শিক্ষিতা পতিতার আত্মচরিত/মিস মুখার্জ্জি

মিস মুখার্জ্জি

 বয়োবৃদ্ধির অনুপাতে সোনাগাছিতে আবার আমার গ্রাহক অনুগ্রাহকের সংখ্যা দিন দিন হ্রাস পাইতে লাগিল। কিন্তু দুর্দ্দিনের সে সূত্রপাতেও আমার ঐ উকিল ব্যরিষ্টার বন্ধু আমাকে ত্যাগ করেন নাই ইহাদিগের পরামতর্শে আমি স্থান ত্যাগ পূর্বক ভবানীপুরে আসিয়া নূতনভাবে জীবিকা অর্জন আরাম্ভ করিলাম। মনস্তত্ত্ববিদগণ জানেন এবং দীর্ঘকাল এই ঘৃণিত ব্যবসায় উপলক্ষে আমিও এ অভিজ্ঞতা অর্জন করিয়াছিলাম যে জগতে যাহা সুলভ ও সহজপ্রাপ্য তাহা প্রকৃতপক্ষে সুন্দর হইলেও তত মোহজনক হয়না; কিন্তু যাহা দুস্প্রাপ্য ও সর্ব্বাপেক্ষা দুর্লভ, তাহাই সমধিক প্রলােভনের বস্তু। আমি ভবানীপুরে একটা সুরম্য ভবনে মিস্ মুখার্জি নামে ব্যরিষ্টার সাহেবটির শ্যালিকারূপে সাধারণের দুস্প্রাপ্য হইয়া আসর জমাইবার চেষ্টা করিতে লাগিলাম। ফলও; ফলিল বালো এবং কৈশোরে বিদ্যা অর্জ্জন করিয়াছিলাম, পরে মানব সমাজের নানাস্তরের নানা প্রকার জীবের সহিত অবাধ মিলনে মনুষ্য হৃদয়ের অতি ঘূঢ় তত্ত্ব ও সংগ্রাম করিতে সক্ষম হইয়াছিলাম, সুতরাং মিস্ মুখার্জ্জি-রূপে যখন সভ্য বন্ধু মহলে হাস্যরসিকতার অভিনয় করিতাম, যখন আপ-টু-ডেট্ সাজ সজ্জার হাবভাব বিলাসে বিগত-প্রায় যৌবনশ্রীর নূতন সংস্করণ লুব্ধ লােকচক্ষুর সম্মুখে ধরিতাম, যখন পার্কে হাত ধরাধরি করিয়া ভগিনীপতি ব্যারিষ্টারের সঙ্গে সান্ধ্য-সমীরণ উপভােগ করিতাম, যখন একটিমাত্র কটাক্ষে অপরিচিতকে পরিচিতের পর্য্যায়ভূক্ত করিয়া বাটিতে আনিয়া স্বহস্তে পরিপাটিরূপে চা পান করাইয়া পরিতৃপ্ত করিতাম ও সঙ্গলিপ্সার দুর্দ্দম্য বেগ তাঁহাদের হৃদয়ে সৃষ্টি করিয়া পরম তৃপ্তিলাভ করিতাম; যেন আমার হৃদয়ের সে আবিল স্বার্থদুষ্ট রূপ কাহারও নয়নপথে পড়িত না, বরং উর্ণনাভের বিস্তৃত জালে তাঁহারা আবদ্ধ হইয়া আমার সহিত নিভৃত আলাপের অনুসন্ধান করিতেন। অবশ্য বলিতে হইবে আমিও কাহাকেও ..............। যাঁহার যখন উদয় হইত তিনিই যে আমার হৃদয় কমলের একমাত্র ভৃঙ্গ এবং অন্য সকলকেই মরিচীকা লইয়া ফিরিতে হইবে তাহাও বুঝাইয়া দিতাম।

