শিক্ষিতা পতিতার আত্মচরিত/পাপের পথে

পঞ্চম
পাপের পথে

 তারপর হইতে নানা খুটিনাটি লইয়া রমেশদার সহিত আমার প্রায়ই ঝগড়া হইতে লাগিল। হাতে নগদ টাকা যাহা ছিল, সমস্ত খরচ হইয়া গিয়াছে, মুকুলদার কাছে চিঠি দেওয়ায় তিনি পঞ্চাশ টাকা পাঠাইয়াছিলেন— তাহাও অতি কষ্টে। তিনি অল্প বেতনে সামান্য মাষ্টারী করেন। সেই পঞ্চাশ টাকার মধ্যে আটাশ টাকা রমেশদা মদ খাইয়া উড়াইয়াছেন। দুর্ভাগ্য যখন আসে তখন এমনই হয়। বেতন না পাইয়া বামুন ঠাকুরটি চলিয়া গিয়াছে। দুই বেলা আমিই রান্না করি। আমি রন্ধন কার্য্য জানিতাম না— কখনও শিখি নাই। অসুস্থ দেহ লইয়া আগুনের তাপে ও ধোঁয়ায় আমার প্রাণ যায় যায় হইয়া উঠিত।

 মথুরায় একটা কাজকর্ম্মের চেষ্টা দেখিতে বলিলাম। কিন্তু সে কথা রমেশদা গ্রাহ্য করিলেন না। শীতের জন্য এক সুট্, দামী পোষাক ছিল, তাহা বিক্রয় করিয়া কিছু টাকা সংগ্রহ হইল। ক্রমে ক্রমে আমার গহনাগুলিও বিক্রয় করিলেন। আমার বিমাতা জন্মদিনের উপহার স্বরূপ আমাকে যে একছড়া সোনার হার দিয়াছিলেন, তাহা আমি বিক্রয় করিতে দিব না বলিয়া লুকাইয়া রখিয়াছিলাম। এই অপরাধে আমার উপর খুব মারধর ও বকুনি হইল। আজকাল কথায় কথায় লাথি, চড়-চাপড় এসব আমার ভাগ্যে জুটিত। আমি কেবল কাঁদিয়া কাঁদিয়া তাহা সহ্য করিতাম।

 রমেশদা আমাকে একদিন বলিলেন, “কমলাকে কিছু পাঠাইতে চিঠি লেখ।” আমি বলিলাম, কমলা দরিদ্র ঘরের মেয়ে, সে টাকা পাইবে কোথায়?” ইহা লইয়া রমেশদা আমার উপর খুব রাগ করিলেন। আমি অগত্যা কমলাকে চিঠি লিখিলাম। সে কুড়িটাকা পাঠাইল। তাহাও কয়েকদিনেই ফুরাইয়া গেল!

 আমার দুই একখানা দামী কাপড় ও গহনা তখনও ছিল। রমেশদা নানা কৌশলে তাহা আমার নিকট হইতে নিয়া বিক্রয় করেন। কেবল সেই সোণার হারছড়া তখনও আমি দেই নাই। একদিন তিনি আসিয়া বলিলেন “মানু, বৃন্দাবনে প্রেম-মহাবিদ্যালয়ে একটা প্রফেসারী কাজ পেয়েছি। রাজা মহেন্দ্র প্রতাপের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে। লোকটা ব্রিটিশ গভর্ণমেন্টের ভয়ানক বিরোধী। আমারও সেইভাব, তুমিত জানই। রাজা খুব খুসী হলেন। আমাকে এখন মাসিক একশত টাকা বেতন দিবেন।” আমি শুনিয়া অতিশয় আহলাদিত হইলাম।

