ভােরে Brindisiতে পৌঁছনো গেল। মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। এক-দল গাইয়ে বাজিয়ে হার্প্ বেয়ালা ম্যান্‌ডােলিন নিয়ে ছাতা মাথায় জাহাজের সামনে দাঁড়িয়ে বাজাচ্ছে এবং একটা ছােটো ছেলে গান গাচ্ছে— বেশ লাগছে। বৃষ্টির জন্যে নাবতে পারলুম না। আমার ডেক্‌চৌকি পিয়ানাে আপিসে পড়ে আছে। আজ বিকেলে বােধ হয় চিঠি পাওয়া যাবে।— বৃষ্টি থেমে গেছে। Gibbs আমাকে টানাটানি করে ডাঙায় নিয়ে গেল। রাস্তায় যেতে যেতে এক জায়গায় দেখলুম একটা উঁচু জমির উপর কতকগুলাে ভাঙা পাথরের সিঁড়ি উঠেছে, উপরে উঠে একটা পুরােনাে গির্জা পাওয়া গেল। ভিতরে গিয়ে দেখলুম নানা রকম টুকিটাকি দিয়ে সাজানাে—খুব গরিব রকমের ব্যাপার। বেদীর এক জায়গা থেকে একটা পর্দা উঠিয়ে দেখালে ক্রাইস্টের মােমের প্রতিমূর্তি শয়ান অবস্থায় রয়েছে—সর্বাঙ্গ ক্ষত বিক্ষত, রক্ত ঝরে পড়ছে। অতি ভয়ানক― এমনতর realistic কাণ্ড কখনাে দেখি নি। সেখেন থেকে বেরিয়ে একটা উঁচু রাস্তা ধরে শহরের বাইরে গিয়ে পড়লুম— দুই ধারে cactus-বেড়া-দেওয়া শস্যক্ষেত্র এবং ফলের বাগান। একটা ফলের বাগানে ঢুকে পড়া গেল। আঙুরের লতাকুঞ্জে থোলো থােলাে আঙুর ফলে রয়েছে। এক রকম গােলাপী আঙুর চমৎকার দেখতে― এক রকম সরু সরু লম্বা আঙুর, ইতিপূর্বে কখনাে দেখি নি। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, পাহাড়ে রাস্তা শুকিয়ে গেছে― কেবল দুই ধারে নালায় মাঝে মাঝে জল দাঁড়িয়ে রয়েছে। রাস্তার ধারে fig গাছে দুটো ছােকরা ফিগ পেড়ে পেড়ে খাচ্ছিল― আমাদের চেঁচিয়ে ডেকে ইশারায় জিজ্ঞাসা করলে আমরা fig খাব কিনা। আমরা বললুম, না। খানিক বাদে দেখি, তারা ফলবিশিষ্ট একটা ছিন্ন অলিভ-শাখা নিয়ে এসে হাজির। জিজ্ঞাসা করলে, অলিভ খাবে? আমরা বললুম, না। তার পরে ইশারায় জানিয়ে দিলে যে, খানিকটা তামাক পেলে তারা বড়াে খুশি হয়। Gibbs তাদের খানিকটা তামাক দিলে। তার পরে বরাবর তারা আমাদের সঙ্গে চলল―প্রবল অঙ্গভঙ্গী -দ্বারা উভয়পক্ষ মনােভাব ব্যক্ত করতে লাগল। জনশূন্য রাস্তা পাহাড়ে জমির ও ক্ষেত্রের মধ্যে দিয়ে বরাবর চলেছে― কেবল মাঝে মাঝে এক-একটা ছােটো ছােটো বাড়ি এবং একএক জায়গায় শাখাপথ নীচের দিকে নেবে বক্রগতিতে অদৃশ্য হয়ে গেছে। ফেরবার মুখে একটা গােরস্থানে ঢুকলুম। এদের গাের নতুন রকমের। গােরের উপরে এক-একটা ঘরের মতাে— পর্দা দিয়ে, রঙিন জিনিস দিয়ে নানা রকমে সাজানাে— একটা বেদীর উপরে অনেকগুলো শামাদানের উপর বাতি লাগানো রয়েছে এবং সাধুদের অথবা কুমারীর প্রতিমূর্তি। কোনো কোনো ধরে মৃতব্যক্তির প্রতিমূর্তি আছে। বােধ হয় আত্মীয়েরা এসে নানা রকম করে সাজিয়ে-গুছিয়ে যায়। এক জায়গায় সিঁড়ি দিয়ে নেবে মাটির নিচেকার একটা ঘরে গিয়ে দেখলুম স্তূপাকারে অসংখ্য মড়ার মাথা সাজানাে রয়েছে, বােধ হয় পুরােনাে গাের থেকে তুলে ঐকম করে রেখে দিয়েছে― কত বৎসরের কত সুখদুঃখের এই একমাত্র অবশেষ। ঐ বাক্যহীন, দৃষ্টিহীন, চিন্তাহীন নিশ্চল ভীষণ স্তূপের মধ্যে হয়তাে এমন অনেক মাথা আছে জীবিত অবস্থায় যার স্পর্শলাভ করলে অনেক হতভাগ্য কৃতার্থ হয়ে যেত। দৈবাৎ হয়তাে তাদের দুটো মাথা পরস্পর পাশাপাশি স্থাপিত হয়েছে― এখন কি ঐ অন্ধকার নেত্রকোটর দিয়ে তারা পরস্পরকে চিনতে পারছে। হায়, যে স্পর্শসুখ এক কালে এক মুহূর্তের জন্যে বহুমূল্যবান ছিল এখন তা চিরদিনের জন্যে নিস্ফল। উঃ― ঐ মাথাগুলাের ভিতরে কত চিন্তা কত স্মৃতি সঞ্চিত ছিল, কত দুরাশা ওর মধ্যে দুর্গ নির্মাণ করেছিল— ওদের মধ্যে থেকে যে-সকল চেষ্টা যে-সকল কার্য উদ্ভূত হয়েছিল তারা এখনাে এই পৃথিবীর কত দিকে কত আকারে প্রবাহিত হচ্ছে, তাদের চিরধাবিত বিচিত্র গতি কেউ বন্ধ করে দিতে পারে না— কেবল ওরাই চিররাত্রিদিনের মতাে নিশ্চল নিশ্চেষ্ট নির্জীব সৌন্দর্যলেশবিহীন। জীবন এবং সৌন্দর্য এই অসীম মনুষ্যলােকের উপরে যেন একটা চিত্রিত পর্দা ফেলে রেখেছে— আস্তে আস্তে পর্দা তুলে দেখাে, ভিতরে লাবণ্যবিহীন অস্থিকঙ্কাল, জ্যোতিহীন চক্ষুকোটর, এবং বুদ্ধিবিহীন কপালফলক। হঠাৎ যদি কোনাে নিষ্ঠুর শক্তি নরসংসার থেকে এই যবনিকা উঠিয়ে ফেলে তা হলে সহসা দেখা যায় সমস্ত পৃথিবী জুড়ে এই চুম্বনমধুর আরক্ত অধরপল্লবের অন্তরালে শুষ্ক শ্বেত দন্তপংক্তি কী বিকট বিদ্রূপের হাস্য করছে! পুরােনাে বিষয়, পুরােনা কথা― ঐ নরকপাল অবলম্বন করে অনেক নীতিজ্ঞ পণ্ডিত অনেক বিভীষিকা প্রচার করেছে। কিন্তু আমি যখন দাঁড়িয়ে দেখলুম এবং ভালাে করে ভাবলুম আজ আমার এই-যে মাথা ভাবছে এবং ভালােবাসছে কিছুদিন পরে সংসারের ঐ চিরবিস্মৃত অসীম স্তূপের মত ভুক্ত হতে পারে, তখন মনের মধ্যে এক রকম বিষণ্ণ বৈরাগ্য উদয় হল বটে, কিন্তু কিছুমাত্র ভয় হল না। ভাবলুম আর যাই হােক, ঐ সহস্র সহস্র মাথা অনিদ্রা দুশ্চিন্তা দুশ্চেষ্টা দুরাশা থেকে চিরদিনের মতাে আরােগ্য লাভ করেছে। তার সঙ্গে এও ভাবলুম, Rowlandএর ম্যাকাসার অয়েল পৃথিবীতে প্রতিদিন শিশি ভরে ভরে বিক্রি হচ্ছে, কিন্তু কোনােকালে এদের তার এক ফোঁটা আবশ্যক হবে না― এবং দন্তমার্জনওয়ালারা যতই প্রচুর বিজ্ঞাপন প্রচার করুক না কেন, এই অসংখ্য অসংখ্য দন্তশ্রেণী তার কোন খোঁজ নেবে না।― শেষােক্ত চিন্তাটা প্রসঙ্গের উপযােগী গম্ভীর নয়, কিন্তু আমাদের চিন্তারাজ্যে জাতিভেদ এবং পৃথক আসনের প্রথা নেই। আমরা লেখবার সময়ে অনেক বিচার করে নির্বাচন করে লিখি, কিন্তু ভাববার সময় হযবরল করে ভাবি। আত্মা পরমাত্মা সম্বন্ধে তর্ক করতে করতে হঠাৎ মনে পড়ে অনেক ক্ষণ তামাক খাওয়া হয় নি, এবং যখন পিঠের ঠিক মাঝখানটা চুলকোচ্ছে এবং কিছুতেই নাগাল পাচ্ছি নে তখন প্রেয়সীর ভুবনমােহিনী মূর্তি মনে উদয় হওয়া কিছুই আশ্চর্য নয়।

 যাই হােক্‌গে, আপাততঃ আমার এই মাথার খুলিটার মধ্যে চিঠির প্রত্যাশা বিজ্‌বিজ্‌ করছে― যদি পাওয়া যায় তা হলে এই খুলির মধ্যে খুব খানিকটা খুশির উদয় হবে, যদি না পাওয়া যায় তা হলে ঐ অস্থিগহ্ব‌রের মধ্যে আজকের দিনের মতাে দুঃখ-নামক ভাবের সঞ্চার হবে, ঠিক মনে হবে আমি ভারী কষ্ট পাচ্ছি। এই মাথাটার পক্ষে গােটাকতক কথা-অঙ্কিত পত্রখণ্ডের কী এমন গুরুতর আবশ্যক কিছু বােঝবার যাে নেই। আজ চিঠি না পাওয়ার দরুন সেদিনকার মহানিদ্রার কি কিছু ব্যাঘাত ঘটবে? সেদিন ইচ্ছানিরপেক্ষ যে চিরবিশ্রাম জুটবে আজ তার ছায়ামাত্র পেলে বেঁচে যাই। ‘মরণ হলে ঘুমিয়ে বাঁচি’ কথাটার মধ্যে মানবজীবনের অনেক বেদনা ব্যক্ত হয়েছে। এই fever of lifeএ দীর্ঘ রাত্রিদিন কেবল এপাশ ওপাশ করা যাচ্ছে— ঘুম আর আসে না।