 কত সতীত্বের ভানই করিয়াছি, আজ তাহা স্মরণ করিলেও হাস্য সম্বরণ করিতে পারি না। একদিন সন্ধ্যার সময় সম্মুখে টিপয়ের একদিকে মিঃ গোস্বামী ও অপর দিকে প্রফেসর চৌধুরী। উভয়েই ধনী, উভয়েই সুপুরুষ। আমি হারমােনিয়মটি অঙ্কে স্থাপন করিয়া বেশভূষার পারিপাট্যের পরিবর্ত্তে ইচ্ছাকৃত একটু অযত্নের ভাবে উন্মাদনা বৃদ্ধি করিয়া গান ধরিয়াছিলাম—

আজি অভিসার রজনী!

কোথা সে আমার কতদূরে তার দেখা পাব বল সজনি!

প্রেমের কমল ফুটেছিল তারই আলােক রেখার পরশে

দিন দিন করি বিতানু জীবন তাহারই পাবার হরষে।

মিঃ গােস্বামী বলিলেন— এখন বলুনতাে কে সে এই ভাগ্যবান! আমি বলিলাম—সে একটী মানস-পুরুষ, একটী আদর্শ প্রণয়ী, বাস্তব জগতের কোন প্রাণী না হইতেও পারে। এমন সময় মিঃ চৌধুরী আমার পশ্চাৎদিকে আঙ্গুলি নির্দ্দেশ পূর্ব্বক বলিলেন, ঐ যে সে পুরুষ-প্রবর আপনি আসিয়াই ধরা দিল। আমি ফিরিয়া চাহিতেই দুজনে উচ্চ হাস্য করিয়া উঠিলেন। আমি দেখিলাম আমার উকীল বাবুর সহিত আধুনিক সমাজের একটা নিতান্ত অচল বেশধারী অর্দ্ধবয়স্ক মাণিক। আহা তাতে ছিলনা কি? ঘড়ি, চেন, গন্ধতেল, আতর, চসমা, ছরি, শাল, ফুলমােজা, পানে পানে ফাটা ফাটা একজোড়া ঠোঁট, মুখের মত চলন বলন, এবং যাহা কিছু অশােভনীয় তার সবই। তিনি আসিয়াই বলিলেন—আমরা বাহিরে দাঁড়াইয়া অনেকক্ষণ ধরিয়া আপনার অপ্সরা কণ্ঠ শুনিতেছিলাম। এ রকম আর একবার শুনে ছিলাম। ওঃ—বহুদিনের কথা, এই কলিকাতা রামবাগানের মতি বিবির বাড়ী। আমি পূর্ববঙ্গের একজন পাট ব্যবসায়ী। আমার পয়সা খায়নি এমন মেয়ে মানুষ সহরে কম। কিন্তু আজ তােমার বাড়ী যা শুনলাম, জীবনে আর কোথাও তা শুনবনা, তোমার কানাচ আর ছাড়ব না। এরা কারা! এই কথা বলিয়াই তিনি একটি গিনি দিয়া আমাকে সম্মানিত করিলেন। তাঁদের ভাব দেখিয়া আমি একটী ঘৃণাসূচক ইংরাজী শব্দ উচ্চারণ পূর্ব্বক উঠিয়া দাঁড়াইয়া হাঁকিলাম—দরােয়ান দরােয়ান! দরােয়ান হাজির হলে বলিলাম, ইস্কো নিকাল দেও। পরে নিজেই সে কার্য্যের ভার লইয়া তাঁহাকে আমার সঙ্গে আসিতে ইঙ্গিত করিলাম এবং রাস্তার ধারে গেটের কাছে আনিয়া বিদায় দিলাম। বললাম, আমি তোমারই; তবে সময় বুঝিয়া কথা কহিতে হয়। যাঁরা বসিয়া ছিলেন তাঁরা আমাকে সহােদরার মত দেখেন।