 রমেশদা চিন্তাকুল চিত্তে কহিলেন “একসুট পোষাক তৈয়ারী করা দরকার— কিন্তু টাকারই ত অভাব।” আমি বলিলাম, “আমার সোনার হারছড়া বাঁধা রেখে কিছু টাকা ধার কর, তারপর একমাসের বেতন পেলেই ছাড়িয়ে আনতে পারবে।” রমেশদা মুখ ফিরাইয়া গম্ভীরভাবে বলিলেন “না, তাও কি হয়, তোমার সৎমার স্নেহের উপহার।” আমি বুঝিলাম, সেদিনের ব্যাপারে আমার উপর এ অভিমান ও শ্লেখ। আমি তখনি জামার হাতবাক্স খুলিয়া রমেশদার কোলের উপর হারটা ফেলিয়া দিলাম। সেই হার বন্ধকে পাওয়া দেড়শত টাকা রমেশদার হাতেই খরচ হইয়াছে। অথচ প্রফেসারী চাকুরীর জন্য যে একসুট পোষাক তৈয়ারী করিবার কথা ছিল তাহা হয় নাই।

 আমার সন্দেহ হইল, চাকুরীর কথা মিথ্যা। আমার শেষ সম্বল হার-ছড়া হস্তগত করিয়া তাহা দ্বারা মদের মূল্য সংগ্রহ করাই রমেশদার উদ্দেশ্য ছিল। আমি একদিন জিজ্ঞাসা করিলাম “কবে থেকে প্রফেসারী আরম্ভ করবে? রমেশদা বেশ চতুরতার সহিত উত্তর করিলেন “রাজা মহেন্দ্রপ্রতাপ হঠাৎ বৃন্দাবন ছেড়ে চলে গেছেন। গভর্ণমেণ্ট তাঁর গ্রেপ্তারী পরওয়ানা বাহির করেছে। এইত হয়েছে এখন মুস্কিল।” পাছে আমার সন্দেহ হয়, সেইজন্য ‘হিন্দু নামক সংবাদপত্র হইতে পড়িয়া আমাকে রাজা মহেন্দ্রপ্রতাপের বিষয় শুনাইলেন।

 মথুরায়, বৃন্দাবনে তখন ঝুলনের উৎসব আরম্ভ হইয়াছে। আমি রমেশদাকে বলিলাম “চল একবার দ্বারকাধীশের মন্দিরে যাই।” তিনি বলিলেন “না, আমার শরীরটা ভাল লাগছে না। তুমি লছমনকে সঙ্গে নিয়ে যাও।” লছমন আমাদের চাকরের নাম। আমি বাহির হইয়া গেলাম। রমেশদা বাড়ীতে রহিলেন।

 ঝুলনের সময় মথুরার মন্দিরে মন্দিরে খুব আমোদ প্রমোদ হয়। দ্বারকাধীশের মন্দিরেই সর্ব্বাপেক্ষা বেশী। স্বর্ণ-রৌপ্য-মণ্ডিত বৃহৎ সিংহাসনে ঠাকুরকে বসাইয়া দোলান হয়। সমস্ত মন্দির আলোক, পুষ্পপত্র, পতাকায় সুসজ্জিত হইয়া এক অপূর্ব্ব শ্রী ধারণ করে। গায়কগণ সুললিত স্বরে ভজন গানে রত থাকেন। এই সকল দর্শন করিলে নানা দুঃখ ও বিপদের মধ্যেও শান্তির ভাব আসে।

 আমরা বিশ্রাম ঘাটের আরতি এবং আরও দুই তিনটী মন্দিরে ঝুলন দেখিয়া রাত্রি প্রায় ৯টার সময় বাড়ীতে ফিরিলাম। ঘরে যাইয়া দেখি রমেশদা নাই। আলো জ্বলিতেছে। শোবার খাটিয়ার উপরে একখানি চিঠি রহিয়াছে। পড়িয়া দেখিলাম তাহাতে এরূপ ভাবের লেখা ছিল—

