লেফ্‌টেন্যাণ্ট সুরেশ বিশ্বাস/সুরেশ খবরের কাগজ বিক্রেতা

চতুর্বিংশতি পরিচ্ছেদ।


সুরেশ খবরের কাগজ বিক্রেতা।

 কি করিবেন কোথায় যাইবেন সুরেশ কিছুই স্থির করিতে না পারিয়া যেদিকে মন চলিল, সেইদিকেই চলিলেন। অবশেষে ঘুরিতে ঘুরিতে তিনি লণ্ডনের বিখ্যাত উদ্যান হাইড্‌পার্ক আসিলেন। ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হইয়া হতাশ চিত্তে তিনি একটী ঝোপের মধ্যস্থ বেঞ্চিতে বসিয়া পড়িলেন। তৎপরে ভাবিতে ভাবিতে ভাবনার কুল না দেখিয়া বিষণ্নচিত্তে সেই বেঞ্চের উপর শয়ন করিলেন। কখন কিরূপে নিদ্রাদেবী আসিয়া তাঁহার চক্ষে অধিষ্ঠিতা হইলেন তাহা তিনি জানিতে পারেন নাই।

 সহসা হাস্যধ্বনিতে সুরেশের নিদ্রাভঙ্গ হইল, তিনি চক্ষু মেলিয়া দেখিলেন একটী ইংরেজ বালক তাঁহার ন্যায় এক কালো মানুষকে এইরূপে শায়িত দেখিয়া আমোদে আটখানা হইয়া হাসিতেছে! সুরেশ প্রথমে উঠিয়া বলিলেন, তৎপরে বালক তাঁহাকে দেখিয়া হাসিতেছে দেখিয়া সুরেশের ক্রোধের উদ্রেক হইল,—বালক বোধ হয় সুরেশের মনের ভাব বুঝিল, বলিল, ‘‘ভায়া, কোন দেশ থেকে এখানে?’’

 বালকের বালকসুলভ স্বভাবে সুরেশের ক্রোধ দূর হইল, তিনি বলিলেন, “আমি দূর ভারতবর্ষ হইতে আসিয়াছি।’’

 বালক। বাঘ আর সাপের দেশ?

 সুরেশ। হ্যাঁ।—যে দেশ আর্য্যজাতির সভ্যতার আকর।

 বালক। তার কিছুই জানি না। সে ব্যাপার খানা কি?

 সুরেশ হাসিলেন। এতো সামান্য সম্বাদপত্র বিক্রেতা বালক। ইংলণ্ডের যাঁহারা শিক্ষিত, তাঁহারা পর্য্যন্ত ভারতের বিষয়ে এতই অজ্ঞ যে তাঁহাদের ভারতবর্ষ সম্বন্ধীয় পাণ্ডিত্য দেখিলে হাস্য সম্বরণ করিতে পারা যায় না। সুরেশ হাসিয়া বলিলেন, “যখন এ দেশের লোকে কাপড় পরিতে জনিত না, তখন আমাদের দেশ সভ্যতার উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হইয়াছিল।’’

 বালক। আমি সে বিষয়ে ভাবনায় বড় ব্যস্ত নই। কি অভিপ্রায়ে তুমি এ দেশে?

 সুরেশ। আমি একটা চাকুরি লইয়া একখানা জাহাজে কলিকাতা হইতে লণ্ডনে আসিয়াছি। কিন্তু এখন এখানে আমার এমনই অবস্থা হইয়াছে যে পকেটে একটী পেনীও নাই যে একটুক্‌রা রুটী কিনিয়া খাই।

 বালক কিয়ৎক্ষণ সুরেশের দিকে চাহিয়া থাকিয়া বলিল, ‘‘কি কর্ব্বে স্থির করেছ?’’ বালক এমনই ভাবে সুরেশকে এই প্রশ্ন করিল, যে সুরেশ তাহাকে সকল কথা না বলিয়া থাকিতে পারিলেন না। তিনি তাঁহার অবস্থা সমস্তই তাহাকে খুলিয়া বলিলেন, সকল শুনিয়া বালক বলিল, ‘‘আলস্যে থাকিলে চলিবে না। এ দেশে নিজের অন্নের জন্য সকলেই পরিশ্রম করে ও সকলকেই নিতে হয়, অন্য উপায় নাই। কেহ কাহারও গলগ্রহ হয় না, হইতেও পার না। তুমিও কেন পরিশ্রম কর না?