 ক্রমশই রাত্রি অধিক হইতে লাগিল; দুজনেই নাছােড়বান্দা। উভয়েরই ধৈর্যের সীমা নাই। মিঃ গােস্বামী পকেট হইতে হ্যামিল্টনের বাড়ীর তাঁর সােণার সিগারেট কেসটী টেবিলের উপর রাখিয়া দিলেন, আমি কেস্ হইতে সবগুলি বাহির করিয়া একটি কাগজের মােড়কে বন্ধ করিয়া কেসটি আলমারী বন্ধ করিয়া বলিলাম—অন্ততঃ ঐ মূল্যবান জিনিষটির অনুরােধেও আপনাকে প্রতি সন্ধ্যায় একবার মিস্ মুখার্জ্জির শরণাগত হ'তে হবে; কেবল যে দিন হ'তে মিস্ মুখার্জ্জিতে আপনার স্নেহের অভাব দেখব সেইদিন এটা ফিরে পাবেন। মিঃ গোস্বামী একটু বিহ্বল ভাবে আমার দিকে চাহিয়া বলিলেন—সেটা কি কখনও সম্ভব হবে? আপনাকে ভুলব? মি চৌধুরী হাসিয়া বলিলেন তাহলে কেসটি মহাশয়ের পকেটে প্রত্যাবর্ত্তনও আর করলনা দেখছি। মিঃ গােস্বামী তার সিগারেট কেসটির অসগ্দতির জন্য অনুতপ্ত হইয়া একটু নীরব ভাব অবলম্বন করিতেই আমি একটু আঘাত করিলাম—বলিলাম, কি রকম, বড় বাড়ীর কথা ভাবছেন নাকি? তিনি বল্লেন সে আবার কি? আমি বল্লাম—Lion's denএ (সিংহের গহ্বরে) একটা beautiful cubএর (সুন্দর সিংহের বাচ্চা) শিকারে যাবেন ভাবছেন ত? তিনি what a fiction বলিয়া যাইতে উদ্যত হইলেই মিঃ চৌধুরী বলিয়া উঠিলেন—But facts are more stranger than fiction, (অর্থাৎ বাস্তব জগতের ঘটনাগুলি কল্পনা রাজ্যের অদ্ভুত ব্যাপার অপেক্ষাও অধিকতর আশ্চর্য্যজনক হয়ে থাকে)।

 মিষ্টার গোস্বামীর অন্তর্ধানের সঙ্গেসঙ্গেই আমার যেন একটু শিরঃপীড়া বোধ হইতে লাগিল। আর একটি অসুখ, যাকে Palpitation of the heart (যাকে হৃৎপিণ্ডের ধরফড়ানি বলে) সেই রোগটি সময় বুঝে দেখা দিল। দুরাত্মার ছলের অভাব নাই, আমি বেশ একটু যেন কাতর হইয়া শোফায় অঙ্গ ঢালিয়া দিলাম; আর, ওঃ―লাইট্‌টা কি স্ট্রং বলিয়া আর্তনাদ করিয়া উঠিতেই মিঃ চৌধুরী নিঃশব্দে আলোকটি সুইচ্‌ অফ্‌ করিয়া দিলেন। তখন চাঁদের কিরণ ঘরে আসিয়া পড়িয়াছিল মিঃ চৌধুরী আমার নিকটে তাঁর চেয়ারখানি টানিয়া আনিতেই আমি তাঁর হাতটি টানিয়া আনিয়া বুকের উপর রাখিয়া বলিলাম―আহা, মিঃ চৌধুরী, আজ গোস্বামীকে কি রকম জব্দ করেছি বলুনত! ৩০০ টাকার কেস্‌টি যে হজম করলাম এটি অবশ্য বুঝতে বাকি নেই, আরও কি আসবে বলেন! তিনি যেমন একটা উত্তর দিতে যাইবেন, এমন সময় তাঁর হাতের আংটিটা, খুলিয়া লইয়া বলিলাম, আপনাদের উভয়েরই আজ পরীক্ষা। ত্যাগের আঁচেই ভাই প্রণয়ের গাদ কাটে, বলিয়া গুণ গুণ করিয়া একটু সুর তুলিলাম:―

ভালবাসার কষ্টি পাতরে
আজ তোমার কষব পরাণ......