 “মানু, তোমার সঙ্গে আর থাকা যায় না। তুমি আমায় চোর, লম্পট, মাতাল বলে ঘৃণা করতে আরম্ভ করেছ। যেখানে ঘৃণা ও সন্দেহ, সেখানে ভালবাসার স্থান নাই। আজ আমি তিন হাজার টাকা আফিসের ক্যাশে গুঁজে দিলেই আমার চোর অপবাদ ঘুচবে—আরও দু’চার দশটা মেয়ে বের করলেও, আমি সমাজে বুক ফুলিয়ে বেড়াব— আর মদ্যপান, সেত বড়লোকের লক্ষণ। তুমি নিজের ভাল বুঝলে না। তোমার আর উদ্ধার নাই। দেখব তোমার নব জাগ্রত নীতিজ্ঞান তোমাকে কতদূর রক্ষা করে। আমি চল্লাম—আমায় খুঁজোনা। পুলিশ আমার পিছু নিয়েছে। তুমি অবিলম্বে এই বাড়ী ছেড়ে যেও।”

 আমার হঠাৎ মনে হইল, একটা পর্ব্বত-প্রমাণ বোঝা যেন আমার মাথার উপর হইতে সরিয়া গেল। ডুবিতে ডুবিতে আমি যেন জলের উপরে নাক তুলিয়া একটু নিশ্বাস ফেলিয়া বাঁচিলাম। রমেশদার ব্যবহার আমার এত অসহ্য হইয়াছিল। আমি স্বাধীনতা চাহিয়াছিলাম, ভগবান বুঝি তাহারই পথ খুলিয়া দিলেন।

 রাত্রিতে রান্না খাওয়া হইল না। গভীর রাত্রিতে আমার মনে নানা দুশ্চিন্তা আসিল। এখন কি করি, কোথায় যাই। ভাবিলাম, দুর্ব্বল চিত্ত হইলে চলিবেনা। আনিদ্রায় রাত্রি কাটিল। সকালে উঠিয়া চারিদিকে চাইতেই রমেশদার জন্য দুঃখ হইল। চা তৈয়ারী করিলাম না। লছমনকে ডাকিয়া বলিলাম “আমি বৃন্দাবনে যাব, একখানি এক্কা অথবা টাঙ্গা ঠিক করে দাও।”

 আমার গহনার মধ্যে হাতে দুগাছা সোনার চুড়ী ও কাণে একজোড়া দুল মাত্র অবশিষ্ট ছিল। সে সমস্ত বিক্রয় করিয়া চাকরের তিনমাসের বেতন চুকাইয়া দিলাম। আমার হাতে কিছু টাকাও রহিল। সেই সময়ে কমলার একখানি চিঠি পাইলাম। সে লিখিয়াছে, “রমেশবাবুর সঙ্গে পলায়ন করা তোমার ভুল হইয়াছে। এ প্রকার প্রেমের মিলন যেমন হঠাৎ এসে পড়ে, বিচ্ছেদও তেমনি হঠাৎ হয়ে যায়। তোমাদের উভয়ের বিবাহে এমন বিশেষ কিছু বাধা ছিল না। তোমার পিতারও বোধ হয় অমত হ’ত না। এখনও তুমি ফিরে এসে ভ্রম সংশোধন করতে পার।”

 কমলার উপদেশ আমার ভাল লাগিল না। তাহার পত্রের কোন উত্তর দিলাম না। বৃন্দাবনে যাইয়া সেবা-কুঞ্জের নিকটে একখানি ছোট ঘর ভাড়া লইলাম। তাহার আশে পাশে আরও অনেক বাঙ্গালী স্ত্রীলোক বাস করিত, তাহাদের প্রায় সকলেই অধিক বয়সের বিধবা। আমি তাহাদিগকে বলিলাম, “মথুরায় থাকিতে আমার স্বামী ও শ্বাশুড়ীর কলেরায় মৃত্যু হইয়াছে। দেশে আত্মীয় স্বজনের নিকট চিঠি লিখিয়াছি।” সকলেই আমার জন্য দুঃখপ্রকাশ করিল।

 একমাস পরে আমি এই ঘর ছাড়িয়া কেশীঘাটের নিকট যাইয়া বাস করিতে লাগিলাম। হাতের সামান্য টাকা ফুরাইয়া আসিয়াছিল। ইতিমধ্যে একবার জ্বর হইয়া প্রায় দশদিন ভুগিয়াছিলাম। ভিক্ষা করিতে পারিলে আহারের অভাব হয় না, কিন্তু আমার শরীর এত দুর্ব্বল হইয়াছিল যে চলিতে পারিতাম না।

