এর মধ্যে পুপেদিদি গেছে দার্জিলিঙে । সে রইল মাথাঘষা গলিতে একলা আমার জিম্মায় । তার ভালো লাগছে না । আমিও জ্বালাতন হয়েছি । বলে , আমাকে দার্জিলিং পাঠাও ।

আমি বললুম , কেন ।

সে বললে , পুরুষমানুষ বেকার বসে আছি , আত্মীয়স্বজন ভারি নিন্দে করছে ।

কী কাজ করবে , বলো ।

পুপোদিদির খেলার রান্নার জন্যে খবরের কাগজ কুচিকুচি করে দেব ।

এত মেহন্নত সইবে না । একটু চুপ করো দেখি । আমি এখন হুঁহাউ দ্বীপের ইতিহাস লিখছি ।

হুঁহাউ নামটা শোনাচ্ছে ভালো , দাদা । ওটা তোমার চেয়ে আমার কলমেই মানাত ঠিক । বিষয়টার একটু আমেজ দিতে পার কি ।

ঠাট্টা নয় , বিষয়টা গম্ভীর , কলেজে পাঠ্য হবার আশা রাখি । একদল বৈজ্ঞানিক ঐ শূন্য দ্বীপে বসতি বেঁধেছেন । খুব কঠিন পরীক্ষায় প্রবৃত্ত ।

একটুখানি বুঝিয়ে বলো — কী করছেন তাঁরা । হাল নিয়মে চাষবাস করছেন ?

একেবারে উলটো , চাষের সম্পর্ক নেই ।

আহারের কী ব্যবস্থা ।

একেবারেই বন্ধ ।

প্রাণটা ?

সেই চিন্তাটাই সব চেয়ে তুচ্ছ । পাকযন্ত্রের বিরুদ্ধে ওঁদের সত্যাগ্রহ । বলছেন , ঐ জঠরযন্ত্রটার মতো প্যাঁচাও জিনিস আর নেই । যত রোগ , যত যুদ্ধবিগ্রহ , যত চুরি - ডাকাতির মূল কারণ তার নাড়ীতে নাড়ীতে ।

দাদা , কথাটা সত্য হলেও হজম করা শক্ত ।

তোমার পক্ষে শক্ত । কিন্তু , ওঁরা হলেন বৈজ্ঞানিক । পাকযন্ত্রটা উপড়ে ফেলেছেন , পেট গেছে চুপ্‌সে , আহার বন্ধ , নস্য নিচ্ছেন কেবলই । নাক দিয়ে পোষ্টাই নিচ্ছেন হাওয়ায় শুষে । কিছু পৌঁচচ্ছে ভিতরে , কিছু হাঁচতে হাঁচতে বেরিয়ে যাচ্ছে । দুই কাজ একসঙ্গেই চলছে , দেহটা সাফও হচ্ছে , ভর্তিও হচ্ছে ।

আশ্চর্য কৌশল । কলের জাঁতা বসিয়েছেন বুঝি ? হাঁস মুরগি পাঁটা ভেড়া আলু পটোল একসঙ্গে পিষে শুকিয়ে ভর্তি করছেন ডিবের মধ্যে ?

না । পাকযন্ত্র , কসাইখানা , দুটোই সংসার থেকে লোপ করা চাই । পেটের দায় , বিল - চোকানোর ল্যাঠা একসঙ্গে মেটাবেন । চিরকালের মতো জগতে শান্তি স্থাপনার উপায় চিন্তা করছেন ।

নস্যটা তবে শস্য নিয়েও নয় , কেননা সেটাতেও কেনাবেচার মামলা ।

বুঝিয়ে বলি । জীবলোকে উদ্ভিদের সবুজ অংশটাই প্রাণের গোড়াকার পদার্থ , সেটা তো জান ?