এমন সময় ব্যারিষ্টার বন্ধুটি আসিয়া চক্ষে অন্ধকার দেখিলেন, চাঁদের আলোয় দুটি প্রাণীর অস্তিত্ব অনুভব করিয়া, তাহলে Let me retire for the night, (তাহলে আজ রাত্রের মত বিশ্রাম লাভ করি) বলিয়া দরজাটি বাহির হইবার সময় টানিয়া দিয়া গেলেন। আমার এই দালাল বন্ধু দুটির নিজ নিজ ব্যবসায়ে পসার হয় নাই, সেই জন্য আমার এই কার্য্যে তাঁহারা সহায়তা করেন, দালালির অংশ আধাআধি।

 কিন্তু আশা মিটে কৈ? খরচও সঙ্কুলান হয় না, বিশেষতঃ এই মহাপাপের পয়সারও আবার বখরাদার দুইজন। একদিন ব্যারিষ্টারকে বলিলাম―তুমি একেবারে অকর্ম্মা। এত জায়গায় জাল ফেলে একটিও রুই কাতলা গাঁথতে পারলেনা। রাজধানীর আশে পাশে জাল হাতে করে ঘুরলে হবেনা, একটু দূরে যাও। যে বাঙ্গালটি, সেই যে পাট ব্যবসায়ী গুহ, সেটি বেশ জবর মক্কেল ছিল, দর্শনেই এক গিনি, স্পর্শনে হয়ত পাটের সওদাগরী জাহাজও খান কতক এই গহ্বরে রেখে যেত। পারবে ধরতে তাকে!

 কিছুদিনের জন্য ব্যারিস্টার দালাল উধাও হইলেন। একটী প্রকাণ্ড কাণ্ড করিয়া বসিলেন। আসাম হইতে বেশ একটি ভদ্রবেশধারী ধনবান মনুষ্য গ্রেপ্তার করিয়া আনিলেন। তিনি চিরকুমার ব্রত প্রচারের জন্য তাঁহার উৎসাহের অভাব নাই। তিনি প্রথম দিনেই আমাদিগের আতিথ্য স্বীকার করিয়া রজনীযোগে চির-কৌমার্য্যের মহিমা কীর্ত্তন শুরু করিয়া দিলেন। আমি কপটাচারে চিরদিনই অভ্যস্ত। গভীর রাত্রে তাঁহার সঙ্গে একাকী এ বিষয়ে আলোচনায় প্রবৃত্ত হইব বলিয়া রাত্রির জলযোগ শেষ করিয়া লইলাম।  মধ্যরাত্রে আলো জ্বালিয়া, ফ্যান্ খুলিয়া দিয়া, যুবক যুবতীর পরস্পরের প্রতি স্বাভাবিক আকর্ষণকে লক্ষ্য করিয়া তাহার বিরুদ্ধে কঠোর অশুভ মন্তব্য প্রকাশ করিতে লাগিলাম। বলিলাম, ঈশ্বরের এই পবিত্র রাঁজ্যে মানুষ নানাবিধ কৃত্রিম উপায়ে পাপ পথে সর্ব্বদা নর নারীকে আকর্ষণ করিতেছে। উদাহরণ স্বরূপ তাহাকে একটা প্যাকেট হইতে কতকগুলি প্যারিসের ছবি খুলিয়া এক একটা করিয়া দেখাইতে লাগিলাম।

 যে পাকা শিকারী সে কখনও চিড়িয়ার প্রাণ বধ করেনা, সিংহ, ব্যাঘ্র প্রভৃতি জবরদস্ত হিংস্রজন্তুই তাহাদের শিকারের বস্তু।