 দুইদিন কিছু খাই নাই। ভিক্ষা চাহিতে জানি না। বংশীবটের নিকট রাস্তার ধারে শুইয়া আছি। ভাবিতেছি, এখন মরণ আসিলেই বাঁচি। একজন বাঙ্গালী ভদ্রলোক যাইতেছিলেন, তিনি আমার দুরবস্থা দেখিয়া দয়ার্দ্র হৃদয়ে আমাকে সঙ্গে লইয়া গেলেন। ইনি এক সাধু মোহান্তের শিষ্য। মোহান্তজীর বৃহৎ আশ্রম— তাহাতে দেব-বিগ্রহ ও বহু শিষ্য-সেবকাদি রহিয়াছে। মোহান্তজী বাঙ্গালী। তাঁহার বয়স প্রায় ৬৫, মস্তকে জটা, আবক্ষলম্বিত দীর্ঘ শশ্রু—অঙ্গে চন্দন বিভূতি। তিনি আসনে বসিয়াছিলেন। আমাকে দেখিয়া শিষ্যকে বলিলেন “একে নিয়ে এসেছ কেন? এ যে অন্তঃস্বত্ত্বা। কোন দুষ্ট লোকের প্ররোচনায় পালিয়ে এসেছে, এখন সেই লোকটী সরে পড়েছে। এর অনেক কষ্টভোগ আছে। আচ্ছা, কিঞ্চিৎ ঠাকুরের প্রসাদ একে দাও।”

 আমি একটু সুস্থ হইলে তিনি আমাকে বলিলেন “মা, আমার এই আশ্রমে ত স্ত্রীলোক রাখবার নিয়ম নাই। বিশেষতঃ তুমি গর্ভবতী—সম্মুখে অনেক বিপদ। তুমি এখন কি করবে বল।” আমি কাঁদিয়া তাঁহার পা জড়াইয়া বলিলাম, “বাবা আমি মহাপাপী, আমায় উদ্ধার করুন। আপনি ত মনের কথা সবই জানেন।” মোহান্তজী বলিলেন “হাঁ, আমি সব জানি। তোমার মনের কথা তুমি যাহা না জান আমি তাহাও জানি। এই অনুতাপ ক্ষণস্থায়ী ও অপ্রকৃত। কামপ্রবৃত্তি একবার হৃদয়ের মধ্যে শিকড় গজাইয়া উঠিলে আর রক্ষা নাই। দুঃখ-দারিদ্র্য, রোগশোকে, সাময়িক বিচার-বুদ্ধিতে সেই পাপ বৃক্ষকে মাঝে মাঝে ছেদন করিয়া দেয়; কিন্তু আবার অনুকূল অবস্থায় নূতন অঙ্কুর জন্মে। একমাত্র ঈশ্বরের কৃপা ব্যতীত এই প্রলোভনকে স্থায়ীরূপে জয় করা যায় না। ইহার জন্য কঠোর সাধনার প্রয়োজন।”

 আমি অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে বলিলাম “আমায় ক্ষমা করুন, আমায় আশ্রয় দিন।” মোহান্তজী স্নেহপূর্ণ স্বরে কহিলেন “মা, অন্নবস্ত্র দেওয়ার দয়া তুমি অনেক পা’বে। সেই দয়ার অভাব সংসারে নাই। তোমাকে এখন যে আক্রমণ করেছে সে দারিদ্র্য নহে— সে তোমার দুর্দ্দমনীয় প্রবৃত্তি। সেই আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার আশ্রয় ত তুমি চাওনা, তোমার প্রার্থনা অন্নবস্ত্র ও বাসগৃহ। আচ্ছা, তুমি ঘরে ফিরে যাবে?”

