প্রধান মেনু খুলুন


সকালে বসে চা খাচ্ছি এমন সময় সে এসে উপস্থিত ।

জিগেস করলুম , কিছু বলবার আছে ?

ও বললে , আছে ।

চট্‌ করে বলে ফেলো , আমাকে এখনি বেরতে হবে ।

কোথায় ।

লাটসাহেবের বাড়ি ।

লাটসাহেব তোমাকে ডাকেন নাকি ।

না , ডাকেন না , ডাকলে ভালো করতেন ।

ভালো কিসের ।

জানতে পারতেন , ওঁরা যাদের কাছ থেকে খবর পেয়ে থাকেন আমি তাদের চেয়েও খবর বানাতে ওস্তাদ । কোনো রায়বাহাদুর আমার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে না , সে কথা তুমি জান ।

জানি , কিন্তু আমাকে নিয়ে আজকাল তুমি যা - তা বলছ ।

অসম্ভব গল্পেরই যে ফরমাশ ।

হোক - না অসম্ভব , তারও তো একটা বাঁধুনি থাকা চাই । এলোমেলো অসম্ভব তো যে - সে বানাতে পারে ।

তোমার অসম্ভবের একটা নমুনা দাও ।

আচ্ছা বলি শোনো —

স্মৃতিরত্নমশায় মোহনবাগানের গোল - কীপারি করে ক্যাল্‌কাটার কাছ থেকে একে একে পাঁচ গোল খেলেন । খেয়ে খিদে গেল না , উলটো হল , পেট চোঁ - চোঁ করতে লাগল । সামনে পেলেন অক্‌‍টর্লনি মনুমেণ্ট । নীচে থেকে চাটতে চাটতে চুড়ো পর্যন্ত দিলেন চেটে । বদরুদ্দিন মিঞা সেনেট হলে বসে জুতো সেলাই করছিল , সে হাঁ - হাঁ করে ছুটে এল । বললে , আপনি শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত হয়ে এত বড়ো জিনিসটাকে এঁটো করে দিলেন !

‘ তোবা তোবা' বলে তিনবার মন্যুমেণ্টের গায়ে থুথু ফেলে মিঞাসাহেব দৌড়ে গেল স্টেট্‌স‍্ম্যান - আপিসে খবর দিতে ।

স্মৃতিরত্নমশায়ের হঠাৎ চৈতন্য হল , মুখটা তাঁর অশুদ্ধ হয়েছে । গেলেন ম্যুজিয়মের দরোয়ানের কাছে । বললেন , পাঁড়েজি , তুমিও ব্রাহ্মণ , আমিও ব্রাহ্মণ — একটা অনুরোধ রাখতে হবে ।

পাঁড়েজি দাড়ি চুম্‌‍রিয়ে নিয়ে সেলাম করে বললে , কোমা ভূ পোর্তে ভূ সি ভূ প্লে ।

পণ্ডিতমশায় একটু চিন্তা করে বললেন , বড়ো শক্ত প্রশ্ন , সাংখ্যকারিকা মিলিয়ে দেখে কাল জবাব দিয়ে যাব । বিশেষ আজ আমার মুখ অশুদ্ধ , আমি মনুমেণ্ট চেটেছি ।

পাঁড়েজি দেশালাই দিয়ে বর্মা চুরুট ধরালো । দু টান টেনে বললে , তা হলে এক্ষুনি খুলুন ওয়েব্‌স্টার ডিক্‌সনারি , দেখুন বিধান কী ।

স্মৃতিরত্ন বললেন , তা হলে তো ভাটপাড়ায় যেতে হয় । সে পরে হবে , আপাতত তোমার ঐ পিতলে - বাঁধানো ডাণ্ডাখানা চাই ।

পাঁড়ে বললে , কেন , কী করবেন , চোখে কয়লার গুঁড়ো পড়েছে বুঝি ?