 যখন ছবিগুলি দেখাইয়া, তাহার মধ্যে কোন্‌ অংশ কিরূপ অশ্লীল, বিশেষভাবে তাহার বিচার করিতে লাগিলাম, দেখিলাম যেন তাহার আস্ফালন অনেকটা মন্দীভূত হইয়াছে। তিনি আগ্রহ সহকারে সেগুলি যেন দুই চোক দিয়া গিলিতে আরম্ত করিয়াছেন। তাহার পর বলিলাম, নর নারীর বিবাহে বা প্রণয় মিলনে এই সব ঘৃণিত কার্যই সম্পাদিত হয়। আপনি যদি চিরকুমার ব্রত ধারণ করিয়া জীবন যাপন করিতে পারেন আমিও আপনার সহিত চিরকুমারীরূপে এই মহান্ ধর্ম্ম প্রচারে সহায়তা করিব। তিনি বলিলেন, এরূপ ছবি আরও আছে। আমি তখন একটী বাক্স আনিয়া তাহার নিকট হাজির করিলাম; তিনি উৎসাহ সহকারে আমার নিকট এমন ঘেসিয়া বসিলেন যে কপট চিরকুমারী আমি তৎক্ষণাৎ তাহার নিকট হইতে আত্মরক্ষা করিবার জন্য চেয়ারটি সরাইয়া লইলাম। তিনি বলিলেন—আপনি কিজন্য এতগুলি ছবি সংগ্রহ করিয়াছেন? আমি বলিলাম, পাপ হইতে দূরেতে থাকিহইলে পাপের স্বরূপ পূর্ব্বে চিনিয়া লওয়া প্রয়োজন, তাই এই গুলি যত্ন করিয়া রাখিয়াছি। কিন্তু কি আশ্চর্য্য, যখন নিভৃতে এইগুলি সম্মুখে রাখিয়া মনে মনে ইহাদের কুৎসিত ভাবগুলি আলোচনা করি, তখন কি একটা ঘৃণিত লিপ্সা প্রাণে জাগিয়া উঠে; যেন, ছিছি সে কথা বলিতে লজ্জা মনে হয়। আপনি চিরকুমার ব্রতধারী, বলিতে লজ্জা করে, তখন মনে হয়―বোধ’হয় অতি নিকট-আত্মীয় বিরুদ্ধ সম্পর্কীয় একজন সুবেশধারী যুবকের সঙ্গও আমার পক্ষে নিরাপদ নহে।

 ঘড়িতে ঢং ঢং করিয়া তিনটা বাজিল। আমি বিশ্রামের প্রস্তাব করিলাম তিনি সম্মত হইলে, উভয়ে একই কক্ষে শয়ন করিলাম, আমি নিদ্রার ভান করিয়া রহিলাম, কিন্তু জাগ্রত ছিলাম, তিনিও নিদ্রা যাইতে পারিলেন না। আমি পূর্ব্বেই পরিচয় পাইয়াছিলাম, তিনি মহাবনী। এক্ষণে সাড়া দিয়া বলিলাম―বাড়ীখানি আমি ভাড়া লইয়াছি, বিশ হাজার টাকা লইলে এখানি নিজস্ব করিয়া, এইখানে দু’জনে থাকিয়া এই মহামন্ত্রের প্রচার করিতে সমর্থ হই, নচেৎ শীঘ্রই এ স্থান ত্যাগ করিতে হইবে। তিনমাসের বাড়ীভাড়া ১০০ টাকা হিসাবে বাকী পড়িয়াছে। তিনি তৎক্ষণাৎ স্বীকার হইলেন। বলিলেন―যদি আপনার মত সঙ্গী পাই তবে যথাসর্ব্বস্ব এই কার্য্যে ব্যয় করিতে প্রস্তুত আছি। বুঝিলাম তাঁহাকে হস্তগত করিয়াছি। তখনও তাঁহার নিদ্রা আসে নাই আসিবার সম্ভাবনও ছিল না, তখন আমার পবিত্র ব্রতধারী, আমার জীবন সঙ্গীর একটু পরিচর্য্যায় নিযুক্ত হইলাম। নিকটে আসিয়া বলিলাম―নতুন স্থানে আসিয়া আপনার নিদ্রার ব্যাঘাত হইতেছে; একটু তোয়াজ করিলেই সুস্থ হইতে পারিবেন। আমার আর তখন ভয় কি? তিনিও পবিত্র আমিও পবিত্র। তাঁহার মস্তক নিজ অঙ্কে স্থাপন করিয়া কেশগুলির মধ্যে অঙ্গুলি সঞ্চালন করিতে লাগিলাম। বলিলাম―যুবক বা যুবতীর মনের দৃঢ়তারও পরীক্ষা হওয়া আবশ্যক। প্যারিশ ছবিগুলির একটি ছবির প্রসঙ্গ তুলিয়া তাঁহার মানসপটে ভাবটি চিত্রিত করিয়া দিলাম, তিনি তৎক্ষণাং পার্শ্ব পরিবর্ত্তন করিলেন, আমি তাঁহার শোচনীয় অবস্থা অনুভব কহিয়া মনে মনে হাসিতে লাগিলাম। আমরা পিশাচী, পৈশাচিক আনন্দই আমাদের আনন্দ। তাঁহাকে এই পর্য্যন্ত পাপের পথে এগাইয়া দিয়া, তাঁহারই অনতিদূরে শয্যা রচনা করিয়া শয়ন করিলাম।