 আমি সম্মতি জানাইলে তিনি আমার পিতার নাম ঠিকানা লিখিয়া লইলেন। পরে শিষ্যকে ডাকিয়া বলিলেন “কলিকাতায় চিঠি লেখ। আশ্রমের পাশের বাগানে রামকিষণ তাহার স্ত্রী ও ছোট দুইটী ছেলে নিয়ে আছে। তাদের সঙ্গে এ স্ত্রীলোকটীও থাকবে। সব ঠিক করে দাও।” শিষ্য চলিয়া গেলে তিনি আমাকে বলিলেন, “তোমার পিতা তোমায় পুনরায় গ্রহণ করবেন ব'লে, আমার মনে হয়না। তাঁকে ত সমাজ মেনে চলতে হচ্ছে। পাপ—প্রলোভনের বশীভূত হওয়া একটা আধ্যাত্মিক ব্যাধি। প্রায়শ্চিত্তের দ্বারা শুদ্ধ না হ’লে চিত্ত কিছুতেই ঈশ্বরাভিমুখী হ’তে পারেনা।”

 রামকিষণের পরিবারের সহিত আমি আশ্রমের বাগানে বাস করিতেছি। রামকিষণ বাগানের তত্ত্বাবধান করে। প্রত্যহ গোয়ালঘর পরিষ্কার করা, তিনটী গাভী ও কয়েকটী বাছুরকে খৈল, ভূষি, খাওয়ান, দশ বার কলসী জল ইন্দারা হইতে তুলিয়া বাগানে দেওয়া, ঠাকুরের ভোগ রান্না করিবার পাত্রাদি মাজা, সাধুদের ভোজন হইয়া গেলে সেই স্থান পরিষ্কার করা, আমার নিজের আহারের জন্য গম পিষিয়া লওয়া আমার নিত্য কর্ত্তব্যরূপে নির্দ্ধারিত হইয়াছিল। আমি সন্তুষ্টচিত্তে এই সকল কার্য্য করিতাম। কিন্তু আমার বড় পরিশ্রম বোধ হইত। মোহান্তজীর নির্দেশ অনুসারে আমার মাথার চুল ছোট করিয়া কাটিয়া ফেলা হইয়াছিল। কেবলমাত্র প্রভাতে মঙ্গল আরতির সময় আমি মন্দির প্রাঙ্গণে যাইবার অনুমতি পাইয়াছিলাম। মোহান্তজী বাগানে আসিলে প্রয়োজন মত আমার সহিত কথাবার্ত্তা বলিতেন।

 একমাস পরে আমার পিতার চিঠি আসিল। তিনি মোহান্তজীকে জানাইয়াছেন যে তিনি আমাকে গ্রহণ করিতে পারেন না। এমন কন্যাকে তিনি মৃতার ন্যায় জ্ঞান করেন। তখন ত‌র্ক করিবার বুদ্ধি আমার ছিল না। আমার শরীর ও মন দুর্ব্বল হইয়া পড়িয়াছিল। কিন্তু আজ আমি পিতার কথার উত্তর দিতে পারি। আমার এই আত্মচরিত লেখা আরম্ভ করিবার কিছুদিন পূর্ব্বে গত ঝুলনের সময় আমি বৃন্দাবনে গিয়াছিলাম। সেখানে মোহান্তজীর সঙ্গে আমি পুনরায় সাক্ষাৎ করি। তাহার বিবরণ যথাস্থানে লিখিব। তখন তাঁহাকে বলিয়াছিলাম “বাবাজী, আমি মহাপাপী, সমাজে আমার স্থান নাই— পিতা আমায় পরিত্যাগ করিয়াছিলেন। কিন্তু আমার মত পাপরতা, পতিতা নারীর পদতলে যে সকল পুরুষ তাহাদের মান, মর্য্যাদা, অর্থসম্পত্তি, দেহমন বিক্রয় করেছে, ঐ দেখুন, তাদেরে সমাজ মাথায় তুলে রেখেছে— তারা কবি ও সাহিত্যিক বলিয়া প্রশংসিত, রাজনীতিক ও দেশসেবক বলিয়া বিখ্যাত— ধনী ও প্রতিপত্তিশালী, বলিয়া সম্মানিত। এমন কি অনেক ঋষি-মোহান্তও গুরুগিরি ফলাইয়া সমাজের শীর্ষস্থানে অধিষ্ঠিত আছেন, তাহা সমাজ জানিয়া শুনিয়াও নীরব। কোর্টে, কাউন্সিলে, করপোরেশনে, গুরুগিরিতে কোথাও তাদের কোন বাধা নাই। আর আমরা কবে বালিকা-বয়সের নির্ব্বুদ্ধিতার জন্য এক ভুল করে ছিলাম, তার ফলে এই বার-বৎসর ধরে, জ্বলে পুড়ে মরছি। এই ত আপনাদের সমাজের বিচার!”

