রাজমালা (ভূপেন্দ্রচন্দ্র চক্রবর্তী)/তৃতীয় পরিচ্ছেদ/১০

(১০)

অমরমাণিক্য ও মঘরাজ

 সুখ দুঃখ বিধির বিধানে মানুষের ভাগ্যে চক্রবৎ পরিবর্ত্তিত হইতেছে। অমরমাণিক্যের জীবনের সুখের ভাগ ফুরাইয়াছিল এখন কেবলি দুঃখের ভাগ অবশিষ্ট রহিল। তাই তাঁহার শেষ কাল অনেকটা সাজাহানের মত। সাজাহানের ন্যায় তিনি সহসা পীড়িত হইয়া পড়িলেন আর অমনি পুত্রদের মধ্যে সাড়া পড়িয়া গেল সিংহাসন কাহার হইবে! রাজ্যের দূর প্রান্তে থাকিয়া যখন রাজধর শুনিলেন পিতার অসুখ অমনি তিনি সৈন্য সামন্ত লইয়া রাজধানী অভিমুখে যাত্রা করিলেন। মহারাজের শয্যাপার্শ্বে তখন কনিষ্ঠ পুত্র যুঝা সিংহ ছিলেন, তিনি বেগতিক দেখিয়া খড়্গ লইয়৷ হাঁকিয়া উঠিলেন—রাজধরের কি রাজ্যলোভ, পিতা বাঁচিয়া থাকিতেই সিংহাসনে বসিতে চায়? কি আস্পর্দ্ধা! এই হাঁক ডাক রাজার কানে গেল, তিনি শয্যায় উঠিয়া বসিলেন। প্রধান সেনাপতি ইষা খাঁকে দিয়া যাহাতে ভাইয়ে ভাইয়ে যুদ্ধ না বাঁধিয়া যায় তাহার ব্যবস্থা করিলেন এবং স্বয়ং সিংহাসনে বসিয়া এই সঙ্কট সময়ে রাজাদেশ প্রচার করিতে লাগিলেন। ইহাতে বিরোধের করাল ছায়া মিলাইয়া গেল বটে কিন্তু ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদ ঠিক মিটিল না, কেবল ভবিষ্যৎ সুযোগের প্রতীক্ষায় রহিল।

 কিছুকাল পরে মহারাজ সুস্থ হইয়া রীতিমত রাজকার্য্য চালাইতে লাগিলেন কিন্তু মনের শান্তি ফিরিয়া পাইলেন না। রাজধানীতে নানা গুজবের সৃষ্টি হইতে লাগিল, অযথা রটনা হইল দেবতার নিকট শিশু বলি দেওয়া হইবে, ঘরে ঘরে আতঙ্কের সৃষ্টি হইল। শিশুদিগকে লুকাইয়া রাখিতে লাগিল। মহারাজ শুনিয়া দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, “হায় হায়, এসব কি কথা, কে এই ভীতির সঞ্চার করিতেছে?”

 কুমারদের মধ্যে বিরোধের হেতু রাজ্যে গোল হইতেছে জানিয়া আরাকানপতি চট্টগ্রাম অঞ্চল আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হইতে লাগিলেন। বাণিজ্যের লোভে পর্ত্তুগীজেরা সেই অঞ্চলে ছড়াইয়া পড়িয়াছিল, আরাকানপতি ইহাদের সাহায্য প্রার্থনা করিলেন। পর্ত্তুগীজের নৌবহর সমুদ্র মোহনা হইতে কর্ণফুলি নদীতে ভিড়ান হইল, ইহাদের উৎকৃষ্ট আগ্নেয়াস্ত্র থাকার কথা বলাই বাহুল্য। সুতরাং মহারাজের প্রতিপক্ষরূপে য়ুরোপীয় একটি জাতিও দাঁড়াইল! এ সংবাদ অমরমাণিক্য যথা সময়ে জানিতে পারিয়৷ তদুপযোগী আয়োজন করিলেন। যুবরাজের মৃত্যুতে রাজধরই ভাবী রাজারূপে গণ্য হইতেন, তাই রাজধরকে সেনাপতিপদে বরণ করিতে বাধ্য হইলেন, তাঁহার অধীনে অপর দুই ভাই অমর ও যুঝা স্ব স্ব সৈন্য মিলাইয়া যুদ্ধ যাত্রা করিলেন। তিন ভাইয়ের সৈন্য একত্রিত হইলেও ইঁহাদের মনের মধ্যে পূর্ব্ববৎ পার্থক্য রহিয়া গেল। প্রত্যেকেই স্ব স্ব প্রধান ও নিজ নিজ কৃতিত্ব দেখাইতে তৎপর। এমন অবস্থায় যুদ্ধের ফল পূর্ব্বেই অবধারিত, এক্ষেত্রেও সেই বিষময় ফল ঘটিয়াছিল।