 পরদিন প্রভাতে কি দেখিলাম! একদিন পূর্ব্বে যিনি আমার সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিলেন, যিনি কখনও কাহারও পাণিপীড়ন করিবেন না বলিয়া প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইয়াছিলেন, তিনিই একরাত্রির মধ্যে আমার পরম ভক্ত, অনুগত দাসে পরিণত হইয়াছেন। যে নারী সর্পদ্রষ্ট অঙ্গুলির ন্যায় তাঁহার পরিত্যজ্য সেই নারী শিরোমণি আমি বারবিলাসিনী মানী, ওরফে মিস্ মুখার্জ্জি ভিন্ন তাঁর অন্ন রোচেনা। চা আসিল, বিস্কুট আসিল, নিষিদ্ধ পক্ষীর একজোড়া ডিম আসিল, কিন্তু তাঁহার মুগ্ধনেত্র আমার অনুসরণ করিতে লাগল। আমি যাইয়া যখন চা পানে রত হইলাম, তখন তিনি শীতল চা-টুকু ঢোকে ঢোকে গিলিতে লাগিলেন।

 বাড়ী ক্রয় করিবার জন্য দুইতিন মাসের মধ্যে বিশহাজার টাকা আমার হস্তগত হইল। আমার অঙ্গ মণি কাঞ্চনাদি নানা অলঙ্কারে ভূষিত হইল। অলঙ্কারে আমি আপত্তি করি লেও তাহা গ্রাহ্য হইল না। আমি একদিন তাঁহাকে বলিলাম―আমিই চিরকুমারী থাকিয়া ব্রত উদ্যাপন করিব, তিনি অনায়াসে সংসার আশ্রমে প্রবেশ করিতে পারেন। তিনি বলিলেন, আশ্রমের সেরূপ ওলট পালট করিতে আমাকে নাকি তাঁহার সঙ্গে যোগ দিতে হইবে। আমি তৎক্ষণাৎ দুই কর্ণে দুই হস্তের দু’টি অঙ্গুলি প্রদান করিতেই, অসাবধানতা বশতঃ তাঁহার সম্মুখে বে-আব্রু হইয়া পড়িলাম, তিনি উন্মত্তের মত আসিয়া আমাকে গভীর আলিঙ্গনে নিষ্পীড়িত করিয়া গণ্ডদেশে এক-নিশ্বাসব্যাপী চুম্বন মুদ্রিত করিয়া দিলেন।

 তারপরই একদিন সরাসরি বিবাহের প্রস্তাব। আমি বলিলাম এর কর্ত্তা আমি নই, দাদা-বাবু। দাদা-বাবু আসামীর সঙ্গে বাঙ্গালী শিক্ষিতা যুবতীর এরূপ মিলন অসম্ভব বলায়, আমার গবচন্দ্র প্রণয়ীটি কিল খাইয়া কিল চুরি করিয়া অদৃশ্য হইলেন।