 তিনমাস অতীত হইয়া গেল। একদিন মোহান্তজী বাগানে আসলে নামকিষণ তাঁহাকে বলিল, “বাবা, এ যে পোয়াতী মেয়ে, এত খাটুনীতে পেটের ছেলেটার কোন কিছু না হয়।” আমি তখন নিকটেই বসিয়া গোবরের ঘুঁটে তৈয়ার করিতে ছিলাম। মোহান্তজী বলিলেন “পেটের ছেলে কি আর বেঁচে আছে! এখন কোনরূপে প্রসব হয়ে গেলে ভাল। এইটুকু পরিশ্রম না করলে শরীর খারাপ হয়ে যাবে যে।” রামকিষণ আশ্চর্য্য হইল। মোহান্তজী বলিলেন “মেয়েটার দেহে কুৎসিত ব্যাধি প্রবেশ করেছে। প্রবৃত্তির উত্তেজনায় মানুষ স্বাস্থ্যবিধিও ভুলে যায়।”

 যথা সময়ে আমি একটী মৃত পুত্র প্রসব করিলাম। রামকিষণের স্ত্রী আমার সেবাশুশ্রূষায় রত হইল। এই সরল প্রকৃতি অশিক্ষিতা কৃষকরমণীর মাতৃসম স্নেহের কথা আমার চিরদিন মনে থাকিবে। কিছুদিন পূর্ব্বে যখন পুনরায় বৃন্দাবনে গিয়াছিলাম, তখন রামকিষণের স্ত্রীর খোঁজ করিয়াছিলাম। কিন্তু শুনিলাম আমি যাইবার আটমাস পূর্ব্বে তাহার মৃত্যু হইয়াছে।

 সন্তানপ্রসবের পর আমার নানা রোগ দেখা দিল। কিছু খাইতে পারিতাম না। সন্ধ্যার সময় অল্প জ্বর হইত। সঙ্গে সঙ্গে পেটের অসুখ। আমি একেবারেই শয্যাশায়ী হইয়া পড়িলাম। মোহান্তজী যথাসম্ভব আমার চিকিৎসার ব্যবস্তা করিয়াছিলেন। প্রায় চারিমাস ভুগিয়া আমি কিঞ্চিৎ সুস্থ হই। এই সময়ে একদিন রাত্রিশেষে আমি বিছানায় পড়িয়া মাথার যন্ত্রনায় ছটফট করিতেছিলাম। আমার মনে হইল আমি যেন আমাদের কলিকাতার বাড়ীতে আছি। মা আমার কাছে বসিয়া আমার মাথায় হাত বুলাইতেছেন। আমি ঘুমের ঘোরে বললাম “মা তোমরা যে থিয়েটারে যাবে, আমায় সঙ্গে নিয়ে চল।” মা বলিলেন “না,—তুই এখন ছেলে মানুষ।” তারপর কে আসিয়া, মাকে ডাকিল। মা উঠিয়া গেলেন। আমি চীৎকার করিয়া বলিলাম “মাগো– আমায় নিয়ে যাও,”— রামকিষণের স্ত্রী পাশের ঘর হইতে ছুটিয়া আসিল। আমি তখনও কাঁদিয়া বলিতেছি “মাগো, আমায় নিয়ে যাও গো।” এই স্বপ্নের কথা আমি মহান্তজীকে বলিয়াছিলাম। তিনি শুনিয়া বলিলেন, “তোমাকে আরও অনেক ভুগতে হবে।” আমি দীক্ষা গ্রহণ করিতে চাহিলাম। তিনি বলিলেন “মা, আমি দৈবকে অতিক্রম করতে পারিনা। দীক্ষা নেবার তোমার এখনও সময় হয় নাই।”