 রাত্রি সাড়ে-দশটা পর্যন্ত চিঠির জন্যে অপেক্ষা করে জানতে পারলুম চিঠি পাওয়া যাবে না। চিঠি আমার পিছনে পিছনে কলকাতায় যাত্রা করবে। দূর হােক্‌গে, শুতে যাওয়া যাক। ঘুম আসছে, এমন সময় লােকেন আর সল্লির চিঠি পেলুম। টফি লেগে সল্লির চিঠির আর্ধেক পড়া গেল না। লােকেন লিখছে ছোটো বউয়ের চিঠি পাঠিয়েছে, কিন্তু পেলুম না।

 সােমবার [২০ অক্‌টোবর]। সমস্ত দিন seasick— অসহ্য যন্ত্রণা। কিচ্ছু খাই নি।

 মঙ্গল [২১ অক্‌টোবর]। উঠে একটু breakfast করেছি, আজ ভালাে বােধ হচ্ছে। আমি আমার কোণে চুপ করে বসে থাকি— Miss Long যতবার আমার সমুখ দিয়ে চলে যায় আমার মুখের দিকে চেয়ে একটু হেসে যায়, আমিও হাসি; মনে হয় এর পরে উঠে গিয়ে তার সঙ্গে একটু আলাপ না করা rude হয়ে পড়ছে, কিন্তু কিছুতে হয়ে ওঠে না। আজ সন্ধের সময় পাশে দাঁড়িয়ে দুএকটা কথা বললুম। বললুম: It was unkind of you Miss Long to look so aggressively well yesterday while we were all so miserable। Miss Long বললে: I was awfully sorry for you, you looked so bad। তার পরে অনেক গল্প হল। আজ সন্ধের সময় আবার এক-চোট নৃত্য হয়ে গেল। Miss Vivianএর সঙ্গে আমি গল্প করছিলুম; সে বলছিল: It always seemed to me something weird, this dancing on board a steamer। আমি বললুম: Yes, it is so out of harmony with the surroundings, with the beautiful, peaceful moonlight night yonder ইত্যাদি। Miss Vivian বেশ প্রশান্ত মৃদুস্বভাব মেয়ে― বেশ মেয়েলি রকমের পড়াশুনো ভালোবাসে, আমার সঙ্গে কবিতা নিয়ে অনেক কথা হল। সে দুই-একজন কবিমেয়েকে জানে: It is a great gift, but poets are not a happy lot। আমি বললুম: To be sure, they are not। সে জানে না আমি সেই হতভাগ্য gifted দলের একজন। Mrs Goodchild আমাকে বলছিল: I have heard you have got a very clever sister। বোধহয় বাবিকে মনে করে বলছিল। Gibbs নাচতে ভালোবাসে না, যদিও তার বয়স ২১ মাত্র— সেইজন্যে তাকে আমার আরও ভালো লাগে। আজ বেশ জ্যোৎস্না রাত্তির হয়েছে।

 বুধ [২২ অক্‌টোবর]। ক্রমেই গরম বাড়ছে। আজ লোকেনকে চিঠি লিখলুম। মাঝে একবার Miss Long এসে তার birthday bookএ আমার নাম লিখিয়ে নিয়ে গেল। একজন লেডির প্রতি একজন যুবক যে রকম ব্যবহার করে Gibbs আমার প্রতি অনেকটা সেই রকম ব্যবহার করে। আমার গ্লাসে জল ঢেলে দেয়, ডিনার-টেবিলে আমাকে নানাবিধ খাবার জোগায়, ছোটোখাটো নানা বিষয়ে আমার সাহায্য করে― অনেক সময়ে আমি লজ্জিত হয়ে পড়ি। বোধ হয় আমার মধ্যে সে এক রকম অকর্মণ্য অসহায় মৃদুভাব দেখতে পায়, যাতে করে তার স্বাভাবিক পৌরুষিক স্নেহ উদ্রেক করে।

 Mrs Fraser আমাকে tea partyতে নিমন্ত্রণ করেছিল। আমি Browning পড়ছিলুম দেখে সে ভারী আশ্চর্য হয়ে গিয়ে ছিল।

 সিঁড়ি দিয়ে ওঠবার সময় একজন বৃদ্ধ লােক এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করলে: Are you not one of the Tagores? আমি বললুম, হাঁ। সে বললে, তােমার sisterকে কোন্-এক পার্টিতে দেখেছিলুম, তােমার মুখ দেখেই তার সঙ্গে সাদৃশ্য টের পেয়েছিলুম— My name is Schiller ইত্যাদি।

 সমুদ্রে চন্দ্রোদয় দেখলে মনের মধ্যে এমন একটা বৈরাগ্য, এমন একটা ঔদাস্য এনে দেয়। এই অসীম সমুদ্র এই অনন্ত রাত্রির এক ধারে একটুখানি আলো, একটুখানি ঝিকিমিকি। মনে হয় আমাদের জীবন এই রকমের― অসীম সংশয়ের মধ্যে একটুখানি বিষণ্ণ দিশাহারা আলােকরেখা, বাঁচবে কি মরবে কিছু ঠিকানা নেই। ঐ সমুদ্রের পরপারে আস্তে আস্তে নিবে যাবে, অসীম জলরাশি গম্ভীর মৃত্যুর গান গাবে— তার পরে আবার আঁধার রাত্রি। মনে হয় আমাদের জীবন প্রকৃতির আভ্যন্তরিক কোন্-এক শক্তির ক্ষণিক চেষ্টা, ক্ষণিক উত্থান; থেকে থেকে অবিশ্রাম মাথা তুলে উঠছে, কিন্তু চার দিক থেকে অসীম জড় এবং অসীম মৃত্যু এসে তাকে আচ্ছন্ন করে নির্বাপিত করে দিচ্ছে। বহু চেষ্টায় প্রকৃতি যেমনি আপন অন্তর্নিহিত প্রতিভাকে পুষ্প-আকারে বিকশিত করে তুলছে অমনি দেখতে দেখতে মাটি তাকে টেনে মাটি করে দিচ্ছে। ইতস্ততবিক্ষিপ্ত বিন্দু বিন্দু জীবনের তুলনায় এই চিরস্থায়ী চিরনীরব মৃত্যু এই সর্বব্যাপ্ত জড়ত্বের অবিশ্রাম অলক্ষ্য মাধ্যাকর্ষণ কী প্রবল! যেমনি জীবন শ্রান্ত হয়ে আসে, যেমনি চেষ্টা একটু শিথিল হয়ে আসে, অমনি ঝরে যেতে হয়, পড়ে যেতে হয়― অমনি হুহু করে ভেসে কোথায় মিলিয়ে যেতে হয় অনন্ত ইহজগতে তার আর কোনাে চিহ্ন পাওয়া যায় না। এই রকম করে মহারাক্ষস মৃত্যু জীবন গ্রাস করে করে চিরদিন বেঁচে রয়েছে। মিছে কেন তর্কবিতর্ক মতামত সন্দেহবিচার! এই ক্ষণিক সূর্যালােকে আমাদের দুদণ্ডের হাসিগল্প মেলামেশা, পরস্পরের প্রতি বিস্ময়পূর্ণ দৃষ্টি এবং প্রেমপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা― চন্দ্রোদয়, ফুল-ফোটা বসন্তের বাতাস, দুদিনের মােহ সমাপন করে নেওয়া যাক্― যবনিকার অন্তরালে মৃত্যু প্রতীক্ষা করে বসে আছে। কোন্ অসম্ভব সুখ কোন্ দুর্লভ ভালােবাসার জন্যে চিরদিন নির্বোধের মতাে অপেক্ষা করে বসে আছি— আমাদের কি অপেক্ষা করবার সময় আছে! যা হাতের কাছে আসে তাই নিয়ে প্রসন্নচিত্তে কাটিয়ে দেওয়া যাক— তাড়াতাড়ি করে জীবনকে যথাসাধ্য সম্পূর্ণ করে তুলতে হবে। তুমি দৈবক্রমে আমার কাছে এসে পড়েছ, এসাে― তুমি আমার ভালােবাসা চাও না, যাও, আপন পথে যাও— জিজ্ঞাসা করবার সময় নেই— বিলাপ করবার অবসর নেই— সুখ দুঃখ হিসাব করবার আবশ্যক নেই। যা পার না প্রসঙ্কুচিত্তে তার মঙ্গল কামনা করে তার কাছ থেকে বিদায় নেওয়া যাক।

 জাহাজের রেলিং ধরে সমুদ্রের দিকে চেয়ে এই রকম করে আপনার জীবন সমালােচনা করছিলুম, এমন সময় একজন এসে জিজ্ঞাসা করলে, তুমি সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কেউ হও কি? আমি বললুম বিশেষ কেউ নয়, তাঁর ভাইমাত্র। এও সিভিলিয়ান। ৮৬ সালে তাঁর হয়ে সােলাপুরে এক্‌টিন ছিল, বাবিকে জানে। Brandকে জানে― বেশ পিয়ানাে বাজাতে পারে, ভারী কুনো। Mrs Moeller আমাকে গান গাইতে অনুরােধ করলে, সে আমার সঙ্গে পিয়ানাে বাজালে। Mrs Moeller বললে: It is a treat to hear you sing। Webb এসে বললে: What would we do without you Tagore― there's nobody on board who sings so well। যা হোক, জাহাজে এসে আমার গান বেশ appreciated হচ্ছে। আসল কথা হচ্ছে এর আগে আমি যে ইংরিজি গানগুলো গাইতুম কোনোটাই tenor pitchএ ছিল না, তাই আমার গলা খুলত না। এবারে সমস্ত উঁচু pitchএর music কিনেছি, তাই এত প্রশংসা পাওয়া যাচ্ছে।

 কাল Miss Longকে জিজ্ঞাসা করছিলুম, এই কি তোমার প্রথম ভারতযাত্রা? সে একটু হেসে আমার দিকে চেয়ে খুব জোর দিয়ে বললে: Do you know Mr Tagore, I am a born Anglo-Indian! আমি কিনা অনেক লোকের কাছে অনেকবার Anglo-Indianদের সম্বন্ধে আক্রোশ প্রকাশ করেছি, বোধ হয় শুনেছে। Miss Long পুনায় যাচ্ছে।

 রাত দুটোর সময় জাহাজ পোর্ট্ সৈয়েদে পৌছল, Gibbs আমাকে নাববার জন্যে অনেক পীড়াপীড়ি করলে, আমি নাবলুম না। আমার ক্যাবিনের অন্য দুজন নেবেছিল।

 বৃহস্পতিবার [২৩ অক্‌টোবর]। এখন সুয়েজ খালের মধ্যে দিয়ে চলেছি। আমাদের যাত্রার আরও এগারো দিন বাকি আছে। এগারোটা দিন আসলে কত অল্প, কিন্তু কী অসম্ভব দীর্ঘ মনে হচ্ছে!

