গৌড়রাজমালা/গৌড়ে বৎসরাজ


 যশোবর্ম্মা কর্ত্তৃক “গৌড়বধ” হইতে, গৌড়মণ্ডলের অপরাপর অংশে ক্রমাগত রাষ্ট্রবিপ্লব চলিতে থাকিলেও, খড়্গ-রাজগণের শাসনাধীনে বঙ্গ সম্ভবতঃ শান্তিলাভ করিয়াছিল। কিন্তু ৭৮৪ খৃষ্টাব্দের পরে, আর এক বহিঃশত্রু বাঙ্গালা আক্রমণ করিয়া, বঙ্গের শান্তিভঙ্গ করিয়াছিল, এবং গৌড়ের বিপ্লবানল প্রবলতর করিয়া তুলিয়াছিল। বাঙ্গালার এই নবাগত অতিথি গুর্জ্জরের (বর্ত্তমান রাজপুতনার) প্রতীহার-বংশীয় রাজা বৎসরাজ। জিনসেন প্রণীত জৈন-হরিবংশের উপসংহারে উক্ত হইয়াছে—

“शाकेष्वब्दशतेषु सप्तसु दिशं पंचोत्तरेषूत्तरां
पातींट्रायुधनाम्नि कृष्णनृपजे श्रीवल्लभे दक्षिणां।
पूर्वां श्रीमदवन्तिभूभृति नृपे वत्सराजे परां
सौर्याणामधिमंडलं जययुते वीरे वराहेवति॥”

 “৭০৫ শাক (৭৮৩-৭৮৪ খৃষ্টাব্দে) যখন ইন্দ্রায়ুধ নামক (রাজা) উত্তরদিক্ পালন করিতেছিলেন; কৃষ্ণরাজের পুত্র শ্রীবল্লভ (রাষ্ট্রকূটরাজ ধ্রুব) দক্ষিণদিক্ পালন করিতেছিলেন; যখন পূর্ব্ব দিক্ শ্রীমান্ অবন্তিরাজের শাসনাধীনে, অপর (পশ্চিম) দিক্ বৎসরাজ (নামক) নৃপতির শাসনাধীনে; এবং সৌর্য্যগণের রাজ্য বীর জয়বরাহের শাসনাধীনে ছিল।”[১]

 এই পশ্চিম দিক্‌পাল বৎসরাজ অবন্তি(মালব)-রাজকে পরাজিত, এবং বাঙ্গালা আক্রমণ করিয়া, গৌড়পতি এবং বঙ্গপতি উভয়কেই পরাভূত করিয়াছিলেন; এবং উভয়ের রাজছত্ৰ কাড়িয়া লইয়াছিলেন। কিন্তু যশোবর্ম্মার ন্যায় বৎসরাজকেও, শত্রুর তাড়নায়, অচিরকালমধ্যেই গৌড়বঙ্গ-বিজয়ফল-সম্ভোগে বঞ্চিত হইতে হইয়াছিল। রাষ্ট্রকূট-রাজ ধ্রুব বৎসরাজকে নবজিত প্রদেশনিচয় ত্যাগ করিয়া, রাজপুতনার মরুভূমিতে আশ্রয় লইতে বাধ্য করিয়াছিলেন। ধ্রুব ৭৭৫ হইতে ৭৯৪ খৃষ্টাব্দের মধ্যে রাষ্ট্রকূট-সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ধ্রুবের পুত্র এবং উত্তরাধিকারী তৃতীয় গোবিন্দ বৎসরাজকে দমন রাখিবার জন্য, অনুজ ইন্দ্ররাজকে লাটের [দক্ষিণ গুজরাতের] “মহাসামন্তাধিপতি” পদে নিযুক্ত করিয়াছিলেন। তৃতীয় গোবিন্দের ওয়ানি এবং রাধনপুরের তাম্রশাসনে বৎসরাজের গৌড়বঙ্গ-বিজয় এইরূপে সূচিত হইয়াছে,—“তিনি (ধ্রুব) অতুল-পরাক্রম সেনাবলের দ্বারা, হেলায় গৌড়রাজ্য জয়-জনিত অহঙ্কারে মত্ত বৎসরাজকে অচিরাৎ দুর্গম মরুমধ্যে তাড়িত করিয়া, কেবল যে (তাঁহার) গৌড়জয়-লব্ধ শরদিন্দু-ধবল ছত্ৰদ্বয়ই কড়িয়া লইয়াছিলেন এমন নহে; তৎক্ষণাৎ তাঁহার দিগন্তব্যাপী যশও কাড়িয়া, লইয়াছিলেন।”[২] ইন্দ্ররাজের পুত্র কর্ক্করাজের ৭৩৪ শকের (৮১২ খৃষ্টাব্দের) বরোদায় প্রাপ্ত তাম্রশাসনে এই ঘটনা আরও স্ফুটতর হইয়াছে। এই তাম্রশাসনে উক্ত হইয়াছে,—“প্রভু (তৃতীয় গোবিন্দ) পরাজিত মালবরাজকে রক্ষা করিবার জন্য, তাঁহার (কর্ক্করাজের) এক হস্তকে, গৌড়েন্দ্র এবং বঙ্গপতিবিজেতা, দুরাশামত্ত গুর্জ্জরপতির আক্রমণার্থ আগমন-পথের সুদৃঢ় অর্গলে পরিণত করিয়া, অপর হস্তকে রাজ্যফলস্বরূপ উপভোগ করেন।”[৩] এই “গুর্জ্জর-পতি”ও অবশ্যই বৎসরাজ। কারণ, ধ্রুব কর্ত্তৃক গুজরাত ও মালবে রাষ্ট্রকূট-প্রাধান্য স্থাপিত হইলে, আর কোনও গুর্জ্জরপতির পুনর্ব্বার গৌড়বঙ্গ-বিজয়ের অবসর পাইবার সম্ভাবনা ছিল না। কর্ক্করাজের এই তাম্রশাসন প্রমাণ করিতেছে,—বৎসরাজ ৮১২ খৃষ্টাব্দ পর্য্যন্ত জীবিত ছিলেন।

  1. Indian Antiquary, XV. P. 141; Journal of the Royal Asiatic Society, 1909 p. 253.
  2. “हेला-स्वीकृत-गौड़राज्यकमलामत्तं प्रवेश्याचिरा-
    दुर्मागं मरुमध्य मप्रतिबलै र्यो वत्सराजं बलैः।
    गौड़ीयं शरदिन्दूपादधवलं छत्रद्वयं केवलं
    तस्मान्नाहृत तद्यशोपि ककुभां प्रान्ते स्थितं तत्क्षणात्॥ ५॥”

    Indian Antiquary, Vol. XI, p. 157; Epigraphia Indica, Vol. VI, p. 242.

  3. “गौड़ेन्द्रवङ्गपति-निर्ज्जय-दुर्व्विदद्ध-सद्गुर्ज्जरेश्वर-दिगर्गलतां च यस्य।
    नीत्वा भुजं विहतमालवरक्षणार्थं स्वामी तथान्यमपि राज्य-फलानि भुंक्ते॥”

    Indian Antiquary, Vol. XII, pp. 156-165.