 আরও ছয় সাত মাস গেল। আমার আশ্রম বাস প্রায় এক বৎসর হইল। শরীর একটু ভাল হইয়াছে, এখন শ্রমের কার্য্যও নিয়মমত করিতে পারি। মোহান্তজীর শিষ্যদের মধ্যে কেহ কেহ নির্দ্দিষ্ট সময়ে বাগানে যাইয়া ঠাকুরের ভোগের জন্য তরীতরকারী ফলমূল শাকসব্জী লইয়া আসিতেন। ইহাদের একজনের সহিত কোন কথা প্রসঙ্গে আমার কুদৃষ্টি দূর হইতে মোহান্তর্জী লক্ষ্য করেন। আমি যদিও তাঁহার প্রতি কুভাবে আসক্ত হইয়াছিলাম কিন্তু তিনি ছিলেন নির্ম্মল চরিত্র। তবুও তদবধি তাঁহাকে আর বাগানে পাঠান হইত না।

 আমি এক দীর্ঘ প্রেমপত্র লিখিয়া তাঁহাকে দিবার জন্য এক দিন বেলা প্রায় দুইটার সময় আশ্রমে প্রবেশ করি। জানিতাম, তখন মোহান্তজী তাঁহার আসনে ধ্যানস্থ থাকেন। আশ্রমপ্রাঙ্গণে একটী বৃহৎ বৃক্ষের তলায় আমি দাঁড়াইয়াছিলাম। হঠাৎ দেখিলাম, মোহান্তজী আমার দিকে আসিতেছেন। আমি ভীত হইলাম। তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন “এ সময়ে তুমি আশ্রমে এসেছ কেন? এখন তোমার আসিবার কথা নয়!” আমি কিছু মাত্র ইতস্ততঃ না করিয়া তখনই উত্তর দিলাম, “শ্যামলী গাইয়ের বাছুরটা এইদিকে ছুটে এসেছে।” মোহান্তজী গম্ভীর স্বরে অঙ্গুলি নির্দ্দেশ করিয়া বলিলেন “বাহিরে যাও– বাছুর এখানে আসেনি। এলেও সে রামকিষণের কাজ— তোমার নয়—”।

 পরদিনই মোহান্তজী আমাকে ডাকিলেন। আমি সভয়ে তাঁহার সম্মুখীন হইলাম। তাঁহার নিকটে আর একজন প্রৌঢ় বাঙ্গালী ভদ্রলোক বসিয়াছিলেন। মোহান্তজী আমাকে বলিলেন “তোমাকে আজই এই ভদ্রলোকটীর সঙ্গে কলিকাতায় যেতে হবে। সেখানে ইনি তোমার সকল ব্যবস্থা করে দিবেন।” আমি মনে মনে সুখী হইলাম।

 মোহান্তজী সাংসারিক জীবনে একজন উচ্চ পদস্থ ব্যক্তি ছিলেন। সেই সূত্রে তাঁহার অনেক বন্ধু বৃন্দাবনে যাইয়া তাঁহার সহিত দেখা সাক্ষাৎ ও ধর্ম্মালোচনা করিতেন। যে ভদ্র লোকটার সঙ্গে আমি কলিকাতায় আসিলাম, তিনি মোহান্তজীর বন্ধু। তাঁহার গৃহে আমি প্রায় দশ দিন অবস্থান করি।

 কলিকাতা নগরের উপকণ্ঠে কোন স্থানে শ্রীযুক্ত— দাস একটী নারী— উদ্ধার-আশ্রম স্থাপন করিয়াছিলেন। তিনি একজন আইন ব্যবসায়ী। দেশকর্ম্মী বলিয়াও প্রসিদ্ধ। মোহান্তজীর বন্ধু সেই প্রৌঢ় ভদ্রলোকটী আমাকে নারী-উদ্ধার-আশ্রমে রাখিয়াছিলেন। শ্রীযুক্ত দাসের সহিত ইঁহার বিশেষ পরিচয় ছিল।