 চমৎকার লাগছে। উজ্জ্বল উত্তপ্ত দিন। এক রকম মধুর আলস্যে পূর্ণ হয়ে আছি। য়ুরোপের ভাব একেবারে দূর হয়ে গেছে। আমাদের সেই রৌদ্রতপ্ত শ্রান্ত দরিদ্র ভারতবর্ষ, আমাদের সেই ধরাপ্রান্তবর্তী অপরিচিত বিস্মৃত নিভৃত ছায়াস্নিগ্ধ নদীকলধ্বনিসুপ্ত বাংলাদেশ, আমার সেই অকর্মণ্য গৃহপ্রিয় বাল্যকাল, আমার ভালােবাসা-লালায়িত কল্পনাক্লিষ্ট যৌবন, আমার নিশ্চেষ্ট নিরুদ্যম চিন্তাশীল অতিব্যথিত জীবনের স্মৃতি এই সূর্যকিরণে এই তন্তুবায়ুহিল্লোলে সুদূর মরীচিকার মত আমার স্বপ্নভারনত দৃষ্টির সামনে জেগে উঠছে। আমি প্রাচ্য, আমি আসিয়াবাসী, আমি বাংলার সন্তান, আমার কাছে য়ুরােপীয় সভ্যতা সমস্ত মিথ্যে— আমাকে একটি নদীতীর, একটি দিগন্তবেষ্টিত কনকসূর্যাস্তরঞ্জিত শস্যক্ষেত্র, একটুখানি বিজনতা, খ্যাতিপ্রতিপত্তিহীন প্রচণ্ডচেষ্টাবিহীন নিরীহ জীবন এবং যথার্থ নির্জনতাপ্রিয় একাগ্রগভীর ভালােবাসাপূর্ণ একটি হৃদয় দাও― আমি জগদ্‌বিখ্যাত সভ্যতার গৌরব, উদ্দাম জীবনের উন্মাদ আবর্ত এবং অপর্যাপ্ত যৌবনের প্রবল উত্তেজনা চাই নে।

 Schiller একজন জর্মান সহযাত্রী আমাকে বলছিল তুমি যদি তােমার গলার রীতিমত চর্চা করো তা হলে আশ্চর্য উন্নতি হতে পারে: You have a mine of wealth in your voice। প্রথম বারে যখন ইংলন্‌ডে ছিলুম তখন যদি এই কাজ করতুম তা হলে মন্দ হত না। আর কিছু না হােক নিদেন পক্ষে হয়তাে একটা উপার্জনের পন্থা থাকত।

 ডেকে বসে খানিকটা Alphonse Daudet পড়ছিলুম। মাঝে একবার উঠে দেখলুম— দু ধারে ধূসরবর্ণ বালুকাস্তূপ, জলের ধারে ধারে একটু একটু বনঝাউ এবং অর্ধশুষ্ক তৃণ উঠেছে― আমাদের দক্ষিণে সেই বালুকাস্তূপের মধ্য দিয়ে এক দল আরব শ্রেণীবদ্ধ উট বােঝাই করে নিয়ে চলেছে― প্রখর সূর্যালােক এবং ধূসর মরুভূমির মধ্যে তাদের নীল কাপড় এবং শাদা পাগড়ি ছবির মতাে দেখাচ্ছে। কেউ বা বালুকাগহ্বরের ছায়ায় পা ছড়িয়ে অলসভাবে শুয়ে আছে, কেউ বা নমাজ পড়ছে, কেউ বা নাসারজ্জু ধরে অনিচ্ছুক উটকে টানাটানি করছে। সমস্তটা মিলে খররৌদ্র আরব-মরুভূমির একটুখানি ছবির মতাে মনে হল।

 জাহাজ মাঝে একবার তলায় আটকে গিয়েছিল। অনেক হাঙ্গাম করে ঠেলে বের করেছে।

 শুক্রবার [২৪ অক্‌টোবর]। Mrs Smallwoodকে আমাদের ডিনার-টেবিলে দেখে অনেক সময় ভাবি― যে-সব মেয়ের বয়স হয়েছে, যাদের গৌরবের দিন চলে গেছে, তাদের মনের অবস্থা কিরকম? এই Smallwood খুব প্রখর মেয়ে― এক কালে বােধ হয় অনেকের উপর অনেক খরতর শরচালনা করেছে― অনেক পুরুষ এর রুমাল কুড়িয়ে দিয়েছে, মিষ্টিকথা বলেছে, নেচেছে, বিবিধ উপায়ে সেবা এবং পূজা করেছে— এখন আর কেউ গল্প করবার জন্যে ছুতাে অন্বেষণ করে না, নাচের সময় আহবান করে না, আহারের সময় পরিবেশন করে না—যদিও সে নাকে মুখে কথা কয় এবং অচিরজাত বিড়ালশাবকের মতাে ক্রীড়াচাতুরীশালিনী এবং তার প্রখরতাও বড়াে সামান্য নয়। অবিশ্যি, বয়স অল্পে অল্পে এগােয় এবং অনাদর ক্রমে ক্রমে সয়ে আসে। কিন্তু তবু যেসব মেয়ে চিত্তজয়ােৎসাহে মত্ত হয়ে শরীরের প্রতি দৃক্‌পাত করে নি, গৃহকার্য অবহেলা করেছে, ছেলেদের দাসীর হাতে সমর্পণ করে রাত্রির পর রাত্রি নৃত্যসুখে কাটিয়েছে, উগ্র উত্তেজনায় মত্ত হয়ে জীবনের সমস্ত স্বাভাবিক সুখের প্রতি অনেক পরিমাণে বীততৃষ্ণ হয়েছে, তাদের বয়স্ক অবস্থা কী শূন্য এবং শােভাহীন। আমাদের মেয়েরা এই উদগ্র আমােদমদিরার আস্বাদ জানে না― তারা অল্পে অল্পে স্ত্রী থেকে মা এবং মা থেকে দিদিমা হয়ে আসে, পূর্বাবস্থা থেকে পরের অবস্থার মধ্যে প্রচণ্ড বিপ্লব বা বিচ্ছেদ নেই। এক দিকে Mrs Smallwoodকে এবং অন্য দিকে Miss Low এবং Miss Hedistedকে দেখি—কী তফাত। তারা অবিশ্রাম পুরুষসমাজে কী খেলাই খেলাচ্ছে! আর কোনাে কাজ নেই, আর কোনাে ভাবনা নেই, আর কোনাে সুখ নেই— সচেতন পুত্তলিকা―মন নেই, আত্মা নেই—কেবল চোখে মুখে হাসি এবং কথা এবং তীব্র উত্তর-প্রত্যুত্তর। এক-এক দিন সন্ধেবেলা যখন সমস্ত পুরুষ আপন আপন চুরোট এবং তাস নিয়ে স্বজাতিসমাজে জটলা করে― তখন Miss Hedisted কী ম্লান বেকার ভাবে এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকে, মনে হয় যেন আপন সঙ্গহীন অবস্থায় আপনি পরম লজ্জিত। একএক দিন সেই রকম অবস্থায় আমি গিয়ে তাকে কথঞ্চিৎ প্রফুল্ল করে তুলি। সেদিন নাচের সময় Miss Vivianএর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। সে বলছিল, তােমরা পুরুষ ball roomএর এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকলে কিছু মনে হয় না; কিন্তু মেয়েদের wall flower হয়ে থাকা দুরবস্থার একশেষ, ভারী লজ্জা এবং নৈরাশ্য উদয় হয়।― এই-সব দেখে আমার মনে হয় আমাদের পুরুষদের জীবনে যা-কিছু সুখ আছে তার স্থায়িত্ব এবং গভীরত্ব মেয়েদের চেয়ে বেশি। অবিশ্যি, দুঃখ এবং নিষ্ফলতাও বেশি। পুরুষদের মধ্যে যারা জীবনের সার্থকতা লাভ করেছে বয়ােবৃদ্ধিকে তারা ডরায় না, বরং অনেক সময়ে প্রার্থনা করে। তাদের আপনার মধ্যে আপনার অনেক নির্ভরস্থল আছে। তাই জন্যে পুরুষরা স্বভাবতঃ কুঁড়ে।― দেখেছি এত পুরুষ আছে, কিন্তু মেয়েরা নাচবার সঙ্গী পায় না। বাজনা বাজছে, সুসজ্জিত উদ্ঘাটিতবক্ষ মেয়েরা উৎসুকভাবে ইতস্ততঃ নিরীক্ষণ করছে, আর পুরুষরা দল বেঁধে জাহাজের কাঠরা ধরে অলসভাবে চুরট খাচ্ছে এবং চেয়ে আছে। Gibbsকে বললুম, তােমার নাচা উচিত। সে বললে: My dear fellow, my dancing days are over। তার বয়স ২১। শেষকালে Miss Long চটেমটে বলল: Oh, men are so lazy! ব’লে রাগ করে মুখ ভার ক’রে বেঞ্চিতে বসে রইল। আজকাল তাই নাচ বন্ধ আছে।

 Browning পড়তে পড়তে The Englishman in Italy বলে কবিতায় (১৫১ পৃ) দেখলুম—

 

Oh these mountains, their infinite movement!
still moving with you;
for ever some new head and breast of them
thrusts into view
to observe the intruder.

