গৌড়রাজমালা/কৈবর্ত্ত-বিদ্রোহ



গৌড়রাজমালা ৭৮.png

[৪৯ পৃষ্ঠা]
কৈবর্ত্তরাজের প্রতিষ্ঠাস্তম্ভ।

 সন্ধ্যাকর নন্দী-বর্ণিত এই প্রজা-বিদ্রোহের কিছু কিছু আভাস তৎকালের তাম্রশাসনে এবং শিলালিপিতেও পাওয়া যায়। কামরূপের রাজা বৈদ্যদেবের তাম্রশাসনে রামপাল সম্বন্ধে উক্ত হইয়াছে (৪ শ্লোক):—

 “যুদ্ধ-সাগর লঙ্ঘন করিয়া, ভীমরূপ রাবণ বধ করিয়া, জনকভূ উদ্ধার করিয়া, রামপাল ত্ৰিজগতে দাশরথি রামের ন্যায় যশ বিস্তার করিয়াছিলেন।”

 “রামপালচরিতের” টীকাকারের মতানুসারে, “জনকভূ” বরেন্দ্রী-অর্থে গ্রহণ করিলে, এই শ্লোকেও কৈবর্ত্ত-বিদ্রোহের প্রমাণ পাওয়া যায়। ১৯০৮ সালের মার্চ্চ মাসে সারনাথের ভগ্নস্তূপের একাংশ খননকালে আবিষ্কৃত একখানি শিলালিপিতে[১] “রামপালচরিতে” উল্লিখিত কয়েক জন পাত্রের এবং কোন কোন ঘটনার উল্লেখ দৃষ্ট হয়। কান্যকুব্জের গহড়বাল-রাজ গোবিন্দচন্দ্রের অন্যতমা মহিষী কুমরদেবী কর্ত্তৃক একটি বৌদ্ধবিহার-প্রতিষ্ঠা-উপলক্ষে এই শিলালিপি উৎকীর্ণ হইয়াছিল। ইহাতে বর্ণিত হইয়াছে,—“পীঠিকা”র বা “পীঠী”র দেবরক্ষিত নামক এক জন রাজা ছিলেন।

“गौड़ेद्वैतभटः सकाण्ड-पटिकः क्षत्रैक-चूड़ामणिः
प्रख्यातो महणाङ्गपः क्षितिभुजाम्मान्यो भवन्मातुलः।
तं जित्वा युधि देवरक्षित मधात् श्रीरामपालस्य यो
लक्ष्मीं निर्जित-वैरि-रोधनतया देदीप्यमानोदयाम्॥”

 “গৌড়ে অদ্বিতীয় যোদ্ধা, ধনুর্দ্ধর (?), ক্ষত্ৰকুলের একমাত্র চূড়ামণি, নরপালগণের সম্মানার্হ মাতুল, মহন নামক অঙ্গপতি ছিলেন। তিনি দেবরক্ষিতকে পরাজিত করিয়া, শক্রর বাধা বিদূরিত হওয়ায়, অধিকতর উজ্জ্বল শ্রীরামপালের রাজলক্ষ্মী অক্ষুণ্ণ রাখিয়াছিলেন।”

 “রামপালচরিতে” [২।৮ শ্লোকের টীকায়] রামপালের মাতুল মহন কর্ত্তৃক পীঠীপতি দেবরক্ষিতের পরাজয় উল্লিখিত হইয়াছে। কুমরদেবীর এই শিলালিপির সাহায্যে রামপালের রাজত্বের সময় নিরূপণ করা যাইতে পারে। এই লিপিতে উক্ত হইয়াছে,—মহনদেব শঙ্করদেবী নাম্নী দুহিতাকে পীঠীপতির করে অর্পণ করিয়াছিলেন। কুমরদেবী এই শঙ্করদেবীর কন্যা, এবং গোবিন্দচন্দ্রের মহিষী। কুমরদেবী এবং গোবিন্দচন্দ্রের বংশাবলী পাশাপাশি রাখিলে দেখা যায়,—

 
 
 
পিতা
 
 
 
 
পিতা
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
অঙ্গাধিপ মহনদেব।
 
ভগিনী=তৃতীয় বিগ্রহপাল-পত্নী।
 
গাহড়বাল চন্দ্রদেব।
(খৃঃ অঃ + ১০৯০-১০৯৭ +)
 
 
 
 
 
 
 
 
শঙ্করদেবী।রামপাল।মদনচন্দ্র।
 
 
 
 
 
 
কুমরদেবী।
 
 
 
 
 