 আমার জীবনের ইতিহাসের এক অধ্যায় শেষ হইল। পিতার অনাদর, কুশিক্ষা ও কুসংসর্গ আমাকে পাপের পথে আনিয়াছে। আমি কখনও সংযম শিখি নাই। প্রবৃত্তির অনলে কেবল ইন্ধন যোগাইয়াছি। গল্প, উপন্যাস পাঠ করিবার ফলে সমাজ শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ভাবই কেবল আমার মনের মধ্যে বদ্ধমূল হইয়াছে। উত্তেজনার বশে কার্য্যের পরিণামের দিকে দৃষ্টি যায় নাই।

 পতিতা নারীদের মধ্যে যাহারা এইরূপে পর-পুরুষের অবৈধ প্রেমে আকৃষ্ট হইয়া কুপথে আসে, তাহাদের সকলের ভাগ্যেই এই দশা ঘটে। সেই পুরুষটী অবোধ বালিকার সর্ব্বনাশ করিয়া অল্প সময়ের মধ্যেই তাহাকে ছাড়িয়া যায়। এমন কোন পতিতা নারী নাই, যে আমরণ তাহার প্রথম প্রণয়ীর সহিত বাস করিতেছে। অভিজ্ঞতা হইতে ইহার যুক্তিসঙ্গত কারণ আমি দেখাইয়া দিতেছি।

 অবৈধ প্রেম উত্তেজনার বশেই জন্মে। উত্তেজনা মাত্রই ক্ষণস্থায়ী ও তাহা কদাচ বিচার বুদ্ধি প্রসূত নহে। সুতরাং যে প্রেম অল্পেতেই জন্মে— তাহা অল্পেতেই বিনাশ প্রাপ্ত হয়। এই প্রকার অবৈধ প্রেমে মিলিত নারীপুরুষের বিচ্ছেদের কারণ— একের বা উভয়েরই দোষ অথবা অবস্থার পীড়ন। অর্থাভাব, গর্ভসঞ্চার, রূপ-বিকৃতি, এই সব হইল অবস্থার পীড়ন। মদ্যপানের অভ্যাস, অপরের প্রতি আসক্তি এই সব হইল নারী পুরুষের দোষ।

 আমাদের ব্যাপারে দুই-ই ঘটিয়াছিল। রমেশদার মদ্যপান ও আমার অসময়ে সন্তান সম্ভাবনা আমাদের বিচ্ছেদের কারণ। যদি রমেশদা হিন্দুর সামাজিক রীতি অনুসারে আমাকে বিবাহ করিয়া আমার স্বামী হইতেন, তবে তিনি কখনই আমাকে পরিত্যাগ করিতে পারিতেন না। আর কিছু না হউক— শেষকালে একটা আইনের ভয়ও থাকিত— লোকলজ্জা ও সমাজ শাসন না হয় ছাড়িয়াই দিলাম। অবৈধ প্রেমে যেমন মিলনের স্বাধীনতা আছে— তেমনি বিচ্ছেদের স্বাধীনতাও আছে। তাই রমেশদা অনায়াসে আমাকে ছাড়িয়া গেলেন। রমেশদাকে প্রশংসাই করিব। আমিই হইয়াছি নিন্দার ভাগী। রমেশদা আমাকে শেষ কথা সত্যই বলিয়া গিয়াছেন।

 তারপর, এত দুঃখ ভোগ করিয়াও আমার শিক্ষা হয় নাই। মোহান্তজীর আশ্রমে এমন পুণ্যের বাতাসের মধ্যে থাকিতেও দুষ্প্রবৃত্তির অঙ্কুর আবার আমার হৃদয়ে দেখা দিয়াছে। সয়তানের প্রলোভন সুখ-স্বর্গের ছবি লইয়া আমার সম্মুখে আসিল। আমি তাহাতে মুগ্ধ হইলাম।