আমার কবিতায় পর্বত সম্বন্ধে দুটো লাইন আছে তার সঙ্গে এর অনেকটা মিলছে—

স্থির তারা নিশিদিন তবু যেন চলে,
চলা যেন বাঁধা আছে অচল শিকলে।

আমার এ দুটো ছত্র অনেকে বুঝতে পারে না।

 শনি [২৫ অক্‌টোবর]। অনেক দিন থেকে য়ুরােপীয় সভ্যতার কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে তার বিদ্যুৎবেগ এবং প্রচণ্ড শক্তি অনুভব করবার ইচ্ছে ছিল। আমি চিরকাল কেবল স্বপ্ন দেখে এবং কথা কয়ে এসেছি, এই জন্যে যথার্থ কার্যের দিকে আমার ভারী আকর্ষণ আছে। শােনা যায় একজন বিখ্যাত ইংরাজ সেনাপতি বলেছিল, যুদ্ধে জয়লাভের চেয়ে যদি Grey's Elegy আমি লিখতে পারতুম তা হলে জীবন অধিক কৃতার্থ মনে করতুম। এর থেকে প্রমাণ হয়, প্রত্যেক মানুষেরই জীবন অসম্পূর্ণ—যে চিন্তা করে কার্যস্রোতে ঝাঁপ দেবার জন্যে তার মনের আকাঙ্ক্ষা থেকে যায়, এবং যে কাজ করে চিন্তায় শিখরে উঠে বহির্জগৎ এবং অন্তর্জগতের অসীমত্ব অনুভব করবার জন্যে তার গােপন ব্যাকুলতা থাকে। এই জন্যে য়ুরােপে যেমন স্বপ্নের আদর এমন আর কোথাও নেই। সেই নিয়মের বশে আকৃষ্ট হয়ে দুই-একটি সঙ্গী আশ্রয় করে ঘর থেকে বেরিয়েছিলুম, কিন্তু এই কাজের কোলাহল এবং আমােদর মত্ততার মধ্যে কি আমি তিষ্ঠতে পারি? সমুদ্রের তরঙ্গ দেখতে বেশ এবং তার কলধ্বনি শুনতে ভালাে লাগে, কিন্তু যে সাঁতার জানে না তীরে বসে উপভােগ করাই তার পক্ষে সুবুদ্ধির কাজ। দেখলুম বন্ধুবান্ধব অনেকেই ঝাঁপ দিচ্ছে এবং মহা আনন্দে চীৎকার করছে, তাই দেখে আমিও তাড়াতাড়ি ঝাঁপ দিয়েছিলুম― খানিকটা নাকানি-চোবানি এবং লােনা জল খেয়ে উঠে এসেছি। এখন কিছুদিন ডাঙার উপরে সর্বাঙ্গ বিস্তার-পূর্বক চক্ষু মুদ্রিত করে রােদ পােহাব মনে করছি।—

ভাসল তরী সকালবেলা,  ভাবিলাম এ জলখেলা—
মধুর বহিবে বায়ু, ভেসে যাব রঙ্গে।

কিন্তু seasicknessএর কথা কে মনে করেছিল! আমার এই সভ্যতার তরঙ্গের মধ্যে সেই seasicknessএর উদয় হয়েছিল। আমার এই চিরবিশ্রামশীল অন্তরাত্মা যে একটুতেই এত নাড়া খাবে এবং প্রতি নিমেষে কণ্ঠাগত হয়ে উঠবে তা কে জানত!


 আজ সকালবেলা স্নানের ঘর বন্ধ দেখে দরজার সামনে অপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে আছি। কিয়ৎক্ষণ বাদে বিরলকেশ স্থূলকলেবর দ্বিতীয় ব্যক্তি তােয়ালে এবং স্পঞ্জ্ হাতে উপস্থিত, স্নানের ঘর খালাস হবামাত্রই দেখি সে অম্লানবদনে ঢােকবার অভিপ্রায় করছে―কিছুমাত্র লজ্জা কিম্বা দ্বিধা নেই। প্রথমেই মনে হল কোনাে রকম করে তাকে ঠেলে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ি, কিন্তু কোনাে রকম শারীরিক স্বত্ব আমার এমন রূঢ় এবং অভদ্র মনে হয় এবং এত অনভ্যস্ত যে কিছুতেই পারলুম না― তাকে আমার অধিকার ছেড়ে দিলুম। মনে মনে অবাক্ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম― ভাবলুম খৃষ্টীয় নম্রতা শুনতে খুব ভালাে, কিন্তু আপাততঃ এই পশুপৃথিবীর পক্ষে অনুপযােগী এবং দেখতে অনেকটা ভীরুতার মতাে। নাবার ঘরে প্রবেশ করতে যে খুব বেশি সাহসের আবশ্যক ছিল তা নয়, কিন্তু প্রাতঃকালেই একটা মাংসবহুল কপিশবর্ণ পিঙ্গলচক্ষু রূঢ় ব্যক্তির সঙ্গে সংঘর্ষ আমার একান্ত সংকোচজনক বােধ হল। পৃথিবীতে স্বার্থপরতা অনেক সময়ে এই জন্যে জয়লাভ করে— প্রবল ব’লে নয়, অতিমাংসগ্রস্ত কুৎসিত ব’লে।

 খুব গরম পড়েছে। ডেকের উপরে যে যার আপন আপন easychairএর উপর পড়ে ধুঁকছে।

 রবিবার [২৬ অক্‌টোবর]। সকাল থেকে একটু ঝোড়ো রকম হয়ে আছে। সকলেই আক্ষেপ করছে, জাহাজে রবিবার অত্যন্ত dull, সময় কাটে না। মেয়েদের মধ্যে একটা খুব excitement, চিত্রবিচিত্র বনেট মাথায় দিয়ে রাবিবারিক বেশ-পরিধান। ইংরেজ মেয়েদের বনেটের উপর ভারী ঝোঁক— বনেটে পরস্পরকে হারিয়ে দেওয়া একটা জীবনের লক্ষ্য। Miss Mull, Miss Oswald, সকলেই বনেট বনেট করে অস্থির। কিন্তু আমার চোখে অধিকাংশ বনেট অত্যন্ত কুৎসিত এবং বর্বর বলে ঠেকে।

 আর-এক সপ্তাহ। নিশিদিন উলটে পালটে কেবল কলকাতার ছবি মনে করছি।


 জাহাজের দিন: সকালে ডেক ধুয়ে দিয়ে গেছে, এখনাে ভিজে রয়েছে, দুই ধারে ডেক্‌চেয়ার বিশৃঙ্খলভাবে রাশীকৃত; খালি পায়ে রাত-কামিজ-পরা পুরুষগণ কেউ বা বন্ধুসঙ্গে কেউ বা একলা মধ্যপথ দিয়ে হুহু করে বেড়াচ্ছে; ক্রমে যখন আটটা বাজল এবং একটি-আধটি করে মেয়ে উপরে উঠতে লাগল তখন একে একে এই বিরলবেশ পুরুষদের অন্তর্ধান। স্নানের ঘরের সম্মুখে ভয়ানক ভিড়― তিনটি মাত্র স্নানের ঘর, আমরা জন চল্লিশেক লােক। সকলেই হাতে একটি তােয়ালে এবং স্পঞ্জ্ নিয়ে দ্বারমােচনের অপেক্ষায় আছে― দশ মিনিটের বেশি স্নানের ঘর অধিকার করবার নিয়ম নেই। স্নান এবং বেশভূষা সমাপনের পর উপরে গিয়ে দেখা যায় ডেকের উপর পদচারণশীল প্রভাতবায়ুসেবী অনেকগুলি স্ত্রীপুরুষের সমাগম হয়েছে। ঘনঘন টুপি-উদ্ঘাটন-পূর্বক মহিলাদের এবং পরিচিত বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে শুভপ্রভাত-অভিবাদন-পূর্বক শীত-গ্রীষ্মের তারতম্য সম্বন্ধে পরস্পরের মতামত ব্যক্ত করা গেল। ক্ষণেক বাদে নটার সময় ঘণ্টা বেজে উঠল— breakfast প্রস্তুত, বুভুক্ষু নরনারীগণ সােপানপথ দিয়ে নিম্নকক্ষে ভােজনবিবরে প্রবেশ করলে, ডেকের উপরে আর জনপ্রাণী অবশিষ্ট রইল না, কেবল সারি সারি শূন্যহৃদয় চৌকি ঊর্ধ্বমুখে প্রভুদের জন্যে অপেক্ষা করে রইল। ভােজনশালা প্রকাণ্ড ঘর― মাঝে দুই সার লম্বা টেবিল এবং তার দুই পাশে খণ্ড খণ্ড ছােটো ছােটো টেবিল, আমরা দক্ষিণপার্শ্বের একটি ক্ষুদ্র টেবিল অবলম্বন করে সাতটি প্রাণী দিনের মধ্যে তিনবার ক্ষুধানিবৃত্তি করে থাকি। মাংস রুটি ফলমূল মিষ্টান্ন মদিরা এবং হাস্যকৌতুক গল্পগুজবে এই অনতিউচ্চ সুপ্রশস্ত ঘর কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। আহারের পর উপরে গিয়ে যে যার নিজ-নিজ চৌকি অন্বেষণ এবং যথাস্থানে স্থাপনে ব্যস্ত। চৌকি খুঁজে পাওয়া দায়―ডেক ধোবার সময় কার চৌকি কোন্‌খানে টেনে নিয়ে রেখেছে তার ঠিক নেই। তার পরে চৌকি খুঁজে নিয়ে আপনার জায়গাটুকু গুছিয়ে নেওয়া বিষম দায়— যেখেনে একটু কোণ, যেখেনে একটু বাতাস, যেখেনে একটু রৌদ্রের তেজ কম, যেখেনে যার অভ্যেস, সেইখেনে ঠেলেঠুলে টেনেটুনে পাশ কাটিয়ে পথ ক’রে আপনার চৌকিটি রাখতে পারলে তার পরে সমস্ত দিনের মতাে নিশ্চিন্ত। তার পরে দেখা যায় কোনাে চৌকিহারা ম্লানমুখী রমণী কাতভাবে ইতস্ততঃ দৃষ্টিক্ষেপ করছে, কিম্বা কোনাে বিপদ্‌গ্রস্ত অবলা এই চৌকিঅরণ্যের মধ্যে থেকে আপনার চৌকিটি বিশ্লিষ্ট করে অভিপ্রেত স্থানে স্থাপন করতে পারছে না, তখন আমরা পুরুষগণ নারীসহায়ব্রতে চৌকি-উদ্ধারকার্যে নিযুক্ত হয়ে সুমিষ্ট ধন্যবাদ উপার্জন করে থাকি। তার পরে যে-যার চৌকি অধিকার করে বসে যাওয়া যায়— ধূম্রসেবীগণ হয় ধূমকক্ষে নয় ডেকের পশ্চাদ্ভাগে সমবেত হয়ে পরিতৃপ্ত মনে ধূমপান করছে। মেয়েরা অর্ধনিলীন অবস্থায় কেউ বা নভেল পড়ছে, কেউ বা সেলাই করছে— মাঝে মাঝে দুই-একজন যুবক ক্ষণেকের জন্যে পাশে বসে মধুকরের মতাে কানের কাছে সহাস্য গুন্‌গুন্‌ করে আবার চলে যাচ্ছে। আহার কিঞ্চিৎ পরিপাক হবামাত্রই quoit খেলা আরম্ভ হল। দুটি বালতি পরস্পর থেকে হাত-দশেক দূরে স্থাপিত হল, দুইজুড়ি স্ত্রীপুরুষ বিরােধীপক্ষ অবলম্বনপূর্বক স্ব স্ব স্থান থেকে কতকগুলি রজ্জুচক্র বিপরীত বালতির মধ্যে নিক্ষেপ করবার চেষ্টা করতে লাগল— যে পক্ষ সর্বাগ্রে একুশ করতে পারবে তারই জিত। কেউ বা দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল, কেউ বা গণনা করতে লাগল, কেউ বা যােগ দিলে, কেউ বা আপন আপন পড়ায় কিম্বা গল্পে নিবিষ্ট হয়ে রইল। একটার সময় lunchএর ঘণ্টা বাজল। আবার এক-চোট আহার। তার পরে উপরে গিয়ে দুই স্তর খাদ্যের ভারে এবং মধ্যাহ্নের উত্তাপে আলস্য অত্যন্ত ঘনীভূত হয়ে আসে। সমুদ্র প্রশান্ত, আকাশ সুনীল মেঘমুক্ত, অল্প অল্প বাতাস দিচ্ছে, কেদারায় হেলান দিয়ে নীরবে নভেল পড়তে পড়তে অধিকাংশ নীলনয়নে নিদ্রাবেশ হয়ে আসছে। কেবল দুই-একজন পাশাপাশি বসে দাবা backgammon কিম্বা draft খেলছে এবং দুই-একজন অশ্রান্ত অধ্যবসায়ী যুবক সমস্ত দিন quoit খেলছে― কোনাে রমণী কোলের উপর কাগজ কলম নিয়ে একাগ্রমনে চিঠি লিখছে এবং কোনাে শিল্পকুশলা কৌতুকপ্রিয়া যুবতী নিদ্রিত সহযাত্রীর ছবি আঁকবার চেষ্টা করছে। ক্রমে রৌদ্রের প্রখরতা হ্রাস হয়ে এল, তখন তাপক্লিষ্ট ক্লান্তকায়গণ নীচে নেবে এসে রুটিমাখন-মিষ্টান্ন-সংযােগে চা-পান করে শরীরের জড়তা পরিহারপূর্বক পুনর্বার ডেকে উপস্থিত। পুনর্বার যুগলমূর্তির সােৎসাহ পদচারণা এবং হাস্যালাপ আরম্ভ হল। কেবল দু-চারজন পাঠিকা উপন্যাসের শেষ পরিচ্ছেদ থেকে কিছুতেই আপনাকে বিচ্ছিন্ন করতে পারছে না, দিবাবসানের ক্ষীণালোকে একান্ত নিবিষ্ট দৃষ্টিতে নায়ক-নায়িকার পরিণাম অনুসরণ করছে। দক্ষিণে জ্বলন্ত কনকাকাশ এবং অগ্নিবর্ণ জলরাশির মধ্যে সূর্য অস্ত গেল, এবং বামে সূর্যাস্তের কিছু পূর্ব হতেই চন্দ্রোদয় হয়েছে— জাহাজ থেকে পূর্বদিগন্ত পর্যন্ত বরাবর জ্যোৎস্যারেখা ঝিক্ ঝিক্ করছে― পূর্ণিমার সন্ধ্যা যেন নীল সমুদ্রের উপর আপনার শুভ্র অঙ্গুলি স্থাপন করে আমাদের এই জ্যেৎস্নাপুলকিত পূর্বভারতবর্ষের পথ নির্দেশ করে দিচ্ছে। জাহাজের ডেকের উপর এবং কক্ষে কক্ষে বিদ্যুদ্দীপ জ্বলে উঠল। ছটার সময়ে ডিনারের প্রথম ঘণ্টা বাজল, বেশপরিবর্তনের জন্যে স্ব স্ব ক্যাবিনে প্রবেশ করলে― তার পরে আধ ঘণ্টা বাদে যখন দ্বিতীয় ঘণ্টা বাজল ভােজনগৃহে প্রবেশ করা গেল। সারিসারি নরনারী বসে গেছে, কারও বা কালাে কাপড়, কারও বা রঙিন কাপড়, কারও বা শুভ্রবক্ষ অর্ধ-অনাবৃত। মাথার উপরে শ্রেণীবদ্ধ বিদ্যুৎ-আলােক অলছে, গুন্‌গুন্ আলাপের সঙ্গে সঙ্গে কাঁটা-চামচের ঝন্‌ঝন্ টুংটাং শব্দ উঠছে― এবং বিচিত্র খাদ্যের পর্যায় পরিচারকদের হাতে হাতে স্রোতের মতাে যাতায়াত করছে। আহারের পর ডেকে গিয়ে শীতল-বায়ু-সেবন― কোথাও বা যুবক যুবতী অন্ধকার একটি কোণের মধ্যে চৌকি টেনে নিয়ে গুন্ গুন্ করছে, কোথাও বা দুজনে জাহাজের বারান্দা ধরে ঝুঁকে পড়ে রহস্যালাপে নিমগ্ন, কোনাে কোনাে যুগল সহাস্য গল্প করতে করতে আলােক এবং অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে দ্রুতপদে চলে বেড়াচ্ছে, কোথাও বা এক ধারে পাঁচ-সাত-জন স্ত্রীপুরুষে জটলা করে উচ্চহাস্য এবং বিবিধ প্রমােদকল্লোল উচ্ছ্বসিত করে তুলছে। অলস পুরুষরা কেউ বা বসে কেউ দাঁড়িয়ে কেউ বা অর্ধশয়ান অবস্থায় চুরট খাচ্ছে, কেউ বা smoking saloonএ কেউ বা নীচে খাবার ঘরে whisky soda পাশে নিয়ে চার-চার জনে দল বেঁধে waist খেলছে। এ দিকে music saloonএ সংগীতপ্রিয় দু-চার জনের সমাবেশ হয়েছে, গানবাজনা এবং মধ্যে মধ্যে করতালি শােনা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে নৃত্যের আয়ােজন হয়, কিন্তু পুরুষ নর্তকদের স্বভাবসিদ্ধ আলস্য এবং অমনােযােগিতাবশতঃ কিছুদিন থেকে নাচ তেমন জমছে না। ক্রমে সাড়ে-দশটা বাজে, মেয়েরা নেবে যায়, ডেকের উপরের আলাে হঠাৎ নিবে যায়, ডেক নিঃশব্দ নির্জন অন্ধকার হয়ে আসে― এবং চারি দিকে নিশীথের নিস্তব্ধতা, চন্দ্রালােক এবং অনন্ত সমুদ্রের চিরকলধ্বনি পরিস্ফুট হয়ে ওঠে।


