শিক্ষিতা পতিতার আত্মচরিত/পঙ্কিল আবর্ত্তে

নবম

পঙ্কিল আবর্ত্তে

 মদ্যপান বন্ধ করা মহাত্মা গান্ধির আন্দোলনের আর একটি কার্য্য ছিল। তদনুসারে যুবকের দল স্থানে স্থানে মদের দোকানে পিকেটিং করিতে আরম্ভ করে। আমাদের চাকর একদিন বাবুর বন্ধুদের জন্য মদ আনিতে যাইয়া বাধা পায়। যুবকেরা তাহাকে ঘিরিয়া ফেলিল। তাহারা জিজ্ঞাসা করিল “কার জন্য মদ কিনেছিস্?” আমাদের চাকর আমার বাড়ীর নম্বর বলিল। তাহারা নাম জানিতে চাহিল। চাকর বলিল “ফিরোজা বিবির ঘর।” আমি ফিরোজা রংয়ের জামা কাপড় পরিতে ভালবাসিতাম বলিয়া রামবাগানে আমার ডাকনাম ছিল ফিরোজা বিবি। চাকরটী তখন কোন প্রকারে ছাড়ান পাইয়া আসিল।

 পরদিন দুপুর বেলার খাওয়ার পর একটু বিশ্রাম করিতেছি, এমন সময় চাকর আসিয়া জানাইল, একজন ভদ্রলোক দেখা করিতে চাহেন। আমি তাঁহাকে ঘরে আনিতে বলিয়া বিছানা হইতে উঠিয়া দাঁড়াইলাম। দেওয়ালের গায়ে ঝুলান বৃহৎ আয়নার সম্মুখে যাইয়া চুল ও পরণের কাপড় ঠিক করিতে ছিলাম। অকস্মাৎ একি—আয়নার মধ্যে কাহার প্রতিবিম্ব পরিল?—আমি চমকিত হইয়া দরজার দিকে ফিরিয়া দেখি নন্দ দাদার এক বন্ধু।

 তাঁহার পরিধানে খদ্দরের ধূতি—গায়ে খদ্দরের এক চাদর—পায়ে মদ্রাজী স্যান্ডেল, হাতে একটা মোটা লাঠি। মাথার চুল ছোট ছোট করিয়া ছাঁটা। আমি কিছুমাত্র বিস্ময়ের ভাব না দেখাইয়া স্পষ্টস্বরে একটু তিরিক্ষি মেজাজে বলিলাম “আপনি কে?—এ সময়ে আপনার কি প্রয়ােজন?” কিন্তু আমার বুক কাঁপিতেছিল।

 নন্দ দাদার বন্ধু আমার আপাদমস্তক একবার দৃষ্টিপাত করিয়া বলিল, “মানী তুমি এখানে?” আমি বলিলাম, “আমার নাম ফিরােজা বিবি,—।” নন্দ দাদার বন্ধু ভিতরে আসিয়া বিছানায় বসিয়া লাঠিটা সম্মুখে শােয়াইয়া রাখিল। আমি দাঁড়াইয়া ছিলাম। নন্দ দাদার বন্ধু আমার ডান হাত ধরিয়া বলিল “বস না এই খানে!" আমি যন্ত্র চালিতের মত বসিয়া পড়িলাম। মাথা নীচু করিয়া বিছানার চাদর খুঁটিতে লাগিলাম। নন্দদার বন্ধুর নাম উপেন্দ্র।

 নন্দ দাদার বন্ধু আমাকে বলিল “মানী, তুমি শেষে এই করিলে?—পড়াশুনার এই পরিণাম?” আমি নন্দদার বন্ধুর পায়ে পড়িয়া কঁদিয়া ফেলিলাম। সে বলিল, “কাল রাত্রিতে মদের দোকানে পিকেটীং কর্‌তে এসে তােমার চাকরের মুখে ফিরােজা বিবির ঠিকানা পেয়েছি। আমরা মহাত্মা গান্ধীর মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে মদ্যপান রহিত করতে প্রতিজ্ঞা করেছি। বেশ্যাদের ঘরেও আমরা এই জন্যে যাই। আজ ফিরােজা বিবির ঘরে আস্‌বার কাজ আমার উপর পরেছিল। এখানে এসে দেখ্লাম সে আমার পরিচিত মানদা। তা হলে আজ থেকে তােমার ঘরে মদ আসা বন্ধ,—মনে রেখাে।

 উপেন বাবুর নিকট বাড়ীর সমস্ত সংবাদ জানিলাম। বাবা মনােদুঃখে কলিকাতার সমস্ত বাড়ী বিক্রয় করিয়া পল্লী গ্রামে যাইয়া বাস করিতেছেন। আমর মামার (নন্দদার পিতার) মৃত্যু হইয়াছে। নন্দ দাদা গান্ধীর আন্দোলনে মজিয়াছে। মুকুলদা বি এল্ পাশ করিয়া...•••কোর্টে প্র্যাকটিশ করিতেছেন। তাঁহার সাহিত্যচর্চ্চার দিকে বেশী মন থাকায় অর্থোপার্জন কিছুই হয় না। কমলা ম্যাট্রীক পাশ করিয়া ডাক্তারী পড়িবার জন্য পশ্চিমে কোথায় গিয়াছে। তাহার মাতা কলিকাতার বাড়া ছাড়িয়া এখন কমলার সহিতই সেখানে থাকেন। নন্দ দাদা তখন ও বিবাহ করেন নাই।

