শিক্ষিতা পতিতার আত্মচরিত/বাল্যে

শিক্ষিতা

পতিতার আত্মচরিত

প্রথম

বাল্যে

 ১৩০৭ সালের ১৮ই আষাঢ় তারিখে আমি জন্ম গ্রহণ করি। আমার পিতা কলিকাতার এক সম্ভ্রান্তবংশীয় ব্রাহ্মণ। আমি তাঁহার প্রথম সন্তান। পিতার নাম ও পরিচয় প্রকাশ করিতে আমি অক্ষম। তিনি, তাঁহার জ্ঞাতি কুটুম্ব, সন্তান-সন্ততি এবং সম্পর্কিত ব্যক্তিগণ অনেকেই এক্ষণে জীবিত রহিয়াছেন। সমাজে তাঁহাদের মান মর্য্যাদা কম নহে। আমার এই আত্মচরিত হয়ত তাঁহাদের হাতে পড়িতে পারে। আমি তাঁহাদিগকে বিব্রত করিতে চাহি না।

 আমার পিতামহ একজন সঙ্গতিপন্ন গৃহস্থ ছিলেন। কলিকাতাতে তাঁহার চারিখানা বাড়ী এবং নগরের উপকণ্ঠে একখানা বাগান বাড়ী ছিল। তিনি বৃদ্ধ বয়সে রাজকার্য্য হইতে অবসর গ্রহণ করেন। আমার পিতা হাইকোর্টের উকীল ছিলেন। অল্পদিনের মধ্যেই তাঁহার পসার বেশ জমিয়া উঠে, বাহিরেও তিনি মাঝে মাঝে যাইতেন।

 আইন কলেজে পড়িবার সময় আমার পিতার বিবাহ হইয়াছিল। তখন আমার পিতামহ জীবিত। আমার মাতুল পরিবারও কলিকাতায় বাস করিতেন। তাঁহারা বিশেষ অর্থশালী ছিলেন না—কিন্তু বংশ মর্য্যাদায় উচ্চ এবং রূপে অতুলনীয় সুন্দরী বলিয়া আমার মাতাকে পুত্র-বধু করিবার জন্য পিতামহ বিশেষ আগ্রহান্বিত হইয়াছিলেন। আমার জন্মের দুই বৎসর পর আমার পিতামহের মৃত্যু হয়।—ঠাকুরদাদার কোলের সুখলাভ যে আমার ভাগ্যে ঘটিয়াছিল—কেবল মাত্র কল্পনাতেই সেই স্মৃতি জাগিয়া আছে।

 কন্যা বলিয়া আমি শিশুকালে অনাদৃত হই নাই। পিতার বন্ধুগণ কেহ কেহ বলিলেন, “প্রথম কন্যাসন্তান, সৌভাগ্যের লক্ষণ”। কথাটা হাস্য পরিহাসের সহিত বলা হইলেও, তাহার মধ্যে সত্য রহিয়াছে বোধ হইল। আমার জন্মের কয়েক মাস পূর্ব্বে পিতা আইন ব্যবসায় আরম্ভ করিয়াছিলেন। দিন দিন তাহার উন্নতি দেখা গেল। কিছুকাল মধ্যেই আমার পিতা কোন সুযোগে বার্ষিক দশ হাজার টাকা আয়ের একটা ছোট জমিদারী নীলামে ক্রয় করিলেন।

 শৈশব অবস্থায় আমার শরীর রুগ্ন ছিল। মা আমাকে লইয়া সর্ব্বদাই বিব্রত থাকিতেন। পিতামহ আমার স্বাস্থ্যের জন্য প্রচুর অর্থব্যয় করিয়াছিলেন। মৃত্যুশয্যায় তিনি নাকি আমার দিকে চাহিতে চাহিতে চক্ষু মুদিয়াছিলেন। আজ মনে হয়, সেই ঋষিতুল্য বৃদ্ধ বুঝি তাহার শেষ নিশ্বাস আমার প্রাণের মধ্যে রাখিয়া গিয়াছেন, তাই আমি মরিতে মরিতেও বার বার বাঁচিয়া উঠিতেছি।