 সােমবার [২৭ অক্‌টোবর]। Red Seaর গরম ক্রমেই বেড়ে উঠছে। ডেকের উপরে মেয়েরা সমস্ত দিন তৃষাতুর হরিণীর মতাে pant করছে, রৌদ্রদগ্ধ ফুলের মতাে তাদের তাপক্লিষ্ট ম্লানমুখ দেখে দুঃখ হয়। তারা কেবল অতি ক্লান্তভাবে ধীরে ধীরে পাখা নাড়ছে, স্মেলিং সল্ট্ শুঁকছে এবং যুবকেরা যখন পাশে এসে করুণ সুরে কুশল জিজ্ঞাসা করছে তখন নিমীলিতপ্রায় নেত্রপল্লব অলসভাবে ঈষৎ উন্মীলন করে ম্লান সহাস্যে গ্রীবাভঙ্গীদ্বারা ইঙ্গিতে আপন দুরবস্থা ব্যক্ত করছে― কিন্তু যতই lemon squash এবং পরিপূর্ণ করে lunch খাচ্ছে ততই জড়ত্ব এবং ক্লান্তি বাড়ছে, ততই নেত্র নিদ্রালস এবং সর্বশরীর শিথিল হয়ে আসছে। আমাকে কেউ কেউ ঈষৎ ক্রোধের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করছে: I suppose you like this weather! আমি বিনীত দুঃখিত কাতরভাবে নতশিরে সসংকোচে অপরাধ স্বীকার করে নিচ্ছি।

 লােকেনকে চিঠি লেখা গেল। আজকের বিশেষ উল্লেখযােগ্য কোনাে খবর না থাকাতে উপরােক্ত প্যারেগ্রাফ লােকেনের চিঠি থেকে উদ্‌ধৃত করে রাখা গেল। কাল একটা কবিতা লিখতে আরম্ভ করেছিলুম। লিখতে লিখতে ডিনারের ঘণ্টা বেজে গেল, আজ ক্যাবিনে পড়ে পড়ে সেটা শেষ করলুম। একটা সামান্য কবিতা লিখতে মনটাকে কী রকম করে নিংড়ে বের করতে হয় যারা পড়ে তারা বােখ হয় তার কিছুই বুঝতে পারে না, তারা কেবল ভালােমন্দ সমালােচনা করে মাত্র। কাল সকালে এডেনে পৌঁছব, তার পরে বম্বে, তার পরে কলকাতা।

 মঙ্গল [২৮ অক্‌টোবর]। আজ সকালে Turnbull আমার কাছে স্বজাতির উপরে খুব আক্রোশ প্রকাশ করছিল। বলছিল: Selfish, stuck up, stiff, no manner in them them। বলছিল, জাহাজে একদিন বসে ছিলুম, একজন মেয়ে পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, আমি ভদ্রতা করে তাকে চৌকি ছেড়ে দিলুম; সে একটি ঘন্টা ধরে আমার চৌকি জুড়ে বসে রইল, উঠে যাবার সময় একটি thank দিয়ে গেল না। Gibb গল্প করছিল crowded ’busএ আমি ভদ্রতা করে একজন মেয়েকে যেমনি জায়গা ছেড়ে দিলুম অমনি অম্লানবদনে তিন-চারজন মেয়ে এসে আমার সমস্ত জায়গা জুড়ে বসল। তারা মনে করে তাদের এটা অধিকার, কিছুমাত্র ভদ্রতার সংকোচ নেই। Turnbull বলছিল, একদিন picture galleryতে lady friend নিয়ে গিয়েছিল, শ্রান্ত হয়ে এক জায়গায় বসেছিল, পাশে একজন মেয়েকে দাঁড়াতে দেখে তাকে জায়গা ছেড়ে দিচ্ছিল, অমনি তার সহচরী কোর্তা ধরে টেনে বসিয়ে দিলে, বললে; Don't be a fool, you are not on the Continent! অর্থাৎ, এখানকার লােকেরা তাে ভদ্রতার মর্যাদা বােঝে না।

 এডেনে পৌঁছনো গেছে। একরাশ আরব এসে ভয়ানক গােল বাধিয়ে দিয়েছে। মনে মনে একটুখানি চিঠির আশা ছিল। steward একটা চিঠি এনে দিলে জ্যোতিদাদার হাতের অক্ষরে; S. Tagore Esq., Passenger P&O Mail Steamer, Aden। তার থেকে বােঝা যাচ্ছে, যে চিঠিতে আমি এডেনে উত্তর লিখতে অনুরােধ করেছিলুম সেটা বাবিরা পেয়েছে। যা হােক, আমার অদৃষ্টে কিছু নেই। শুনছি রবিবার রাত একটার সময় জাহাজ বম্বে বন্দরে পৌঁছবে, তা হলে তার পরদিন সমস্ত দিন গাড়ির জন্যে অপেক্ষা করতে হবে। এমন বিশ্রী লাগছে! একটা Messagerie জাহাজ এডেনের কাছে জলে ডুবে রয়েছে দেখলুম, Messagerie লাইনের আর-একটা জাহাজের সঙ্গে ধাক্কা লেগেছিল।