 আমি তাহাকে মাঝে মাঝে আসিতে অনুরােধ করিলাম। উপেন বাবু বলিলেন “তােমার কাছে যে উদ্দেশ্যে আসা, তা'ত হয়ে গেল। আর মদ কিনবেন না, বাস, আর ত কোন প্রয়ােজন নাই।” উপেন বাবু বিছানা হইতে উঠিলেন। আমি তাহাকে কিছু খাইবার জন্য কত মিনতি করিলাম কিন্তু তিনি কিছু খাইলেন না—একটা পান পর্য্যন্ত না। এমন চরিত্রবান যুবক কর্ম্মী ও আমাদের সংস্পর্শে আসিয়াছেন, যাঁহারা পাপীর সংস্পর্শে আসিয়াও পাপ হইতে দূরে থাকিতে সমর্থ হইয়াছেন।

 আমার ঘরে আর মদ আসিত না। বাবুর বন্ধুগণ অসন্তুষ্ট হইলেন— বাবুও রাগ করিলেন। উপেন বাবুর কাছে আমি চিঠিপত্র লিখিতাম— সে তাহার সংক্ষিপ্ত উত্তর দিত। আমার বাবু ইহা সন্দেহের চক্ষে দেখিতেন। সুতরাং আমাদের মধ্যে মনােমালিন্য দিন দিন বাড়িয়া উঠিল।

 নন্দদাদার এই বন্ধুটী আমার পরিচিত। বাল্যকালে তাহাকে আমাদের বাড়ীতে অনেকবার দেখিয়াছি। তিনি নন্দনাদার প্রতিবেশী এবং দূর সম্পর্কিত আত্মীয়। নন্দদাদাকে আসিবার জন্য অনেকবার বলিয়া দিয়াছি, কিন্তু তিনি আমার এই পরিণাম শুনিয়া আর আমার নিকট আসেন নাই।

 দুই তিন মাসের মধ্যেই আমার এই পাধ্যায় বাবু আমাকে ছাড়িয়া দিলেন। যে অভিনেত্রীর সহিত তাঁহাকে হাস্য পরিহাস করিতে দেখিয়াছিলাম, তাহারই ঘরে তিনি যাতায়াত করিতে আরম্ভ করিলেন। এখন ব্যাঙ্কের টাকায়ই নটীর পূজা আরম্ভ হইল। অপব্যয়ের ফলে কয়েক বৎসরের মধ্যেই ব্যাঙ্ক ফেল্ হইল। তিনি নিজেও গেলেন, দেশের লোকেরও সর্ব্বনাশ। অনেক ব্যবসা, শিল্প প্রতিষ্ঠান এইভাবে নষ্ট হইয়া গিয়াছে। অনেকের আজীবন সঞ্চিত ধন, ব্যাঙ্ক ফেল হওয়ায়, তাঁহারা ভিখারী সাজিয়াছেন। আপনারা মূল কারণ অনুসন্ধান করিলে তাহা জানিতে পারিবেন। কোনও পুরাতন বিখ্যাত মাসিক পত্রিকাও তাহার ম্যানেজারের বেশ্যাশক্তির ফলে বিলুপ্ত হইয়াছে।

 আমি মনে করিলাম আর কাহারও নিকট বাঁধা থাকিবনা। ভাল গায়িকা বলিয়া আমার সুনাম ছিল—আমি সোনাগাছিতে উঠিয়া গেলাম। এইখানে রাজশাহী জেলার কোন জমিদার যুবক আমার গৃহে আসিতেন। তিনি অতিশয় মদ্যপায়ী ছিলেন। তাঁহার সঙ্গে প্রায়ই থিয়েটারে যাইতাম। একদিন বক্সে বসিয়া আছি—জমিদার বাবুটি অতিরিক্ত মদ্যপানে একটু মাতলামি আরম্ভ করিয়াছেন। আমরা জানিতাম না—বাবুর শাশুড়ীটি নিকটবর্ত্তী আর এক বক্সে বসিয়াছিলেন। তিনি নাকি পূর্ব্ববঙ্গের কোন বিশিষ্ট জমিদার গৃহিণী। জামাতার এইরূপ লজ্জাজনক আচরণ দেখিয়া তিনি আমাদের নিকট হইতে জামাতাকে তখনি নিজগৃহে লইয়া গেলেন। এখন সেই জমিদার বাবুটী সত্যবালা নাম্নী আমার পরিচিতা এক পতিতার ঘরে যান। সমাজে তাঁর মান মর্য্যাদা যথেষ্ট।

 আমি মাঝে মাঝে বড়লোকের বাগান অথবা মজলিসে গানের মুজ্‌রায় যাইতাম। ইহাতে অর্থোপার্জ্জন হইত বটে, কিন্তু বিপদও ছিল। বড়লোকের খেয়াল মাফিক চলা যে কি বিরক্তিজনক, তাহা বুঝাইবার সাধ্য আমার নাই। সারারাত্রি জাগরণ, ভালবাসার ভাণ, মাতলামির ঝঞ্ঝাট— এই সব করিতে শরীর মন একবারে অবসন্ন হইয়া পড়িত। ভাবিতাম—আর না, সকল বন্ধন ছিন্ন করিয়া ফেলি। হৃদয়ে দারুণ অনুতাপ উপস্থিত হইত। কিন্তু প্রলোভন কখনও জয় করিতে পারি নাই— বার বার ঘূর্ণিপাকে পরিয়াছি।