 আমার যখন তিন বৎসর বয়স, তখন একবার কঠিন জ্বরে আক্রান্ত হইয়াছিলাম। কলিকাতার বড় বড় ডাক্তার কবিরাজ আমার জীবনের আশা ছাড়িয়া দিয়াছিলেন। আমার সমস্ত ইন্দ্রিয়শক্তি লুপ্ত হইয়াছিল। মহামহোপাধ্যায় স্বর্গীয় দ্বারকা নাথ সেন আমার চিকিৎসায় বিশেষ নৈপুণ্য দেখাইয়া ছিলেন।

 মা নিত্য শিবপূজা করিতেন। একদিন দুশ্চিন্তার উদ্বেগে নিতান্ত কাতর চিত্তে তিনি পূজার ঘরে অচেতন হইয়া পড়েন। জ্ঞান সঞ্চার হইলে মা বলিলেন, “খুকুমণি সেরে উঠ্‌বে, আর কোন ভয় নেই।” তিনি অন্তরে অন্তরে তাহার অভীষ্ট দেবের নিকট হইতে কোন আশ্বাস পাইয়াছিলেন কিনা কে জানে, তার পর হইতে বাস্তবিক আমার দেহ একপ্রকার ঔষধাদি ব্যতীতই নীরোগ হইতে লাগিল। চারি মাসের মধ্যে আমি সম্পূর্ণ সুস্থ হইলাম।

 একটা প্রতিক্রিয়া দেখা দিল। মেঘমুক্ত চন্দ্রের মত আমার দেহকান্তি দিন দিন বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। আমার পরিপুষ্ট অবয়ব—উজ্জ্বল মুখ-শ্রী—দীর্ঘ নিবির কুন্তলশোভা―আনন্দোৎফুল্ল চলন ভঙ্গী দেখিয়া আত্মীয় স্বজন ও প্রতিবেশীগণ সকলেই আশ্চর্য্যান্বিত হইল। আমি পূর্ব্বে ধীর ও শান্তপ্রকৃতি ছিলাম; কিন্তু এই রোগ ভোগের পর আমি কিছু চঞ্চল স্বভাব হইয়া উঠিলাম। বিস্কুট লজেঞ্জুস কিনিবার জন্য মায়ের নিকট হইতে পয়সা লইয়া বড় রাস্তার উপরে মনোহারী দোকানে ছুটিয়া যাইতাম―ঘুড়ী ধরিবার জন্য আমাদের বাড়ীর প্রশস্ত ছাদে দৌড়াদৌড়ি করিতাম―অবশ্য পড়িয়া যাইবার আশঙ্কা ছিল না। ঝির সঙ্গে কখনও কখনও তাহাদের বাড়ীতে চলিয়া যাইতাম। চাকরেরা আমার দুষ্টামীতে অতিষ্ঠ হইয়া উঠিত। বাবার বৈঠকখানা ঘরে যাইয়া আমি গোলযোগ আরম্ভ করিতাম। বাড়ীতে আর ছোট ছেলে মেয়ে কেহই ছিল না। একমাত্র আমার চীৎকার ও হাস্য কলরবে এত বড় বাড়ীখানি সর্বদা মুখরিত থাকিত। বাবার নিকট আমার ছেলে বেলার এই সকল কথা শুনিয়া আমি সঙ্কুচিত হইতাম।

 স্নান করা আমার অতি আনন্দের বিষয় ছিল। মায়ের অনুরোধে বাবা আমার জন্য বাড়ীর উঠানে একটা বৃহৎ চৌবাচ্চা তৈয়ারী করাইয়াছিলেন। তার মধ্যস্থলে সুন্দর ফোয়ারায় জল উঠিত। ছয় সাত বৎসর বয়সে আমি সাঁতার শিখিয়াছিলাম। স্নান করিবার সময় আমার সমবয়সী প্রতিবেশী ছেলে মেয়েদের ডাকিয়া আনিতাম। আমরা সকলে চেঁচামেচি হুটোপাটি করিয়া সেই বৃহৎ চৌবাচ্চার জলে হাঁসের মত ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেলায় মত্ত থাকিতাম। মা আমাকে অত্যন্ত আদর করিতেন, সেই জন্য বাবা আর কিছু বলিতেন না।