স্মৃতিরত্ন বললেন , তুমি খবর পেলে কেমন করে । সে তো পড়েছিল পরশু দিন ।

ছুটতে হল উল্টোডিঙিতে যকৃত - বিকৃতির বড়ো ডাক্তার ম্যাকার্টনি সাহেবের কাছে । তিনি নারকেলডাঙা থেকে শাবল আনিয়ে সাফ করে দিলেন ।

পাঁড়েজি বললে , তবে ডাণ্ডায় তোমার কী প্রয়োজন ।

পণ্ডিতমশায় বললেন , দাঁতন করতে হবে ।

পাঁড়েজি বললে , ওঃ , তাই বলো , আমি বলি নাকে কাঠি দিয়ে হাঁচবে বুঝি , তা হলে আবার গঙ্গাজল দিয়ে শোধন করতে হত ।

এই পর্যন্ত বলে গুড়্‌গুড়িটা কাছে নিয়ে দু টান টেনে সে বললে , দেখো দাদা , এইরকম তোমার বানিয়ে বলবার ধরন । এ যেন আঙুল দিয়ে না লিখে গণেশের শুঁড় দিয়ে লম্বা চালে বাড়িয়ে লেখা । যেটাকে যেরকম জানি সেটাকে অন্যরকম করে দেওয়া । অত্যন্ত সহজ কাজ । যদি বল লাটসাহেব কলুর ব্যাবসা ধরে বাগবাজারে শুটকি মাছের দোকান খুলেছেন , তবে এমন সস্তা ঠাট্টায় যারা হাসে তাদের হাসির দাম কিসের ।

চটেছ বলে বোধ হচ্ছে ।

কারণ আছে । আমাকে নিয়ে পুপুদিদিকে সেদিন যাচ্ছে - তাই কতকগুলো বাজে কথা বলেছিলে । নিতান্ত ছেলেমানুষ বলেই দিদি হাঁ করে সব শুনেছিল । কিন্তু , অদ্ভুত কথা যদি বলতেই হয় তবে তার মধ্যে কারিগরি চাই তো ।

সেটা ছিল না বুঝি ?

না , ছিল না । চুপ করে থাকতুম যদি আমাকে সুদ্ধ না জড়াতে । যদি বলতে , তোমার অতিথিকে তুমি জিরাফের মুড়িঘণ্ট খাইয়েছ , সর্ষেবাঁটা দিয়ে তিমিমাছ - ভাজা আর পোলাওয়ের সঙ্গে পাঁকের থেকে টাটকা ধরে আনা জলহস্তী , আর তার সঙ্গে তালের গুঁড়ির ডাঁটা - চচ্চড়ি , তা হলে আমি বলতুম , ওটা হল স্থূল । ওরকম লেখা সহজ ।

আচ্ছা , তুমি হলে কী রকম লিখতে ।

বলি , রাগ করবে না ? দাদা , তোমার চেয়ে আমার কেরামতি যে বেশি তা নয় , কম বলেই সুবিধে । আমি হলে বলতুম —

তাসমানিয়াতে তাস খেলার নেমন্তন্ন ছিল , যাকে বলে দেখা-বিন্‌‍তি । সেখানে কোজুমাচুকু ছিলেন বাড়ির কর্তা , আর গিন্নির নাম ছিল শ্রীমতী হাঁচিয়েন্দানি কোরঙ্কুনা । তাঁদের বড়ো মেয়ের নাম পাম্‌কুনি দেবী , স্বহস্তে রেঁধেছিলেন কিণ্টিনাবুর মেরিউনাথু , তার গন্ধ যায় সাত পাড়া পেরিয়ে ।