 বিকেলটা কাটাবার জন্যে বসে বসে একটা কবিতা লেখা গেল। এক-এক সময়ে কবিতা লিখে মনটা বেশ প্রফুল্ল হয়ে ওঠে। এক সময়ে কবিতা রচনা মনের উপরে যেন একটা বেদনার রক্তরেখা রেখে দিয়ে যায়, এবং সেইখানটা বরাবর ব্যথা করতে থাকে।— সমস্ত দিন কোনােক্রমে কেটে যায়, কিন্তু দীর্ঘ সন্ধেবেলা ভারী ছটফটানি ধরে। সাড়ে-ছটার সময় ডিনার, তার পরে কতক্ষণ চুপচাপ করে বসে থাকি। Gibbs hurricane deckএ বেড়াতে নিয়ে যাবার জন্যে টানাটানি করে, তখন ভারী বিরক্ত ধরে। এইসকল নানা কারণে আমার মতাে moody লােকের পক্ষে বন্ধুত্ব ভারী দুঃসাধ্য।

 বুধবার [২৯ অক্‌টোবর]। দালাল ব’লে একজন পার্শি আমাদের জাহাজে আছে। তাকে প্রায় অবিকল যােগেশের মতাে দেখতে সেই রকম মুখের বেড়, সেই রকম দাড়ির ছাঁট, সেই রকম ভ্রূ এবং কপাল, কেবল এর চোখ দুটো খুব বড়ো। অল্প বয়স। ন মাস য়ুরােপে বেড়িয়ে বিলিতি পােশাক এবং চালচলন ধরেছে। বলে, India like করে না। বলে, তার য়ুরােপীয় বন্ধুদের (অধিকাংশ মেয়ে) কাছ থেকে ইতিমধ্যে তিনশাে চিঠি পেয়েছে— ‘কিন্তু আমি কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চাই নে, যখন আমার আলাপীরা মনে করে আমি তাদের বন্ধু তখন সে ভুল ভাঙিয়ে দিতে আমি বিলম্ব করি নে। There's no fun keeping friends— only lot of troubles।’ তার পরে বললে: I don't care for flirting, There's no fun in it. I have flirted with great Italian German French English girls— I am tired of it. You tell lot of lies to a girl, and she hits you with her fan— not much fun in it— I don't like the Englishmen who come from India. Therefore I don't speak to the people in this boardship— of course if they come to me and speak to me I speak to them. I speak to some twelve thirteen people in this steamer ―I speak for about two hours to a gentleman every morning. (ভালাে ইংরিজি বলে না এবং ঈষৎ নতুন রকমের উচ্চারণ―speakকে spick বলে) বাঙালীদের বাবু বলে, আমাকে বলে: You speak very good English― where did you learn it? বলে: With my European dress people take me for an Italian or a French. I am not dark enough for an Indian। লােকটা আমারই মতাে dark। লােকটা খুব লম্বা লম্বা কথা বলে—ভারী অদ্ভুত, ভারী stupid। বলে, আমি scientific বই ভালােবাসি। আমি বললুম, আমাকে দুই-একটা ধার দিতে পারো? বললে, তােরঙ্গের নীচে আছে, বের করা শক্ত।

 বুধবার। একটা ইংরিজি কাগজ পড়ছিলুম, তাতে আমাদের দিশি মেয়েদের দুরবস্থা সম্বন্ধে খুব কাতরভাবে লিখেছে। আমাদের দিশি মেয়েদের ঠিক অবস্থা ইংরেজদের পক্ষে বােঝা ভারী শক্ত। আমার তাে মনে হয় আমাদের মেয়েরা ইংরেজ মেয়েদের চেয়ে ঢের বেশি সুখী। ভালােবাসাতেই মেয়েদের জীবনের প্রকৃত সফলতা, তার থেকে আমাদের মেয়েরা বঞ্চিত নয়। নিজের ছেলেমেয়ে, নিজের স্বামী এবং বৃহৎ পরিবারের মধ্যে তাদের হৃদয়ের সমস্ত প্রবৃত্তি চরিতার্থতা লাভ করে― ভালােবাসার সমস্ত শাখা প্রশাখা চতুর্দিকে আপনাকে প্রসারিত করবার স্থান পায়। আর যাই হােক, কার্যাভাবে তাদের হৃদয় কঠিন ও শুষ্ক হবার অবসর পায় না। একজন ইংরেজ old maidএর হৃদয় কী শূন্য, কী সংকীর্ণ এবং নীরস হয়ে আছে। আমাদের বালবিধবারা প্রকৃতপক্ষে ইংরেজ old maidএর সমতুল্য—কিন্তু বৃহৎ পরিবারের মধ্যে শিশুস্নেহ গুরুভক্তি সখিত্ব বিচিত্র প্রবাহে তাদের নারীহৃদয়কে সর্বদা কোমল ও সরস করে রাখে, সভা কিম্বা কুকুরশাবকের দ্বারা সমস্ত শূন্য জীবনকে ব্যাপৃত রাখবার আবশ্যক হয় না। আমার মনে হয়, সভ্যতার আকর্ষণে ইয়ুরােপীয় মেয়েরা এতদূর বেরিয়ে এসেছে যে, তাদের কেন্দ্র থেকে ছিন্ন হয়ে কক্ষের বাহির হয়ে পড়েছে। তারা প্রমােদের পাকেই ঘূর্ণ্যমান হােক, কিম্বা কার্যক্ষেত্রে পুরুষদের সঙ্গে জীবনসংগ্রামে প্রবৃত্ত হােক, কিম্বা বিজনে কৌমার্য বা বৈধব্য -যাপন করুক, তাদের স্ত্রীপ্রকৃতির মধ্যে শান্তি নেই। হয় তারা প্রমােদে উন্মত্ত, নয় তারা আন্তরিক অসন্তোষে আক্রান্ত। আর যাই হোক, আমাদের ব্যক্তিগত ও জাতীয় উন্নতির পক্ষে যতই ব্যাঘাতজনক হােক, আমাদের বৃহৎ পরিবার মেয়েদের পক্ষে একান্ত উপযােগী। কারণ, ভালােবাসাহীন শূন্য স্বাধীনতা নারীর পক্ষে অতি ভয়ানক, মরুভূমির স্বাধীনতা গৃহপ্রিয় লােকের পক্ষে যেমন নিদারুণ শূন্য। আমরা যাকে বন্ধন মনে করি মেয়েদের পক্ষে তা বন্ধন নয়। অবিশ্যি, সুখদুঃখ পুরুষদের মতাে মেয়েদের জীবনেও আছে—পুরুষদের অগত্যাকাজ যেমন কঠিন, ভালােবাসার কর্তব্যও তেমনি সকল সময়ে লঘু নয়। ভালােবাসারও অনেক দায়, অনেক বালাই আছে। কিন্তু ভালােবাসার ত্যাগস্বীকার অনেক সহজ― আমার পক্ষে বন্ধুর নিমন্ত্রণ রক্ষা না ক’রে চাপকান প’রে আপিসে যাওয়া যত কঠিন, মায়ের পক্ষে সন্তানের অনুরােধে নিমন্ত্রণ অগ্রাহ্য করা তত কঠিন নয়। এই জন্যে মেয়েদের জীবন পুরুষের চক্ষে যত কঠিন ঠেকে মেয়েদের পক্ষে ততটা নয়। তাদের নিভৃত সুখদুঃখের মধ্যে থেকে উৎপাটন করে তাদের বাইরে এনে দাও, তারা কখনােই সুখী হবে না। আমাদের মেয়েরা যে ইংরেজ মেয়েদের চেয়ে অসুখী বা নির্বোধ বা অশিক্ষিত তা নয়। আপন সীমানার বাইরে তারা নির্বোধ শঙ্কিত সংকুচিত— বাইরে নিয়ে গেলে তারা জানে না কী করতে হবে, কোথায় যেতে হবে, কিন্তু আমাদের ঘরের মধ্যে তারা সহৃদয়প্রতিভাশালিনী। তারা আমাদের সেবা করে, আমাদের সকলের খাওয়া হয়ে গেলে তবে খায়, তার থেকে যদি কেউ মনে করে আমাদের মেয়েদের আমরা অনাদর ও পীড়ন করি তবে সে মহা ভুল। অন্তঃপুরে তারা কর্ত্রী, আমরা তাদের অতিথি, তাই আমাদের এত আদর— আমরা কর্তা ব’লে নয়। এমন কথা কে কবে বলেছে আমাদের উপার্জনকার্যে মেয়েরা সাহায্য করে না, অতএব তারা স্বার্থপর ও হৃদয়হীন— কর্মক্ষেত্রে আমরা কর্তা— সেখানকার সমস্ত কষ্ট আমরা বহন করে মেয়েদের তার থেকে রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য। (উদর এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের fable)

 আমাদের মেয়েরা খুব বেশি লেখাপড়া শেখে নি তা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু আমাদের দেশে ইংরাজি-শিক্ষার কী ফল কে জানে। নাহয় ঘরের মধ্যে একটা দিশি শিক্ষার দুর্গ রইল তাতে ক্ষতি কী? বাল্যকাল থেকে বিদেশী ভাষা শিক্ষায় আমাদের মস্তিষ্ক অবসন্ন এবং চিন্তাশক্তি ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে। আমরা পুরুষরা তাে ইংরিজি শিক্ষার তা লেগে লেগে অতি শীঘ্র অকালে পেকে যাচ্ছি, আমাদের অন্তঃপুরে নাহয় অন্তর থেকে বাংলা রসাকর্ষণ করে অল্পে অল্পে স্বাভাবিক পরিণতির একটা পরীক্ষাস্থল থাক্। ইংরিজি শিক্ষা বাংলার মধ্যে দিয়ে তাদের নাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করুক এবং বর্তমান অবস্থাবিপর্যয়ের সঙ্গে অল্পে অল্পে তাদের সামঞ্জস্যসাধন হােক। এই-যে বইগুলাে লিখছি এবং ছাপাচ্ছি এবং বঙ্গবাসীতে বিজ্ঞাপন দিচ্ছি, নিদেন মেয়েরা পড়ূক, না পড়ে তাে কিনুক।

 ইংরেজরা একটা বুঝতে পারে না যে, ইংরেজ স্ত্রীপুরুষ এবং দিশি স্ত্রীপুরুষের মধ্যে বৈলক্ষণ্য প্রায় সমান। ইংরাজ স্ত্রীপুরুষের মধ্যে যদি শিক্ষা স্বাধীনতার সাম্য থাকত, তা হলে Millএর বই লেখবার এবং বর্তমান বিদুষীমণ্ডলীর বিদ্রোহ করবার কোনাে কারণ থাকত না। আমরা মাটি কামড়ে কোনােমতে ঘরের প্রাঙ্গণটিতে পড়ে থাকি, আমাদের মেয়েরা সেই ঘরের অন্তঃপুরে বিরাজ করে। তােমরা পুচ্ছ-আস্ফালনে সমস্ত সংসার ঘােলা করে বেড়াও, তােমাদের মেয়েরা তােমাদের অনুবর্তী। কিন্তু এখনও তােমরা পুরুষরাই প্রধান, তােমরাই প্রভু― তােমাদের স্ত্রীরা অনুগত ছায়া। তােমাদের তুলনায় তােমাদের স্ত্রীরা অশিক্ষিত।