পাপমুখে কেমন করে বলব যে জানি , কিন্তু বুদ্ধিমানেরা নিতান্ত যদি জেদ করেন তা হলে মেনে নেব ।

দ্বৈপায়ন পণ্ডিতের দল ঘাসের থেকে সবুজ সার বের করে নিয়ে সূর্যের বেগ্‌নি - পেরোনো আলোয় শুকিয়ে মুঠো মুঠো নাকে ঠুসছেন । সকালবেলায় ডান নাকে ; মধ্যাহ্নে বাঁ নাকে ; সায়াহ্নে দুই নাকে একসঙ্গে , সেইটেই বড়ো ভোজ । ওঁদের সমবেত হাঁচির শব্দে চমকে উঠে পশুপক্ষীরা সাঁতরিয়ে সমুদ্র পার হয়ে গেছে ।

শোনাচ্ছে ভালো । অনেকদিন বেকার আছি দাদা , পাকযন্ত্রটা হন্যে হয়ে উঠেছে — তোমাদের ঐ নস্যটার দালালি করতে পারি যদি নিয়ুমার্কেটে , তা হলে —

অল্প একটু বাধা পড়েছে , সে কথা পরে বলব । তাঁদের আর - একটা মত আছে । তাঁরা বলেন , মানুষ দু পায়ে খাড়া হয়ে চলে বলে তাদের হৃদ্‌যন্ত্র পাকযন্ত্র ঝুলে ঝুলে মরছে ; অস্বাভাবিক অত্যাচার ঘটেছে লাখো লাখো বৎসর ধরে । তার জরিমানা দিতে হচ্ছে আয়ুক্ষয় করে । দোলায়মান হৃদয়টা নিয়ে মরছে নরনারী ; চতুষ্পদের কোনো বালাই নেই ।

বুঝলুম , কিন্তু উপায় ?

ওঁরা বলছেন , প্রকৃতির মূল মতলবটা শিশুদের কাছ থেকে শিখে নিতে হবে । সেই দ্বীপের সব চেয়ে উঁচু পাহাড়ে শিলালিপিতে অধ্যাপক খুদে রেখেছেন — সবাই মিলে হামাগুড়ি দাও , ফিরে এসো চতুষ্পদী চালে , যদি দীর্ঘকাল ধরণীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চাও ।

সাবাস ! আরো কিছু বাকি আছে বোধ হয় ?

আছে । ওঁরা বলেন , কথা কওয়াটা মানুষের বানানো । ওটা প্রকৃতিদত্ত নয় । ওতে প্রতিদিন শ্বাসের ক্ষয় হতে থাকে , সেই শ্বাসক্ষয়েই আয়ুক্ষয় । স্বাভাবিক প্রতিভায় এ কথাটা গোড়াতেই আবিষ্কার করেছে বানর । ত্রেতাযুগের হনুমান আজও আছে বেঁচে । আজ ওঁরা নিরালায় বসে সেই বিশুদ্ধ আদিম বুদ্ধির অনুসরণ করছেন । মাটির দিকে মুখ করে সবাই একেবারে চুপ । সমস্ত দ্বীপটাতে কেবল নাকের থেকে হাঁচির শব্দ বেরোয় , মুখের থেকে কোনো শব্দই নেই ।

পরস্পর বোঝাপড়া চলে কী করে ।

অত্যাশ্চর্য ইশারার ভাষা উদ‍্ভাবিত । — কখনো ঢেঁকি - কোটার ভঙ্গিতে , কখনো হাতপাখা - চালানোর চালে , কখনো ঝোড়ো সুপুরি গাছের নকলে ডাইনে বাঁয়ে উপরে নীচে ঘাড় দুলিয়ে বাঁকিয়ে নাড়িয়ে কাঁপিয়ে হেলিয়ে ঝাঁকিয়ে । এমন - কি , সেই ভাষার সঙ্গে ভুরু - বাঁকানি চোখ - টেপানি যোগ করে ওঁদের কবিতার কাজও চলে । দেখা গেছে , তাতে দর্শকের চোখে জল আসে , নস্যির জায়গাটা বদ্ধ হয়ে পড়ে ।

কিছু টাকা আমাকে ধার দাও , দোহাই তোমার । ঐ হুঁহাউ দ্বীপেই যেতে হচ্ছে আমাকে । এতবড়ো নতুন মজাটা —

নতুন আর পুরোনো হতে পেল কই । হাঁচতে হাঁচতে বস্‌‍তিটা বেবাক ফাঁক হয়ে গেছে । পড়ে আছে জালা - জালা সবুজ নস্যি । ব্যবহার করবার যোগ্য নাক বাকি নেই একটাও ।

এ তোমার আগাগোড়াই বানানো । বিজ্ঞানের ঠাট্টার পক্ষেও এটা বাড়াবাড়ি শোনাচ্ছে । এই হুঁহাউ দ্বীপের ইতিহাস বানিয়ে তুমি পুপেদিদিকে তাক লাগিয়ে দিতে চাও । ঠিক করেছিলে , তোমার এই অভাগা সে - নামওয়ালাকেই বৈজ্ঞানিক সাজিয়ে সারা দ্বীপময় হাঁচিয়ে হাঁচিয়ে মারবে । বর্ণনা করবে ,আমি ঘাড় - নাড়ানাড়ির ঘটাকরে ঘটোৎকচ - বধ পাঁচালির আসর জমাচ্ছি কী করে।

হয়তো কোন্‌ হামাগুড়িওয়ালি মনোহর - ঘাড় - নাড়ানির সঙ্গে আমার বিয়ে দিয়ে বসবে , ঘাড়নাড়া - মন্ত্রে কনে নাড়বে মাথা বাঁ দিক থেকে ডান দিকে , আর আমি নাড়ব ডান দিক থেকে বাঁ দিকে । সপ্তপদী - গমন উঠবে চতুর্দশপদী । ওদের সেনেট হলে ঘাড়নাড়া ভাষায় যখন ওরা সারে সারে পরীক্ষা দিতে বসেছে , তার মধ্যে আমাকেও বসাবে এক কোণে । আমার উপর তোমার দয়ামায়া নেই , দেবে ফেল করিয়ে । কিন্তু ওদের স্পোর্টিং ক্লাবে হামাগুড়ি - রেসে আমাকেই পাওয়াবে ফাস্ট্‌ প্রাইজ । বলে দিচ্ছি , পুপেদিদিকে এমন করে হাসাতে পারবে মনেও কোরো না ।

বেশি বোকো না । চাণক্যপণ্ডিত শ্রেণীবিশেষের আয়ুবৃদ্ধির জন্যে বলেছেন : তাবচ্চ বাঁচতে মূর্খ যাবৎ ন বক্‌বকায়তে । — তুমি তো সংস্কৃত কিছু শিখেছিলে ?

যতটা শিখেছিলেম ভুলেছি তার দেড়গুণ ওজনে । নয়া - চাণক্য জগতের হিতের জন্যে যে উপদেশ দিয়েছেন সেটাও তোমার জানা দরকার দাদা , ছন্দ মিলিয়েই লেখা : তখন হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচি যখন পণ্ডিত চুপায়তে । — চললুম । আমার শেষ পরামর্শ এই , বৈজ্ঞানিক রসিকতা ছেড়ে দিয়ে ছেলেমানুষি করো যতটা পার ।

এই কাহিনীটা পুপেদিদির কাছে একটুও পছন্দসই হয় নি । কপাল কুঁচকে বললে , এ কখনো হয় ? নস্যি নিয়ে পেট ভরে ?

আমি বললেম , গোড়াতে পেটটাকেই যে সরিয়ে দিয়েছে ।

পুপুদিদি আশ্বস্ত হয়ে বললে , ওঃ , তাই বুঝি ।

শেষ পর্যন্ত ওর গিয়ে ঠেকল কথা না বলাতে । ওর প্রশ্ন , কথা না বলে কি বাঁচা যায় ।

আমি বললুম , ওদের সব চেয়ে বড়ো পণ্ডিত ভূর্জপাতায় লিখে লিখে দ্বীপময় প্রচার করেছেন , কথা বলেই মানুষ মরে । তিনি সংখ্যাগণনায় প্রমাণ করে দিয়েছেন , যারা কথা বলত সবাই মরেছে ।

হঠাৎ পুপুদিদির বুদ্ধিতে প্রশ্ন উঠল , আচ্ছা , বোবারা ?

আমি বললেম , তারা কথা বলে মরে নি , তারা মরেছে কেউ বা পেটের অসুখে , কেউ বা কাশিসর্দিতে ।

শুনে পুপুদিদির মনে হল , কথাটা যুক্তিসংগত ।

আচ্ছা , দাদামশায় , তোমার কী মত ।

আমি বললুম , কেউ বা মরে কথা বলে , কেউ বা মরে না বলে ।

আচ্ছা , তুমি কী চাও ।

আমি ভাবছি , হুঁহাউ দ্বীপে গিয়ে বাস করব , জম্বুদ্বীপে বকিয়ে মারল আমাকে , আর পেরে উঠছি নে ।