গন্ধে শেয়ালগুলো পর্যন্ত দিনের বেলা হাঁক ছেড়ে ডাকতে আরম্ভ করে নির্ভয়ে , লোভে কি ক্ষোভে জানি নে। কাকগুলো জমির উপর ঠোঁট গুঁজে দিয়ে মরিয়া হয়ে পাখা ঝাপটায় তিন ঘণ্টা ধরে । এ তো গেল তরকারি । আর , জালা জালা ভর্তি ছিল কাঙ্‌চুটোর সাঙ্‌চানি । সে দেশের পাকা পাকা আঁক্‌সুটো ফলের ছোবড়া - চোঁয়ানো । এই সঙ্গে মিষ্টান্ন ছিল ইক্‌‍টিকুটির ভিক্‌‍টিমাই , ঝুড়িভর্তি । প্রথমে ওদের পোষা হাতি এসে পা দিয়ে সেগুলো দ'লে দিল ; তার পরে ওদের দেশের সব চেয়ে বড়ো জানোয়ার , মানুষে গোরুতে সিঙ্গিতে মিশোল , তাকে ওরা বলে গাণ্ডিসাঙ্‌ডুং , তার কাঁটাওয়ালা জিব দিয়ে চেটে চেটে কতকটা নরম করে আনলে । তার পরে তিনশো লোকের পাতের সামনে দমাদ্দম হামানদিস্তার শব্দ উঠতে লাগল । ওরা বলে , এই ভীষণ শব্দ শুনলেই ওদের জিবে জল আসে ; দূর পাড়া থেকে শুনতে পেয়ে ভিখারি আসে দলে দলে । খেতে খেতে যাদের দাঁত ভেঙে যায় তারা সেই ভাঙা দাঁত দান করে যায় বাড়ির কর্তাকে । তিনি সেই ভাঙা দাঁত ব্যাঙ্কে পাঠিয়ে দেন জমা করে রাখতে , উইল করে দিয়ে যান ছেলেদের । যার তবিলে যত দাঁত তার তত নাম । অনেকে লুকিয়ে অন্যের সঞ্চিত দাঁত কিনে নিয়ে নিজের বলে চালিয়ে দেয় । এই নিয়ে বড়ো বড়ো মকদ্দমা হয়ে গেছে । হাজারদাঁতিরা পঞ্চাশদাঁতির ঘরে মেয়ে দেয় না । একজন সামান্য পনেরোদাঁতি ওদের কেট্‌কু নাড়ু খেতে গিয়ে হঠাৎ দম আট্‌কিয়ে মারা গেল , হাজারদাঁতির পাড়ায় তাকে পোড়াবার লোক পাওয়াই গেল না । তাকে লুকিয়ে ভাসিয়ে দিলে চৌচঙ্গী নদীর জলে । তাই নিয়ে নদীর দুই ধারের লোকেরা খেসারতের দাবি করে নালিশ করেছিল , লড়েছিল প্রিভিকৌন্সিল পর্যন্ত।

আমি হাঁপিয়ে উঠে বললুম , থামো , থামো ! কিন্তু জিগেস করি , তুমি যে কাহিনীটা আওড়ালে তার বিশেষ গুণটা কী ।

ওর গুণটা এই , এটা কুলের আঁঠির চাটনি নয় । যা কিছুই জানি নে তাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করবার শখ মেটালে কোনো নালিশের কারণ থাকে না । কিন্তু , এতেও যে আছে উঁচু দরের হাসি তা আমি বলি নে । বিশ্বাস করবার অতীত যা তাকেও বিশ্বাস করবার যোগ্য করতে পার যদি , তা হলেই অদ্ভুত রসের গল্প জমে । নেহাত বাজারে - চল্‌‍তি ছেলে - ভোলাবার সস্তা অত্যুক্তি যদি তুমি বানাতে থাক তা হলে তোমার অপযশ হবে , এই আমি বলে রাখলুম।

আমি বললেম , আচ্ছা , এমন করে গল্প বলব যাতে পুপুদিদির বিশ্বাস ভাঙতে ওঝা ডাকতে হবে।

ভালো কথা , কিন্তু লাটসাহেবের বাড়িতে যাওয়া বলতে কী বোঝায় ।

বোঝায় , তুমি বিদায় নিলেই ছুটি পাই । একবার বসলে উঠতে চাও না , তাই ‘তুমি যাও' অনুরোধটা সামান্য একটু ঘুরিয়ে বলতে হল।

বুঝেছি , আচ্ছা , তবে চললুম ।