 
গোবিন্দচন্দ্র।
(খৃঃ অঃ + ১১১৪-১১৫৪ +)
 
 
 
 
 
 

 অর্থাৎ মহনদেব গাহড়বাল-রাজ চন্দ্রদেবের সমকালবর্ত্তী ছিলেন। মহনদেব এবং রামপাল, সম্পর্কে মামা-ভাগিনেয় হইলেও, উভয়ে সম্ভবত সমবয়সী ছিলেন। “রামপালচরিতে” উক্ত হইয়াছে (৪।৮-১০ শ্লোক), মহনদেব (মথন) পরলোক গমন করিয়াছেন শুনিয়া, “মুদ্গিরিতে” (মুঙ্গেরে) অবস্থিত রামপাল গঙ্গাগর্ভে প্রবেশ করত তনুত্যাগ করিয়াছিলেন। সুতরাং রামপাল কান্যকুব্জ-রাজ চন্দ্রদেবের সমসাময়িক, এবং একাদশ শতাব্দের শেষ পাদ পর্য্যন্ত গৌড়-রাজ্যের রাজপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন, এরূপ অনুমান করা যাইতে পারে।

 “রামপালচরিতের” যে অংশে ভীমের বন্ধনের পরবর্ত্তী ঘটনা সকল বর্ণিত হইয়াছে, তাহার টীকা নাই। মহামহোপাধ্যায় শ্রীযুক্ত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়ের মতানুসারে, ভীম ধৃত হইলে, তদীয় সুহৃৎ হরি, ছত্রভঙ্গ বিদ্রোহী সেনা পুনঃ সম্মিলিত করিয়া, যুদ্ধার্থ অগ্রসর হইয়াছিলেন। ভীষণ যুদ্ধের পর, হরি ধৃত এবং নিহত হইয়াছিলেন। ভীমও সম্ভবত নিহত হইয়াছিলেন। এই রূপে বিদ্রোহানল নির্ব্বাপিত হইলে, পালবংশের জন্মভূমি [জনকভূ] আবার পাল-নরপালের হস্তগত হইয়াছিল।

 বিদ্রোহ দমন করিয়া, রামপাল “রামাবতী” নামক এক নূতন নগর নির্ম্মাণ করিয়া, বরেন্দ্রভূমির শোভাবর্দ্ধন করিয়াছিলেন। তিনি এক দিকে যেমন অভিনব নগর-নির্ম্মাণে রত ছিলেন, আর এক দিকে তেমনি নষ্টপ্রায় গৌড়-রাজশক্তির পুনরুজ্জীবন-সাধনে যত্নবান হইয়াছিলেন। সন্ধ্যাকর লিখিয়াছেন—পূর্ব্বদিকের এক জন নরপতি, পরিত্রাণ পাইবার জন্য, রামপালকে বর-বারণ, নিজের রথ এবং বর্ম্ম উপহার প্রদান করিয়াছিলেন। যথা—

“स्वपरित्राण-निमित्तं पत्या यः प्राग्दिशीयेन।
वर-वारणेन च निज-स्यन्दन-दानेन वर्म्मणाराधे॥” ३৷४४॥

 বরেন্দ্রবাসী সন্ধ্যাকর যাঁহাকে “প্রাগ্দিশীয়” বলিয়াছেন, তিনি সম্ভবত বাঙ্গালার পূর্ব্ব সীমান্তের কোন পার্ব্বত্য-প্রদেশের নৃপতি। রামপাল কামরূপ জয় করিয়া, গৌড়রাষ্ট্রভুক্ত করিয়াছিলেন [“বিগ্রহনির্জ্জিতকামরূপভৃৎ”]। এই কামরূপ-জয় যে সন্ধ্যাকর নন্দীর কল্পনা-প্রসূত নহে, কুমারপালের প্রসঙ্গে আমরা তাহা দেখিতে পাইব। রামপাল উৎকলে এবং কলিঙ্গেও স্বীয় প্রাধান্য-স্থাপনের চেষ্টা করিয়াছিলেন। সন্ধ্যাকর নন্দী লিখিয়াছেন—

“भवभूषण-सन्ततिभूव मनुजग्राह जित मुत्कलत्रं यः।
जगदवतिस्म समस्तं, कलिङ्गत स्तान् निशाचरान् निघ्रन्॥”३৷४५॥

 “ভবভূষণ (চন্দ্রের) সন্ততির রাজ্য উৎকল জয় করিয়া, তৎপ্রতি যিনি অনুগ্রহ করিয়াছিলেন, এবং চৌরগণকে নিহত করিয়া, কলিঙ্গ হইতে আরম্ভ করিয়া সমস্ত জগৎ প্রতিপালন করিয়াছিলেন।”