 আমার আর একটী অভ্যাস ছিল—প্রত্যহ বৈকালে বেড়াইতে বাহির হওয়া চাই। যে দিন বাবা বাহিরে যাইতেন না, সেদিন আমি মায়ের সঙ্গে মোটরে চড়িয়া যাইতাম। আমার এক মামাত ভাই আমাদের বাড়ীতে থাকিয়া স্কুলে পড়িত। তাহার নাম ছিল নন্দলাল, তাহাকে আমি নন্দ দাদা বলিয়া ডাকিতাম। তাহার সঙ্গে কখনও কখনও হাঁটিয়া বেড়াইতে যাইতাম। রাস্তার দুইধারে সুন্দর সুন্দর সাজান দোকানপাট, ট্রামগাড়ী, আলোকমালা, অসংখ্য লোক চলাচল, সেসব দেখিয়া আমার মনে কি আনন্দ হইত! আলিপুরের চিড়িয়াখানা, চৌরঙ্গীর যাদুঘর, হাবড়ার পুল, পরেশনাথের বাগান, কালীঘাটের মন্দির এসকল আমি বালিকা বয়সেই অনেকবার দেখিয়াছি।

 পুতুলখেলা অপেক্ষা পাখী পুষিবার সখই আমার ছিল বেশী। পায়রা, ময়না, টীয়াপাখী, কাকাতুয়া, হীরেমন, শালিক প্রভৃতি নানাপ্রকার সুন্দর পাখী বাবা আমাকে আনিয়া দিতেন। কুকুর বিড়াল আমি ভাল বাসিতাম না। ফুলগাছেও আমার মন আকৃষ্ট হইত না। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে পাখীর নেশা আমার কমিয়া আসিয়াছিল।

 দ্বিতীয়বার এক মৃত সন্তান প্রসবের সময় আমার মায়ের মৃত্যু হয়। আমার বয়স তখন দশ বৎসর। প্রাণে দারুণ আঘাত পাইলাম। মৃত্যু কি, তাহা তখন আমি বুঝিতাম। আমাকে কেহ মিথ্যা বাক্যে ভুলাইতে পারিল না―কেহ আমাকে সান্ত্বনার কথা বলিতে পারিল না। আমি চীৎকার করিয়া মাটিতে লুটাইয়া কাঁদিলাম। বাবা আমাকে কোলে তুলিয়া লইলেন। কিন্তু আমি ছিন্নশির ছাগশিশুর মত ছট্‌ফট্‌ করিতে করিতে বাবার কোল হইতে নামিলাম। প্রতিবেশীগণ মায়ের মৃত দেহ পালঙ্কের উপর পুষ্পমালায় সাজাইয়া কাঁধে করিয়া লইয়া গেল। আমি তাহাদের পশ্চাতে ছুটিয়া চলিলাম। আমার মনে আছে, কতকদূর যাইয়া ফুটপাতের উপর আছড়াইয়া পড়িয়াছিলাম। মুখ তুলিয়া সম্মুখে চাহিয়া দেখি, বাহকেরা দূরে চলিয়া গিয়াছে। পালঙ্কের পশ্চাদ্দিকে মায়ের আল্‌তা মাখান পা-দুখানি বাহির হইয়া রহিয়াছে; তাহাই আমার দৃষ্টি পথে।

 আজ আমার দুঃখময় জীবনের কাহিনী লিখিতে বসিয়া চক্ষুর জল ঝরিতেছে। কত দিন কত দুঃখে অশ্রু বিসর্জ্জন করিয়াছি―আমার মনে হইয়াছে, তাহা মায়ের সেই চরণযুগলে নিপতিত হইয়া তার শুষ্ক অলক্তক-রাগকে আরও উজ্জ্বল করিয়া তুলিয়াছে।