 ১৯২৪ সালের বর্ষাকালে তারকেশ্বরের সত্যাগ্রহ আরম্ভ হয়। বর্ত্তমান মোহান্ত সতীশ গিরির বিরুদ্ধে পূর্ব্বাবধি নানাবিধ অত্যাচারের অভিযোগ ছিল। তদনুসারে দেবোত্তর সম্পত্তির তত্ত্বাবধানের জন্য গভর্নমেন্ট রিসিবার নিযুক্ত করিয়াছিলেন। কিন্তু স্বামী সচ্চিদানন্দ ও বিশ্বানন্দের নেতৃত্বে মহাবীরদল রিসিবারের মন্দির প্রবেশ বাধা দেন। এদিকে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের নেতৃত্বে কংগ্রেসীদল প্রবেশধিকার দাবী করেন। তাঁহারা বলেন মোহান্তের কোন ব্যক্তিগত সম্পত্তি থাকিতে পারে না। এই প্রাসাদের মধ্যে যে মূর্ত্তি আছে, তাহা দর্শন ও পূজা করিবার অধিকার জনসাধারণের আছে। এই গোলযোগের মধ্যে মহাবীরদল, গভর্ণমেণ্ট, মোহান্ত, কংগ্রেস সকলে জড়াইয়া পড়িল। মারামারি লুটপাট প্রভৃতি তুমুল কাণ্ড চলিতে লাগিল।

 কলিকাতা হইতে আমরা প্রায় দশ বার জন পতিতা নারী তারকেশ্বরে যাত্রা করি। সেখানে যাইয়া দেখিলাম হুগলী, শ্রীরামপুর, নোনাডাঙ্গা, সেওড়াফুলি প্রভৃতি স্থান হইতে আরও বেশ্যা আসিয়াছে। আমরা সকলে মিলিয়া মহিলা-ভলাণ্টিয়ার দল গঠন করিলাম, সত্যাগ্রহ পরিচালনা করিবার জন্য আমরা কিছু টাকা চাঁদাও তুলিয়াছিলাম।

 মোহান্তের প্রাসাদের সম্মুখে সত্যাগ্রহ করিতে কংগ্রেসীদল আমাদিগকে দিলনা। মন্দির রক্ষা করাই আমাদের প্রধান কার্য্য হইল। স্বামী সচ্চিদানন্দকে পুলিশ গ্রেপ্তার করিতে আসিলে আমরা তাঁহার চারিদিকে ঘেরিয়া বসিলাম। পুলিশ বিফল মনোরথ হইয়া চলিয়া গেল। আমরা পালা করিয়া মন্দিরের দ্বারে প্রহরীর কার্য্য করিতে লাগিলাম।

 ডাক্তার প্রতাপ চন্দ্র গুহরায় ও শ্রীযুক্তা সন্তোষ কুমারী গুপ্তা ইঁহারাই তারকেশ্বরে সত্যাগ্রহের প্রধান পরিচালক ছিলেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন একদিন যাইয়া আমাদের সকলকে উৎসাহিত করিয়া আসেন। আমাদের সুখ ও স্বচ্ছন্দতার জন্য প্রচুর অর্থব্যয় হইয়াছে। সত্যাগ্রহ তহবিলে বহু সহস্র টাকা চাঁদা উঠিয়াছিল। যথাসময়ে তারকেশ্বর সমস্যার এক প্রকার মীমাংসা হয়। কিন্তু সত্যাগ্রহ আন্দোলনের সময় সেখানে যে বীভৎস ব্যাপার প্রত্যক্ষ করিয়াছি, তাহা আজও ভুলিতে পারি নাই। মহিলা ভলাণ্টিয়ার নামধারী বেশ্যাদের সহিত বিভিন্ন দলের ভলাণ্টিয়ার নামধারী অনেক ভণ্ড লম্পটের অবাধ কলুষিত সংযোগ— যাঁহারা দেশকর্ম্মী বলিয়া পরিচিত তাঁহাদের কাহারও রাত্রিযাপন সমস্যা— আমার নিকট কোন সত্যাগ্রহী ব্যক্তির প্রস্তাব— এই সব দেখিয়া মনে হইয়াছে, তারকেশ্বরে ধর্ম্ম প্রতিষ্ঠিত হয় নাই— তথায় পুণ্যের আলোক নিভিয়া গিয়াছে।

 সেখানে দেব-দর্শনার্থী সুকৃতি নাম্নী এক যুবতীর সহিত আমার পরিচয় হয়। সাবিত্রী নামে সুকৃতির এক ভগ্নী ছিল। ইহারা কলিকাতা জোড়াসাঁকো পল্লীর বিখ্যাত উচ্চ বংশের কন্যা। লোকে বলে এই বংশে লক্ষ্মী সরস্বতীর বিবাদ নাই। সুকৃতি ও সাবিত্রী উভয়েই পতিতাবৃত্তি অবলম্বন করিয়া শােভাবাজারে বাস করে। গভর্ণমেন্টের একজন উকীল সুকৃতির ঘরে যাতায়াত করিয়া থাকেন। কিছুকাল পূর্ব্বে সাবিত্রীর মৃত্যু হইয়াছে। একজন বড় দেশকর্ম্মী তাহার কাছে যাইত। যে সকল পরিবার বাংলার গৌরব, তাহাদেরও আজ এ কি অধঃপতন! ইহার নিকট বাংলার বহু বিখ্যাত ব্যক্তির যে ইতিহাস শুনিয়াছি, তাহা লিখিলে হয়ত আইনের দায়ে পড়িতে হবে— এজন্য লিখিলাম না। এই পরিবারই অবাধ মেলামেশার পথ প্রদর্শক।

 উপেন বাবুর নিকট শুনিয়াছি, নন্দদার সংযম অটুট রহিয়াছে। কোন নারী তাহার সম্মুখে প্রলােভন লইয়া আসিতে পারে নাই। অসহযোগ আন্দোলনের ভাল দিক্‌টা তাহার পূর্ব্ব গঠিত চরিত্রকে আরও সুদৃঢ় করিয়া তুলিয়াছে। বিলাস শূন্যতা ও সৎকার্য্যে আসক্তি এই দুইটী তাহার ব্রহ্মচর্যোর প্রধান সহায়। আমার মত সাহিত্য চর্চ্চা না করা নন্দদার পক্ষে মঙ্গলজনক হইয়াছে। দারিদ্র্য তাহার বন্ধুর কার্য্য করিয়াছে। এমন নির্ম্মল চরিত্রের কর্ম্মীও আছে, কিন্তু তাহাদের সংখ্যা অল্প।