 রামপাল যখন গৌড়ের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত, তখন গঙ্গ-বংশীয় অনন্তবর্ম্মা-চোড়গঙ্গ [রাজত্ব ১০৭৮-১১৪২ খৃষ্টাব্দ] কলিঙ্গের রাজা ছিলেন, এবং তিনিই উৎকল অধিকার করিয়াছিলেন। গঙ্গ-বংশীয় নৃপতিগণ চন্দ্র বংশোদ্ভব বলিয়া পরিচিত ছিলেন।[২] সুতরাং এ স্থলে সন্ধ্যাকর নন্দী চোড়-গঙ্গকে স্মরণ করিয়াই, উৎকলকে “ভবভূষণ-সন্ততিভূ” বলিয়াছেন।[৩] কিন্তু রামপাল কর্ত্তৃক চোড়-গঙ্গের এই পরাজয়-কাহিনী কতদূর সত্য, তাহা নির্ণয় করা কঠিন। গঙ্গ-বংশীয় নৃপতিগণের মধ্যে চোড়-গঙ্গ সর্ব্বাপেক্ষা পরাক্রান্ত ছিলেন। গঙ্গ-বংশীয় নৃপতিগণের তাম্রশাসনে উক্ত হইয়াছে,—চোড়-গঙ্গ গঙ্গার তীর পর্য্যন্ত স্বীয় আধিপত্য বিস্তার করিয়াছিলেন, এবং গঙ্গাতীরবর্ত্তী যুদ্ধক্ষেত্রে “মন্দারাধিপতিকে” পরাজিত এবং আহত করিয়াছিলেন।[৪] এই সূত্রেই হয়ত কলিঙ্গ-পতির সহিত গৌড়-পতির সংঘর্ষ উপস্থিত হইয়াছিল, এবং কলিঙ্গ-পতিকে প্রতিদ্বন্দ্বীর অনুগ্রহ প্রার্থনা করিতে হইয়াছিল। চোড়-গঙ্গের অতি দীর্ঘকালব্যাপী রাজত্বের প্রথম ভাগে, তাঁহাকে রামপালের সম্মুখীন হইতে হইয়াছিল। সেই সময়, গৌড়াধিপের নিকট মস্তক অবনত করা অসম্ভব নহে; এবং রামপালের মৃত্যুর পর, হয়ত চোড়-গঙ্গ প্রবলতর হইয়াছিলেন। সন্ধ্যাকর নন্দী যে সত্যের অপলাপ করেন নাই, কুমরদেবীর সারনাথের শিলালিপি এবং বৈদ্যদেবের তাম্রশাসন তাহার সাক্ষ্যদান করিতেছে। সুতরাং তাঁহার বর্ণিত রামপালের কলিঙ্গ-জয়-কাহিনী অমূলক বলিয়া উপেক্ষিত হইতে পারে না। রাঢ়ও অবশ্য রামপাল কর্ণাট-রাজের কবল হইতে উদ্ধার করিয়াছিলেন। দেবপাড়ার শিলালিপি-অনুসারে, সামন্তসেন যে সকল কর্ণাটলক্ষ্মী-লুণ্ঠনকারী দুর্বৃত্তগণকে বিনষ্ট করিয়াছিলেন, তাহারা গৌড়াধিপেরই সেনা। সামন্তসেন এই সকল “দুর্বৃত্তগণকে” বিনাশ করিয়াও, রাঢ়ে কর্ণাট-রাজের আধিপত্য অটুট রাখিতে না পারিয়া হয়ত শেষ বয়সে বানপ্রস্থ অবলম্বন করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন।