 মায়ের মৃত্যুতে বাবা খুব কাঁদিয়াছিলেন। তিন দিন পর্য্যন্ত তিনি কিছু আহার করেন নাই। অবশেষে বন্ধুদের সনির্ব্বন্ধ অনুরোধে খাদ্য গ্রহণ করিয়াছিলেন। বাবার শয়নগৃহের প্রাচীরে মায়ের একখানি বৃহৎ সিপিয়া রংএর ব্রোমাইড এনলার্জ্জমেণ্ট ছবি ছিল। আমার সপ্তম জন্মতিথিতে বাবা আমাকে উহা উপহার দিয়াছিলেন। সাড়ে সাত শত টাকা ব্যয়ে তিনি ঐ ছবিখানি বিলাত হইতে তৈয়ারী করাইয়া আনেন। মায়ের মৃত্যুর পর হইতে বাবা নিত্য এক ছড়া ফুলের মালা দিয়া ছবিখানিকে সাজাইতেন।

 মায়ের জীবদ্দশাতেই আমি বেথুন স্কুলে ভর্ত্তি হইয়াছিলাম। তাঁহার মৃত্যুকালে আমি ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী। বাড়ীতে একজন গৃহ শিক্ষক আমাকে ও নন্দ দাদাকে পড়াইতেন। মায়ের মৃত্যুর পর বাবা আমাকে স্কুলে হইতে ছাড়াইয়া আনিলেন। বাড়ীতে অধিক সময় পড়াইবার জন্য একজন ভাল শিক্ষক নিযুক্ত হইলেন। আমাকে সর্ব্বদা কাছে কাছে রাখিয়া শোকবেগ কতকটা প্রশমিত করিবার জন্যই বোধ হয় বাবা এইরূপ ব্যবস্থা করিয়াছিলেন। যাহা হউক ইহাতে আমার পড়াশুনার কোন ক্ষতি হইল না।

 ছয় মাস চলিয়া গেল। তখন বাংলাদেশে স্বদেশী আন্দোলনের অব্যবহিত পরেই বোমার গোলযোগ আরম্ভ হইয়াছে। নেতাদের নির্ব্বাসন, যুবকদের কারাদণ্ড, বিপ্লববাদীদের গ্রেপ্তার, বোমাওয়ালাদের ফাঁসী, এই সকল ভীষণ ব্যাপারে দেশময় একটা চাঞ্চল্য দেখা দিয়াছে। নানাস্থানে সভা সমিতি, লাঠিখেলার আখড়া প্রভৃতি স্থাপিত হইল। আমার পিতা এই আন্দোলনের মধ্যে ছিলেন। নন্দ দাদা আমাকে মাঝে মাঝে স্বদেশী সভায় লইয়া যাইতেন। সেখানে কত উত্তেজনাময় বক্তৃতা শুনিতাম।

 একটা কথা বলিতে ভুলিয়া গিয়াছি। আমি বেশ গান গাহিতে পারিতাম। স্বাভাবিক শক্তিতেই আমার সুর তাল জ্ঞান ছিল, কণ্ঠস্বরও নাকি আমার সুমিষ্ট―যাঁহারা আমার গান শুনিয়াছেন, তাঁহারা সকলেই আমার এই প্রশংসা করিতেন। সঙ্গীতের ক্ষমতা আমার কিরূপে জন্মিল, আমি বুঝিতে পারি না। আমার পিতামাতা কেহই সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন না। বাবা আমাকে একটী খুব ভাল টেবিল হারমোনিয়ম কিনিয়া দিয়াছিলেন। এক জন শিক্ষক আমাকে এস্রাজ বাজ্‌না ও গান শিখাইতেন।