 আমার সম্বন্ধে নন্দদাদা নাকি এই কথা বলিত “মানদা যদি তার পাপজীবনের সমস্ত ঐশ্বর্য্য ছেড়ে এক বস্ত্রে আমার কাছে আসে, আমি তা'কে আদরের সহিত মাথার মণি করে রাখব—বােন বলে তেমনি স্নেহ ক'রব। কিন্তু সে পতিতাপল্লীতে পতিতাবৃত্তিতে থাকিলে আমি তাহার সঙ্গে কোন সম্বন্ধ রাখ্তে পারি না।”

 আমি কখনও সিগারেট অথবা মদ খাই নাই। পতিতা নারীদের এই অভ্যাস অর্থোপার্জনের অনুকূল নহে। আমার বাবুগুলি আমাকে এই নেশা দুইটা ধরাইবার জন্য চেষ্টা করিয়াছিছেন কিন্তু কেহই সফলকাম হন নাই। উপেন বাবু মদ্যপান নিবারণের জন্য বেশ্যাদের গৃহে পিকেটিং অনেকদিন চালাইয়াছেন। আমি যথাসাধ্য তাঁহার সাহায্য করিয়াছি।

 পূজার ছুটী, বড়দিনের অবকাশ প্রভৃতি উপলক্ষে মফস্বলের উকীল ও আফিসের কর্ম্মচারীগণ কলিকাতায় আসিয়া থাকেন। তখন আমাদের গৃহে তাঁহাদেরে অনেকের শুভাগমন হয়। যাঁহারা জমিদার ও ব্যবসায়ী তাঁহারা অন্য সময়েও আসিতে পারেন। অনেকে মফঃস্বল হইতে এখানে তাঁহাদের রক্ষিতাদিগকে মাস মাসে টাকা পাঠাইয়া থাকেন। নােয়াখালির এক রায়-বাহাদুর, বর্দ্ধমানের এক জমিদার, ঢাকার এক বড় ঔষধ ব্যবসায়ী, রংপুরের এক উকীল ইহাদের নিকট হইতে আমি মাসিক কিছু টাকা পাইতাম। চীৎপুরে বিশিষ্ট সােণার লেণের মেয়ে প্রভা নামে আমার এক বন্ধু আছে। ময়মনসিংহের এক উকীল তাহার বাবু, ঢাকার সেই ব্যবসায়ীর সহিত ইহার নাকি পরিচয় ছিল। সেই সূত্রে ঢাকার লোকটা আমার ঘরে আসিত। প্রভার বাড়ীতে কলিকাতার এক ব্যারিষ্টারে কুমারী কন্যাও আছেন। এইরূপে নিত্য নূতন লােক লইয়া সােনাগাছিতে আমার দিন কাটিতে লাগিল। বিশিষ্ট ঘরের পতিতা মেয়েদের সঙ্গে আমি একটু বেশী মেলামেশা করিতাম। এই ব্যারিষ্টার কন্যার মত নির্ভিক পতিতা আমি কম দেখিয়াছি।

 এই সময়ে একটি শােচনীয় দুর্ঘটনা আমার প্রত্যক্ষ হইল। আমি এস্থলে তাহার বর্ণণা করিতেছি। তাহাতে বুঝা যাইবে, কি ঘােরতর পাপ সমাজের মধ্য প্রবেশ করিয়াছে। ইহার প্রতিকার কিরূপে হইতে পারে তাহাও সমাজপতিদের ভাবিয়া দেখা কর্ত্তব্য।

 কলিকাতার মধ্যভাগে বাদুড়বাগান পল্লীর নিকট এক জমিদার বাস করে। তাহার পূর্ব্বপুরুষ নাকি সুপরিচিত বিখ্যাত ব্যক্তি। সেই জমিদার অতিশয় দুশ্চরিত্র। প্রতিবেশী গৃহস্থদের কুলবধূর উপর তাঁহার কুদৃষ্টি। তাঁহার দুষ্কার্যের সহায় কতকগুলি বন্ধু ও অনুচর আছে। ইহারা নানা কৌশলে গৃহস্থের কুলবধূদিগকে প্রলুব্ধ করিয়া প্রভুর কাম-লালসা তৃপ্তির জন্য লইয়া আসে। কখনও কলিকাতার প্রাসাদে, কখনও বা নিকটবর্ত্তী বাগান বাড়ীতে এই সকল পাপলীলার অনুষ্ঠান হয়।

 গৃহস্থের কুলবধূর কেহ প্রলােভনে স্বেচ্ছায় কেহ বা অনিচ্ছায় বাধ্য হইয়া আসিয়া থাকে। তাহারা অনেকেই গান জানে না, মদ্য পান ও করে না। এই প্রকার আমােদের জন্য সােনাগাছী অথবা রামবাগান হইতে পতিতা নারীদিগকে নেওয়া হইত। আমি এই জমিদারের বাগান বাড়ীতে দুই একবার গিয়াছিলাম। প্রতিরাত্রিতে এক শত টাকা লইতাম—গান গাওয়াই আমার কার্য্য ছিল। আমি মদ খাইতাম না। আরও দুই তিনটী বেশ্যা যাইত। তাহারাই মদ্য পানের আমােদে যােগ দিত।

