মহাভারত (রাজশেখর বসু)/বনপর্ব/কির্মীরবধপর্বাধ্যায়

॥কির্মীরবধপর্বাধ্যায়॥

৪। কির্মীরবধের বৃত্তান্ত

 মৈত্রেয় চ’লে গেলে ধৃতরাষ্ট্র বিদুরকে বললেন, তুমি কির্মীরবধের বৃত্তান্ত বল। বিদুর বললেন, যুধিষ্ঠিরের নিকট যে ব্রাহ্মণেরা এসেছিলেন, তাঁদের কাছে যা শুনেছি তাই বলছি।—পাণ্ডবরা এখান থেকে যাত্রা ক’রে তিন অহোরাত্র পরে কাম্যকবনে পৌঁছেছিলেন। ঘোর নিশীথে নরখাদক রাক্ষসরা সেখানে বিচরণ করে। তাদের ভয়ে তপস্বী গোপ ও বনচারিগণ সেই বনের নিকটে যান না। পাণ্ডবরা সেই বনে প্রবেশ করলে এক ভীষণ রাক্ষস বাহু প্রসারিত করে তাঁদের পথ রোধ ক’রে দাঁড়াল। তার চক্ষু দীপ্ত তাম্রবর্ণ, দশন প্রকটিত, কেশ ঊর্ধ্বগত হস্তে জ্বলন্ত কাঠ। তার গর্জনে বনের পক্ষী হরিণ ব্যাঘ্র মহিষ সিংহ প্রভৃতি সন্ত্রস্ত হয়ে পালাতে লাগল। দ্রৌপদী ভয়ে চোখ বুজলেন, পঞ্চপাণ্ডব তাঁকে ধ’রে রইলেন। পুরোহিত ধৌম্য যথাবিধি রক্ষোঘ্ন মন্ত্র পাঠ ক’রে রাক্ষসী-মায়া বিনষ্ট করলেন। যুধিষ্ঠির রাক্ষসকে প্রশ্ন করলেন, তুমি কে, কি চাও? রাক্ষস বললে, আমি কির্মীর, বক রাক্ষসের ভ্রাতা, তোমাদের যুদ্ধে পরাজিত ক’রে ভক্ষণ করব। যুধিষ্ঠির নিজেদের পরিচয় দিলে কির্মীর বললে, ভাগ্যক্রমে আমার ভ্রাতৃহন্তা ভীমের দেখা পেয়েছি, সে ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে মন্ত্রবলে আমার ভ্রাতাকে মেরেছে, আমার প্রিয় সখা হিড়িম্বকে বধ ক’রে তার ভগিনীকে হরণ করেছে। আজ ভীমের রক্তে আমার ভ্রাতার তর্পণ করব, হিড়িম্ববধেরও প্রতিশোধ নেব, ভীমকে ভক্ষণ করে জীর্ণ ক’রে ফেলব।

 ভীম একটি বৃক্ষ উৎপাটিত ও পত্রশূন্য করে হাতে নিলেন, অর্জুনও তাঁর গাণ্ডীব ধনুতে জ্যারোপণ করলেন। ভীম বৃক্ষ দিয়ে রাক্ষসের মস্তকে প্রহার করলেন, রাক্ষসও দীপ্ত অশনির ন্যায় জ্বালিত কাষ্ঠ ভীমের দিকে ছুঁড়ে মারলে। ভীম বামপদের আঘাতে সেই কাষ্ঠ রাক্ষসের দিকেই নিক্ষেপ করলেন। তার পর ভীম ও কির্মীর বলবান বৃষের ন্যায় পরস্পরকে আক্রমণ করলেন। ভীমের নিপীড়নে জর্জর হয়ে কির্মীর ভূতলে পড়ল, ভীম তাকে নিষ্পিষ্ট ক’রে বধ করলেন।

 কির্মীরবধের পর যুধিষ্ঠির সেই স্থান নিষ্কণ্টক করে দ্রৌপদী ও দ্রাতাদের সঙ্গে সেখানে বাস করছেন। আমি তাঁদের কাছে যাবার সময় মহাবনের পথে সেই রাক্ষসের মৃতদেহ দেখেছি।