 একদিন দেখিলাম নন্দদাদা দুইখানি লম্বা ছোরা কিনিয়া আনিয়াছে। আমার সম্মুখে টেবিলের উপর ছোরা দুইখানি রাখিয়া বলিল “মানি, তোকে ছোরা খেলা শিখ্‌তে হবে।” আমি একখানি ছোরা হাতে লইয়া বলিলাম, “সে কি নন্দ-দা?” নন্দ-দা আর একখানি ছোরার বাঁট ধরিয়া তাহার অগ্রভাগ আমার বুকের দিকে লক্ষ্য করিল। অপর হস্তে আমার ডান হাতের কব্জি ধরিয়া এমন ভঙ্গিমায় দাঁড়াইল, যেন সে সত্যই আমাকে মারিতে উদ্যত। আমিও বা হাতে নন্দদা’র ডান হাতের কব্জি ধরিয়া ফেলিলাম। সে বলিল “এই ত ঠিক, এমনি করেই ত আট্‌কাতে হয়।” আমি কিছুদিন পূর্ব্বে এক স্বদেশী সভায় ছেলেদের ছোরা খেলা দেখিয়াছিলাম, আমি বলিলাম “মেয়েদের এসব শিখে কি হবে?” নন্দলাল বলিল “কেনরে মানি, শুনিস্ নি সেই গান,―“আপনার মান রাখিতে জননী আপনি কৃপাণ ধরগো”

 আমি বলিলাম “হাঁ,―মনে আছে।” এই বলিয়া আমি তখন টেবিল হারমোনিয়মের সম্মুখে গাইয়া বসিলাম। তাহার ঢাক্‌না খুলিয়া চাবি টিপিয়া গলা ছাড়িয়া গান ধরিলাম,―

আপনার মান রাখিতে জননী, আপনি কৃপাণ ধরগো,―
পরিহরি চারু কনক ভূষণ গৈরিক বসন পরগো
আমরা তোর কোটী কুসন্তান,
ভুলিয়া গিয়াছি আত্ম বলিদান,
করে মা পিশাচে তোর অপমান প্রতিকার তার করগো।

 গান শেষ হইলে বাবা আসিয়া বলিলেন “কিরে, খুকু―তোদের কি হচ্ছে?” নন্দ-দা মুহুর্ত্তের মধ্যে ছোরা দুখানি লইয়া আর এক দরজা দিয়া ছুটিয়া পলাইল। আজও আমার সে দিনের ঘটনা বেশ মনে আছে।

 সে দিন বাবা আমাকে এক স্বদেশী সভায় লইয়া গেলেন। এই গানটী আমি সভাস্থলে গাহিলাম। সকলে আমার খুব প্রশংসা করিল। ৺সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সেই সভার সভাপতি ছিলেন। আমি তখন বুঝিতে পারি নাই―উহাতেই আমার সর্ব্বনাশ হইতেছে। ঐ সভাতে বাবা এক বক্তৃতা দিলেন।

 তখন দামোদরের বন্যায় বর্দ্ধমান সহর ও তাহার নিকটবর্ত্তী বহুদূরব্যাপী স্থানসমূহের গৃহস্থগণ আশ্রয়হীন এবং দুর্দ্দশাগ্রস্থ হইয়াছিল। তাহাদের দুরবস্থা মোচনের জন্য সাহায্য ভাণ্ডার খোলা হয়। দেশের সহৃদয় জনসাধারণ তাহাতে অর্থদান করেন। অধিক পরিমাণে অর্থ সংগ্রহের জন্য কলিকাতার থিয়েটার সিনেমায় বেনিফিট্‌ নাইট অর্থাৎ সাহায্য রজনী ও অপর নানাবিধ আমোদ প্রমোদের ব্যবস্থাও হইয়াছিল।

