রাজমালা (ভূপেন্দ্রচন্দ্র চক্রবর্তী)/চতুর্থ পরিচ্ছেদ/১৪

(১৪)

মুকুন্দমাণিক্য ও ইন্দ্রমাণিক্য

 ভ্রাতার মৃত্যুর পর সর্ব্বকনিষ্ঠ ভ্রাতা যুররাজ চন্দ্রমণি ঠাকুর মুকুন্দমাণিক্য নামে ১৭২৬ খ্রীষ্টাব্দে সিংহাসন আরোহণ করেন। তাঁহার জ্যেষ্ঠ পুত্র পাঁচকড়ি মুর্শিদাবাদে নবাবের নিকট রাজপ্রতিনিধিরূপে বাস করিতেন, এতদ্ব্যতীত রাণী প্রভাবতীর গর্ভে কৃষ্ণমণি ও আরও এক পুত্র জন্মিয়াছিল। অন্য রাণী রুক্মিণীর গর্ভে জয়মণি, হরিমণি, ভদ্রমণি নামে তিন পুত্র জন্মে।

 মুকুন্দমাণিক্য নিত্যানন্দবংশীয় বৃন্দাবনচন্দ্র গোসাই হইতে দীক্ষা গ্রহণ করেন এবং ইষ্ট দেবতা বৃন্দাবনচন্দ্রের মন্দির উদয়পুরে নির্ম্মাণ করেন।

 মুকুন্দমাণিক্যের রাজত্বকাল বড়ই দুঃখময়। ধর্ম্মমাণিক্যের শাসনকালে ত্রিপুরা রাজ্যের সমতল অংশ জমিদারীরূপে পরিণত হওয়ায় নবাবের ফৌজ তথায় স্থায়ী বসতি স্থাপন করিল, ইহাতে ত্রিপুরা রাজ্য অনেকটা কোণঠাসা হইয়া পড়িতে লাগিল। সে সময়ে ফৌজদার ছিলেন মহস্তন। হস্তিকর বাকী পড়ায় নবাবের দরবার হইতে লেখাপড়া চলিতে লাগিল, যুবরাজ পাঁচকড়িও এ সম্বন্ধে পিতাকে জানাইলেন কিন্তু তত সহসা হাতী ধরা গেল না। তাই ফৌজদার মহস্তনকে তাগিদ দিবার জন্য উদয়পুরে পাঠান হইল। মুকুন্দমাণিক্য সুবা রুদ্রমণি (জগন্নাথের প্রপৌত্র) ঠাকুরকে হাতী ধরিবার জন্য গভীর জঙ্গলে পাঠাইলেন কিন্তু ভাল হাতী ধরা পড়িল না। পার্ব্বত্য প্রজারা যখন বুঝিতে পারিল নবাবের দ্বারা মহারাজ শাসিত হইতেছেন তখন ইহাদের মধ্যে অসন্তোষের ভাব দেখা গেল। নবাবের শক্তি কত ইহার পরিমাণ না জানিয়া ফৌজদারসহ মোগল ফৌজটিকে মারিলেই দেশ অব্যাহতি পায় এইরূপ চিন্তা প্রবল হইল। তাহার ফলে রুদ্রমণিসুবা এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হইলেন এবং ফৌজ ধ্বংসের প্রস্তাব মহারাজের কর্ণে তুলিলেন। কিন্তু মহারাজ ইহাতে কোনমতেই সম্মত হইলেন না। বিশেষতঃ পাঁচকড়ি মুর্শিদাবাদে রহিয়াছেন।

 কিন্তু এই ষড়যন্ত্রের কথা ফৌজদার মহস্তন জানিতে পারিয়া ঝটিতি মুকুন্দমাণিক্য ও রাজপুত্র কৃষ্ণমণি প্রভৃতিকে বন্দী করিয়া ফেলিলেন। ত্রিপুর সৈন্য ক্ষেপিয়া গিয়া মোগল সৈন্যের সহিত সংগ্রাম বাঁধাইয়া দিল। মহারাজ মুকুন্দমাণিক্য এই দুঃসহ অপমানে বিষপানে প্রাণত্যাগ করেন। রাণী প্রভাবতী স্থানান্তরে ছিলেন, তাঁহার আসিতে সাত দিন বিলম্ব হইল, এই সময় রাজদেহ তৈলে ডুবাইয়া রাখা হইল। রাণী আসিতেই রুদ্রমণিসুবাকে রাজাসনে বসিবার আদেশ প্রার্থনা করা হইলে রাণী নিতান্ত অসার বলিয়া এ সকল উড়াইয়া দিয়া সহমরণ গমন করিলেন। কিন্তু রাজ্যলোভ বড় লোভ— রুদ্রমণিসুবা “জয়মাণিক্য” নাম গ্রহণপূর্ব্বক সিংহাসনে বসিলেন।

 মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্ত্তন-অভিলাষী হইয়া পাঁচকড়ি নবাবের অনুমতিগ্রহণক্রমে সে সময় দেশে ফিরিতেছিলেন, পদ্মা তীর অবধি পৌঁছিয়া অনুজ কৃষ্ণমণি ঠাকুরের পত্রে পিতার মৃত্যু ও রুদ্রমণিসুবার সিংহাসন অধিকার বৃত্তান্ত শুনিয়া পুনরায় মুর্শিদাবাদ ফিরিয়া গেলেন। নবাবের নিকট স্বীয় দুর্দ্দশার কাহিনী বর্ণনা করিলে নবাব পাঁচকড়িকে সৈন্য সাহায্য দিতে সম্মত হইলেন। পাঁচকড়ি সামরিক সাহায্যের বিনিময়ে নবাব হইতে সনন্দ গ্রহণ করিলেন, এই সনন্দ গ্রহণ দ্বারা ত্রিপুরার পার্ব্বত্য অংশে স্মরণাতীতকাল হইতে যে স্বাধীনতা বিরাজ করিতেছিল তাহার বিলোপ ঘটিতে বসিল। নবাব সৈন্যের সহিত পাঁচকড়ি আসায় জয়মাণিক্যের পরাজয়ে বিলম্ব ঘটিল না।

 জয়মাণিক্য স্বীয় পাত্র মিত্র মন্ত্রী লইয়া উদয়পুরের দক্ষিণে সরিয়া গেলেন এবং মতাই নামক স্থানে রাজপাট স্থাপন করিলেন; তথা হইতে পার্ব্বত্য দক্ষিণাংশ শাসন করিতে লাগিলেন। এদিকে ১৭৩৯ খৃষ্টাব্দে (১১৪৯ ত্রিপুরাব্দে) পাঁচকড়ি ইন্দ্রমাণিক্য নামে ঘোষিত হইয়া সিংহাসনে বসিলেন। অনুজ কৃষ্ণমণি যুবরাজ এবং গঙ্গাধর বড় ঠাকুর হইলেন। উদয়পুরের বিরোধী জয়মাণিক্যের শাসনে পার্ব্বত্য ত্রিপুরা দ্বিখণ্ডিত হইয়া পড়িল, ফলে উভয়ের মধ্যে প্রবল রেষারেষির সৃষ্টি হইল। যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হইয়া দাঁড়াইল, মেহেরকুলের জমিদার হরিনারারণ চৌধুরী প্রভৃতি কয়েকজন জয়মাণিক্যের পক্ষভুক্ত হইলেন কিন্তু নূরনগরের তালুকদারগণ ইন্দ্রমাণিক্যের পক্ষাবলম্বন করিলেন।

 তৎকালীন ঘটনা ষড়যন্ত্র হেতু জটিল, কাযেই সুখপাঠ্য নহে। ইন্দ্রমাণিক্যের পরাভব ঘটিল, যুবরাজ কৃষ্ণমণি প্রথমে কৈলাসহর পরে হেড়ম্বরাজ্যে চলিয়া যান। ইন্দ্রমাণিক্য প্রথম বয়স নবাব দরবারে কাটাইয়াছিলেন পুনঃ নবাব সান্নিধ্যে এ সময়ে মুর্শিদাবাদে চলিয়া আসিলেন। ভাগ্যবিপর্য্যয়ের লাঞ্ছনার মধ্যে তথায় গঙ্গাস্নান করিয়া পরম তৃপ্তি পাইতেন। ঢাকার নায়েব নাজিমের সহিত যোগাযোগ স্থাপন করিয়া জয়মাণিক্য যখন সমগ্র ত্রিপুরা অধিকারে প্রয়াসী ছিলেন তখন ধর্ম্মমাণিক্য-তনয় গঙ্গাধর নায়েব নাজিমকে বশীভূত করিয়া একদল সৈন্যসহ কুমিল্লা নগরে উপস্থিত হইয়া নিজকে “উদয়মাণিক্য” রূপে ঘোষণা করেন। এইরূপে মুসলমানদের সহায়তায় ত্রিপুরা সিংহাসনের দাবীদার বাড়িয়া চলিল। জয়মাণিক্য পুনঃ ঢাকার নায়েব নাজিমকে বশীভূত করিবার জন্য ঢাকার জগৎমাণিক্যকে প্রলোভন দিয়া জানাইলেন যদি তিনি নায়েবকে বশে আনিতে পারেন তবে তাহার ভ্রাতা নরহরিকে যৌবরাজ্য দিবেন। ষড়যন্ত্র সিদ্ধ হইল, নায়েবের সাহায্যে জয়মাণিক্য উদয়মাণিক্যকে বিতাড়িত করিলেন এবং কথামত নরহরি যুবরাজ হইলেন। এইরূপে ত্রিপুরার সিংহাসন ঘেরিয়া রাজ্যলোভের অপূর্ব্ব লীলা চলিতে লাগিল। মুসলমানদের সহায়তায় আর একবার ইন্দ্রমাণিক্য সিংহাসনে বসিয়াছিলেন এবং জয়মাণিক্য কারারুদ্ধ হইয়াছিলেন। কিছুকাল পরে আবার ইন্দ্রমাণিক্য জয়মাণিক্যের চেষ্টায় সিংহাসন হারাইয়াছিলেন। ইন্দ্রমাণিক্য মুর্শিদাবাদে চলিয়া যান এবং সেখানে মৃত্যুমুখে পতিত হন। এ দিকে জয়মাণিক্যও কালপ্রাপ্ত হন। উভয়ের বিবাদ বিসম্বাদের উপর মৃত্যু যবনিকা টানিয়া দিল, স্বাধীনতার জ্যোতিও যেন ঘন মেঘে বিদ্যুৎ চমকের ন্যায় মিলাইয়া যাইতে লাগিল।