 একরাত্রিতে জমিদারের বাগান বাড়ীতে আমার যাইবার ডাক পড়িল। আমি আমার পাওনা টাকাকড়ি অগ্রিম লইয়া রাত্রি আটটার সময় তথায় যাই। দেখিলাম, একটা সুন্দরী যুবতী কুলবধূকে আনয়ন করা হইয়াছে। তাহার বয়স ১৮/১৯ এইরূপ হইবে। গায়ের রং যেন কাঁচা সােণা—মুখখানি কোমল, লাবণ্য-মাখা; আমার প্রাণে বড় ব্যথা বাজিল। এই দুর্বৃত্ত জমিদারের পাপ প্রবৃত্তির কবলে কত সতীর বলিদান দেখিয়াছি। আমরাও এই পাপের ভাগী। সে রাত্রিতে গানে আমার মন লাগিল না। আমি এই বধূটির সহিত কথাবার্ত্তার সুযোগ খুঁজিতে লাগিলাম।

 আমোদ-প্রমোদ আরম্ভ হইল। জমিরার ও তাঁহার বন্ধুগণ মদ্যপান করিতে লাগিলেন। আমি দুই একটি গান গাহিলাম। অন্যান্য বেশ্যারাও তারপর নাচিতে গাহিতে আরম্ভ করিল। আমি গরমের অছিলায় বাহিরে আসিবার সময় সেই বন্ধুটিকে আস্তে আস্তে বলিলাম “চল, একবার বাগানে বেড়াইয়া আসি।” আমরা উভরে পুকুরের ঘাটে একটি বেদীর উপরে বসিলাম। তাহার সহিত আমার অনেক কথা হইল। তাহার সার মর্ম্ম এই— বধূটির নাম অপরাজিতা দেবী। সে ব্রাহ্মণ কন্যা। বর্দ্ধমান জেলার কোন গ্রামে তাহার পিত্রালয়। কলিকাতার কোন মুখোপাধ্যায় যুবকের সহিত নাকি বিবাহ হইয়াছে। তাহার স্বামী পিসিমার কাছে থাকেন। এই পিসিমায়েরা কয়েক ভগ্নি, নিজ নিজ বাড়ীতে বাস করেন। তাহার স্বামীর পিতামাতা বা অপর কোন আত্মীয় স্বজন বোধ হয় নাই। তিনি অতি নিরীহ ও শান্ত স্বভাব। সর্ব্বদা পিসিমার মন যোগাইয়া চলেন। পিসিমার মৃত্যুর পর বাড়ী ও নগদ টাকা নাকি পাইবেন, ইহা তাঁহার আশা ছিল।

 অপরাজিতার পিসশাশুড়ী নাকি বিধবা অবস্থায়........ অর্থ উআর্জ্জন করিয়াছেন, এইরকম দুর্ণাম আছে। এক্ষণে বর্দ্ধক্যে নিজে অশক্ত হওয়ায় ভ্রাতুষ্পুত্রের বধুদের সতীত্বের বিনিময়ে অর্থ উপার্জ্জন করেন। অপরাজিতার স্বামীর পুর্ব্বে আরও দুইবার বিবাহ হইয়াছিল। পর পর সেই দুইটি বধুর অগ্নিদাহে মৃত্যু হয়। পিসশাশুড়ী প্রকাশ করেন যে, বধূরা নিজের দেহে আগুণ লাগাইয়া আত্মহত্যা করিয়াছে। অপরাজিতা তাহার স্বামীর তৃতীয় পক্ষের স্ত্রী— তাহার একটি শিশুপুত্র আছে।

 অপরাজিতাকেও তাহার পিসশাশুড়ী পাপ পথে অর্থ উপার্জ্জন করিতে নিযুক্ত করেন, অপরাজিতা তাহাতে সম্মত নহে। ইহাতে পিসশাশুড়ী তাহার উপর দিনরাত্রি উৎপীড়ন করিতেন! এক দুষ্ট ডাক্তার পিসশাশুড়ীর প্রধান মন্ত্রণাদাতা ও দুষ্কার্য্যের সহায় ছিল। অপরাজিতা এতদিন তাহার সতীত্ব রক্ষা করিয়া আসিয়াছে।

 আমি অপরাজিতাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “তুমি এখন কি করবে?—তুমিও কি আত্মহত্যা করতে চাও?” অপরাজিতা বলিল, “আত্মহত্যা করব কেন? — আমার বাবা আছেন— ভাই আছেন— আমার ছেলে আছে— আমি আত্মহত্যা করব না। তবে ঐ লম্পটের হাতে আমি সতীত্ব কিছুতেই দিব না, আমার প্রাণ যায়, তাও স্বীকার।” আমি এই কিশোরী বধূর দৃঢ়প্রতিজ্ঞা ও অপূর্ব্ব আত্ম-সংযম দেখিয়া বিস্ময়ে স্তম্ভিত হইলাম। এই বালিকা কোন শিক্ষা পায় নাই— লেখাপড়া জানে না, সাহিত্য-চর্চ্চা করে নাই, অথচ ইহার মধ্যে এমন তেজ ও শক্তি কোথা হইতে আসিল?