 কুমার গোপিকারমণ রায় উল্লিখিত জমিদার যুবকের নাকি বিশেষ বন্ধু, কুমার বাহাদুরের আলয়ে আমার হতাশ প্রণয়ী নিমন্ত্রিত হইতেন, শুনিয়াছি। কতদিন ইনি কুমার বাহাদুরের গৃহে আমাকেও লইয়া যাইতে চাহিয়াছিলেন কিন্তু আমি সে অনুরোধ রক্ষা করিতে পারি নাই। তবে কুমার বাহাদুরকে একদিনের জন্য আমার প্রণয়ীর মারফত, আমার কুটীরে পদধূলি প্রদানের জন্য অনুরোধ করিয়াছিলাম, কিন্তু জানিনা কি অপরাধে তিনি আমাকে কৃতার্থ করেন নাই। ঐ সময় আমি বেশ্যা বলিয়া পরিচিতা ছিলাম না। আমার এই বিচিত্র জীবনের আখ্যায়িকার কত কথাই লিখিলাম। মানুষ প্রবৃত্তির তাড়নায় কত ঘৃণিত কার্য্য করিতে পারে তাহাও দেখাইলাম। যাহা পবিত্র, মানুষ তাহাকে কলুষিত করিতে বিশেষভাবে চেষ্টিত। সে মুখখানি আবরণ হীন, লোকে তাহার দিকে দৃষ্টিপাত করেনা, যাহা আবৃত, যাহা পাপষ্পর্শে মলিন হইয়া যায়, লোক তাহাতেই আকৃষ্ট। যে নারী প্রকাশ্যভাবে পুরুষের সঙ্গ কামনা করে, পুরুষ তাহা চায় না। অথচ যে কুলমহিলা পাপষ্পর্শে সদা ভীত, পাপাত্মাগণ তাহাকেই পাপ পঙ্কে নিমজ্জিত করিতে চায়! হায়, আমার চিরকুমার ব্রতধারীর কি পরিণামই ঘটিল! কোথায় সেই ব্রত! কোথায় তার উদ্যাপন! এত অল্পদিনে নারী ষ্পর্শেই তাঁর দৃঢ় হৃদয় চূর্ণ হইয়া গেল, সঙ্কল্প বিকল্পে পরিণত হইল। তিনি ধন, মান, যশ হারাইয়াছেন, এত অল্পদিনেই আমার চরণে দাসখত লিখিয়া দিয়া ধন্য হইলেন। আমি কাহাকেও ক্ষমা করি নাই। সুন্দর রাজ অট্টালিকাবাসী ধনী মাড়োয়ারী মহলেও আমার বিশেষ কদর ছিল। তাহাদের কতক অর্থও আমার হস্তগত হইয়াছে। আমার উকীল দালাল একজন বিশিষ্ট মাড়োয়ারীকে আনিয়াছিলেন। সে আমাকে দেখিবামাত্র বলিল—বিবি সাহেব, স্বজাতীয় নাদাপেটী মাড়োয়ারী নারীতে কোথাও শোভা নাই। বিদেশীয় আস্বাদেই পরমতৃপ্তি। সে আমাকে সোহাগ করিতে বলিত। আমি তাহাকে প্রাণেশ্বর বলিয়া একটী করিয়া গিনি সংগ্রহ করিয়াছি। একটী চুম্বনের মূল্যস্বরূপ দুটী গিনিও হস্তগত করিয়াছি। একদিন বাগান বাড়ীতে যাইয়া আমি ৩০০ টাকা আদায় করিয়াছিলাম। যাহারা হিন্দু-ধর্ম্মের এমন ধ্বজা উড়ায় তাহারা যে এমন কামান্ধ, পরদার পরায়ণ, তাহা আমার সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিল।