সাহিত্য-চিন্তা/সৌন্দর্য্য-তত্ত্ব

সৌন্দর্য্য-তত্ত্ব

 সৌন্দর্য্য, তুমি স্বর্গের দূত—দুঃখীর সান্ত্বনা। তুমিই প্রকৃতি-মন্দিরের দ্বারা মুক্ত করিয়া জগদতীত বার্ত্তা আমাদের নিকট আনয়ন কর। স্বর্গ ও মর্ত্ত্যের মাঝখানে যে যবনিকা চির-কল্যাণকে আবৃত করিয়া রহিয়াছে, তোমারই প্রেম-হস্ত সেই মায়া-আবরণ আমাদের চক্ষুর নিকট হইতে অপসারিত করে। তুমি কত অন্ধকে দৃষ্টিশক্তি, কত বধিরকে শ্রবণ-জ্ঞান দিয়াছ। তোমার স্পর্শে শুষ্ক তরু মুঞ্জরিত—মরুভূমিতে নির্ম্মল উৎস উৎসারিত হইয়া উঠে। তুমি কত ওমর, পল, কত জগাই মাধাইকে অপার্থিব জ্যোতিতে মণ্ডিত করিয়াছ। হে সৌন্দর্য্য, তোমায় কত রূপে ভিতরে বাহিরে দেখিতেছি, কিন্তু আজ পর্য্যন্তও তোমার তত্ত্ব জানিতে পারিলাম না।

 যখন বৈজয়ন্তের অফুটন্ত মুকুলের মত কোন্ অজ্ঞাত রাজ্য হইতে সমাগত একটি ক্ষুদ্র জীব প্রথম বসুন্ধরার অঙ্ক অলঙ্কৃত করে,—জননীর হৃদয় আনন্দ-রসে উচ্ছ্বসিত করিয়া তোলে; তখন লোক-কোলাহলময়ী কর্ম্মভূমিতে সেই নবাগত যাত্রীটির নয়নপথে সর্ব্বাগ্রে কোন্ বস্তু পতিত হয়?—সৌন্দর্য্য। সৌন্দর্য্যই বিশ্বরাজ্যের সহিত তাহাকে ধীরে ধীরে পরিচিত করিতে থাকে, এবং শিশু-হৃদয়ের সুপ্ত জ্ঞান ক্রমেই বিকশিত হইয়া উঠে। সহস্র অনুভূতির সঙ্গে সৌন্দর্য্য-বোধও তাহার প্রাণে ক্রমে জাগ্রত হয়। যখন সে কাঁদিতে থাকে, একখানি সুন্দর ছবি অথবা একখানি সুন্দর খেলেনা দেখিয়া সে আবার হাসিয়া উঠে। কোন্ বস্তু তাহার নিকট সর্ব্বাপেক্ষা সুন্দর? মায়ের স্নেহ-স্পর্শ, কিংবা মায়ের স্নেহপূর্ণ মুখ! যে নারীকে কুৎসিত কুরূপা বলিয়া জগৎ‍ ঘৃণার চক্ষে দর্শন করে, ক্রোড়স্থিত শিশুর নিকট তাহার মুখখানিও কত সুন্দর! এ সৌন্দর্য্যবোধ কে আনয়ন করিল?—প্রেম। যে জন্মান্ধ,—চিরদৃষ্টিহীন, প্রেমনয়নেই সে মাকে দেখিয়া লয়,—জগতের নিকট পরিচিত হয়। প্রেম ভিতরে থাকিয়া দৃষ্টিহীনের নিকট যে সৌন্দর্য্য ফুটাইয়া তোলে, বাহিরের দৃষ্টিশক্তি তাহার কাছে কোন্ ছার।

 কত যুগ যুগান্তর ব্যাপিয়া দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বৎসরের পর বৎসর, প্রকৃতি একই ভাবে শোভা পাইয়া থাকে, একই সূর্য্য নিত্য প্রাচী উজ্জল করিয়া হাসিয়া উঠে,—একই বৃক্ষ লতা পল্লব বনভূমিকে সুসজ্জিত করে,—নিত্য একই তটিনী অনিল-প্রবাহে তরঙ্গভঙ্গে ছুটিয়া যায়,—সন্ধ্যার রক্তিম আভায় ধরণীকে রঞ্জিত করিয়া রবি অস্তাচল চূড়ায় অদৃশ্য হয়। নিত্য একই ভাবে রূপসী অপ্সরার মত নক্ষত্রকুল রূপের আভায় বিশ্ব মোহিত করিয়া যেন অন্তরের কপাট খুলিয়া হাসিয়া উঠে। নিত্যই চন্দ্রমা রজতচন্দ্রিকা-লহরে ধরণীকে ভূষিত করে। প্রকৃতি-রাণীর প্রতি অঙ্গের ভুবনমেহিনী মাধুরী একই রূপে কত কাল ধরিয়া দেখিতেছি; কই, দেখিয়া তো সাধ মিটে না. আঁখি পরিতৃপ্ত হয় না। ঐ সৌন্দর্য্য-বিভব যেন নিত্যই নূতন। প্রেমই পুরাতনে নূতনত্ব দান করে। কারণ প্রেম স্বয়ং চৈতন্যময়ী মহাশক্তিরই চিরন্তন সৌন্দর্য্য।

 প্রেমই প্রাণে সৌন্দর্য-বোধ জাগ্রত করে; সেই প্রেম দুই মূর্ত্তিতে জগতে দর্শন করা যায়; স্বভাব-বিকশিত এবং সাধন-বিকশিত।

 শিশু মাকে ভালবাসে, একটু না দেখিলেই মা মা বলিয়া কাঁদিয়া অস্থির হয়। সংসারের সঙ্গে যাহার অল্পই পরিচয় জন্মিয়াছে, যে অস্ফুট হৃদয়ে জ্ঞানের কিছুমাত্র বিকাশ নাই, সে এত ভালবাসা কোথা হইতে লাভ করিল? তাহার প্রেম স্বভাবে জন্মিয়া স্বভাব দ্বারাই ধীরে ধীরে বিকশিত হইয়া উঠিয়াছে। সস্তানের প্রতি মাতার যে নিঃস্বার্থ স্নেহ তাহাও এই শ্রেণীর। যিনি মাতৃবক্ষে স্তন্য-সুধা দান করিয়াছেন, তাঁহারই করুণায় মাতৃ-হৃদয়ের স্নেহ অমৃত-ধারার ন্যায় প্রবাহিত হইয়া বিমল প্রবাহে জীবলোক পবিত্র ও প্লাবিত করিতেছে। এই স্বভাব-বিকশিত প্রেমই বিশ্ব প্রকৃতিতে অতি পরিস্ফুট রূপে দেখিতে পাওয়া যায়। সেই অলক্ষ্য সঞ্জীবন মন্ত্রে প্রাণীজগৎ বর্দ্ধিত ও রক্ষিত হইতেছে। পাখীটি বনে বনে ঘুরিয়া শাবকের জন্য আহার সংগ্রহ করিতেছে,—নিজে ঝড়বৃষ্টি সহ্য করিয়া পক্ষপুটে সস্তানকে ঢাকিয়া রাখিতেছে। পশু আহার নিদ্রা ভুলিয়া কত যত্নে সন্তান পালন করিতেছে। কীট পতঙ্গেও এই প্রেম বিদ্যমান। কোন কোন ইতরপ্রাণীকে সন্তানের জন্য নিজ প্রাণ পর্য্যন্ত বিসর্জ্জন করিতে দেখা যায়। মানব-মাতার কথা আর কি বলিব? প্রকৃতি যেন জগদ্ধাত্রী বেশে সকল জীবকেই আপনার স্নেহবক্ষে টানিয়া লইয়াছেন। এই প্রেমে যে সৌন্দর্য্য-বোধ, তাহাও প্রকৃতি প্রদত্ত। যে নিগ্রো-শিশুকে শ্বেতকায় ব্যক্তি ঘৃণার চক্ষে দর্শন করেন, সেই কৃষ্ণকায় বালকও নিজ জননীর নিকট কত সুন্দর! তাহার প্রতি কথা, প্রতি অঙ্গভঙ্গী, হাসি, কান্না, খেলা, মাতার চক্ষে কত সৌন্দর্য্য ঢালিয়া দেয়! যে বৃক্ষটি আমি যত্নে রোপণ করি—তাহাতে সতত জল সেচন করি, অন্যের নিকট না হউক, সে বৃক্ষ আমার নিকট কত সুন্দর।

 যে প্রেমের উন্মেষ সাধনসাপেক্ষ, তাহার নামই সাধন-বিকশিত প্রেম। যে স্বর্গের ধনে মনুষ্যের জন্ম সার্থক হয়, জগৎ আনন্দময় হইয়া উঠে, তাহা কখনও সাধনা ভিন্ন লাভ হইতে পারে না।

 সমুদ্র নীল দিগন্তকে আলিঙ্গন করিয়া অনন্তপ্রবাহে শোভা পাইতেছে; পর্ব্বত হিমানীমণ্ডিত বেশে শুভ্রজটাজুট-ধারী যোগীর ন্যায় বিরাজ করিতেছে; কত ফুল বনে ফুটিয়া উঠিয়া মাধুরী ঢালিতেছে; লতা তরুর শ্যাম অঙ্গে বায়ু-হিল্লোলে দুলিয়া দুলিয়া যেন সৌন্দর্য্য ছড়াইতেছে। পাখীর কলকণ্ঠে, ভ্রমর গুঞ্জনে, ঝিল্লীর নিশীথ-গীতি-ধ্বনিতে কত মাধুর্য্য! এ সকল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য কি সকলে সমান ভাবে অনুভব করিতে সমর্থ হয়? কবি, ভাবুক ও ভক্তের প্রাণে যেমন সৌন্দর্য্যের অনুভূতি, সাধারণের পক্ষে তাহা কখনও সম্ভবপর নহে। এই প্রেম, যদিও স্বভাব হইতেই জন্মে, তথাপি সাধন ভিন্ন তাহা বিকশিত হইতে পারে না।

 জ্ঞান আমাদের নিকট কেবল বস্তু-তত্ত্বই নির্ণয় করিয়া থাকে। সুদূরস্থ নীহারিকা-পুঞ্জে নক্ষত্রে নক্ষত্রে, গ্রহে গ্রহে ভ্রমণ করিয়া বিজ্ঞান সৃষ্টিতত্ত্ব নির্দ্ধারণ করিতেছে। মহাসমুদ্রের অতল গর্ভে প্রবেশ করিয়া কোথায় কোন্ পদার্থ, কোন্ রত্ন নিহিত রহিয়াছে, তাহা জ্ঞাপন করিতেছে, ভূগর্ভে প্রবিষ্ট হইয়া পৃথিবীর জন্মকাল নির্ণয় করিতেছে; কিন্তু তাহাকে সৌন্দর্য্যে শোভিত-করা— ভাব-সম্পদে ভূষিত করা, জ্ঞানের সাধ্য নয়; প্রেমেই কেবল এই দুজ্ঞেয় সৃষ্টিলীলাকে সৌন্দর্য্যে মহিমাময়ী করিয়া তুলিয়াছে। কবি, ভাবুক, ভক্তের নিকট বিজ্ঞানের জটীল রহস্যও কত মাধুর্য্যময়!

 ইটালীর সুসন্তান কবিবর দান্তে বলিয়াছেন, মানবহৃদয় প্রেমে সুন্দর না হইলে তাহা হইতে কবিতার উৎপত্তি হইতে পারে না। প্রেম স্বয়ং বিশ্বাতীত এবং সৌন্দর্য্যের সার। আর্য্য কবিগণ তাঁহাদের অতুলনীয় তুলিকায় প্রেমের মাধুরী বিচিত্র বর্ণে চিত্রিত করিয়াছেন।

 প্রেম সত্য সত্যই সুন্দর। কিন্তু এই মর্ত্যলোকে প্রেমের সৌন্দর্য্য কোথায় মূর্ত্তি গ্রহণ করিয়া প্রকাশ পাইয়াছে?—নারীচরিত্রে। পৃথিবীর কাব্য ইতিহাস এইরূপ শতশত জীবন্ত নারী-চিত্রে পূর্ণ রহিয়াছে।

 ঐ যে ঋষি-প্রতিপালিতা তরুণী কুটীর দ্বারে উপবিষ্টা! প্রেমের এক গভীর সাধনায় তাঁহার প্রাণ নিমগ্ন। বাহিরের কোন দর্শনীয় বস্তু তাঁহার নয়ন দেখিতেছে না,—কর্ণ কোন শব্দই শ্রবণ করিতেছে না, এই বাহ্য-জগৎ যেন তাঁহার হৃদয়ে বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে। একখানি সুন্দর মুখ মানসপটে উদিত হইয়া তাঁহাকে সংজ্ঞাহীন করিয়াছে। তিনি একেবারে প্রিয়তমে তন্ময়তা লাভ করিয়াছেন। এমন সময় সাক্ষাৎ জ্বলন্ত অগ্নির ন্যায় মহর্ষি দুর্ব্বাসা নিকটে সমুপস্থিত হইয়া সদর্পে গর্জ্জন করিয়া কহিলেন,—

 “দ্বারে অতিথি সমাগত—দুর্ব্বাসা অতিথি।”

 কিন্তু এই জলদ-নির্ঘোষে তাপসীর তপস্যা ভঙ্গ হইল না। মুহূর্ত্ত মধ্যে প্রিয়-ধ্যাননিরতা তরুণীর মস্তকে ঘোররবে বজ্রপাত হইল। তথাপি সেই নবীনা তপস্বিনীর ধ্যান ভঙ্গ হইল না।

 এই মনোরম জীবন্ত চিত্রটি দেখিতে দেখিতে প্রাণ আপনা আপনি বলিয়া উঠে,—কি সুন্দর! কি সুন্দর!

 আর একটি বিচিত্র চিত্র,—ভারতের গিরি-নিকেতনে এক রমণীয় তপোবন। শ্যামল তরুগুল্ম ও ফলে ফুলে তাহা অপূর্ব্ব শোভা ধারণ করিয়াছে। পাদপ্রান্তে স্বচ্ছসলিলা স্রোতস্বিনী প্রস্তররাশি ধৌত করিয়া প্রবাহিত হইতেছে। এই মনোজ্ঞ স্থানে পবিত্রতার প্রতিমূর্ত্তি রূপে বিরাজিত থাকিয়া বেদবতী তপস্যা করিতেছেন। তাঁহার রূপরাশি তপঃপ্রভাবে হোমাগ্নির ন্যায় উজ্জ্বল হইয়া উঠিয়াছে! আত্মীয় স্বজনের স্নেহ, সমস্ত ভোগবাসনা ত্যাগ করিয়া তাঁহার প্রাণ কোন্ সৌন্দর্য্যে মগ্ন রহিয়াছে?

 বেদবতী ধ্যানান্তে জপে প্রবৃত্ত রহিয়াছেন, এমন সময় লঙ্কা-অধিপতি রাবণ ত্রিলোক জয় করিয়া সেখানে উপস্থিত হইল।

 একাকিনী অরক্ষিতা নারীকে সেখানে তপস্যায় রত দেখিয়া রাক্ষস-নাথ রাবণ কহিল,—

 “দেবী, তুমি কে? তোমার এই অলৌকিক রূপ কখনও তপস্যার উপযুক্ত নহে। তুমি আমার মহিষীরই যোগ্যা। আমি দেবতাদিগের অধীশ্বর।”

 বেদবতী কহিলেন— “রাক্ষস, তোমার মঙ্গল হউক, আমি বিষ্ণুকে মনে মনে পতিত্বে বরণ করিয়াছি। এই নির্জ্জন অরণ্যে ভগবানই আমার একমাত্র রক্ষক। তিনিই অবলার বল।”

 রাবণ দেখিল, এইরূপ অসহায়া ক্ষীণাঙ্গী নারীকে হরণ করা তাহার মৃত বলশালী বীরের পক্ষে কিছুমাত্র আয়াস-সাধ্য নয়। বৃথা বাক্যব্যয়ে প্রয়োজন কি? এই ভাবিয়া সে দুর্ব্বৃত্ত রাক্ষস দুই পদ অগ্রসর হইয়া বেদবতীর কেশাগ্র ধারণ করিল। কিন্তু দুর্জ্জয় দৈববলের নিকট পাশব-বল পরাস্ত হইল। সহসা সেই লাবণ্যময়ী তরুণীর কান্তি আশ্চর্য্য ব্রহ্মতেজে দীপ্ত হইয়া উঠিল এবং প্রবল পরাক্রান্ত দশাননকে ভীত ও স্তম্ভিত করিয়া ফেলিল।

 বেদবতী কহিলেন,—“দুরাচার, কেশ স্পর্শ করিয়া আমার দেহ অশুচি করিয়াছিস্। আমি অগ্নিতে এই দেহ আহুতি প্রদান করিয়া মৃত্যুর পর প্রিয়তমের সঙ্গে মিলিত হইব।”

 এই বলিয়া সেই জ্যোতির্ম্ময়ী নারী সমীপস্থ যজ্ঞীয় অগ্নিতে প্রবেশ করিয়া ধর্ম্মের মর্যাদা রক্ষা করিলেন। সর্ব্বভুক্ হুতাশন দেখিতে দেখিতে বেদবতীর কমনীয় দেহ ভস্মীভূত করিয়া ফেলিল। প্রেম, পবিত্রতা ও আত্মোৎসর্গের কি জীবন্ত সৌন্দর্য্য!

 সত্য সত্যই নারী ধর্ম্মের রক্ষয়িত্রী। নারী যদি প্রেমের অমৃত-রসে ধরণীকে সঞ্জীবিত না করিতেন, তবে জন-সমাজ মরুভূমিতে পরিণত হইত! স্নেহময়ী জননীরূপে, সেবাপরায়ণা দুহিতারূপে, অনুরাগের প্রস্রবণ দয়িতারূপে, নারীকে দেখিতে পাই। কি ধনীর রম্য হর্ম্ম, কি দরিদ্রের পর্ণকুটীর, কি নগর, কি গ্রাম, কি বন, সর্ব্বত্রই নারীর পবিত্র সেবা-হস্ত; সকল স্থানই নারী-প্রেমের অপূর্ব্ব সৌন্দর্য্যে ভূষিত হইয়া রহিয়াছে!

 এই সৌন্দর্য্য বিশ্ব-প্রেমে উজ্জ্বল হইয়া উঠিলে তাহা প্রকৃতই অতুল্য। ভগবদ্ভক্তিতে তাহার পূর্ণতা সম্পাদিত হয়।

 যখন মহর্ষি ঈশা ক্রুশে দেহত্যাগ করিয়াছিলেন,— সেই, শান্ত সমাহিত কান্তি শোণিতস্রোতে প্লাবিত হইয়। যাইতেছিল, তথাপি মহর্ষির মুখ বিশ্ব-প্রেমে সমুজ্জল, তিনি হত্যাকারীর মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করিতেছিলেন! আর যখন নবদ্বীপের পথে নিত্যানন্দ জগাই মাধাই কর্তৃক আহত ও রক্তধারায় প্লাবিত হইয়া আনন্দ উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলিতেছিলেন—

“মেরেছিস্ কলসীর কানা,
তা বলে কি প্রেম দেব না?”

এবং তাহাদিগকে ভাই বলিয়া প্রীতিভরে আলিঙ্গন করিবার জন্য ব্যাকুল হইয়াছিলেন, তখন এই পৃথিবীতে বিশ্ব-প্রেমের যে সৌন্দর্য্য দেব জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিয়াছিল, তাহার তুলনা মিলে কি?

 সকল সৌন্দর্য্যের আধার সেই অনন্ত প্রেম-প্রস্রবণের একটি ধারা মর্ত্যলোক প্লাবিত করিতেছে। সাধনা দ্বারা ভক্তগণ তাহা লাভ করিয়া থাকেন, তাই, প্রেমিক ভক্তের হৃদয় এত সুন্দর! এই প্রেম-ধারার নামই পরানন্দ বা চিদানন্দ ঘন।

 কত তাপস তপস্বিনী নির্জ্জন গিরি-কন্দরে, পূতসলিলা তটিনী-পুলিনে সেই আনন্দ স্বরূপের ধ্যানে যুগযুগান্তর অতিবাহিত করিয়াছেন তাঁহারা সেই দেবদেবকে “রসো বৈ সঃ” রূপে ঘোষণা করিয়াছেন।

“যতো বাচেো নিবর্ত্তন্তে অপ্রাপ্য মনসা সহ।
আনন্দং ব্রহ্মণো বিদ্বান্ ন বিভেতি কুতশ্চ নেতি”
তৈত্তিরীয়োপনিষৎ।

 “মনের সহিত বাক্য যাঁহাকে না পাইয়া যাঁহা হইতে ফিরিয়া আইসে সেই ব্রহ্মের আনন্দ যিনি জানেন তিনি কোন বস্তু হইতে ভয় প্রাপ্ত হন না।”

 যিনি বিশ্ব সৌন্দর্য্যের প্রাণ,—সাধক যাঁহাকে “শিব সুন্দর” রূপে ভজনা করেন, বৈষ্ণব কবি যাঁহার হলাদিনী শক্তিতে মোহিত হইয়াছেন, তাঁহাতে প্রাণ সমর্পণ করিলেই মানুষ সৌন্দর্য্যের সারতত্ত্ব বুঝিতে পারেন।

“সচ্চিৎ-আনন্দময় কৃষ্ণের স্বরূপ,
অতএব স্বরূপ-শক্তিতে তিন রূপ।
আনন্দাংশে হলাদিনী, সদংশে সন্ধিনী,
চিদংশে সম্বিৎ যারে জ্ঞান করি মানি,
হলাদিনীর সার অংশ তার প্রেম নাম,
আনন্দ চিন্ময় রস প্রেমের লক্ষ্মণ।”
—শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত

 সত্যস্বরূপ, জ্ঞানস্বরূপ, আনন্দস্বরূপ পরমেশ্বরের আনন্দেই সৃষ্টির সৌন্দর্য্য নিহিত রহিয়াছে। এজন্যই উপনিষৎকার ঋষিগণ তাঁহাকে “রসস্বরূপ” বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। ভগবানের এই আনন্দস্বরূপই হলাদিনীশক্তি; হলাদিনীশক্তিই বিশ্বলীলায় বিকশিত হইয়া সৌন্দর্য দান করিয়াছে। তাহার নামই প্রেম। এই প্রেম চির সুন্দর, চির নূতন,—চির মঙ্গলময়। ইহার রূপ-মাধুরীতে চিরদিন জগৎ মোহিত। সৌন্দর্য্যের ইহাই সার-তত্ত্ব।