স্রোতের গতি/পঞ্চম পরিচ্ছেদ

পঞ্চম পরিচ্ছেদ

নবাগত

ধোবা অনেক দিন কাপড় দিয়া যায় নাই। অনেকগুলি ময়লা-কাপড় খাটের নীচে পুটুলি বাঁধা পড়িয়া আছে। পরণের শাড়ী জ্যাকেটগুলিও ময়লা হইয়া আসিয়াছে। সকালবেলা অত্যন্ত অপ্রসন্নচিত্তে ধোবার তাগিদের জন্য অমিয়া মীনার খোঁজে গিয়া দেখিল, সে তখন বাগানের অপর অংশের অব্যবহার্য্য ঘরগুলির প্রসাধনে ব্যাপৃত। একগাছি লাঠির মাথায় ঝাঁটা বাঁধিয়া, টুলের উপর দাঁড়াইয়া, নাকে মুখে পর্য্যাপ্ত পরিমাণে ধূলা মাখিয়া ও উড়াইয়া, মাথার চুলে একরাশ ঝুল লাগাইয়া ঘর ঝাড়ার কাজ শেষ করিয়া এইবার সে ফুলগাছের টবগুলি কোথায় কি ভাবে সাজাইলে বাহার খুলিবে, তাহাই পর্য্যবেক্ষণ করিয়া দেখিতেছিল। অমিয়াকে ঘরে ঢুকিতে উদ্যত দেখিয়া হাসিয়া হাত নাড়িয়া নিবারণ করিয়া কহিল―“এস না, এস না ভাই, দেখ্‌চ না কি রকম ধূলো উড়্‌চে। কাপড় মাথা সব ময়লা হ’য়ে যাবে।” অমিয়া অপ্রসন্ন-হাস্যে কহিল―“সবই ত সাফ্‌ আছে, তার ময়লা হবার ভয়! কিন্তু সকালবেলা তোমার এ কি খেলা হ’চ্চে শুনি। উত্তম কোথা গেল, তাকে ডাক্‌লেও ত হ’ত?”

 ফুলের টবগুলি যথাস্থানে সাজাইয়া, টেবিল চেয়ারগুলি কোথায় কি ভাবে রাখিলে মানাইবে মীনা মনে মনে তাহারই একটা খস্‌ড়া করিতেছিল; অমিয়ার কথায় মুখ না ফিরাইয়াই কহিল―“উত্তম এখন ত গরু দেখ্‌ছে। জাব দেবে, জল তুল্‌বে, সে ত এখন আর ছুটি পাবে না ভাই। ঠাকুরপো কখন এসে পড়্‌বেন, তার আগে ঘরটরগুলো সাজিয়ে গুছিয়ে রাখতে হবে। একেই ত মেয়েদের নিন্দে কর্‌তে পেলে তাঁর চতুর্ম্মুখ হয়। তাঁর বিশ্বাস, আহার নিদ্রা পরচর্চ্চা ছাড়া আমাদের মেয়ে-জাতটার আর কোন কাজ নেই।”

 মীনা ঝাড়ন দিয়া টেবিল চেয়ারের ধূলা ঝাড়িতে আরম্ভ করায় অমিয়া বিরক্তভাবে কহিল―“মেয়েরা যদি এত নির্গুণ তবে ওঁদের সংসার চালায় কে? বিনা মাইনের কেনা দাসী পেয়েছেন বলেই না এত বাবুগিরি! নিজেদের সুবিধের জন্যে মেয়েদের এমন করে চেপে না রাখ্‌লে কে ওঁদের রেঁধে ভাত দিত, ছেলের ধাই হত, জুতোর ফিতে চাপকানের বোতাম খুল্‌ত, রাত জেগে ওঁদের আর ওঁদের ছেলেপুলেদের সেবা কর্‌তো, ওষুধ দিত, হেঁটে এলে পায়ে তেল মালিস্ কর্‌ত শুনি? সত্যি বল্‌চি মীনা, তোমাদের নিজেদের দোষেই তোমাদের এত দুর্গতি।”