 বিধবাবিবাহ না থাকাতে আমাদের সমাজে স্ত্রীলােকদের অত্যন্ত কষ্ট? তােমাদের দেশে কুমারীবিবাহ বন্ধ হয়ে সমাজে যত অনাথা স্ত্রীলােকের আবির্ভাব হয়েছে আমাদের দেশে বিধবাবিবাহ বন্ধ হয়ে তত হয় নি। সমাজের মঙ্গলের প্রতি যদি লক্ষ করা যায় তবে আমাদের দেশে বিধবাবিবাহ অসম্ভব, তােমাদের দেশে অবস্থা বিশেষে বিধবাবিবাহ আবশ্যক। সকল সমাজনিয়মই আপেক্ষিক। আমাদের সমাজ তােমরা কিছুমাত্র জানাে না, এই জন্য আমাদের সমাজ সম্বন্ধে তােমরা কিছুই বুঝতে পারাে না।

 যেমন লােকভেদে তেমনি জাতিভেদে সুখদুঃখ বিভিন্ন। আমি যখন গাজিপুরে থাকতুম তখন ইংরেজরা মনে করত, আমােদ প্রমােদ খেলা ও সঙ্গ অভাবে আমি বুঝি ভারী ম্রিয়মাণ হয়ে আছি। তাই আমাকে ক্রমাগত নিমন্ত্রণ করত এবং ক্লাবের মেম্বর হবার জন্যে অনুরােধ করত। আমি যে আমার ঘরের কোণে সন্ধেবেলা আলােটি জ্বেলে আমার আপনার লােক নিয়ে কত সুখে থাকতুম তা তারা বুঝতে পারত না। একজন Lady Dufferin -মেয়ে-ডাক্তার আমাদের অন্তঃপুরে প্রবেশ করে যখন দেখে অপরিষ্কার ছােটো ঘর, ছােটো জানলা, ময়লা বিছানা, মাটির প্রদীপ, দড়িবাঁধা মশারি, আর্ট্ স্টুডিয়াের রঙ-লেপা ছবি, তখন সে মনে করে— কী সর্বনাশ! কী ভয়ানক কষ্টের জীবন! এদের পুরুষরা কী স্বার্থপর! স্ত্রীলােকদের জন্তুর মতাে করে রেখেছে! জানে না আমাদের দশাই এই। আমরা মিল পড়ি, রস্কিন পড়ি, স্পেন্সর পড়ি, কেরানিগিরি করি, খবরের কাগজে লিখি, বই ছাপাই, ওই মাটির প্রদীপ জ্বালি, ঐ মাদুরে বসি, অবস্থা সচ্ছল হলেই স্ত্রীর গয়না গড়িয়ে দিই, এবং ঐ দড়িবাঁধা মােটা মশারির মধ্যে আমি আমার স্ত্রী এবং মাঝখানে একটি কচি খােকা নিয়ে তালপাতার হাতপাখা খেয়ে রাত্রিযাপন করি। ওগাে, তবু আমরা জন্তু নই। আমাদের কৌচ কার্পেট কেদারা নেই, কিন্তু তবুও আমাদের দয়ামায়া ভালােবাসা আছে। তক্তপােষের উপর তাকিয়া ঠেসান দিয়ে তােমাদের সাহিত্য পড়ি, তবুও অনেকটা বুঝতে পারি এবং সুখ পাই। ভাঙা প্রদীপে খােলা গায়ে তােমাদের ফিলজফি অধ্যয়ন করে তবুও আমাদের ছেলেরা তােমাদেরই মতাে agnostic হয়ে আসছে।― আমরা আবার তােমাদের ভাব বুঝতে পারি নে। তােমাদের সুখ স্বচ্ছন্দতা আরএক রকমের। কৌচ কেদারা তােমরা এত ভালােবাস যে স্ত্রীপুত্র না হলেও চলে। আরামটি তােমাদের আগে, তার পরে তােমাদের ভালােবাসা। আমাদের ভালােবাসা নিতান্তই আবশ্যক, তার পরে আরাম থাক্ বা না থাক্।

 কিন্তু তােমরা খুব সভ্য জাতি, তােমরা অনেক মহৎ কার্য করেছ, অতএব তােমাদের সমস্ত প্রথাকেই মানবের উন্নতির অনুকূল বলে মেনে নিতে হবে। কিন্তু আমরাও এক কালে উন্নত জাতি ছিলুম, এই বিপুল স্ত্রীপুত্রপরিবারের ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে আমাদের পতন হয়েছে― এবং কে বলতে পারে ঐ উত্তরােত্তরবর্ধনশীল স্তুপাকৃত আরামের মধ্যেই তােমাদের সভ্যতার সমাধি হবে না? ভারতবর্ষে পারিবারিক প্রথা ক্রমে এত বিপুল এবং জটিল হয়ে পড়েছিল যে সমাজের সমস্ত শক্তি পরিবাররক্ষার মধ্যেই পর্যবসিত হয়েছিল, সংহত পরিবারের চাপে ব্যক্তিগত মহত্ত্বের স্ফূর্তি বন্ধ হয়ে সমস্ত একাকার হয়ে এসেছিল। তােমাদের আরাম ক্রমেই এত বেড়ে উঠছে যে, স্বাধীন গতিবিধির পথ বন্ধ হবার উপক্রম হয়েছে। তােমাদের পরিবারপ্রতিষ্ঠার শক্তি বন্ধ হয়ে আসছে― পণ্ডিতগণ ভীতভাবে মন্ত্রণা দিচ্ছেন, এবং socialism মধ্যে মধ্যে নখদন্ত বিকাশের উপক্রম করছে।

 মাঝের থেকে মেয়েদের আর মেয়ে থাকবার যাে নেই, তাদের পুরুষ হওয়া বিশেষ আবশ্যক হয়েছে। য়ুরােপে ক্রমে গৃহ নষ্ট হয়ে হােটেল বৃদ্ধি হচ্ছে― যে যার নিজে নিজে উপার্জন করছে এবং আপনার ঘরটি, easychairটি, কুকুরটি, ঘােড়াটি, চুরটের পাইপটি এবং একটি ক্লাব নিয়ে নির্বিঘ্ন আরামের চেষ্টায় প্রবৃত্ত আছে। সুতরাং মেয়েদের মৌচাক ভেঙে যাচ্ছে। পূর্বে সেবকমক্ষিকারা মধু অন্বেষণ করে চাকে সঞ্চয় করত এবং রাজ্ঞীমক্ষিকারা কর্তৃত্ব করত― এখন চাক বাঁধা বন্ধ করে যে যার আপনার একটি কক্ষ ভাড়া ক’রে সকালে মধু উপার্জন করে সন্ধ্যা পর্যন্ত একাকী নিঃশেষে উপভােগ করছে। সুতরাং রানীমক্ষিকাদের এখন বেরােতে হচ্ছে, কেবলমাত্র মধু দান এবং মধু পান করবার সময় আর নাই। স্ত্রীপুরুষের এই স্বাভাবিক অবস্থাবিপর্যয়ের জন্য য়ুরােপীয় সমাজের কী কোনাে ক্ষতি হবে না? একবার ভালাে করে ভেবে দেখাে, আমাদের স্ত্রীরা অসুখী না তােমাদের স্ত্রীরা অসুখী। আমাদের স্ত্রীরা গাড়ি চড়ে হাওয়া খায় না, কিন্তু তাদের কোমল স্নেহশীল হৃদয় সর্বদাই পরিপূর্ণ— কোনো অবস্থাতেই তারা গৃহহীন নয়।

 কেউ যেন না মনে করে মেয়েদের গাড়ি চড়ে হাওয়া খাওয়াকে আমি দূষণীয় জ্ঞান করি। আমার বলবার অভিপ্রায় এই, গাড়ি চড়ে হাওয়া না খেয়েও তারা এক রকম সুখে আছে, হাওয়া খেয়ে তারা আরও সুখী হয় আরও ভালাে। অন্তঃপুরের সংকীর্ণ সীমার মধ্যে থেকেও তাদের হৃদয়ের অভাব নেই, জ্ঞান ও স্বাধীনতা- বৃদ্ধির সঙ্গে তাদের হৃদয়ের প্রসারতা আরও বাড়ে তো আরও ভালাে। আমার বলার অভিপ্রায় এই যে, আমাদের মধ্যে মন্দ যেমন আছে তেমনি ভালােও আছে― তােমরা যতটা বিভীষিকা দেখ ততটা কিছু নয়। আমার ধর্ম যে মানে না সে চিরনরকে দগ্ধ হবে এ যেমন গোঁড়া খৃষ্টানি, আমাদের মতাে যাদের প্রথা নয় তারা অসুখী এও তেমনি গোঁড়া দ্বৈপায়নতা।

 শুক্রবার [৩১ অক্‌টোবর]। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন হয়ে আসছে। এখন আমাদের বাইরে বিক্ষিপ্ত হবার সময়, কেবলমাত্র পরিবার-প্রতিপালন আমাদের একমাত্র কাজ বলে ধরে নিলে চলবে না। ইংরেজের সংঘর্ষে এসে তাদের সঙ্গে প্রতিযােগিতা আমাদের একান্ত আবশ্যক হয়ে পড়েছে। চিরদিন অপমানিত এবং ধিক্‌কৃত হয়ে আর জীবনধারণ করা চলে না। শিক্ষা করতে এবং শিক্ষা দিতে হবে, আপনার শক্তি দেশে বিদেশে পরিচালিত করতে হবে―পৃথিবীতে আপনার উপযােগিতা প্রমাণ করতে হবে। সুতরাং মেয়েদের অবস্থারও পরিবর্তন আবশ্যক। এখন কেবল তাদের গৃহের সামগ্রী করলে চলবে না। তাদেরও জাগ্রত হয়ে আমাদের জাগ্রত করতে হবে। তাদের মধ্যেও এই নবজীবনের উন্মেষ আবশ্যক।

 আজ সন্ধের সময় Hamiltonএর সঙ্গে গল্প হচ্ছিল। সে বলছিল: তােমরা আর যাই করাে, য়ুয়ােপের নকল কোরাে না― Then you are nowhere, you are lost! তােমাদের ধর্ম, তােমাদের সভ্যতা, সহস্র সহস্র বৎসর টিঁকে আছে। কিন্তু চার শো বৎসর আগে আমরা কী ছিলুম? চার শো বৎসর পরে আমরা কী থাকব? আমাদের বড়ো বড়ো নগরের মধ্যে কী ভয়ানক পঙ্কিলতা প্রবেশ করেছে ভেবে দেখলে আশা থাকে না।