 আমি বলিলাম “তুমি যদি ইহাদের কুপ্রস্তাবে সম্মত না হও, তবে কি হবে তা জান?” অপরাজিতা বলিল, “হাঁ জানি। এরা আমাকে মেরে ফেলবে। আমার পিসশাশুড়ী আমার ঐ দুই সতীনকেও মেরে ফেলেছেন, তারপর লোকের কাছে বলেছেন যে, উহারা কাপড়ে কেরোসিন তেল দিয়ে আগুন লাগিয়ে মরেছে। কিন্তু মানুষ এত বোকা নয় যে, সে কথা আর বিশ্বাস করবে; পর পর দুইটী বৌ একই রকমে মারা যায়। আজ সারাদিন পিশাশুড়ীর সহিত আমার ঝগড়া হয়েছে। আমি বলেছিলাম যে, আমি সমস্ত কথা প্রকাশ করে দিব। শাশুড়ী আমাকে বলেন তাহ’লে তোর গলায় পা দিয়ে একেবারে তোর জীবন শেষ করব! “আমিও সেই থেকে প্রতিজ্ঞা করেছি, এরা জীবিত অবস্থায় যেন আমার অঙ্গ স্পর্শ করতে না পারে।”

 অপরাজিতার কথা শুনিতে শুনিতে আমার মাথা লজ্জায় নুইয়া পড়িল। ভাবিলাম, অপরাজিতা কোন স্বর্গের দেবী— আর আমি কোন নরকের কীট! হিন্দু সমাজে কেবল আমার মত কলঙ্কিনীই জন্মগ্রহণ করে না, অপরাজিতার মত সতীও জন্মগ্রহণ করেন। আমার দেহের দূষিত বাতাসে অপরাজিতার পবিত্রতা নষ্ট হইয়া যাইবে— এই ভাবিয়া তাহার সহিত আর অধিকক্ষণ কথা কহিলাম না। দেখিলাম, তাহার পিশাশুড়ী ও আর একজন লোক (অপরাজিতা বলিল, লোকটী নাকি...... ডাক্তার) সেইদিকে আসিতেছেন। আমি অপরাজিতার পায়ের ধূলা নিয়ে তাহাকে প্রণাম করিলাম। সে অগ্রসর হইয়া গেল— আমি একটা লতাকুঞ্জের অন্তরালে দাঁড়াইলাম!

 সে রাত্রিতে আমি আর অমোদ প্রমোদে যোগ দিলাম না। শরীর অসুস্থ বলিয়া শীঘ্র চলিয়া আসিলাম। দুঃস্বপ্নে ভাল ঘুম হইল না। দুইদিন পরে খবরের কাগজে পড়িলাম, অপরাজিতার মৃত্যু হইয়াছে। তাহার পিসশাশুড়ী পুলিশের নিকট জানাইয়াছেন, সকালবেলা উনুনে আঁচ ধরাইবার সময় অসাবধানে কাপড়ে আগুন লাগিয়া অপরাজিতার মৃত্যু ঘটে। শবদেহের ডাক্তারী পরীক্ষায়, পুলিশ তদন্তে ও করোণারের বিচারে প্রকৃত রহস্য প্রকাশিত হইল না। এই ঘটনার পর প্রায় সপ্তাহ কাল পর্যন্ত আমি নিতান্ত মানসিক উদ্বেগ ও অশান্তিতে কাটাইয়াছি। এখনও অপরাজিতার মুখখানি আমার মনে আছে।

 এদেশের ঘরে ঘরে এমন কত শোচনীয় দুর্ঘটনা হইতেছে, সে সংবাদ কি সমাজের কর্ত্তারা রাখিয়া থাকেন?— সতী-শিরোমণি বালিকাবধূর অভিশাপে সমাজ রসাতলে যাইতেছে। দুর্বৃত্ত লম্পটেরা অর্থের বলে মান মর্য্যাদা আদায় করিয়া সমাজের মধ্যে নির্ভয়ে বুক ফুলাইয়া বেড়ায়।

 কালীদাসী একদিন আমার বাড়ীতে আসিল; তাঁহার চেহারা দেখিয়া বুঝিলাম, সে অতিশয় দুরবস্থায় পড়িয়াছে। তাহার মুখে শুনিলাম, রেস্ (ঘোড়-দৌড়ের জুয়াখেলা) খেলিয়া এবং মদ খাইয়া তাহার সেই ভাটিয়া বাবু সর্বস্বান্ত হইয়াছে। তাহার কারবার উঠিয়া গিয়াছে। কালীদাসী এখন এক মাড়োয়ারীর কাছে বাঁধা। কিন্তু হাতে টাকাকড়ি নাই। আমার কাছে গহনা বন্ধক রাখিয়া পাঁচশত টাকা কর্জ্জ চায়।

 যাহারা পতিতালয়ে যাতায়াত করে, তাহাদের মধ্যে অধিকাংশ লোকের দুইটী প্রধান নেশা জন্মে— ঘোড়দৌড়ের জুয়াখেল এবং মদ্যপান। রেস্ খেলিয়া অনেকে হাজার হাজার টাকা পায়— এইরূপ শুনা যায়— কিন্তু তাহা থাকে না; পথে উৎপত্তি, সেই পথেই নিষ্পত্তি। রেসের দিন বেশ্যা পল্লীতে খুব ভিড়। যে খেলায় জিতিয়া কিছু লাভ করিয়াছে, সে যেমন আমোদ করিতে সেখানে যায় যে হারিয়া সমস্ত খোয়াইয়াছে সেও তেমন দুঃখ ভুলিতে সেখানে ছুটিয়া যায়।

 আমার হাতে টাকা ছিল না। ঊষাবালা নামে একটি স্ত্রীলোক আমাদের বাড়ীতে নূতন আসিয়াছিল, তাহার কাছে কিছু নগদ টাকা আছে জানিতাম। কালীদাসী যে গহনা আনিয়াছিল, তাহার মূল্য প্রায় এক হাজার টাকা। সুতরাং আমার কথায় সম্মত হইয়া ঊষাবলা ঐ গহনা বন্ধক রাখিয়া কালীদাসীকে পাঁচ শত টাকা দিল।

