রাজমালা (ভূপেন্দ্রচন্দ্র চক্রবর্তী)/দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ/৭

(৭)

ধন্যমাণিক্যের শাপমোচন

 ধর্ম্মমাণিক্যের দুই পুত্র ধন্য ও প্রতাপ। ধর্ম্মমাণিক্যের মৃত্যু হইলে সেনাপতিগণ চক্রান্ত করিয়া কনিষ্ঠ প্রতাপকেই সিংহাসনে বসাইয়া দিল, জ্যেষ্ঠ ধন্য পলাইয়া কোনও রূপে জীনব রক্ষা করিলেন। সেনাপতিরা হয়ত ভাবিয়াছিল প্রতাপ আমাদের হাতের পুতুল হইয়া থাকিবে, আর আমরা তাহার নামে রাজ্য শাসন করিব। কিন্তু ব্যাপার অন্যরূপ হইল। প্রতাপ ক্রমেই দুরন্ত হইয়া উঠিতে লাগিল, তাহার দৌরাত্ম্যে সকলে অতিষ্ঠ হইয়া উঠিল। প্রজারা কাঁদিয়া আকুল—হা বিধাতঃ! মহারাজ ধর্ম্মের পরে ত্রিপুরা রাজ্য অধর্ম্মের হাতে আসিয়া পড়িয়াছে, কতকাল এ দুর্জ্জনের শাসন চলিবে?

 কিছুদিন যায়, সেনাপতিরা আর সহ্য করিতে না পারিয়া প্রতাপকে মারিয়া ফেলিল। তখন রাজ-সিংহাসন শূন্য হইয়া পড়িল, সেনাপতিদের মধ্যে কলহ উপস্থিত, কে রাজা হইবে! শ্রেষ্ঠ সেনাপতির সুবুদ্ধি হইল, ধন্য কোথায় আছেন, তাঁহার সিংহাসন তাঁহাকে দিলেই ত সব গোলের অবসান হয়। তখন ধন্যের খোঁজ আরম্ভ হইল, রাজ্য শুদ্ধ হুলস্থূল, ধন্য কোথায় গেল? কিন্তু কেহই কোন সন্ধান দিতে পারিলনা। অবশেষে শ্রেষ্ঠ সেনাপতি বুদ্ধি করিয়া ধাত্রীর নিকট সংবাদ জানিতে চাহিলে ধাত্রী ত প্রমাদ গণিল! ঐ ধাত্রীই ধন্যকে লালন পালন করে। যখন ষড়যন্ত্র আরম্ভ হয় তখন পাছে বা ধন্যের প্রাণ যায় সেই ভয়ে তাঁহাকে লুকাইয়া রাখিবার ব্যবস্থা হয়। পুরোহিতের ঘরে তাঁহাকে ছদ্মবেশী ভৃত্যরূপে রাখিয়া দেওয়া হয়। সেইখানেই সকলের দৃষ্টির আড়ালে ধন্য বড় হইতে থাকে।

 ধাত্রীর মনের ভাব বুঝিয়া সেনাপতি কহিল ধন্যকে সিংহাসনে বসাইবার জন্যই খুঁজিতেছি, কোন আশঙ্কা করিও না। এই বলিয়া শালগ্রাম শিল। ছুঁইয়া সত্য করিলে ধাত্রী কুমারের সন্ধান বলিয়া দিল। তখন দশ সেনাপতি হাতী ঘোড়ায় মিছিল সাজাইয়া পুরোহিতের বাটীর প্রাঙ্গণে আসিয়া উপস্থিত। ধন্য এসব সোরগোল শুনিয়া ভয়ে মাচার নীচে যাইয়া লুকাইলেন। পুরোহিত ধাত্রীর নিকট হইতে এসংবাদ পূর্ব্বেই পাইয়া ছিলেন কাযেই তাঁহার সন্দেহ হইল না। তিনি ঘরে আসিয়া দেখেন ধন্য মাচার নীচে ভয়ে জড়সড়। পুরোহিতকে দেখিয়া বলিলেন—“দোহাই ঠাকুর, আমি সেবক হইয়া উচ্ছিষ্ট ফেলিয়। একমুষ্টি অন্ন তোমার ঘরে পাইয়া থাকি, আমাকে দূর করিয়া দিও না।” পুরোহিত অনেক বুঝাইলেন—“বাবা, কোন ভয় নাই, তুমি শাপভ্রষ্ট দেবকুমার, তোমার দুঃখের দিন কাটিয়া গিয়াছে রাজমুকুট পরাইবার জন্য তোমাকে বরণ করিতে আসিয়াছে।” পুরোহিতের অভয় বাক্যে কুমারের প্রত্যয় হইল। তখন কুমার বাহিরে আসিলেন। শুক্রাচার্য্যের কৃপায় যেমন দৈত্যরাজ বলির ইন্দ্রত্ব লাভ ঘটে, পুরোহিতের কৃপায়ও তেমনি ধন্যের রাজ্য লাভ হইতে চলিল। সেনাপতিগণ কুমারকে দেখিবা মাত্র তাঁহার পায়ে লুটাইয়া পড়িল এবং গলবস্ত্র হইয়া কুমারের নিকট অপরাধ স্বীকার করিল। কুমার তখন হাতীর উপর জরির হাওদায় বসিয়া রাজা হইতে চলিলেন। পুরোহিতের বাক্য যথার্থ—এতদিনে তাঁহার শাপ মোচন হইল।

 ধাত্রীর কথা পড়িবার সঙ্গেই রাজপুত ইতিহাসে ধাত্রী পান্নার কথা স্মরণ হয়—শোণিত-পিপাসু বনবীরের হাত হইতে শিশু উদয়সিংহকে বাঁচান এক অত্যাশ্চর্য্য ঘটনা। ত্রিপুর ইতিহাসেও যে এইরূপ ধাত্রী বিরল নহে ইহা দেশের পক্ষে গর্ব্বেরই বিষয়।