 অমিয়া হঠাৎ স্বর নামাইয়া একটু হাসির সহিত কহিল―প্রাণতোষবাবুর সম্বন্ধে আমি কিছু বল্‌চি না। তাঁকে অবশ্য আমি শ্রদ্ধা করি―আমি বল্‌চি সাধারণ পুরুষসমাজকে। সহ্য ক’রে, দাসীপণা করে ওঁদের তোমরা মাথায় তুলেচ বলেই না ওঁদের এত সাহস বেড়েচে―যে যার নোড়া তারই দাঁত ভাঙ্গতে চান! মেয়েরা একবার প্রতিজ্ঞা করে সব কুমারী থাকুক্ দেখি―কেমন না ওঁদের বিষদাত ভাঙ্গে? দিনকতক নিজে নিজে চালান না সংসার, দেখুন না তাতে কত সুখ! আর আমরাও বুঝিয়ে দেবো যে, পুরুষের দাসীত্বই আমাদের একমাত্র কাম্য নয়। আমরাও মানুষ―মানুষের অবশ্যপ্রাপ্য অধিকার লাভের ইচ্ছা ও শক্তি আমাদেরও আছে। আর, ন্যায়সঙ্গত বলে একদিন তা আমরা অধিকারও করব।”

 মীনা ঝাড়নখানা দেওয়ালের একটা হুকে টাঙ্গাইয়া রাখিয়া একটুখানি মিষ্ট হাসিয়া কহিল―“কে জানে ভাই, ঠাকুরপো ত বলেন আমরাই ওঁদের সংসার-যাত্রার পথে বিরাট্‌ বাধা। ভাগ্যে তাঁদের ইঞ্জিনের জোর বেশী, তাই এই গাধাবোটগুলোকে কোন মতে ওঁরা টেনে নিয়ে যেতে পারেন। নইলে নিজেদের জোরে চলাফেরা করারও নাকি আমাদের শক্তি নেই। তিনি ত বিয়ে করবেন না বলেই প্রতিজ্ঞা করে বসে আছেন। এতেই বোঝ না, মেয়েদের উপর তাঁর কেমন ভক্তি।”

 এই নূতন লোকটির আগমন-সম্ভাবনা অমিয়ার মনে এতক্ষণ যে অস্বস্তির ছায়া ফেলিয়াছিল, তাহার মতের পরিচয় লাভে সে বিরক্তির ভাবটুকু যেন সরিয়া গিয়া বেশ একটু কৌতুকপূর্ণ আগ্রহের ভাব জাগিয়া উঠিল। এই নারীদ্বেষী লোকটিকে তবে ত ভাল করিয়া একবার দেখা উচিত!

 চিন্তাপূর্ণ-চিত্তে অমিয়া মাঠে বেড়াইতে বাহির হইয়া গেল। আজ আর হব্‌সেন বা খোকা কাহারও তত্ত্ব লইতে তাহার মনে পড়িল না। মনের সবখানটাই তখন সেই অদৃষ্ট অভ্যাগতের চিন্তায় পূর্ণ হইয়া উঠিয়াছিল। এই নূতন লোকটিকে সে কি ভাবে গ্রহণ করিতে পারিবে, ইহাই যেন তাহার মনের এক মাত্র সমস্যা হইয়া উঠিয়াছিল।

 লোকটার চিন্তা মনে উঠিতে প্রথমেই তাহার মনে হইল—তাঁহার চেহারা কেমন? মনে হইল―মোটাসোটা, শ্যামবর্ণ, দাড়ীগোঁফ-কামান, মাথার চুল খুব ছোট করিয়া ছাঁটা, চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ, চুলের সঙ্গে চিরুণীর সম্পর্ক রাখার প্রয়োজন হয় না। পরণে সাদা ধুতি, গরদের কোট, বেশ একটুখানি মুরুব্বি-আনাভাবের কথাবার্ত্তা, একটু দাম্ভিক ভাব!

 অমিয়া স্থির করিল, এই অপ্রিয় লোকটিকে সে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করিয়া এড়াইয়াই চলিবে। নারীকে যে ঘৃণা করে, নারীও তাহাকে ঘৃণা করিতে জানে। কিন্তু সব সমস্যার সমাধান করিয়া এইবার বোধ হয় তাহার বাড়ী ফেরাই উচিত হইতেছে। নিজের পরিপুষ্ট বাহুখানির পানে চাহিয়া একটুখানি সলজ্জ হাসির রেখা তাহার আরক্ত অধরপুটে ফুটিয়া উঠিল। মনে হইল ইহার পর শরীর সারান কোন শিক্ষিতা মহিলার পক্ষেই সঙ্গত হইবে না। এখানের জলবাতাসের গুণে সে যেমন সারিয়াছে তেমনি ময়লাও হইয়াছে, কাপড়-চোপড়ের অবস্থাও তাই। এখন তাহার পরিচিত বন্ধু-বান্ধবেরা তাহাকে দেখিলে, সেই তন্বী গৌরী শোভনা সুন্দরীর এই আশ্চর্য্য পরিবর্ত্তনে একেবারে অবাক্ হইয়া যাইতেন―মনে করিতে মনে মনে সে খুসী হইয়া লজ্জানুভব করিতেছিল।