 সুরেশ। আমি পরিশ্রম করিতে কাতর নহি, কিন্তু কাজ পাই কই?

 বালক। তুমি আমাকে হাসালে। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সহরে আবার কাজের অভাব। এখানে যথেষ্ঠ কাজ আছে; তবে চেষ্টা, যত্ন, পরিশ্রম চাই।

 সুরেশ। এই কথা মনে ভাবিয়াই আমি দেশ ছাড়িয়া এ দেশে আসিয়াছিলাম। কিন্তু এখানে এসে সবই উল্টা দেখিতেছি। বিদেশী লোকের এখানে কোন কাজ পাইবার সম্ভাবনা কিছুই নাই।

 বালক। আমি রাজার হালে নেই, তবে অনাহারেও মরিতেছি না। যদি আমি অনাহারে না থাকি, তবে তুমিই বা কেন থাকিবে তাহা জানি না।

 সুরেশ। তুমি খবরের কাগজ বিক্রয় করিয়া দুপয়সা পাও; আমি বিদেশী, অপরিচিত, কোন্ কাগজওয়ালা আমাকে বিশ্বাস করিয়া কাগজ বিক্রয় করিতে দিবে?

 বালক। যদি তুমি কাগজ বেচতে চাওত হয় ত আমি তোমাকে সে বিষয়ে সাহায্য কর্ত্তে পারি।

 সুরেশ। যদি তুমি আমার এ উপকার কর, তাহা হইলে আমি চিরকালের জন্য তোমার নিকট কৃতজ্ঞতাপাশে বদ্ধ থাকিব। যে কোন কাজই হউক না কেন, আমি করিতে প্রস্তুত আছি।

 বালক। ধন্যবাদের পাত্র আমরা নই। আমাদের কাগজের ম্যানেজারের নিকট চল, বোধ হয় তিনি তোমাকে কাজ দিলেও দিতে পারেন।

 সুরেশ বালককে ধন্যবাদ দিয়া তাহার সঙ্গে সঙ্গে খবরের কাগজের আপিসে উপস্থিত হইলেন। তাঁহার সৌভাগ্য বশতঃ ম্যানেজার সাহেব কোন আপত্তি করিলেন না, সুরেশকে কাগজ বিক্রয়ের জন্য নিযুক্ত করলেন। সুরেশ বাহিরে আসিয়া কোথায় বাসা লইবেন তাহাই ভাবিতে লাগিলেন,—সে বাসায় তাঁহার যাইবার একেবারেই ইচ্ছা ছিল না। তিনি তাহার মনের কথা বালককে বলায় সে বলিল, “যদি তোমার আপত্তি না থাকে, তবে আমি যে ঘরে থাকি তুমিও সেই ঘরে আমার সঙ্গে একত্রে থাকিতে পার।’’

 কোন কাজেই সুরেশ অধিক দিন মনোনিবেশ করিয়া থাকিতে পারিতেন না। এক কাজ অনেক দিন তাঁহার ভাল লাগিত না। কাজেই সম্বাদপত্র বিক্রয় কাজও তাঁহার অধিক দিন ভাল লাগিল না। তিনি এ কাজে বেশ দুপয়সা উপার্জ্জন করিতে লাগিলেন;—তাঁহাকে বিদেশী দেখিয়া অনেকে তাঁহার নিকট হইতেই সম্বাদপত্র ক্রয় করিতেন; তিনি ভারতবাসী শুনিলে গ্রাহকগণ অন্যের নিকট কাগজ না লইয়া তাঁহারই নিকট হইতে লইতেন,—এই রূপে সুরেশ অন্যান্য সম্বাদপত্র বিক্রেতা বালকগণ যাহা প্রত্যহ উপার্জ্জন করিত, তাহাপেক্ষা অনেক অধিক উপার্জ্জন করিতে লাগিলেন,—কিন্তু তিনি এ কার্য্যে সন্তুষ্ট হইয়া থাকিতে পারিলেন না; তাঁহার প্রাণে উচ্চ আশা সর্ব্বদা জাগরিত,—তিনি সংসার-সমুদ্রের গভীর জলে নিমগ্ন হইয়াছেন,—সম্ভ্রান্তবংশে জন্মিয়া এক্ষণে লণ্ডনের রাজপথে সম্বাদপত্র বিক্রয় করিয়া জীবনযাত্রা নির্ব্বাহ করিতেছেন,— অবস্থার হীনতা যতদূর হওয়া সম্ভব তাহা হইয়াছে, কিন্তু তবুও তিনি আশা ছাড়েন নাই।