 বরেন্দ্রভূমির বিদ্রোহানল নির্ব্বাণ করিয়া, এবং কামরূপ ও কলিঙ্গে আধিপত্য বিস্তার করিয়া, রামপাল যে গৌড়রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন, সেই অভিনব গৌড়রাষ্ট্রের সহিত রামপালের পূর্ব্বপুরুষগণের শাসিত গৌড়রাষ্ট্রের অনেক প্রভেদ ছিল। প্রজাসাধারণের নির্ব্বাচিত গৌড়াধিপ গোপালের গৌড়রাষ্ট্র, প্রজার প্রীতির এবং প্রজাশক্তির সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু হতভাগ্য দ্বিতীয় মহীপালের “অনীতিকারম্ভের” ফলে, এবং দিব্বোক-নিয়ন্ত্রিত বিদ্রোহানলে, সেই ভিত্তি ভস্মীভূত হইয়া গিয়াছিল। রামপালের পক্ষে, গৌড়রাজ্যের বিচ্ছিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পুনরায় একত্রিত করিয়া, উহার পুনর্গঠন সম্ভব হইলেও, সেই দেহে প্রাণপ্রতিষ্ঠা,—সেই ভগ্ন অট্টালিকার বহিরঙ্গের সংস্কার সম্ভব হইলেও,—উহার নষ্টভিত্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা, অসম্ভব হইয়াছিল। সুতরাং রামপালের মৃত্যুর পরই, আবার রাষ্ট্রের বিভিন্ন অংশে, বিদ্রোহ উপস্থিত হইল। কিন্তু রামপালের জ্যেষ্ঠ পুত্র “গৌড়েশ্বর” কুমারপালের, এবং তাঁহার প্রধান-সচিব এবং সেনাপতি, বৈদ্যদেবের বাহুবলে, গৌড়রাষ্ট্রের পতন আরও কিছু কালের জন্য স্থগিত রহিল। বৈদ্যদেবের [কমৌলিতে প্রাপ্ত] তাম্রশাসনে বৈদ্যদেব কর্ত্তৃক [অনুত্তর বঙ্গে) দক্ষিণবঙ্গে, নৌ-যুদ্ধে জয়লাভ-প্রসঙ্গে, পুনরায় বিদ্রোহ সূচিত হইয়াছে (১১ শ্লোক)। এই সময়ে কামরূপের সামন্ত-নরপতিও বিদ্রোহাচরণ করিয়াছিলেন। বৈদ্যদেবের তাম্রশাসনে উক্ত হইয়াছে—

 “পূর্ব্বদিগ্বিভাগে বহুমান-প্রাপ্ত তিম্‌গ্যদেব-নৃপতির বিদ্রোহ-বিকার শ্রবণ করিয়া, গৌড়েশ্বর তাঁহার রাজ্যে এইরূপ [গুণগ্রাম-সমন্বিত] বিপুল কীর্ত্তিসম্পন্ন বৈদ্যদেবকে নরেশ্বর-পদে নিযুক্ত করিয়াছিলেন। সাক্ষাৎ মার্ত্তণ্ড-বিক্রম বিজয়শীল সেই বৈদ্যদেব [আপন] তেজস্বী প্রভুর আজ্ঞাকে মাল্যদামের ন্যায় মস্তকে ধারণ করিয়া, কতিপয় দিবসের দ্রুত-রণযাত্রার [অবসানে] নিজ ভুজবলে সেই অবনিপতিকে যুদ্ধে পরাভূত করিবার পর, [তদীয় রাজ্যে] মহীপতি হইয়াছিলেন (১৩-১৪ শ্লোক)।”

  1. Epigraphia Indica, Vol. IX, pp. 323-326.
  2. अजनि रजनिजानि-वंशचूड़ा-
    मणि रणिमादि-गुणेन चोड़गङ्गः॥

    Inscription of Svapnesvara, Verse 7, Epigraphia Indica, Vol. VI, p. 200

  3. “রামচরিতের” ভূমিকায় শাস্ত্রী মহাশয় লিখিয়াছেন,—“He (Rāmapāla) conquered Utkala and restored it to the Nāgvamsis” ইহা দ্বারা বুঝা যায়, শাস্ত্রী মহাশয় “ভবভূষণ-সন্ততি”-পদ “নাগবংশী”-অর্থে গ্রহণ করিয়াছেন। নাগ ভবের (শিবের) ভূষণ হইলেও, নাগবংশীয় কোন রাজা উড়িষ্যায় কখনও রাজত্ব করিয়াছেন বলিয়া এ পর্য্যন্ত জানা যায় নাই। পক্ষান্তরে “রামচরিতের” (২।৫) টীকা হইতে জানা যায়, রামপালের রাজ্যলাভের অব্যবহিত পূর্ব্বে, উৎকলে “কেশরী”-উপাধিধারী একজন নৃপতি ছিলেন। ভীমের সহিত যুদ্ধোদ্যত রামপালের সহিত যাঁহারা যোগদান করিয়াছিলেন, তন্মধ্যে “উৎকলেশ কর্ণকেশীর”র পরাভবকারী দণ্ডভুক্তি-ভূপতি জয়সিংহের নাম দৃষ্ট হয়।
  4. J. A. S. B., Vol. LXV, Part. p. 241.