 রোদের তাপ মাথা ও মুখে কষ্টকর হইয়া বুঝাইয়া দিল, এইবার গৃহে ফেরা একান্তই আবশ্যক। সেই সঙ্গে চিন্তার ধারা পরিবর্ত্তিত হওয়ায় প্রথমেই মনে হইল, মীনা এতক্ষণ তাহার চায়ের বাটী হাতে তাহারই প্রতীক্ষায় ব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছে। আজ কোথায় মীনার একটুখানি সাহায্য করিয়া তাহার কোন কাজে লাগিবে, তা না হইয়া নিজের কাজেই তাহাকে জোড়া করিয়া রাখিয়াছে। মাসীমা তাহাকে সংসারে কোন কাজে না লাগাইয়া এমনি অকর্ম্মণ্য করিয়া তুলিয়াছেন যে, কাজের প্রয়োজন কখন ও কোথায় তাহা সে অনুভব করিতেও পারে না।

 ফিরিবার সময় নবাগতের দৃষ্টি এড়াইবার ইচ্ছায় ঘুরিয়া সে পিছনের দরজা দিয়া বাড়ী ঢুকিল। যেদিন প্রথম সে এখানে আসে, এই পথ দিয়াই বাড়ী ঢুকিয়াছিল! আজও গেটের দুই পাশে দুইটা প্রকাণ্ড গাই তাহাদের বাঁকা শিং লইয়া দুর্গ-রক্ষকের ন্যায় সগর্ব্বে দাঁড়াইয়া আছে। বাধা পাইয়া মুহূর্ত্তের জন্য সে থমকিয়া দাঁড়াইয়া পড়িল। কিন্তু আজ আর সেদিনের ন্যায় নিজকে তাহার বিপন্ন বলিয়া মনে হইল না। দৃষ্টান্ত ও অভিজ্ঞতা তাহাকে সাহসী করিয়াছে।

 মীনার অনুকরণে সাহস করিয়া সে গরু দুটির গায়ে ধীরে ধীরে হাত দিয়া ঠেলা দিতেই তাহারা পথ ছাড়িয়া দিয়া সরিয়া দাঁড়াইল। স্নেহপালিত প্রকাণ্ড পাহাড়ী-গাই দু’টি নিরীহ মার্জ্জার-শিশুর ন্যায় যেন অমিয়ার আদর প্রত্যাশায় মাথা দিয়া তাহার গাত্র স্পর্শ করিয়া আদর জানাইল। তাহাদের স্বচ্ছ বৃহৎ চক্ষুর পানে চাহিয়া চাহিয়া অমিয়ার মনে হইতেছিল, সে দৃষ্টি যেন বলিতেছিল, বাহির দেখিয়া অন্তরের বিচার করিও না―প্রকাণ্ড শরীরের মধ্যেও অত্যন্ত নিরীহ প্রাণ বাস করিতে পারে।

 বাড়ী ঢুকিতেই বিলম্বের জন্য মীনার নিকট মৃদু স্নেহতিরস্কারের সহিত খবর পাইল, রণেন্দ্রবাবু যথাসময়ে আসিয়া পৌঁছাইয়াছেন, এবং এই কতক্ষণ তিনি স্নানার্থে নদীতীরে গিয়াছেন। খোকাবাবু উত্তমের কোলে চাপিয়া তাঁহার অনুবর্ত্তী হইয়াছেন। এবং ধোবা আসিয়া অনেকক্ষণ বসিয়া আছে। এবেলার মত নবাগতের সহিত সাক্ষাতের সম্ভাবনা চুকিয়া যাওয়ায় অমিয়া মনে মনে খুসী হইয়া, জলযোগ করিয়া খাতা পেন্‌সিল লইয়া কাপড় মিলাইতে বসিয়া গেল।