 সম্বাদপত্র বিক্রয় আর ভাল না লাগায় তিনি এ কার্য্য পরিত্যাগ করিলেন। তার পর কয়েকদিন অতি কষ্টে কাটাইলেন। যখন সম্বাদপত্র বিক্রয় করিতেন, তখন তাঁহার আহারের ক্লেশ ছিল না, এক্ষণে তা দেখা দিল। কোন দিন কিছু আহার জুটিত, কোন দিন একেবারেই কিছু জুটিত না। এ সময়ে তাঁহার কোন নির্দ্দিষ্ট কাজ ছিল না,—যখন যে দিন যাহা ফুটিত, তখন তাহা করিয়া দুই এক শিলিং উপার্জ্জন করিতেন এবং অতি কষ্টে সে দিনটা কাটাইয়া দিতেন। এই সময়ে তিনি অনুসন্ধান করিয়া আসটন সাহেবের জনক জননীর সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছিলেন। তাঁহারা অতি সাদরে তাঁহাকে অভ্যর্থনকরিয়াছিলেন। মধ্যে মধ্যে তাঁহারা কিছু কিছু অর্থও সাহায্য করিতেন। যাহাতে তাঁহার কোন একটা কাজের সুবিধা হয়, তাহার জন্যে বিশেষ যত্নও পাইয়াছিলেন,—কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ তাঁহারাও সুরেশের কোন কাজ জোগাড় করিয়া দিতে পারেন নাই।

 তাঁহার অবস্থা ঘোরতর শোচনীয় হইয়া দাঁড়াইল। অনাহার মুখ ব্যাদন করিয়া তাঁহাকে গ্রাস করিতে উদ্যত হইল। বাড়ীওয়ালী ভাড়া না পাইয়া তাঁহাকে গৃহ হইতে বহিষ্কৃত করিয়া দিতে ব্যগ্র হইয়া পড়িল। এ ভারতবর্ষ নহে, এদেশে গৃহ না থাকিলে গাছতলায় শয়ন করিয়া রাত্রি কাটে; ২ ৪ পয়সা হইলে একরূপে দিন কাটিয়া যায়। লণ্ডন সেরূপ স্থান নহে, কঠোর শীতে কেহ ঘরের বাহিরে রাত্রিযাপন করিতে পারে না। বাহিরে এক মুহূর্ত্তও থাকিবার যো নাই, অবিশ্রান্ত বরফ পড়িতেছে। গৃহ হইতে তাড়াইয়া দিলে তিনি কোথায় গিয়া বাস করিবেন? তাহা হইলে শীতে ও বরফে লণ্ডনের রাজপথে তাঁহাকে মৃত্যুমুখে পতিত হইতে হইবে?

 তিনি অর্থের জন্য বাড়ী পত্র লিখিলেন। সকলেই তাঁহাকে ভুলিয়াছে। তাঁহার আত্মীয় স্বজনের নিকট তিনি আর জীবিত নাই। তাঁহার পিতা বা খুল্লতাত কেহই তাঁহার পত্রের উত্তর দিলেন না। দেশ হইতে এক পয়সা পাইবার আশাও তাঁহার রহিল না। তিনি কি করিবেন,—কি রূপে কোন কাজ সংগ্রহ করিবেন! শেষ কি লণ্ডনের পাপসাগরে পাপে ডুবিবেন? শেষ কি উদরান্নের জন্য চুরি জুয়াচুরি প্রভৃতিও করিতে হইবে! ঘোর বিপদে পড়িয়া পেটের দায়ে হয়ত সুরেশকে মহাপাপে নিমগ্ন হইতে হইত, কিন্তু যিনি পদে পদে তাঁহাকে রক্ষা করিতেছিলেন তিনি এবারও তাঁহাকে রক্ষা করিলেন।