 এই উপলক্ষে বাবা আমাকে কয়েকবার থিয়েটার ও বায়স্কোপ দেখাইতে লইয়া গিয়াছিলেন। নন্দ দাদাও সঙ্গে যায়। থিয়েটারের অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের সঙ্গীত ও অভিনয় দেখিয়া আমি অতিশয় মুগ্ধ হইয়াছিলাম। আমার মনে আছে, আমি প্রথম নাটক অভিনয় দেখি―দেবীচৌধুরাণী ও আলিবাবা। দেবীচৌধুরাণীর ‘বীণা―বাজেনা কেন’ এবং আলিবাবার ‘ছি ছি এত্তা জঞ্জাল’ এই দুইটী গান আমি এমন সুন্দর অনুকরণ করিয়াছিলাম যে আমার পিতা অনেকবার বাড়ীতে আমার মুখে উহা শুনিয়াছিলেন। রবিবার বায়স্কোপে যাওয়া আমার ক্রমশঃ অভ্যাস হইয়া উঠিল। কখনও নন্দ দাদা,―কখনও বা বাবা নিজে আমার সঙ্গে যাইতেন। কোন কোন রবিবারে আমি বাবার সঙ্গে ব্রাহ্মসমাজের উপাসনা মন্দিরে যাইতাম। আমার পিতা ব্রাহ্মধর্ম্মাবলম্বী ছিলেন না, কিন্তু সামাজিক রীতিনীতিতে তিনি ব্রাহ্মদের মত উদার ভাবাপন্ন ছিলেন।

 মাতার মৃত্যুর পর হইতে বাবা প্রতিদিন মায়ের ছবিতে একটী ফুলের মালা দিতেন। এখন আর মায়ের ছবিতে ফুলের মালা দেওয়া হয় না। বহুদিন যাবৎ একছড়া বেলফুলের মালা উহাতে শুকাইয়া ছিল, একদিন চাকর দেওয়াল ঝাড় দিতে উহা ফেলিয়া দিয়াছে। আমাদের কাহারও মনেই তাহাতে কোন চঞ্চলতা বা বিরক্তি আসে নাই। সকাল ছয়টা হইতে নয়টা―অপরাহ্ন একটা হইতে চারিটা মাষ্টার মহাশয় পড়াইতেন। শনিবারে কখনও কখনও থিয়েটারে, রবিবারে বায়স্কোপে যাওয়া আমার নিয়মিত কার্য্য মধ্যে ছিল।

 নন্দ দাদার চেষ্টায় ছোরা খেলা শিখিয়াছিলাম। আমার ডান হাতে একটা বড় কাটার দাগ এখনও তার সাক্ষী। বাবার আদেশে ছোরা খেলা পরিত্যাগ করি। তার পরিবর্ত্তে গল্পের পুস্তক পড়ায় আমার মন আকৃষ্ট হইল। আমার গৃহশিক্ষক মহাশয় ইহাতে আমাকে বিশেষ উৎসাহ দিতেন।

 ‘দেবীচৌধুরাণী’ নাটক অভিনয় দেখিবার পর আমি বোধ হয় ‘ভ্রমর’ ও ‘কপালকুণ্ডলা’ দেখিয়াছিলাম। মাষ্টার মহাশয় একদিন আমাকে বলিলেন, বঙ্কিম বাবুর লেখা আসল বই না পড়্‌লে, রস ও সৌন্দর্য্য উপলব্ধি হয় না। আমাদের বাড়ীতে তিনটী আলমারী বোঝাই অনেক পুস্তক ছিল। মাষ্টার মহাশয় অনুসন্ধান করিয়া তাহার মধ্য হইতে বঙ্কিম বাবুর গ্রন্থাবলী বাহির করিয়া দিলেন। আমি দিবারাত্রি সেই উপন্যাস পাঠ করিতে লাগিলাম। সকল স্থানে বুঝিতে পারিতাম না। কিন্তু তথাপি প্রাণে কেমন একটা অপূর্ব্ব পুলকের সঞ্চার ইইত।

 আমাকে দেখাশুনা করিবার নিমিত্ত আমার বিধবা পিসিমা আসিয়াছিলেন। তিনি আমার পিতার জেষ্ঠ্যা ভগিনী। আমার যাহাতে কোন কিছুর অসুবিধা না ঘটে, সে বিষয়ে তিনি সর্ব্বদা দৃষ্টি রাখিতেন। একদিন আনি শুনিলাম, পিসিমা বাবাকে বলিতেছেন “হাঁরে খোকা এইত এক বৎসর প্রায় হ’য়ে এল। আর ত দেরী করা ভাল নয়। তোর শাস্ত্র জ্ঞান আছে—বংশ রক্ষা, পিতৃকুলের জলপিণ্ড, এসব তুই কি জানিস্ না।” আমি তখন ইহার অর্থ বুঝিতে পারি নাই।