 আমি পরে জানিয়াছি, কালীদাসী রেস্ খেলিয়া ও মদ খাইয়া সে টাকাও উড়াইয়াছে। ভাটিয়া বাবুর সংসর্গে কালীদাসীকে রেস ও মদের নেশায় পাইয়াছিল। এই পথেই সে উচ্ছন্ন গিয়াছে। আমি আরও জানিলাম, এই নূতন মাড়োয়ারী যুবকটীর সহিত কালীদাসার পূর্ব্ব হইতেই গুপ্ত-প্রণয় ছিল। এইসব দেখিয়া শুনিয়া তাহার প্রতি আমার আর বিন্দুমাত্র সহানুভুতি রহিল না। ঊষাবালার ঋণ সে পরিশোধ করিতে পারে নাই।

 কালীদাসী এখনও বাঁচিয়া আছে। সে আমারই মত তাহার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিতেছে। কিছুদিন পূর্ব্বে তাহাকে কলিকাতার কোন অপরিচ্ছন্ন বস্ত্রীতে এক বিড়ীওয়ালা মুসলমান যুবকের সহিত যেভাবে ইয়ারকি করিতে দেখিলাম— তাঁহাতে বুঝিতে পারিয়াছি; পতিতাদের শীঘ্র মরণ হয় কেন। সেই ২৬ বৎসরের যুবতীর দেহ ৬০ বৎসরের বৃদ্ধের মত ক্ষীণ শুষ্ক, অস্তি-চর্ম্মসার; মদ্যপানের ফলে নানারোগের আক্রমণ, পরণে একখানা কাপড়ই যথাসর্ব্বস্ব— দুইবেলা আহার জুটে না— তার উপর অত্যাচার! আমি কালীদাসীর সহিত কথা কহিলাম না। মোহান্তজীর উপদেশ আমার মনে হইল— “দৈবকে অতিক্রম করিবার শক্তি কাহারও নাই। কর্ম্মফলই দৈব।”

 ঊষাবালার কথা এইখানেই বলিব। সে ফরিদপুরের কোন ব্রাহ্মণ উকিলের পরিণীতা স্ত্রী, পিত্রালয় হইতে কয়েকজন ধনী মুসলমান তাহাকে অপহরণ করিয়া কলিকাতার নিকটবর্ত্তী বেলিয়াঘাটায় রাখে। নারী-রক্ষা-সমিতির কর্ম্মী শ্রীযুক্ত মহেশচন্দ্র আতর্থী মহাশয় সংবাদ পাইয়া তাঁহার কর্ম্মীদের দ্বারা ও পুলিশের সাহায্যে ঊষাবালাকে উদ্ধার করেন। এইজন্য পুলিশ-আদালতে মামলা চলিতে থাকে। তাহার স্বামী তাহাকে স্ত্রী বলিয়া অস্বীকার করেন। ঊষাবালা কিছুদিন সঞ্জীবনী সম্পাদক, নারীরক্ষা সমিতির পরিচালক শ্রীযুক্ত কৃষ্ণকুমার মিত্র মহাশয়ের বাড়ীতে অবস্থান করে। এই উষাবালার কথাই আমি পূর্ব্বে একবার উল্লেখ করিয়াছি। সে আমার নিকট বলিয়াছে “কৃষ্ণকুমার মিত্র মহাশয় আমাকে নিজ কন্যার মত দেখতেন। তিনি আমাকে লেখাপড়া শিখাইবার ব্যবস্থা করলেন; শিল্প কাজ শিখবার জন্য এক স্কুলে ভর্ত্তী করে দিলেন। কিন্তু আমি কিছুতেই মনস্থির করতে পারলাম না। দুপ্রবৃত্তি দমন করা আমার পক্ষে অসাধ্য হয়ে উঠল। আমার বয়স আঠার বৎসরের বেশী— সুতরাং তাঁরা আমাকে আর জোর করে রাখতে পরেন না। নানা অবস্থার পাক চক্রে ঘুরে আমি এই পথে এসেছি। কিছু দিন আমাকে রাস্তায় বসে পান বিক্রীও করতে হ’য়েছিল।

 নারী-নিগ্রহের বিশেষ উপদ্রব আরম্ভ হইলে আমি একজন ভদ্রলোককে প্রায়ই বেশ্যাদের ঘরে আসিতে দেখিতাম, তিনি আমাদের নিকট তারকবাবু নামে পরিচিত, পতিতাদের মধ্যে চারি পাঁচজন তাঁহার বিশ্বাসভাজন ছিল, আমাকেও তিনি বিশ্বাস করিতেন। আমরা ইহা বিশেষরূপ লক্ষ্য করিয়াছি, তিনি কোন কুমতলবে বেশ্যালয়ে আসেন না। তিনি নারীরক্ষা সমিতির কর্ম্মী— না পুলিশের গোয়েন্দা, তাহা জানি না; কিন্তু আমাকে তিনি বলিয়াছেন, অজিকাল অনেক দুর্ব্বৃত্ত গৃহস্থ ঘরের মেয়ে বৌকে চুরি করিয়া বেশ্যা গৃহে লুকাইয়া রাখে— কোন স্ত্রীলোক কলঙ্কের ভয়ে বাধ্য হইয়া প্রণয়ীয় সহিত স্বেচ্ছায় পতিতালয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে— এই সব সন্ধান লইবার জন্যই তিনি গোপনে বেশ্যাদের নিকট যাতায়াত করিয়া থাকেন, আমরা তাঁহার কার্য্যে যথাসাধ্য সাহায্য করিতাম।

 একদিন তারকবাবু আমাকে বলিলেন, “তোমাদের সম্মুখের সমস্ত বাড়ীটা ভাড়া নিয়ে যে নূতন মেয়েটী রয়েছে, তা’র সম্বন্ধে একটু বিশেষ খোঁজ করে দেখবে; আমার প্রয়োজন আছে।” আমি তার পরদিন হইতে সেই বাড়ীতে যাতায়াত করিতে লাগিলাম। অল্পদিনের মধ্যেই মেয়েটার সহিত আমার ভাব হইল। তার ভিতরের কথা অনেকটা জানিলাম।