 ত্রিপুর সৈন্য চট্টগ্রাম পৌঁছিয়া স্থির করিল আরাকানপতিকে আক্রমণ করা দরকার, সেই মতে এক নিভৃত প্রদেশে কর্ণফুলি নদীর উপরে ভাসমান সেতু সৃষ্টি করিয়া নদী পার হইয়া ত্রিপুর সৈন্য মঘ রাজ্য প্লাবিত করিতে লাগিল। দেখিতে দেখিতে রাম্বূ, দেয়াঙ্গ প্রভৃতি স্থান জয় হইয়া গেল। মঘদের কৌশল রাজধর বুঝিয়া উঠিতে পারেন নাই। ত্রিপুর সৈন্য যখন বিজয় গর্ব্বে দিশাহারা হইয়াছিল তখন দেখা গেল মঘ ও পর্ত্তুগীজেরা তাহাদিগকে পেছন হইতে ঘিরিয়া ফেলিয়াছে, তাহারা বেড়াজালে আটক হইয়া পড়িয়াছে। নদী পার হইয়া তাহারা যে হঠকারিতার পরিচয় দিয়াছে তাহা তখন বুঝিতে কাহারও বাকী রহিল না। মঘেরা রসদের সব রাস্তা বন্ধ করিয়া দিল, ত্রিপুর সৈন্যের অন্নকষ্ট উপস্থিত হইল। খাদ্যাভাবে তাহারা পার্ব্বত্য জুমের খোঙ্গা আলু চিবাইতে লাগিল, অদ্যাপি সেই স্থানের পর্ব্বতকে খোঙ্গি শৈল কহে। মঘেরা তাহাদিগকে তাড়া করিয়া নদীতীরে আনিল, অনশনে উদ্বেগে তাড়া খাইয়া অনেকেরই প্রাণ বিয়োগ হইল, যাহারা প্রাণে বাঁচিল তাহারা নদী সাঁতরাইয়া এপারে আসিল।

 রাজধর বুঝিলেন মস্ত ভুল হইয়া গেল। কর্ণফুলি নদীর তীরে মাথায় হাত দিয়া নিজের শিবিরে বসিয়া পড়িলেন, দেখিতে দেখিতে সন্ধ্যার অন্ধকার ছাইয়া গেল। অনেক চিন্তার পর রাজধর স্থির করিলেন, রাত্রি থাকিতে থাকিতে গিরিবর্ত্ম-গুলিতে ঝোপের ফাঁকে ফাঁকে সৈন্য রাখিতে হইবে, যেন মঘেরা বিন্দুমাত্র টের না পায়। নিজের গড়খাই হইতে কিছুদূরে সৈন্য সজ্জা রাখা হইবে যেন মঘেরা মনে করে ত্রিপুর সৈন্য ইহার বেশী অগ্রসর হয় নাই; নিঃসঙ্কোচে যখন ইহারা পর্ব্বত হইতে নামিতে থাকিবে তখন সঙ্কেত পাইয়া ত্রিপুর সৈন্যেরা ইহাদের উপর লাফাইয়া পড়িবে। যেমন চিন্তা তেমন কাজ। সারারাত্রি ধরিয়া যুদ্ধের ফাঁদ পাতা হইল, মঘেরা বিজয়োল্লাসে পান ভোজনে মত্ত থাকিয়া কিছুই জানিতে পারিল না।

 পরদিন অতি প্রত্যূষে লড়াই বাঁধিয়া গেল। মঘেরা পাহাড় হইতে নামিতে গিয়া একেবারে টুকরা হইয়া গেল। দূরে ত্রিপুরসৈন্য ইহা দেখিয়া তাহাদিগকে তাড়া করিয়া আসিল, তৃতীয় কুমার অমর দুর্লভ সেনাপতিরূপে তাহাদিগকে চালনা করিয়া শৈলমূলে স্বীয় সৈন্যের সহিত মিলিত হইলেন। মঘেরা এই অতর্কিত আক্রমণে ভীত হইয়া পড়িল, তাহারা শ্রেণীবদ্ধ হইয়া যুদ্ধ করিবার পূর্ব্বেই কুমার অমরের চাপে একেবারে ছত্রভঙ্গ হইয়া যে যেদিকে পারিল পলায়ন করিল। অমর দুর্লভ তখন অশ্বারোহণে সৈন্য চালনা করিয়া শত্রুর পশ্চাৎ ছুটিলেন। রণমদে মত্ত হইয়া দুই জন মাত্র সওয়ার সাথে অমর দুর্লভ রাইপুর পর্য্যন্ত শত্রু হঠাইতে হঠাইতে গেলেন। রাজধর স্বীয় শিবিরে থাকিয়া আক্রমণকারী একদল মঘের সহিত লড়িলেন, তাহাতে প্রায় সহস্রাধিক মঘের পতন হইয়াছিল। ইহার পর আর কোন দিক হইতে মঘেরা তাঁহার সহিত লড়িতে আসে নাই।

 এদিকে দুপুর পার হইয়া গেল, সূর্য্যদেব ক্রমশঃই পশ্চিম গগনে পদার্পণ করিতে লাগিলেন তথাপি অমর দুর্লভের কোন খবর নাই। রাজধর বড়ই চিন্তিত হইলেন, তাঁহার দূতেরাও তাঁহার সম্বন্ধে সঠিক খবর দিতে পারিতেছিল না কারণ কুমার আগু হইয়া পড়িয়াছিলেন। সন্ধ্যা ঘনীভূত হইল, এমন সময় দেখা গেল তিনজন অশ্বারোহী বিদ্যুৎবেগে রাজধরের শিবির অভিমুখে আসিতেছে, যখন কাছে আসিল তখন রাজধরের বদন আনন্দে উৎফুল্ল হইয়া উঠিল। রক্তাক্ত তরবারী হাতে অমর দুর্লভ ঘোড়া হইতে নামিলেন আর অমনি রাজধর তাঁহাকে আলিঙ্গন করিলেন।