 কিছুদিন পরে বাবা আমাকে পুনরায় বেথুন স্কুলে ভর্ত্তি করিয়া দিলেন। আমি পঞ্চম শ্রেণীতে পড়িতে লাগিলাম। আমি স্কুলের গাড়ীতেই যাতায়াত করিতাম। কারণ―বাবা বলিলেন, তাঁহাকে এখন প্রায়ই মোটরে বাহিরে যাইতে হয়, সুতরাং আমাকে ঠিক সময়ে স্কুলে পৌঁছাইতে ও স্কুল হইতে লইয়া আসিতে নিজেদের মোটর সকল সময় পাওয়া যাইবে না। গৃহ শিক্ষক মহাশয় সকালে ও সন্ধ্যায় দুবেলা আমাকে পড়াইতেন।

 যতদিম মা বাঁচিয়া ছিলেন, আমি মায়ের সঙ্গে এক বিছানায় ঘুমাইয়াছি। মায়ের মৃত্যুর পর আমি বাবার ঘরে পৃথক বিছানায় শুইতাম। একদিন বাবা আমাকে বলিলেন, “খুকু―তুমি তোমার পিসিমার কাছে ঘুমিও”। আমি কখনও পিতার অবাধ্য হই নাই। আর একদিন বাবা চাকরকে ডাকিয়া দেওয়ালে মায়ের ছবিখানা দেখাইয়া বলিলেন, “এই বড় ছবিখানা খুকুর পড়বার ঘরে টানিয়ে দিস্‌ ত।” আমার জন্য দুইটি নূতন বড় বুক্‌কেস্, একখানা বড় মেহগিনি কাঠের সুন্দর টেবিল ক্রয় করা হইয়াছিল। তাহা আমার পড়িবার ঘরে সাজান হইল। মেজেতে পাতিবার জন্য সুন্দর কার্পেট আসিল। একটা কাট্‌গ্লাসের খুব দামী দোয়াতদানী ও একটী ওয়াটারম্যানের ফাউণ্টেন পেন বাবা আমাকে দিলেন। গ্রীষ্মকাল পড়িয়াছিল; আমার পড়িবার ঘরের বিজলী পাখায় নূতন রং করা হইল। আরও চারিখানা সুন্দর বিলাতী ল্যান্ডস্কেপ ছবির সঙ্গে মায়ের ছবিখানাও সেই ঘরে শোভা পাইল। মাষ্টার মহাশয় আমার পড়িবার ঘরের সাজসজ্জা দেখিয়া অতিশয় প্রীত হইলেন। আমি স্কুলের পড়ায়, নভেলে, থিয়েটার ও সিনেমার আমোদে নিমগ্ন।

 এমন সময় এক বসন্ত প্রভাতে আমাদের গৃহদ্বারে নহবতে সুমধুর রৌসানচৌকী বাজিয়া উঠিল। প্রতিবেশী বন্ধুগণ ও আত্মীয় স্বজন আনন্দ কোলাহলে মত্ত। পিসিমা কার্য্যে অতিশয় ব্যস্ত। পিতাকে নব বর-বেশে সজ্জিত দেখিলাম। পুষ্পপত্রে শোভিত চতুর্দ্দোল আসিয়াছে। শুভ সন্ধ্যায় শোভাযাত্রার আলোকমালা জ্বলিয়া উঠিল। আমিও উৎসবে মাতিলাম। আমার পড়িবার ঘরের সম্মুখ দিয়া যাইবার সময় হঠাৎ মায়ের সেই ছবিখানির দিকে আমার দৃষ্টি পড়িল। আমি মুহুর্ত্তের জন্য স্তম্ভিত হইয়া দাঁড়াইলাম; আমার চক্ষে জল আসিল। তার পর ধীরে ধীরে যাইয়া বিছানায় শুইলাম। কেহ আমাকে লক্ষ্য করিল না। পরদিন যখন ঘুম ভাঙ্গিল―দেখিলাম বিমাতা আসিয়াছেন।