 কয়েকদিন পর তারকবাবু আসিলে আমি বলিলাম, “মেয়েটি ব্রাহ্মণ বংশীয়া— নাম সুরুচিবালা, তাহার পিতা একজন অবসরপ্রাপ্ত ইঞ্জিনীয়ার, এখন কাশীতে আছেন, হুগলী জেলার কোন ব্রাহ্মণ যুবকের সহিত সুরুচির বিবাহ হয়। সুরুচি বলে যে, তাহার, স্বামী আর এক বিবাহ করিয়াছিল। সুরুচির স্বামীগৃহে স্থান হয় নাই। সে কাশীতে পিতার নিকট থাকিত। বাল্যকাল হইতে উপন্যাস নাটক নভেল পড়ায় তাহার খুব ঝোঁক ছিল। ক্রমশঃ সে উচ্ছৃঙ্খল প্রকৃতির হইয়া উঠে। পিতামাতার শাসন সে মানিত না, কাশীতে দুষ্ট লোক অনেক আছে, সুরুচি কোন দুর্বৃত্তের সহিত পলায়ন করিয়া কলিকাতায় আসে! এখানে অনেকের হাতে পড়িয়া সে কলুষিত হয়। পুলিশ তাহাকে আপত্তিজনক অবস্থায় পাইয়া গ্রেপ্তার করে, পুলিশ আদালতে তাহাকে নেওয়া হইলে বিচারক বিষম সঙ্কটে পড়িলেন, নারীরক্ষাসমিতির অক্লান্ত কর্ম্মী ও সম্পাদক শ্রীযুক্ত মহেশচন্দ্র আতর্থী মহাশয় সেদিন অন্য কোন কার্য্য উপলক্ষ্যে আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তাঁহাকে বিচারক চিনিতেন। তিনি মহেশবাবুকে বলিলেন “আপনি এই মেয়েটিকে নিয়ে যান, নারীরক্ষা সমিতি হইতে ইহার যথোচিত ব্যবস্থা করুন।”

 সুরুচি কৃষ্ণকুমার মিত্র মহাশয়ের ঘরে আশ্রয় পাইল, তিনি পিতৃস্নেহে ইহাকে সৎপথে আনিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন, কিন্তু সুরুচি এই সরল-প্রাণ, উদার হৃদয়, মহানুভব ব্যক্তিকে প্রতারণা করিয়া চলিয়া আসিল, দুষ্ট লোকের প্রলোভনে পড়িয়া সে পাশের পথই বাছিয়া লইল। এক্ষণে এক ধনী পার্শী যুবক তাহাকে বাঁধা রাখিয়াছে, মেম-সাহেবদের ষ্টাইলে সে থাকে— ঘাড়ের উপর পর্য্যন্ত ছোট করিয়া চুল ছাঁটা— হাঁটু পর্যন্ত স্কার্ট, খোলা হাতের রংএর সহিত মানন-সই সিল্কের মোজা,— পরিষ্কার হিন্দী বলে; ইংরাজীও কিছু শিখেছে।”

 তাঁরকবাবু সমস্ত মনোযোগের সহিত শুনিয়া বলিলেন, “সে কৃষ্ণবাবুর বাড়ী হইতে পলাইল কেন, তাহা বুঝি জান না। আমি বলিলাম—না—সে কথাত সুরুচি কিছু বলে নাই। তারকাবু বলিলেন,”সে কৃষ্ণবাবুর জামাতা শচীনবাবুর একটী সোনার ঘড়ী সরাইয়াছিল, এজন্য মহেশবাবু তাহাকে পুনরায় আদালতে দিয়া আসেন। তথায় সে বেশ্যাবৃত্ত করিবার অনুমতি চায়, বিচারক অগত্যা তাহাকে তথাস্তু বলিয়া ছাড়িয়া দেন।”

 আমাদের এ রূপ কথাবার্ত্তা হইতেছিল এমন সময় সুরুচি হাসিতে হাসিতে আমার ঘরে আসিয়া প্রবেশ করিল, তাহার হাতে নানাবিধ ফুল, ফল, কেক্, বিস্কুট, প্রভৃতি রহিয়াছে। আমি তাহাকে বসিতে বলিলাম, সে দাঁড়াইয়াই বলিতে লাগিল “মানদি, আজ মোটরে চড়ে হগ্‌সাহেবের বাজারে গিয়েছিলুম, এই সব কিনে এনেছি, কাল সকালে আমাদের বাড়ীতে তোমার চাঁ-এর নিয়ন্ত্রণ, যেও। ভাল কথা, আজ সেই বুড়ো মহেশ আতর্থীর সঙ্গে দেখ হ’ল, আমি বল্লুম, কি বুড়ো কেমন আছ?

 তারকবাবু হুরুচির সম্বন্ধে কি করিয়াছিলেন জানি না, আমি সুরুচি ঊষার কথা ভাবিয়া দেখিলাম ইহারা আমারই মত হতভাগিনী। যৌবনের প্রারম্ভে প্রলোভনের বশীভূত হইয়া সংযমের বাঁধ একবার ভাঙ্গিয়া গিয়াছে, আর ত অকুল সমুদ্রে ফুল পাইতেছে না। ইহারাও আমার মত সৎপথে আসিবার সুযোগ পাইয়াছিল; কিন্তু আমারই মত ইহাদের অদৃষ্টেও বোধ হয় আরও দুঃখ ভোগ আছে তাই অনিবার্য্য কর্ম্মফল কেহ খণ্ডাইতে পারিল না।