 শনিবার [১ নবেম্বর]। Dillon মৃত্যুশয্যায় শয়ান। বম্বে পর্যন্ত পৌঁছবে কি না সন্দেহস্থল। বৃদ্ধ আমাদেরই সঙ্গে এক আহাজে য়ুরোপে গিয়েছিল। কাল সন্ধেবেলায় যখন গানবাজনা নাচ হচ্ছিল, এবং আজ সকালে যখন খেলা চীৎকার হাসি চলছিল, তথন চতুর্দিকের এই জীবনের কলরব তার কানে প্রবেশ করে কিরকম লাগছিল! আজ সুন্দর সকালবেলা, ঠাণ্ডা বাতাস বচ্ছে, সমুদ্র সফেন তরঙ্গে নৃত্য করছে, উজ্জ্বল রোদ্‌দুর উঠেছে, কেউ বা quoit খেলছে, কেউ বা নবেল পড়ছে, কেউ গল্প করছে, music saloonএ গান চলছে, smoking saloonএ তাস চলছে, dining salooঈ lunch খাবার আয়ােজন হচ্ছে― আর Dillon মরছে।

 আজ সন্ধে আটটার সময় Dillonএর মৃত্যু হল। আজ সন্ধের সময় একটা অভিনয় হবার কথা ছিল, হল না।

 Gibbs আজ আবার তাদের মেয়েদের কথা বলছিল। বলছিল, মেয়েরা কমে ভারী নির্লজ্জ হয়ে আসছে, তারা অম্লানবদনে প্রকাশ্যে উলঙ্গাপ্রায় পুরুষদের ব্যায়ামক্রীড়া ও swimming match দেখতে যায়― এবং picture saloonএর কথা বললে। আমার কিন্তু এগুলাে ততটা খারাপ লাগে না। এই উলঙ্গ দৃশ্যের মধ্যে একটা বেশ অসংকোচ healthiness আছে― আর্ধেক ঢাকাঢাকি এবং suggestivenessই কুৎসিত, যেমন ball-roomএ মেয়েদের বুকখােলা কাপড় এবং নাচ। waltz নাচ সম্বন্ধে Gibbs যে রকম করে বলছিল সে আমি লিখতে পারি নে― সে শুনে আমার ভারী লজ্জা এবং কষ্ট হচ্ছিল। youngmanরা এ সম্বন্ধে যে রকম ভাবে কথা কয় মেয়েদের শোনা উচিত। ইতিপূর্বে একদিন আশু এবং লোকেনের কাছে এ বিষয়ে অনেক কথা শুনেছিলুম।

 ডিনার-টেবিলে Third Officer গল্প করছিল— Hurricane ডেকের উপর তাদের ঘরের পাশে আজকাল সন্ধেবেলায় অন্ধকারে অনেক চুম্বনের শব্দ শোনা যাচ্ছে— জাহাজ গম্যস্থানের নিকটবর্তী হয়েছে, বিদায়ের সময় এসেছে, তারই আয়োজন। শুনে Miss Hedistedt লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। 3rd Off. গল্প করলে: আর-একবার সমুদ্রযাত্রায় সে চীনদেশ থেকে কাপড়ের পাড় কিনে নিয়ে যাচ্ছিল, তাই দেখাবার জন্যে একজন মা এবং মেয়ে যাত্রীকে তার ক্যাবিনে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল। পাড় দেখা হয়ে গেলে মা এগিয়ে গেল, মেয়ে একটু পিছিয়ে রইল। Officer তার কারণ অনুসন্ধান করতে যাওয়াতে মেয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করল: won't you kiss me? Off.: No. Why? মেয়ে: But other officers always kiss me when they take me to their cabin।— শুনে আমরা এবং মেয়েরা সবাই অপ্রস্তুত। লোকটার মুখে কিছুই বাধে না।

 রবি [২ নবেম্বর]। আজ সকাল আটটার সময় ডিলনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হয়ে গেল। আমি দেখতে গেলুম। একটা টেবিলের উপরে কফিন পড়ে আছে। Hamilton, Connolly, এক দল পর্টুগীজ ভৃত্য, এবং দু-তিনজন ক্যাথলিক মেয়ে হাঁটু গেড়ে কফিন ঘিরে রোমান ক্যাথলিক burial service পড়ছে। আর, সকলে কালো কাপড় প’রে টুপি খুলে চারি দিকে নীরবে জড়িয়ে। প্রার্থনা হয়ে গেলে পরে কফিন সমুদ্রের জলে ফেলে দিলে। তার পরে জাহাজ আবার চলতে লাগল। এই অন্ত্যেষ্টিসৎকারের সঙ্গে আমাদের সমুদ্রযাত্রার শেষ দিন আগত হল।

 আজ রাত্তিরে জাহাজ বম্বে পৌঁছবে। স্পেশাল ট্রেনে আমাকে যেতে দেবে কি না কে জানে— তা না হলে মেজদাদাদের চিঠি একদিন আগে গিয়ে পৌঁছবে, আমার হঠাৎ গিয়ে পড়বার কল্পনা একেবারে মাটি হয়ে যাবে। কূলে এসে তরী ডােবা একেই বলে।

 আর ডায়ারি বন্ধ করা যাক্।―

 ২ মাস এগারাে দিন কেটে গেল। মনে হচ্ছে কত যুগ। রাত দুপুরের সময় বম্বে পৌঁছনো গেল। স্পেশল ট্রেন ধরতে পারলুম না― তাই ভারতবর্ষে পৌঁছেও মন ভারী বিগড়ে আছে— হঠাৎ গিয়ে পড়ব ব’লে কত কী কল্পনা করেছিলুম, এক দিনের জন্যে সমস্ত ফস্কে গেল। বাড়ি যতই কাছে আসছে মন ততই যেন অস্থির হয়ে উঠছে। gravitationএর নিয়মানুসারে ভার পৃথিবীর যতই নিকটবর্তী হয় তার বেগ ততই বাড়ে— মনেরও সেই নিয়ম দেখছি। কাল সমস্ত রাত এক মুহূর্ত ঘুমােই নি। আজ সকালে তাড়াতাড়ি Watsons Hotelএ বেরিয়ে পড়লুম। এখেনে এসে দেখি আমার টাকার ব্যাগটি জাহাজে ফেলে এসেছি। মাথায় যেন বজ্রাঘাত হল। তার মধ্যে আমার return ticket এবং টাকা। তাড়াতাড়ি গাড়ি নিয়ে আবার সেই জাহাজে চললুম। সেই পুরােনাে ক্যাবিনের pegএ ব্যাগটি ঝুলছে— ধড়ে প্রাণ এল। এ রকম ফিরে পেলে হারিয়ে সুখ আছে। ব্যাগটি কাঁধের উপর ঝুলিয়ে সমস্ত পৃথিবী আনন্দময় বােধ হল। আমার মতাে লােকের ঘর ছেড়ে এক পা বেরোনাে উচিত নয়। যখন আমার biography বেরােবে তখন এই সমস্ত অন্যমনস্কতার দৃষ্টান্তগুলাে পাঠকদের কাছে ভারী আমােদজনক এবং কবির উপযুক্ত শােনাবে, কিন্তু আপাততঃ ভারী অসুবিধে। এই ব্যাগ ভুলে যাবার সম্ভাবনা কাল সন্ধেবেলায় একবার মনে উদয় হয়েছিল। তার পরে মনকে বিশেষ করে সাবধান করে দিলুম, ব্যাগটা যেন না ভােলা হয়। মন বললে, ক্ষেপেছ! টাকার ব্যাগ আমি ভুলি! আজ সকালে তাকে আচ্ছা এক-চোট গাল দিয়ে নিয়েছি। সে নিরুত্তর হয়ে রইল। তার পরে যখন ব্যাগ ফিরে পাওয়া গেল তখন আবার তার পিঠে হাত বুলােতে বুলােতে হােটেলে ফিরে এসে স্নান করে বড় আরাম বােধ হচ্ছে। ভরসা করি আজ সন্ধেবেলায় আবার ভুলব না। আজ সন্ধেবেলায় সমস্ত গুছিয়েগাছিয়ে নিয়ে যখন গাড়িতে চড়ে বসব তখন মনটা একবার নৃত্য করে উঠবে— তার পরে হুগলির কাছাকাছি গিয়ে যখন সকাল হবে—তখন―। ঐ breakfastএর ঘণ্টা বাজল—খেয়ে আসি, ক্ষিধে পেয়েছে।

 গাড়ির জন্যে একটা বালিশ কিনেছিলুম— সেটা হােটেলে ফেলে এসেছি।

 আমাদের good morning প্রভৃতি কোনােরকম greeting নেই বলে Gibbs আমাদের নেহাত অসভ্য মনে করেছে।


 Truth কাগজ থেকে একটা জায়গা উদ্‌ধৃত করে রাখি:

 The expression of a fashionably-dressed woman is now emphatically one of nakedness. Her sleeveless bodice, cut halfway to her waist, betrays much and suggests more. Her large white arms, her uncovered shoulders crossed with an airy line, her bust displayed to the last inch permitted by the law which protects morality and forbids obscenity, her back bared in a wedge-shaped track to her band, the colour of her gown scarce distinguishable from her skin, and the “fit” one which moulds the figure and makes no pretence at disguise— in this indecent nudity she offers herself to public admiration; and the bold looks of the men are the caresses which make her purr with pride and pleasure. Her dress is her note of invitation, and if but few honestly confess, no one is deceived.

 Orientalদের dishonesty সম্বন্ধে ইংরেজরা প্রায় আলােচনা করে থাকে, তাই নিম্নের খবরটা টুঁকে রাখা গেল: Truth: Oct. 16, 1890:

 The writer was yesterday in a city restaurant, when, in an adjoining box he overheard scraps of conversation which, at first, were meaningless to him; but, in the light of something he had heard earlier in the day, he was able to piece out one of those stories of trickery and fraud in connection with the Stock-Exchange which, as a rule, the public only hear of after the victims are ruined. The party were very jubilant, and the copious champagne that they indulged in made them possibly more reckless than in their sober moments they would have been. Briefly, what was overheard made it clear that the party were members of a ring which had for its purpose the breaking down of the credit of some wellknown South African shares, and some important information was alluded to that was being kept in the background until the right moment― that is, when an immediate rise was to follow... The writer encloses his private card, and, in confidence, would be happy to answer any inquiries.

 Editor remarks: My correspondent, who is highly respectable, and is unconnected with financial jobbery etc.


 আসল কথা হচ্ছে, পরের জাত সম্বন্ধে আমরা যেটা দেখি এবং শুনি সেইটেই আমাদের কাছে মস্ত হয়ে ওঠে― তার সমস্তটা আমরা তদন্ত করতে পারি নে। এই জন্যে তাড়াতাড়ি generalize করে একটা মত খাড়া করি।