 এক দিন রাত্রে তিনি শয়ন করিয়া আছেন, গৃহ ঘোর অন্ধকারে পূর্ণ। সহসা তাঁহার বোধ হইল যেন, সেই গৃহে সেই অন্ধকারে আর এক জন দণ্ডায়মান রহিয়াছে। লণ্ডনে তিনি যে দিন প্রথম রাত্রি যাপন করেন, সেই দিন ঠিক এই দৃশ্য দেখিতে পাইয়াছিলেন। পূর্ব্বের ন্যায় এই ছায়ামূর্ত্তি তাঁহার শয্যার চারি দিক পর্য্যবেক্ষণ করিল,—তৎপরে এই মূর্ত্তি শয্যার পদপ্রান্তে আসিয়া দাঁড়াইল,—তৎপরে হস্ত উত্তোলন করিয়া তাঁহার দিকে অঙ্গুলী নির্দ্দেশ করিল। সুরেশ স্পষ্ট বুঝিলেন, এই মূর্ত্তি, যাঁহার মূর্ত্তিই হউক, তাঁহাকে সাবধান হইতে বলিতেছেন। কেন তিনি জানেন না তাঁহার হৃদয়ে বল দেখা দিল; হৃদয়ে আশা পুনরুদ্দীপিত হইল;—তিনি প্রাণে শান্তিলাভ করিলেন। ক্রমে ধীরে ধীরে এই ছায়ামূর্ত্তি অন্তর্হিত হইয়া গেল, তিনিও নিদ্রিত হইয়া পড়িলেন।

 পর দিবস প্রাতে সুরেশ লণ্ডনের রাজপথে মুটেগিরি করিতে প্রস্তুত হইলেন। পেটের অন্য কোন পাপকার্য্য করা অপেক্ষা মুটেগিরি করিয়া খাওয়াও ভাল, এই ভাবিয়া তিনি অবাধে বিনা দ্বিধায় লণ্ডনে মুটের কাজ আরম্ভ করিলেন। নাথপুরের সম্ভ্রান্ত বিশ্বাস বংশের পুত্র সুরেশ বিশ্বাস বিলাতের রাজপথে মুটে ও কুলির কার্য্য করিয়া জীবিকা নির্ব্বাহ করিলেন। সুরেশ দেখিলেন সম্বাদপত্র বিক্রয় অপেক্ষা ইহাতে উপার্জ্জন অনেক বেশী হয়, তিনি যে দিন হইতে এই কার্য্য আরম্ভ করিলেন, সেই দিন হইতে তাঁহার অনেক কষ্ট ঘুচিল। আহারের কষ্ট একেবারেই থাকিল না, বরং তিনি এক রূপ বেশ সুখে সচ্ছন্দে থাকিতে পারিলেন। তবে তিনি বেশ বুঝিয়াছিলেন, যে কিছু অর্থ সংগ্রহ করা প্রয়োজন,—কারণ অসুখ বিসুখ আছে,—সময় কাজকর্ম্ম না জুটিতে পারে;—এরূপ অবস্থায় কিছু অর্থ হাতে থাকা নিতান্তই আবশ্যক। এই জন্য এখন হইতে সুরেশ প্রত্যহ যাহা উপার্জ্জন করিতেন, তাহা হইতে কিছু কিছু প্রত্যহই সংগ্রহ করিয়া রাখিতেন। মুটের কার্য্যে বেশ দুই পয়সা রোজগার হইতেছিল সত্য, কিন্তু সুরেশ ইহাতেও বহু দিবস মনোনিবেশ করিয়া থাকিতে পারিলেন না। তিনি কয়েক মাস পরে এ কাজ ছাড়িয়ে দিলেন।